লেকচার নোট: বায়ো কলোনিয়ালিজম পরিচয়

বায়োকলোনিয়ালিজমের ধারণাটি পুরনো হলেও এটি নিয়ে খুব আলোচনা অদ্যাবধি বেশি হয় নি। কৃষিতে পড়ার সুবাদে একটি হাইব্রিড জাতের শস্যের বীজ দুইবার চাষ করতে না পারার কথা আমি শিখেছি এবং বুঝেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এই হাইব্রিড দিয়ে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাকে কোন একটা গোষ্ঠী তাদের কুক্ষিগত করে ফেলছেনা তো? শ্রদ্ধেয় সাইমুম রেজা পিয়াস ভাইয়ের সাথে আলাপকালে প্যাটেন্ট নিয়ে কিছুটা কথা হয়। প্যাটেন্ট আদতে মানবজাতির জন্য কতটুকু আশীর্বাদ স্বরূপ নাকি এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সংকট এটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্যাটেন্টের নামে যে বিপুল পরিমাণ জৈববৈচিত্র হারিয়ে যাচ্ছে এবং লোকায়ত জ্ঞান ও সম্পদ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে সেটি একবারে দিবালোকের মত সত্য। এই সমস্ত ব্যাপার অনুসন্ধান করতে গিয়েই বায়োকলোনিয়ালিজম নিয়ে পড়া এবং সবার সাথে শেয়ার করতে চাওয়া।

বায়োকলোনিয়ালিজম- অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ সম্ভবত মানবজাতির কিছু অংশের চিরন্তন স্বভাব। এ থেকেই আমরা কলোনিয়ালাইজেশনের যুগে সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ দখল, দ্বীপ দখল ইত্যাদি দেখি। সরাসরি ঔপনিবেশিক যুগ শেষ হওয়ার পর আমরা দেখি কিভাবে পরোক্ষভাবে আমাদের সম্পদ, কাঁচামাল, মেধা ইত্যাদি অন্য দেশের হয়ে যাচ্ছে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেটি সহজে চোখে পড়ার মত নয়। খুব সহজ করে বললে, দুর্বল দেশগুলোর প্রাণবৈচিত্র্য, উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, শস্য বীজ থেকে শুরু করে জিন পর্যন্ত বেদখল হয়ে যাচ্ছে কর্পোরেট আগ্রাসনে। প্রযুক্তিতে উন্নত দেশগুলো কর্তৃক অনুন্নত কিন্তু জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশগুলোর হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী জেনেটিক সম্পদ ও লোকায়ত জ্ঞানকাঠামোর এই লুণ্ঠনকেই বায়োকলোনিয়ালিজম বলা হয়।

বায়োকলোনিয়ালিজম বা প্রাণ উপনিবেশিকরণ বুঝার আগে বুঝতে হবে জার্মপ্লাজম সম্পর্কে। রাশিয়ান বিজ্ঞানী ভ্যাভিলভ এর কথা আমরা জানি যিনি সর্বপ্রথম ব্যাপকভাবে জার্মপ্লাজম সংগ্রহের গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলেন এ কারণে তিনি পৃথিবী ঘুরে তিনি প্রচুর উদ্ভিদ, সবজি ও ফলমূল সংগ্রহ করেন। কিছু কুটিল মানুষের চক্রান্তের কারণে তাঁকে স্ট্যালিনের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। তাঁকে এবং তার দলকে তাঁদের পুরো সংগ্রহসমেত বন্দিশালায় আটক করা হয়। একসময় খাদ্যের অভাবে সবাই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ভ্যাভিলভের কথা।

উদ্ভিদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একে শত শত বছর ধরে সংরক্ষণ করা যায় হুবহু এর গুণাগুণ ‍ঠিক রেখে। ভবিষ্যতে যাতে প্রয়োজনে আবার ব্যবহার করা যায় এ কারণে উন্নত ব্যবস্থায় বীজ বা উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ কিংবা ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়। সংরক্ষণ করতে গেলে আগে প্যাটেন্ট রাখতে হয়। কিন্তু আমাদের অজান্তেই আমাদের বহু পুরনো জাতের উদ্ভিদ ও শস্যের প্যাটেন্ট উন্নত বিশ্ব নিয়ে নিয়েছে সার্ভে করার নামে, বিভিন্ন প্রকল্প বিনিয়োগের নামে।

