বিজেপি : সাংগঠনিক পাঠ্য ও বিভ্রান্তি

ভারতীয় জনতা পার্টি বা “বিজেপি” দলটির সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত। ভারতের মত “অসাম্প্রদায়িক” (ভারতের দাবি) দেশে দলটি গণমানুষের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বেশ কয়েকবার।
বিজেপি সম্পর্কে নানা খবরই আগ্রহ নিয়ে পাঠ করলেও আমার এ রচনার উদ্দেশ্য বিজেপির আদর্শিক পাঠ্যসূচি নিয়ে।

বিজেপি গঠিত হয় ১৯৮০ সালে,কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের “ভারতীয় জনসংঘ” থেকে এটির উদ্ভব। নিখিল ভারতীয় রুপ পেতে ১৯৭৫ সালের শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর “জরুরী অবস্থা” র সময় অব্দি লেগে যায়।

সংগঠন হিসেবে বিজেপি বিশ্বের সবচে বড় দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। দাবী করা হয়, “প্রাথমিক সদস্যপদ” সংখ্যাগত দিক থেকে দুনিয়ার সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বিজেপি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের থাকে নিজ আদর্শ, গঠনতন্ত্র ইত্যাদি। দলের আদর্শিক দিক নিয়ে লিখিত ও অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থের গুণগত মান, উদাহরণ, যুক্তি প্রয়োগ,শব্দচয়ন ইত্যাদির উপরেই জানা যায়, সংগঠনটি কতখানি রাজনৈতিক আর আদর্শিক মাহাত্ম্য কতটুকু এতে?

“বিজেপির” সাংগঠনিক পাঠ্যগুলো পড়া শুরু করেছি, এবং প্রথমেই জনপ্রিয় দুটি পুস্তক বেছে নিয়েছি। “দিব্যজ্ঞান নয়, কাণ্ডজ্ঞান চাই” নামক পুস্তকটি “শিবপ্রসাদ রায়” পশ্চিমবাংলা ও সমগ্র ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী এ লেখাটি বিজেপির অবশ্য পাঠ্য। অন্য লেখাটি বিজেপির “মহান নায়ক শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়” এর উপরে লেখা।
প্রথমেই আসি “দিব্যজ্ঞান নয়,কাণ্ডজ্ঞান চাই” লেখাটির বিষয়ে। ১৯৮২ সালে “মহামায়া প্রেস এন্ড বাইন্ডিং” থেকে প্রকাশিত পুস্তকটিতে প্রকাশক লিখেছেন, “এটি ভারতীয় হিব্দুদের ঘুমন্ত চেতনায় চাবুকাঘাত করে”। বাস্তবিকই তাই,ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়া বইটিতে মৌলিক চিন্তা প্রায় কিছুই না থাকলেও রয়েছে ভিন্নধর্ম কর্তৃক হিন্দু ধর্মকে কিভাবে হীন করা হচ্ছে,তা প্রমাণের নানা কসরত।

“চোখের জল আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাকিস্তান” সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবী করেন লেখক। এই চোখের জল,সম্ভ্রম শুধুই যে হিন্দুরাই উৎসর্গ করেছেন,সেটির অভিযোগ লেখকের।

আগেই লিখেছি মৌলিক কোনো চিন্তার লেখা নয় এটি। নিতান্তই ভাবাবেগ নির্ভর সাম্প্রদায়িক জাগরণী। যেখানে ভারতীয় হিন্দুদের নিয়ে লেখার চাইতে বেশী লেখা হয়েছে “মুসলিম” নিয়ে।

প্রায় প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক লেখনীর তীর যে ভারতীয় মুসলমানকেই শুধু বিদ্ধ করেছে,তা কিন্তু নয়! বরং খ্রিস্টীয় সম্প্রদায়ও বাদ যায়নি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন প্রসঙ্গে লেখক দাবী করেন, ” হিন্দুরা স্বর্গীয় চেতনায় ভারতের জন্য আত্নাহুতি দিলেই মুসলিমরা ছিলো অসাম্প্রদায়িক রাজ্য বিস্তারের স্বপ্নে বিভোর”।

বিজেপির দেবতুল্য “শ্যামাপ্রসাদকে” সাম্প্রদায়িক বলে যারা গালি দেয়,তারা নিতান্তই অজ্ঞ বলে দাবী করা হয়। শ্যামাপ্রসাদ কাশ্মীরের চূড়ান্ত ভারতভূক্তি চেয়েছিলেন।

“বাবরি মসজিদ” প্রশ্নে মুসলিমরা “দাঙ্গাবাজ” বলে দাবী করা হয়। হাজার বছরের মন্দির ধ্বংস করে মসজিদের কলঙ্ক ভারতীয়দের কাছে ছিলো অসম্মানজনক। ভারতীয় নেতাদের “দিব্যজ্ঞানের” দোষের ভারতের ৩০ শতাংশ মাটিতে পাকিস্তান হয়েছে,তবুও কাণ্ডজ্ঞান হয়নি এদের।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বিজেপির “তুরুপের টিক্কা” আগেও ছিলো। বাংলাদেশ থেকে নিপীড়িত হিন্দুরা তো আসছেই, ১ কোটির উপরে “বাংলাদেশী মুসলমান” আলিপুর, মুর্শিদাবাদে এসে ঘাঁটি গেরে আছে,আর জ্যোতি বসু সরকার এদের পক্ষ নিয়েছে,নিপীড়িত হিন্দুদের জন্য কোনো মায়া নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় যাঁরা চোখ রাখেন,তাঁরা সহজেই ২০১৬ সালের বিজেপির ভাষ্যগুলোর সাথে মিল পেয়ে যাচ্ছেন। যাই হোক বিজেপির নীতির বড় একটা অংশ জুড়েই বাংলাদেশ রয়েছে।

কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে আর কিছু না হলেও অন্ততপক্ষে “মার্কসবাদী” রা সেখানে যাক,গিয়ে ওদের স্বাধীনতার পথ থেকে ভিন্নপথে পরিচালন করুক,এটাও বিজেপির এই পুস্তকে লেখা হয়েছে।

গোহত্যা নিয়ে চমৎকার উদ্ধৃতি পেয়েছি লেখাটিতে। গান্ধীজি বলেছিলেন, “ভারতের স্বাধীনতার চেয়ে গোহত্যা বন্ধ চাই আগে”। যদিও পুরো পুস্তকের কোথাও তথ্যসূত্র উল্লেখ নেই।
বিজেপির সামাজিক মাধ্যমের “পাতায়” কদিন আগে একটি পোস্ট দেয়া হয়েছিলো,যেখানে “গান্ধীজি” কে অসম্মানজনকভাবে অশ্লীল গালিগালাজ করা হয়েছে। (ফেসবুক/পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি)।

মহাপ্রভু গৌরাঙ্গ বলেছিলেন, “শঙ্ঘশক্তি কলৌযুগে”। অর্থাৎ, কলিযুগের জন্য শঙ্ঘশক্তি প্রয়োজন, সেজন্য হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একতার প্রয়োজনীয়তা নির্দোষ বটে,তবে এর সাথে “শিবপ্রসাদ রায়” অন্য একটি উদাহরণ প্রয়োগ করেছেন।
“হিন্দুদের প্রতিটি দেবতার হাতে অস্ত্রের অভাব না থাকলেও, বাড়িতে পূজিত দেবতার হাতে একটা লাঠিগাছাও নেই কেনো”? অর্থাৎ অন্যদের রুখতে প্রতিটি বাড়িতে অস্ত্রাগার গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এবার একেবারেই অপ্রত্যাশিত যুক্তি। শিবপ্রাসাদ রায় দাবী করেন, “একশ বছর আগে ভারতে লোকজন ছিলো “ত্রিশ কোটি”, দেবতা আছেন “তেত্রিশ কোটি”। প্রতিটি লোকের জন্য একজন করে দেবতা নিয়োগ হলেও,তিনকোটি দেবতা “বিদেশে প্রেরণ” করা যেতো।

শিবঠাকুরের আপন দেশে মুসলিমরা “২০০০” সালে সংখ্যাগুরু হবে এবং “ভারতের” নাম বদলে যাবে।

বঙ্গসেনা ও বি.এল.ও.র মতো মহান সংগঠনগুলো যখন “বাংলাদেশের আটটি জেলা” নিয়ে স্বাধীন হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য লড়ছে,তখন “শয়তান” মিডিয়াগুলো সে সংবাদ ছাপেইনা!

মাদার তেরেসাকে নিয়ে আজ যে বিতর্ক করছে বিজেপি,সেটার ধুয়া এই শিবপ্রসাদী দর্শনেই প্রথম। মাদার তেরেসা, “খ্রিষ্টধর্মের” মিশন নিয়ে এসেছিলেন বলে তাঁর উদ্দেশ্য অসৎ ছিলো। আসামে যখন খ্রিষ্টানরা “একলক্ষ হিন্দু” হত্যা করলো,তখন এই মাদার তেরেসা চুপ ছিলেন। বাংলাদেশ মাদার তেরেসাকে দেশে ঢুকতেই দেয়নি।

বিজেপিই একমাত্র ভারতমাতার দল,বাকিরা পরীক্ষিতভাবে দাউদ ইব্রাহিমের চর। মুসলমানদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

এবার আজকের লেখার শেষদিকে আসি। বিজেপি বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বকে দাবী করলেও, তাদের সাংগঠনিক পাঠ্যের প্রথম পুস্তকটি অসংখ্য ভুল তথ্যে ঠাসা। নিজ দল ও আদর্শের মাহাত্ম্য নিয়ে প্রায় শুণ্যগর্ভ এ রচনার শুরু থেকেই ভিন্য সম্প্রাদায়ের যুক্তিহীন সমালোচনা ও নিজ সম্প্রদায়কে যুদ্ধপ্রস্তুতি নিতে তাগিদ দেয়া হয়েছে এ লেখায়।

বাংলাদেশ নিয়ে বিজেপির বস্তাপচা রাজনীতি যে চরম মিথ্যাচারের আশ্রয়,তার দীক্ষাগুরু এই “শিবপ্রসাদ”। বাংলাদেশী এককোটি মুসলিম পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে,এটি ডাহা মিথ্যাভাষ।

পুস্তকটি পাঠের পর আমার শুধু একটাই বোধ হচ্ছে, ভারতের মতো সাহিত্যসমৃদ্ধ দেশে এরূপ সস্তাদরের উগ্র,বিকৃত,ভ্রান্ততথ্যসমৃদ্ধ পুস্তকটি কিভাবে আলোড়ন তোলে,তা আমার বোধগম্য নয়। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বল্লেও,পুস্তকটি সত্যিই অতিসস্তা ও অসংলগ্ন লেগেছে। যা কিনা বিশ্বের বড় রাজনৈতিক দলের প্রধান পাঠ্য। মৌলিকত্ব বিবর্জিত লেখাটির আদর্শই “অন্যের সমালোচনা” নিজের আদর্শ নয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment