বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প নাই

সুন্দরবন ও প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র:

২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল সেখানে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সঞ্চালনের একটি প্রস্তাব ছিল। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০১২ সালে সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপালে দুটি ৬৬০ ইউনিট মিলে মোট ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই ২০১০ সালের ২৭ ডিসেম্বর কোনোরূপ পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ না করেই প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি করা হয় এবং অবকাঠামো উন্নয়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়।

মা হরিণ
পৃথিবীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন ধরনের প্রযুক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়।
ক. সাব ক্রিটিক্যাল

খ. সুপার ক্রিটিক্যাল

গ. আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল

 

বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’ পরিচালিত হবে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে।‘সাব’ বা ‘সুপার’র চেয়ে ‘আলট্রা সুপার’ ক্রিটিক্যালে যেহেতু কয়লা কিছু পরিমাণ কম পোড়াতে হয়, ফলে দূষণও কিছুটা কম হয়। সেই দূষণ কমের পরিমাণ কম-বেশি ২% থেকে ৫%। আরও সহজ করে বলি- সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ১০০ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হবে, আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করলে তা ১০ টন কমবে। অর্থাৎ ১০০ টনের জায়গায় ৯০ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড বের হবে। ১০ টন কম মানে পরিবেশ দূষণ একটু কম। ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহার করব, কোনও দূষণ হবে না, সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না- যা সম্পূর্ণ ‘অসত্য’ এবং বাস্তবতা বিবর্জিত কথা।

মনে রাখা দরকার— বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে, কিন্তু সুন্দরবনের বিকল্প নাই।

সরকারের পরিবেশ সমীক্ষা অনুযায়ী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাই অক্সাইড, ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে। বছরে ৯ লাখ টন অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত ছাই বাতাসে মিশবে। সরকারের এই হিসেব কিন্তু ‘আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তিকে বিবেচনায় নিয়েই। সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার দূরে বিষাক্ত সালফার, নাইট্রোজেন, ছাই উৎপন্ন হবে, আর সুন্দরবনের ক্ষতি হবে না? এই বিষাক্ত জিনিসগুলো যাবে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর নেই, আছে শুধু ‘ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে না’ তথ্যহীন বক্তব্য।

Spotted Deer (Cervus axis), stag with his harem, Yala National Park, Sri Lanka, February.

Spotted Deer (Cervus axis), stag with his harem, Yala National Park, Sri Lanka, February.

আপত্তি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে নয়। আপত্তি রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে। কারণ রামপালের পাশে সুন্দরবন। বিদ্যুতের চেয়েও সুন্দরবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপাল ছাড়াও আরও অনেক জায়গায় নির্মাণ করা যায়। একাধিক নির্মাণ করা যায়। নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু সুন্দরবন পৃথিবীতে একটিই। আর একটি সুন্দরবন যেহেতু বানানো যাবে না, সুতরাং সুন্দরবন ধ্বংস বা ক্ষতিও করা যাবে না।

সুন্দরবন হতে স্বল্প সঙ্কট দূরত্ব:

সুন্দরবনের সঙ্কট দূরত্বের মধ্যে এই কয়লাভিত্তিক তাপ-বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশ ঝুঁকি বিবেচনা করে বাংলাদেশের পরিবেশবিদরা প্রতিবাদ করেন এবং এক পর্যায়ে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ সার্টিফিকেট না নিয়ে এই প্রকল্প চালুর বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে। এমতাবস্থায় তড়িঘড়ি করে পরিবেশ অধিদপ্তরের ইনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্টে এই প্রকল্পকে পরিবেশবান্ধব বলে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পটি সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে এবং সরকার নির্ধারিত সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার ইনভায়রনমেন্টালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) থেকে ৪ কিমি বাইরে বলে নিরাপদ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু জিআইএস সফটওয়্যার দিয়ে মেপে দেখা যায়, এই দূরত্ব সর্বনিম্ন ৯ কিলোমিটার হতে সর্বোচ্চ ১৩ কিলোমিটার।

৪.হরিণ

ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত সুন্দরবন গবেষক জেসিকা লরেঞ্জ তাঁর এক ব্লগে ‘বাংলাদেশের সুন্দরবন অঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং নদীতে ইরাবতী ডলফিনের বসবাস হাজার বছর বছর ধরে পাশাপাশি বাঘ আর ডলফিনের বাস পৃথিবীর বুকে একটি অনন্য ঘটনা৷ কিন্তু লোভের কারণে তাদের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে৷’ আর এর জন্য তিনি দায়ী করেছেন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে।

