বিভিন্ন আলোয় নীরদের প্রতিবিম্ব

নীরদ সাম্রাজ্যবাদী কেন

নীরদ চৌধুরী কেন সাম্রাজ্যবাদী ‘জ্যামিতিক রীতি’ মেনে এর জবাব লিখছেন ‘আমার দেবোত্তর সম্পত্তি’র দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘আমি সাম্রাজ্যবাদী কেন’ অংশে তিনি বলেন:

  1. আমি সাম্রাজ্যবাদী, প্রথমত, মানুষ বলিয়া; কেঁচো নই বলিয়া
  2.  আমি সাম্রাজ্যবাদী, দ্বিতীয়ত, সভ্য মানুষ বলিয়া; অসভ্য, পদদলিত, দাসজাতীয় মানুষ নই বলিয়া
  3.  আমি সাম্রাজ্যবাদী, তৃতীয়ত, সত্যকার হিন্দু বলিয়া, মলিন প্যান্ট-পরিহিত, আধা-ট্যাসফিরিঙ্গি, অথচ গনৎকারের উপাসক হিন্দু নই বলিয়া।

তারপর তিনি একে এক বিভিন্ন ছোট ছোট অংশে দেখানোর চেষ্টা করেন সাম্রাজ্যবাদ কেন জরুরী। তার প্রবন্ধগুলোর শিরোনামগুলো শুধু বলি-‘আদিম সাম্রাজ্য-পশু-পক্ষী ও উদ্ভিদের উপর’, ‘গ্রীক, রোমান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ’, ‘হিন্দুর সাম্রাজ্যবাদ’, ‘প্রাচীন ভারতে সাম্রাজ্য’, ‘সাম্রাজ্যের অবসান হইলে কি ঘটে’, ‘বাঙালীর সাম্রাজ্যবিদ্বেষের মূলে কি’।

এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়ের একটি উক্তি ব্যবহার করেছেন নীরদ যেটা মনে রাখার মতো! এক ফরাসী বৈজ্ঞানিক যুবক ভিক্টর জাকমঁর সাথে আলাপচারিতায় বলেছিলেন-

“Conquest is very rarely an evil when the conquering people are more civilized than the conquered, because the former bring to the latter the benefits of civilization.”

১৮২৯ সালের ২১ জুন কলকাতার বাগান বাড়িতে রাজা রামমোহন রায় এ কথা বলেছিলেন। নীরদ এর রেফারেন্স দিয়েছেন তার ‘বাঙালীর সাম্রাজ্যবিদ্বেষের মূলে কি’ প্রবন্ধে।

আমি একাধারে বাঙালী ও ইংরেজ

নীরদ এই অধ্যায়ে এস নিজেই নিজেকে প্রশ্ন ছুড়েন, ‘আমার ব্যক্তিত্ব আসলে কি?

উনি নিজেই এর উত্তর দেন:

“উহা একদিক হইতে যেমন দ্বিধাবিভক্ত, আর একদিকেও তেমনই দ্বিধাসংযুক্ত। আমি যে ইংরেজের প্রশংসা করি ও ইংরেজের জীবন ও সভ্যতা সম্বন্ধে গৌরব অনুভব করি, তাহা ইংরেজের অধীন বাঙালী হিসাবে নয়, করি নিজেকে ইংরেজ মনে করি বলিয়া; অর্থাৎ জন্মে না হইলেও মানসিক ধর্মে এবং আংশিকভাবে জাতীয়তাবোধেও আমি ইংরেজ, ইহা মনে করিয়া।” (আমার দেবোত্তর সম্পত্তি, পৃষ্ঠা: ১১৫)

“আমি যে বর্তমানে ইংরেজের সমালোচনা করি উহা প্রকৃতপ্রস্তাবে দেশের দোষ সম্বন্ধে দেশপ্রেমিকের অসহিষ্ণুতার ফল।

এইবার আমার দ্বিত্বের বাঙালী দিকটার কথা বলি। ইংরেজি শিক্ষার ফলে আমার জীবনে ও আচার ব্যবহারে যে ইংরেজী ভাব দেখা দিয়াছিল তাহার বশে আমি ইংরেজ সম্বন্ধে যেমন অভিমত প্রকাশ করিয়াছি, জন্মে ও কুলে শীলে বাঙালী হইয়া বাঙালী সম্বন্ধেও ঠিক তাহাই করিয়াছি। আরও স্পষ্ট করিয়া বলি যে, একদিকে যেমন বাঙালীর কীর্তি সম্বন্ধে গর্ব অনুভব করি, অন্যদিকে বাঙালীর অধোগতি ও ধর্মভ্রষ্টতা দেখিয়া ক্রুদ্ধ হই। আমার মনোভাব ইংরেজ সম্বন্ধে যাহা বাঙালীর সম্বন্ধেও তাহাই। ইংরেজ সম্বন্ধে আমার বিচারহীন পক্ষপাতিত্ব নাই, বাঙালী সম্বন্ধেও বিচারহীন অনুরাগ নাই।আমি এইভাবে দ্বিধাবিভক্ত হইয়াও ঐক্য লাভ করিয়াছি। উহার কারণ আমি বাঙালী হিসাবেও খাঁটি, ইংরেজ হিসাবেও খাঁটি। ” (আমার দেবোত্তর সম্পত্তি,পৃষ্ঠা ১১৫-১১৬)

