বিরূপ সময়ে সাহসী উচ্চারণ, আড়াই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন কিছু বাক্য, শব্দ বা পদ একটা জাতির মোড় পাল্টে দেয়। কোন ব্যক্তির মুখ থেকে উচ্চারিত বাণী সময়কে ছেয়ে, ছাপিয়ে মহাকালে অনুরণন সৃষ্টি করে। এমন কিছু বক্তৃতার সংকলন করেছেন জ্যাকব এফ ফিল্ড তার ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বীচেস্’ (আমরা সমুদ্র সৈকতে লড়াই করবো) বইয়ে। গত আড়াই হাজার বছরের বাছাই দেশ বা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে সংকটকালীন মুহূর্তে দেয়া ৪১ টি বক্তৃতা এবং সেসব বক্তৃতার উপলক্ষ (কনটেক্সট)এবং ফলাফল (কনসিকোয়েন্সেস)নিয়ে লেখা এ বই।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ২২৪ পৃষ্ঠার এই নাতিদীর্ঘ বইটির ভূমিকার প্রথম প্যারাতেই এর সারবত্তা বর্ণিত হয়েছে। ‘দ্বন্ধ সংঘাতের সময়েই পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় বক্তৃতাগুলোর জন্ম হয়েছে’। বক্তাদের তালিকায় যেমন রয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সমরবিদ, রাষ্ট্রনায়ক এবং পূজনীয় ব্যক্তিদের বক্তৃতা আবার সবচেয়ে ঘৃণিত ও সমালোচিত ব্যক্তিদের বক্তৃতাও। সিসেরো থেকে চার্চিল, লিংকন থেকে রিগ্যান, সাইমন বলিভার থেকে মুজিব, ক্রমওয়েল থেকে হিটলার সবার বক্তৃতাই রয়েছে বইটিতে।

৪৩০ খ্রি.পূ. অ্যাথেন্সের প্যারিক্লিসের বক্তৃতা থেকে শুরু করে থেমেছে রোনাল্ড রিগ্যানের বক্তৃতায়। স্পার্টার আক্রমণে ধ্বংসপ্রায় অ্যাথেন্স থেকে রক্ষা করার মন্ত্র ছিল প্যারিক্লিসের বক্তৃতায়। আবার বার্লিন প্রাচীর ভাঙার মাধ্যমে নতুন জার্মানি এবং স্নায়ুযুদ্ধের বিদায়যাত্রা ঘোষণা করেন রোনাল্ড রিগ্যান।

বইয়ের শিরোনামটি নেয়া হয়েছে স্যার উইনস্টন চার্চিলের বিখ্যাত বক্তৃতা থেকে। নাজি জার্মানী যখন পোল্যান্ড ও ফ্রান্স দখল করে ব্রিটেনের দিকে তার শক্ত থাবা বিস্তার করেছিল, লন্ডনের আকাশ জার্মান বোমারু বিমানে ঢেকে দিয়েছিল তার পরবর্তী মুহূর্তেই এ বক্তৃতা দিয়ে ব্রিটিশদের মনোবল চাঙা করেছিলেন। চার্চিলের ওই একই বক্তৃতার আরেকটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘উই শ্যাল নেভার সারেন্ডার’। চার্চিলের এমন কিছু উক্তি পুরো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে মিত্রবাহিনীর মনোবল শক্ত করেছিল, ব্রিটিশদেরকে যুদ্ধে নিয়োজিত রাখতে সাহায্য করেছিল। এজন্য উইনস্টন চার্চিলকে ব্রিটেনের সেরা যুদ্ধকালীন নেতা মনে করা হয়। চার্চিলের পলিসি এখনো অনেক মিলিটারী একাডেমীতে পাঠ্য।