Collect Information

Collect Information

মূলত বায়ো কলোনিয়ালিজম শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দিতে যখন প্যাটেন্ট ধারণার সূত্রপাত হয়। মেধাস্বত্ব বা প্যাটেন্ট  এর অধিকার  নিশ্চিত করা হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‍ট্রিপস চুক্তির মাধ্যমে। Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights এর ২৭ নং অনুচ্ছেদে প্যাটেন্ট এর অধিকারের কথা বলা হয়েছে।  বলা হয়েছে, Patents shall be available and patent rights enjoyable without discrimination as to the place of invention, the field of technology and whether products are imported or locally produced. এবং এ চুক্তির সেকশন ৮ এ বলা হয়েছে প্যাটেন্ট থাকবে শুধুমাত্র সরকার, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও কন্টাক্ট কৃষকদের। অর্থাৎ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল যে কৃষক শত বছরের পরম্পরা অনুসারে যে  জাতের ধান চাষ করেছেন হঠাৎ করেই তিনি একদিন দেখলেন সেই জাতটি আর তার নেই।

বায়োকলোনিয়ালাইজেশন হয় দুই ভাবে-

১) পণ্যকরণ ও বাণিজ্যিকীকরন এর মাধ্যমে জীবসম্পদ ও উদ্ভিদসম্পদের বৈচিত্রতা বেহাতকরণ
২) দেশে দেশে নিওলিবারেল পলিসির আগ্রাসী বাস্তবায়ন

যেভাবে পণ্যকরণ করা হয়- প্রথমে বিভিন্ন দেশঘুরে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো সার্ভে করার নামে বিভিন্ন লোকাল জাতের বীজ, উদ্ভিদ ইত্যাদি সংগ্রহ করে। তারপর তাদের উন্নত প্রযুক্তির ল্যাবরেটরীতে সেই উদ্ভিদ এর জেনেটিক কোড বা সিকোয়েন্স বের করা হয়। এবং প্যাটেন্ট এর আবেদন করা হয়। একবার প্যাটেন্ট পেয়ে গেলে সেটি নিয়ে আর প্রকৃত মালিক কাজ করতে পারেননা খুব সহজেই। ওটা নিয়ে কাজ করতে চাইলে চড়া দামে সেই উদ্ভিদের স্যাম্পল কিনতে হবে। উন্নত বিশ্ব আর একটি কাজ করে, সেটি হল ন্যাচারাল শস্যটাতে কিছু একটা উপাদান বাইরে থেকে সংযোজন করে (যেমন ভিটামিন এ, জিংক ইত্যাদি) একে জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম নামে বাজারে ছেড়ে দেয় সেই শস্যটি যেটি কৃষক তাঁর মাঠে বছরের পর বছর ধরে চাষ করে আসছিল। এতে করে জমিতে কৃষক তার মালিকানা হারিয়ে ফেলে। তাঁকে শৃংখলিত হতে হয় বুর্জোয়া কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে।

আগ্রাসী নিওলিবারেল পলিসি- বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অর্থনৈতিক দর্শন হচ্ছে নিওলিবারেল পলিসি যার যার মূল কথা হচ্ছে বাণিজ্য উদারীকরণ এর মাধ্যমে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে উন্নত বিশ্ব কর্তৃক  অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের বাজার দখল করা। ডব্লিউটিও’র গ্যাট (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড এন্ড ট্যারিফ) অথবা গ্যাটস (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড ইন সার্ভিসেস) এর অন্যতম উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক খাতকে বৈশ্বিক ভাবে উদারীকরণের দিকে নিয়ে যাওয়া এবং সংস্কারের নামে বাণিজ্য সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণশীল বাধা সমুহ দূর করে অনুন্নত দেশের অর্থনীতিতে বৃহৎ কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য পাকাপোক্ত করা। আর বাণিজ্য সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় বাধাসমূহের মধ্যে রয়েছে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক । ফলে ডব্লিউটিও চায় এসব শুল্ক প্রত্যাহার। ডব্লিউটিও কর্তৃক দরিদ্র দেশগুলোকে আমদানি শুল্ক কমানো অথবা প্রত্যাহার করতে বলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এসব দেশের বাজার বহুজাতিক কর্পোরেশনের পণ্যে সয়লাব করা এবং স্থানীয় উৎপাদন কাঠামো ভেঙ্গে ফেলে নিরঙ্কুশ অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করা ।এর চাক্ষুষ ফলাফল হচ্ছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ধ্বস। কৃষককে মূলত বাধ্য করা হয় নির্দিষ্ট কোম্পানির হাইব্রিড জাতের শস্য চাষ করতে । এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে একসময় প্রায় ১৮০০ জাতের ধান চাষ হত। কিন্তু এখন প্রায় ৭৫% জমিতে মাত্র ১০ টি জাতের ধানের চাষ হয়। এটা সত্যি যে, ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে আমাদেরকে হাইব্রিড চাষ করতে হচ্ছে, আবার এটাও সত্যি যে, যে পুরো বিশ্বের বীজ ভান্ডারের ৬৪ শতাংশ মাত্র ১০ টি জায়ান্ট কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে কুক্ষিগত রয়েছে। পৃথিবীর ৮১% এগ্রিবিজনেস তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ খুব কৌশলে পুরো বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থা একটা সিন্ডিকেটের অধীনে আছে। যেকোন সময় চাইলেই তারা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে খুব সহজেই মানবজাতির জন্য।

জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম: বায়োকলোনিয়ালিজমের অন্যতম হাতিয়ার

বীজ নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির যে রাজনীতি তার নিষ্করুণ শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্য! ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস (বিটি) বেগুন চাষের অনুমোদন দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সরকার। জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) আলুর ফিল্ড ট্রায়াল চলছে বাংলাদেশে, এই জিএম আলু প্রকল্প হচ্ছে মার্কিন সংস্থা USAID এর অর্থায়নে,এদেশের শস্যবীজের উপর মার্কিন কোম্পানির মনোপলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই হবে যাদের মূল উদ্দেশ্য। জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ধান গোল্ডেন রাইস, জিএম টমেটো, জিএম তুলাও আনার প্রক্রিয়া চলছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন বহুজাতিক এগ্রো করপোরেশনের জিএম বাণিজ্যের উর্বর ভূমিতে পরিণত হচ্ছে। এভাবে একে একে কৃষিতে বীজ আগ্রাসন আমাদের হাজার বছরের বীজবৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে। ফলন বৃদ্ধির নামে বীজ মালিকানা নিজের দখলে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে এগ্রো জায়ান্টরা! ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালে সম্পাদিত ‘বিটি বেগুন প্রকল্পের’ নামে মনস্যান্টো বাংলাদেশের নয়টি বেগুন জাত ছিনতাই করেছে। বিটি প্রযুক্তির মালিক মনসান্তো-মাহিকো হওয়ায় এবং এই দুই কোম্পানির কারিগরি সহায়তা ও মার্কিন সংস্থা USAID এর অর্থায়নে এই প্রকল্প চালু হওয়ায় তার মালিকানা কোম্পানির হাতেই থাকবে। এর ফল হল প্রত্যেক বছর এইবীজ আপনাকে কিনে আনতে হবে যেটিকেই বলা হচ্ছে বায়ো কলোনিয়ালিজম। কলোনিয়ালিজমের সেই প্রেতাত্মা যেখানে সম্পদ আপনার কিন্তু ব্যবহার করবে অন্যরা আর আপনাকেই তাদের পণ্য কিনতে হবে চড়াদামে।

ইতোমধ্যে আমরা অনেক কিছুর প্যাটটেন্ট হারিয়েছি। উদাহরণস্বরূপ, ফজলি আম, প্রচুর দেশি জাতের ধান, কিছু বেগুনের জাত, কিছু গমের জাতি ইত্যাদি। নিত্যই হাতছাড়া হচ্ছে অনেক জীববৈচিত্র। ১৯৯১ সালে USDA সার্ভে করার নামে আমাদের কাছ থেকে নিম গাছের কীটনাশক অ্যাজাডিরাকটিন এর প্যাটেন্ট হাতিয়েছে। এরকম বেশুমার উদাহরণ রয়েছে। আমাদের মানসিকতার দৈন্য দশার কারণে  অজান্তেই আমাদের লোকায়ত জ্ঞান ও সম্পদ বিদেশিদের কাছে চলে যাচ্ছে।

উত্তরণের উপায় কি?

অনুন্নত দেশগুলোর ট্র্যাডিশনাল বীজ, হারবাল মেডিসিন, জ্ঞানকাঠামো এবং প্রাণবৈচিত্র্যের এই লুণ্ঠন ও প্যাটেন্টকরণ বন্ধ করতে হবে। দেশীয় পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। গবেষণায় বাজেট বাড়িয়ে ব্রেইনড্রেইনের পরিমাণ কমাতে হবে। সর্বোপরি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে একজোট হয়ে রাজপথে ও আলোচনার টেবিলে দাবি আদায়ে সোচ্চার হতে হবে।

তথ্যসূত্র-

১. জোবায়ের আল মাহমুদ, বায়োকলোনিয়ালিজম এবং খাদ্য রাজনীতিঃ টার্গেট বাংলাদেশ

২.Spivak, G. (2000). The New Subaltern: A Silent Interview. In: Chaturvedi, V. ed. Mapping subaltern studies and the postcolonial. London, Verso. pp. 324-340
২। Butt, H. (2012). “Cultural symbols, biocolonialism and the commodification of rural and indigenous bodies”.
৩। Greenfield, G. (1999). “The WTO, the world food system, and the politics of harmonised destruction”,

৪। McMichael, P. (1995). “The ‘new colonialism’: Global regulation and the restructuring of the inter-state system.” In D. Smith and J. Borocz (eds.), A New World Order? Global Transformations in the Late Twentieth Century (pp. 37–56). Westport: Greenwood Press.

৫। McMichael, P. (2000). “The power of food”. Agriculture and Human Values 17:21-33.

-সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ

শিক্ষার্থী, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Related Posts

About The Author

Add Comment