নীরদ তার পরিচয় অত্যন্ত পরিস্কার করেছেন। তার অবস্থান বুঝা আমাদের এখন সহজ হওয়া উচিত। নীরদ কেন এমন ‘দ্বিধাবিভক্ত’ ও দ্বিধাসংযুক্ত’ বাঙালী ও ইংরেজ তার পরিচ্ছন্ন ছবি আঁকতে গেলে আমরা তার আত্মজীবনীর দুই খণ্ড দেখতে পারি।

“The Autobiography of an Unknown Indian” নামে প্রথম অংশটি প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে, ম্যাকমিলান থেকে। “Thy Hand, Great Anarch! শিরোনামে সিক্যুয়েলটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে।

তার আত্মজীবনীতে তার ছোটবেলার জীবন, গড়ে উঠা, পঠন-পাঠন, অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, লেখালেখি এ সব কিছুই তার ভবিষ্যতের নীরদ হওয়ার মসলা যে একই সাথে ইংরেজ ও বাঙালী হওয়ার দু:সাহস দেখাবে!

তার আত্মজীবনী থেকে আমি শুধু একটি অংশ নিয়ে কিছু কথা বলবো:

তার ‘The Autobiography of an Unknown Indian’ থেকে চতুর্থ অধ্যায় নিয়ে কথা বলবো যে অধ্যায়টির শিরোনাম ‘ENGLAND’।

‘ইংল্যান্ড’ শিরোনামে এ অধ্যায়টিতে নীরদ তার গড়ে উঠা এবং কিছু চরিত্রের সাথে পরিচয়ের কথা বলেছেন। ওখানে দেখা গেছে যে রাণী ভিক্টোরিয়া, প্রিন্স আলবার্ট, নেপোলিয়ন, শেক্সপীয়র, রাফায়েল, মিল্টন, বার্ক, হেস্টিং, ওয়েলিংটনের সাথে কখন পরিচিত হয়েছেন এটা নিশ্চিত বলতে পারেননা। তবে এটা নিশ্চিত বুঝ-জ্ঞান হওয়ার নূন্যতম যোগ্যতা অর্জনের সাথে সাথেই তাদের নাম-পরিচিতি তার কানে ও মনে গেথেছিল অন্যসব Advanced English ছেলে মেয়েদের মত। এ সূত্রে তার ছোটবেলাকে অনেকটা ইংরেজিআনা শৈশব বললে দোষের কিছু দেখিনা।

আবার সাহিত্যের সাথে যখন তার পরিচয় ঘটছিল তখন অন্যসব ভারতীয় হিন্দু শিশুর মত রামায়ণ, মহাভারতের সাথে পরিচয় ঘটেছিল, এবং একই সাথে হোমার ও মিল্টনের সাথেও পরিচয় ঘটছিল-অনেকটা যুগপৎভাবেই।

আরো কয়েকটা পয়েন্ট যদি বলা হয় তাহলে বলতে হয়:

  • তিনি কবিতার জনক হিসেবে হোমার ও বাল্মিকীকে সমান শ্রদ্ধাই করতেন।
  • রাফায়েলের ‘ম্যাডোনা’ চিত্রটি তার বাসার সামনের দরজায় টাঙানো ছিল।
  • নিজেদেরকে ‘বোনাপার্টিস্ট ইন বেঙ্গল’ বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ চৌধুরী পরিবার ছিল নেপোলিয়ন ভক্ত এবং নীরদ ছিল নেপোলিয়নের একনিষ্ঠ ভক্ত।
  • ‘ব্যুওর ওয়ার’ নিয়ে বিস্তর জানাশুনা ছিল এবং এ নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা লেখা থেকেই এটা আরও পরিস্কার হয়ে যায়। এ যুদ্ধে ইংরেজের বিজয় নিয়ে তিনি যে ব্যাপক উৎসাহ দেখান তা কেবল একজন ইংরেজের সাথেই মানানসই। নীরদ এ যুদ্ধে নিজেকেই জয়ী মনে করেছেন। অবশ্য আবার বিরোধিদের প্রতিও সহমর্মিতা দেখলাম।
  • তিনি ইংল্যান্ডে না গিয়েই ইংল্যান্ড নিয়ে কল্পনার ছবি একে ফেলেছেন। মনে রাখতে হবে তিনি প্রথম বিলেত যান ৫৫ বছরের পরেই কেবল!

(to be continued…)

সাবিদিন ইব্রাহিম

[email protected]

Related Posts

About The Author

Add Comment