ব্রিটেনের সর্বকালের সেরা প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় উইনস্টন চার্চিলের নাম প্রথম সাড়িতেই থাকে। মহাত্মা গান্ধীকে ‘নেংটা ফকির’ বলা থেকে শুরু করে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশের সর্বশেষ কঠিন সমর্থক হওয়া, ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে ৪০-৫০ লক্ষ বাঙালী মারা যাওয়ার পেছনে চার্চিলের পলিসিকেই দায়ী করে থাকেন অনেক চার্চিল সমালোচক। তাছাড়া তার ‘হিস্ট্রি অব ইংলিশ স্পিকিং পিপল’ বইয়ে বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে একজন দুর্বল শাসক, দুশ্চরিত্র এবং নির্মম মানুষ হিসেবে উপস্থাপনা থেকে শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পেছনে অনেক যুক্তি দেখান। এজন্য খুব কম সংখ্যক ভারতীয়ই তাকে পছন্দ করতে পারে।

তবে চার্চিল যে বিশ শতকের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী দশ ব্যক্তির একজন ছিলেন এ নিয়ে সন্দেহ করলে বোকামী হবে। ১৯৩৩ সালে হিটলারের নেতৃত্বে আগুয়ান নাজি জার্মানীর বিরুদ্ধে একেবারে প্রথম দিকে যে সতর্ক বাণী দিয়েছিল তিনি ছিলেন উইনস্টন চার্চিল। সে সময় কোন ধরণের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন থেকে মুক্ত থাকা অবস্থায় নিজের খামার বাড়িতে বসে হিটলার ও নাজি জার্মানীর উত্থান এবং এর ভয়ানক হুমকি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রবন্ধ লিখেছিলেন উইনস্টন চার্চিল। আর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পাওয়া একমাত্র রাজনীতিবিদ কিন্তু চার্চিল। ‘হিস্ট্রি অব দ্য সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার’ বইয়ের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করে নিজেকে আরেকটু উপরে তুলে ধরেছেন। রাজনীতিকে প্রধান মিশন হিসেবে নেওয়ার আগে তিনি কিন্তু একজন সাংবাদিক ছিলেন। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মান বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন এবং তার ভয়ানক কষ্ট করে পালিয়ে আসার গল্প তাকে যুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটেনে নায়কের আসনে বসিয়ে দেয়। তারপর যুদ্ধপরবর্তী নির্বাচনে দাড়িয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অঙনে পা রাখেন। তারপর থেকে আজীবন তিনি ছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে পরিচিত মুখের একটি। জীবনে অসংখ্য বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বাগ্মীতার একজন ক্লাসিকাল উদাহরণ হিসেবে চার্চিলের অবস্থান। চার্চিলের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আশা জাগানিয়া বক্তৃতার একটি বাক্যাংশ নিয়েই এ বইটির শিরোনাম।

৪১ টি বক্তৃতার মধ্যে বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডারের একটি বক্তৃতা রয়েছে।ভারত জয় করতে এসে আলেকজান্ডার তার বাহিনীর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন, সর্বশেষ শক্তিশালী শাসক পুরোসকে পরাজিত করে আরও সামনে আগানোর আহ্বান জানানোর লক্ষে এ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ৩২৬ খ্রি.পূ. এ হাইডাসপেস নদীর তীরে এ বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। অসাধারণ শব্দ ঝংকার, বাক্যের গাথুনী আর অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তৃতা হওয়া সত্ত্বেও তার সৈন্যরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। তারা বরং জন্মভূমিতে ফেরার তাড়াই দিচ্ছিল মহাবীর আলেকজান্ডারকে। এজন্য অনেকটা ব্যর্থ মনোরথেই দেশের পথে রওয়ানা দিয়েছিল আলেকজান্ডারের বাহিনী। নিজ সেনাদলের বিরোধিতা তার মৃত্যুর পেছনে দায়ী কিনা এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। জ্বরে আক্রান্ত হয়ে খুব অল্প বয়সেই মারা যান আলেকজান্ডার। তাও আবার নিজ বাসভূমে নয়, দূর ব্যবিলনে। তার মৃত্যুর পেছনে তার সৈন্যদের অবদান থাকতে পারে, কেউ বিষ খাওয়াইতে পারেন বা ভারতবর্ষে মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন বলে মনে করা হয়। দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের অসাধারণ বক্তৃতাটি কিভাবে তার বাহিনীকে অনুপ্রাণিত করতে পারলো না এটা নিয়ে চিন্তার জন্যও এ বক্তৃতাটি পড়া যায়।