প্রকল্প এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনবসতি, ফসল ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি :

রামপালে প্রতিষ্ঠিতব্য এই ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ভারতে প্রতিষ্ঠার জন্য ৭৯২ একর একফসলি কিংবা অনুর্বর পতিত জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল অথচ বাংলাদেশে সেই একই প্রকল্পের জন্য ১৮৩৪ একর কৃষি, মৎস্য চাষ ও আবাসিক এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার ৯৫ শতাংশই তিনফসলি কৃষি জমি, যেখানে বছরে ১২৮৫ টন ধান ও ৫৬৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয় এই ধান-মাছ উৎপাদন বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রায় ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে, যার মধ্যে উদ্বাস্তু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার।

কয়লা পরিবহনজনিত পরিবেশদূষণ:

পরিবেশের জন্য আরেকটি হুমকি হচ্ছে, রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমদানিকৃত কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই পরিবহন করা হবে সমুদ্রপথে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন আমদানি করা কয়লা প্রথমে বড় জাহাজে করে সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত আনতে হবে, তারপর আকরাম পয়েন্ট থেকে ছোট ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে কয়লা পরিবহন করে প্রকল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠিতব্য কয়লা বন্দরে নিয়ে যাওয়া হবে। এতে করে সুন্দরবনের ভেতরে হিরণ পয়েন্ট থেকে আকরাম পয়েন্ট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার নদীপথে বড় জাহাজে বছরে ৫৯ দিন এবং আকরাম পয়েন্ট থেকে রামপাল পর্যন্ত প্রায় ৬৭ কিমি পথ ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে বছরে ২৩৬ দিন পরিবহন করতে হবে!

১

আর্থিকভাবে অলাভজনক:

প্রস্তাবিত রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি অগ্রহণযোগ্য দিক হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য আর্থিকভাবে অলাভজনক। এই প্রকল্পের ১৫ শতাংশ অর্থ জোগান দেবে পিডিবি, ১৫ শতাংশ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসি এবং বাকি ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ নেয়া হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ পিডিবি কিনবে আর যে নিট লাভ হবে সেটা ৫০ শতাংশ হারে পিডিবি ও এনটিপিসির মধ্যে ভাগ হবে। কয়লার ক্রয়মূল্যকে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাব অনুযায়ী ইতিমধ্যেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকারি পর্যায়ে ১৪৫ ডলার মূল্যে কয়লা আমদানির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় পিডিবি তথা সরকারকে দেশের জনগণের জন্য ৮ দশমিক ৮৫ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অথচ পিডিবির সঙ্গে দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের যে ক্রয় চুক্তি হয়েছে তাতে এই কোম্পানির মাওয়ায় প্রতিষ্ঠিতব্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা মূল্যে এবং খুলনার লবণচরা ও চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রতিষ্ঠিতব্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট ৩ দশমিক ৮০ টাকা মূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হবে এ অবস্থায় রামপাল থেকে দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে পিডিবিকে অবশ্যই ভর্তুকি দিয়ে জনগণের কাছে বিক্রয় করতে হবে। ফলে এই প্রকল্প থেকে পিডিবির প্রাপ্ত লভ্যাংশটি আখেরে ভর্তুকির মাধ্যমে লোকসানে পরিণত হবে; লাভ হবে কেবল ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির পরিবেশকে বিবেচনায় না নিলেও জেনেশুনে এই ধরনের লোকসানি প্রকল্প হাতে নেয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা আরো ভেবে দেখা দরকার ছিল।

Save-The-Sundorbon

পরিশেষে বলব যে,

বিতর্ক নয়, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা ১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাই, নাকি সুন্দরবন চাই? বিদ্যুৎকেন্দ্র ১০০টি জায়গায় ১০০টি নির্মাণ করতে পারব। একটি সুন্দরবন বাংলাদেশের ভেতরে তো নয়ই, পৃথিবীর কোথাও কেউ তৈরি করতে পারবে না। বিজ্ঞান এখনও নিশ্চিয়তা দিতে পারছে না- কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতাস, জমিন, পানি, মানুষ সর্বোপরি প্রকৃতিকে দূষণ মুক্ত রাখবে।

(বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাপ্তাহিক লেকচারের লেকচার নোট। বক্তা: আতিক রহমান)

Atiq Rahman

লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আতিক

 

Related Posts

About The Author

Add Comment