সমরবিদ্যার অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রিয় মুখ হানিবালেরও একটি বক্তৃতা রয়েছে এ সংকলনে। রোমানদের উত্থানকালে যে শক্তিটি তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড়িয়েছিল, ভালো নাকানিচুবানি দিয়েছিল রোমানদের এবং রোম থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিল রোমানদের এবং রোমান সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল তা ছিল হানিবালের বাহিনী। রোমানদের অপর পাশেই ছিল হানিবালের কার্থেজেরে অবস্থান। আজ থেকে প্রায় বাইশশত বছর আগে (২১৮ খ্রি.পূ.)হানিবালই ছিলেন একমাত্র সমরনায়ক যিনি আল্পস পর্বত ঢিঙিয়ে রোম আক্রমণ করার মতো অবিশ্বাস্য কাজ করেন। তাও আবার শীতের সময়, একলক্ষ সেনা ও ৩৭ টি যোদ্ধা হাতি নিয়ে। হানিবালের এমন আক্রমণের কথা তখনকার সুপার পাওয়ার রোম কল্পনাও করতে পারেনি।

হানিবালের এই দুঃসাহসী সামরিক অভিযানের পেছনের কারণ ছিল আসলে তার জন্মভূমি কার্থেজকে রক্ষা করা। রোমান সাম্রাজ্য তার বিশাল ডানা বিস্তার করছিল পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেই কিন্তু কার্থেজ তাদের পাশে মাথা উচু করে দাড়িয়েছিল। কার্থেজের উত্থান ঠেকানোর জন্যই রোমান সেনাদল কার্থেজ অভিযানে নেমে পড়ে। এদিকে কার্থেজের বাহিনী হানিবালের নেতৃত্বে একেবারে রোমান সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ডে হামলা করার অভাবনীয় পরিকল্পনা ফাঁদে। ঠিকই তীব্র শীত ও তুষারপাতের মধ্যে মাত্র ১৫ দিনে আল্পস পর্বত ডিঙায় হানিবালের বাহিনী। হানিবালের রোম আক্রমণের খবর শুনে রোমান বাহিনী কার্থেজ আক্রমণের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নিজ সাম্রাজ্যের প্রাণভোমড়া রক্ষা করতে ফিরে আসে। সেই রোমানদের মুখোমুখি হওয়ার আগে হানিবাল যে বক্তৃতা দেন সেটাই সংকলিত আছে এ বক্তৃতায়।

আবার ২১৬ খ্রি.পূ. কানাইয়ের যুদ্ধে প্রায় ৮০ হাজার সৈন্য সমেত রোমান বাহিনীর প্রায় পুরোটিকেই যেভাবে ধ্বংস করে দেন হানিবাল তা সামরিক বিজ্ঞানের অত্যন্ত নিয়মিত পাঠের বিষয়। এই আধুনিক সময়েও হানিবালের যুদ্ধরীতি অনুসরণ করে অনেক জেনারেল যুদ্ধে বিজয় নিয়ে এসেছেন। হানিবালের চেয়ে কয়েকগুণ সৈন্য সমাবেশ করেও কিভাবে রোম হারলো তা সামরিক বিজ্ঞানের একটি আলোচিত বিষয়।

হানিবালের প্রায় দুই হাজার বছর পর আরেক বিশ্বজয়ী সমরনায়ক যিনি আল্পস পর্বত ঢিঙানোর দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন তিনি নেপোলিয়ন বোনাপার্ত। নেপোলিয়নের প্রিয় সমরনায়কদের একজন ছিলেন হানিবাল এবং হানিবাল থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন ‘দেয়ার উইল বি নো আল্পস ইন আওয়ার ওয়ে’ (আমাদের পথে কোন আল্পস থাকবে না) বলার সময়।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বক্তৃতার মধ্যে জুলিয়াস সিজারের একটি অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তৃতা রয়েছে এ তালিকায়। ৪৮ খ্রি.পূ. এ পম্পেইর বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধে নামার আগে সৈন্যদের উদ্দেশ্য করে সে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন। ফারসালুস যুদ্ধের মাঠে জুলিয়াস সিজার বক্তৃতাটি দেন যখন তার প্রতিপক্ষ সেনাদলে তার চেয়ে দ্বিগুণ সৈন্য ছিল। জুলিয়াস সিজার তার সৈন্যদের তাবু ধ্বংস করতে আহ্বান করেন এবং খাদগুলোকে পূরণ করার আদেশ দেন যাতে পলায়নের কোন সুযোগ না থাকে। সামনে আগানো এবং শত্রুকে শেষ করে দিয়ে তাদের তাবুকে নিজের তাবু করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না সিজারের লেজিয়নের কাছে। উল্লেখ্য এ যুদ্ধের একমাস আগে পম্পেইর কাছে এক ভয়ানক পরাজয় এবং প্রাণ হারিয়ে ফেলতে গিয়েও কোনমতে পিছু হটে নিজেকে এবং নিজের সেনাদলকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। কোন জাদুবানে সিজারের সেনারা জেগে উঠলো, নিজেদের চেয়ে দ্বিগুণ সংখ্যক সৈন্যকে পরাজিত করতে পারলো তা জানতে হলে জুলিয়াস সিজারের বক্তৃতাটি আপনার অবশ্য পাঠ্য হওয়া দরকার।

নর্মান বিজেতা উইলিয়াম দ্য কনকারার ব্রিটেন দখল করার সময় যে বক্তৃতা দেন সেটাও আছে এ তালিকায়।

আর আছে অলিবার ক্রমওয়েলের একটি বক্তৃতা। অলিবার ক্রমওয়েল একজন সেরা সমরনায়ক ছিলেন। তিনিই ব্রিটেনের সর্বশক্তিমান রাজার অবস্থানকে ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন এবং রাজা প্রথম চার্লসকে শিরোচ্ছেদের মঞ্চে নিয়ে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রের পথটা সুগম করার রাস্তা তৈরি করেছিলেন।

আছে রাণী প্রথম এলিজাবেথের সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতাটি। ১৫৮৮ সালে স্পেনের আরমাদা ঠেকানোর জন্য সব ব্রিটিশ সেনার সাথে ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত চলে আসেন রাণী প্রথম এলিজাবেথ। নিজেকে অনিরাপধ করে একেবারে সাধারণ সৈন্যদের মাঝে নেমে আসা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল তার অনেক উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্খী। কিন্তু ব্রিটেনকে সবচেয়ে ভয়ানক পরাজয় ও লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য রাণী এলিজাবেথ যে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও তাকে ব্রিটিশদের হৃদয়ে আসন দিয়ে রেখেছে। এজন্য আমরা তার বক্তৃতার শুরুতেই সে কথার উল্লেখ পাই যে তিনি বেশ নিরাপত্তা ঝুকি নিয়ে যুদ্ধ ময়দানে এসেছেন। তিনি তার উপদেষ্টাদের কথায় কর্ণপাত না করার পেছনে যুক্তি দেখিয়ে বলেন তিনি তার সৈন্যদের বিশ্বাস করেন।

“My loving people, we have been persuaded by some, that are careful of our safety, to take heed how we commit ourselves to armed multitudes, for fear of treachery; but I assure you, I do not desire to live to distrust my faithful and loving people. Let tyrants fear; I have always so behaved myself that, under God, I have placed my chiefest strength and safeguard in the loyal hearts and good will of my subjects. And therefore I am come amongst you at this time, not as for my recreation or sport, but being resolved, in the midst and heat of the battle, to live or die amongst you all; to lay down, for my God, and for my kingdom, and for my people, my honor and my blood, even the dust. “

 

তিনি যে একজন নারী এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে যে উক্তিটি করেন তা আজও সবার মুখে মুখে। তার কথাটি ছিল এমন, ‘আমি জানি আমার শরীর, নারীর দুর্বল শরীর কিন্তু আমার হৃদয় একজন রাণীর এবং সেটা ইংল্যান্ডের’। তিনি ব্রিটেনকে বহি:শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে নিজে অস্ত্র ধারণ করবেন এবং সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবেন, ইংরেজ সেনাদের যুদ্ধে অবদানের বিচার ও পুরস্কার বিধান করবেন, যুদ্ধ মাঠের ধূলা গায়ে মাখবেন।

“I know I have the body but of a weak and feeble woman; but I have the heart and stomach of a king, and of a king of England too, and think foul scorn that Parma or Spain, or any prince of Europe, should dare to invade the borders of my realm; to which rather than any dishonour shall grow by me, I myself will take up arms, I myself will be your general, judge, and rewarder of every one of your virtues in the field. “

রাণীর মুখ থেকে প্রায় লক্ষাধিক সেনা এমন বক্তৃতা শোনার পর দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধে নেমেছিল। সে কারণ এবং আরেকটি প্রাকৃতিক কারণেই ব্রিটেন তার সূচনালগ্নে ভয়ানক এক পরাজয় থেকে বেঁচে যায়। রাণী প্রথম এলিজাবেথের এই বক্তৃতাটিকে ‘স্পিচ এট টিলবারি’ (টিলবারির বক্তৃতা) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

জর্জ ওয়াশিংটন, নেপোলিয়ন, সাইমন বলিভার, গ্যারিবাল্ডি থেকে শুরু করে আধুনিক জার্মানীর স্থপতি বিসমার্কের ‘ব্লাড এন্ড আয়রন’ বক্তৃতার মর্মার্থ রয়েছে এ বইটিতে। আরও আছে আব্রাহাম লিংকন, ভ্লাদিমির লেনিন ও ওড্রো উইলসনের বক্তৃতা।

তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় সবগুলো প্রধাণ চরিত্রের একটি করে বক্তৃতা সংকলিত হয়েছে। এডলফ হিটলারের দ্বিতীয় রাইখকে ডিফেন্ড করে একটি বক্তৃতা, জার্মান নাগরিকদের টোটাল ওয়ারে অংশগ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়ে গোয়েবলসের একটি বক্তৃতা এর অন্যতম।

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই অ্যাডলফ হিটলার বিশ্বের সবচেয়ে বাগ্মী বক্তাদের মধ্যে অন্যতম। তার সংকলিত বক্তৃতাটিতে এর পুরো প্রমাণ পাওয়া যাবে। তিনি নিজেকে জার্মানদের মধ্য থেকে উঠে আসা এক সাধারণ সৈন্য হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের পাশাপাশি এ যুদ্ধে জার্মানদের বিজয় অথবা মৃত্যু পর্যন্ত না থামার অঙ্গিকার করে যে বক্তৃতা দেন তা অনলবর্ষী। আর তার প্রিয় শিষ্য গোয়েবলস্ টোটাল ওয়ারের সাফাই গেয়ে যে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন তা তার গুরুর পিঠ বাচানোর কাজে অনেক সহায়তা করেছিল যদিও আল্টিমেটলি পরাজয় রুখতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের বছরগুলোতে হিটলার খুব কম সময়ই প্রকাশ্যে আসতেন। বার্লিন থেকে দূরে, পাহাড়ের একটি ব্যাংকার থেকেই পুরো ইউরোপে নির্দেশনা পাঠাতেন হিটলার। আর সকল বার্তা সম্প্রচার, হিটলারের পক্ষে সকল বাণী দিতেন গোয়েবলস্। মিথ্যা এবং প্রতারণার সমার্থক হিসেবে পরিচিত গোয়েবলস যে একজন অসাধারণ বক্তা ছিলেন এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

ফ্রাঙকলিন ডি রুজভেল্ট ও শার্ল দ্য গলের ও একটি করে বক্তৃতা রয়েছে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতার মহান নায়ক হো চি মিনের একটি অনন্য বক্তৃতা পাওয়া যাবে এ বইয়ে। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও ফরাসী বিপ্লবের স্লোগান ‘স্বাধীনতা, সাম্য ভ্রাতৃত্ব’ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র দিয়ে বক্তৃতা শুরু করে আমেরিকা ও ফ্রান্সের নিপীড়নমূলক পলিসির সমালোচনা করেন এবং ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি তুলে ধরেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করতে চাইবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ ই মার্চের বক্তৃতাটি রয়েছে কিনা! হ্যা, শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের বক্তৃতার গুরুত্ব ও ব্যবহার নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। বঙ্গবন্ধুর এ বক্তৃতাটি যে বিশ্বের সর্বকালের সেরা বক্তৃতার একটি এ বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না কিন্তু কোন বই বা গবেষণা গ্রন্থে এটা স্থান পায়নি এতদিন। সে যাই হউক প্রায় ৪০ বছর পর ঠিকই তার প্রাপ্য মর্যাদা পেয়েছে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেই সাহসী উচ্চারণকে বইয়ে জায়গা দেয়া হয়েছে এই ইংরেজি শিরোনামে ‘The Struggle This Time Is The Struggle For Independence’.ভবিষ্যতে আরও অনেক বইয়ে সেটা স্থান করে নেবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

শেখ মুজিবুর রহমান জাতির ক্রান্তিলগ্নে যে বক্তৃতাটি দেন তা এতই শক্তিশালী যে দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধরত দেশে উপস্থিত না থাকতে পারলেও সে বক্তৃতাটি জাতিকে দিক নির্দেশনা দিয়েছে এবং হাজার বছরের পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীনতার লাল পতাকা নিয়ে আসতে পেরেছে বাঙালী এবং বাঙালী প্রথম নিজেদেরকে শাসন করার ক্ষমতা পেয়েছে। সফল গণযোগাযোগের সকল টেকনিক ব্যবহারের সাথে সাথে এর সাহিত্যগুণ এবং কার্যকারিতার দিক থেকে এটি বিশ্ব ইতিহাসে একটি সফল বক্তৃতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতাটি গত আড়াই হাজার বছরের সেরা বক্তৃতায় জায়গা করে নেওয়ার ঘটনাটি এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।

বক্তৃতা হচ্ছে মানুষের কাছে পৌছার সবচেয়ে ডিরেক্ট মাধ্যম। এজন্য সেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। জ্যাকব ফিল্ডের বইয়ে যে ৪১ টি বক্তৃতা রয়েছে তার সবগুলোই বিরূপ সময়ে। সেই বিরূপ মুহূর্তে বক্তৃতাগুলো ব্যাপক অনুপ্রাণিত করেছিল, ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল, মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছিল। আমরা যখন আজও সেগুলো পড়বো, ভাববো তাহলে আমরা দেখবো সেগুলো আজও আমাদেরকে প্রভাবিত করছে, আজও আমাদেরকে নাড়া দিচ্ছে, আজও আমাদের শরীর ও মনে শিহরণ সৃষ্টি করছে যেমনটা করেছিল যখন বক্তৃতাগুলো দেয়া হয়েছিল। এখানেই বইটি পড়ার স্বার্থকতা ও যথার্থতা।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)

Mail: [email protected]

Facebook: https://www.facebook.com/sabidin.ibrahim

 

Related Posts

About The Author

Add Comment