বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোচিং সেন্টার: আলাউদ্দীনের জাদুর চেরাগ

স্কুল-কলেজ পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ণের নিমিত্তে হানা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে, এ যেন পুকুর থেকে সমুদ্রে এসে পড়ার মত। কুয়োর ব্যাঙের মত ক্ষুদ্র রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয় স্কুল-কলেজে, জ্ঞানের বিশালতার স্বরূপ প্রতিষ্ঠা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্ঞানকে নিক্তিতে মাপা যায়না, অজ্ঞানী জ্ঞানকে ভক্তি করে, শ্রদ্ধা করে, বিদ্বান জ্ঞান অর্জন করে, বিতরণ করে আর জ্ঞানী জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমাজকে শিকড় থেকে শিখরে নিয়ে যায়। জ্ঞানকে স্কুল-কলেজের বীজতলা থেকে সমৃদ্ধ বাগানে নিয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়েরর বোদ্ধারা। আলাউদ্দীন মোহাম্মদ একজন তরুণ লেখক, তারুণ্যের ধার ও ভার তার লেখার অবয়বে ফুটে উঠেছে। তিনি এমন এক বিষয়কে তার লেখার উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন যে বিষয় নিয়ে সবাই ভাবার সাহস পায় না, মনের ভিতরের চাপা কথা গুলো উন্মোচন করে জাতিকে আলোর পথ দেখানোর জন্য তার ক্ষুদ্র প্রয়াস “বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোচিং সেন্টার” নামক গ্রন্থটি।

ট্রিনিটি কলেজের এক অধ্যাপককে এক শিক্ষার্থী একবার মনের আবেগে বলেই ফেলেছিল, “স্যার, আমার জ্ঞান অর্জন শেষ!” এই শিক্ষার্থীকে রীতিমত তাক লাগিয়ে দিয়ে শিক্ষক বলেছিলেন, “আরে বোকা, তোমার জ্ঞান অর্জন শেষ, আর আমার জ্ঞান অর্জন শুরু। বোকাদের জ্ঞান অর্জন এভাবে শেষ হয়ে যায়।” আসলে ঐ শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পড়াশুনা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার উচ্ছ্বাস, আবেগ, অনুভূতি কয়েকটি কথায় আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে গেল। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ হলেই জ্ঞান অর্জন শেষ হয়ে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান অর্জনের এক সিঁড়ি তৈরিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় মানুষ তৈরির কারখানা, এখানে শিক্ষার্থীদের মনের চৌহদ্দীতে জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরের ফরমান পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। অবশ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে নজর দিলে আমরা দেখতে পাই যে আগেকার দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্মতত্ত্বের আদিখ্যেতা ছিল প্রবল, কালের ঘড়ি টিক টিক করে চলতে চলতে সেই স্রোতের মোহনায় অনেক গুলি নতুন প্রবাহের জন্ম হয়েছে।মোদ্দাকথা হল, আগেকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি Micro level বা ক্ষুদ্র পর্যায়ে কাজ পরিচালনা করতো, এখন কালের বিবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি Macro level বা বৃহৎ পর্যায়ে কাজ সম্পাদনে বদ্ধপরিকর।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবলমাত্র সংগৃহীত জ্ঞানের পাঠশালা নয়। বরং অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা ও বিতরণ করার এক পরম ক্ষেত্র। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা প্রচলিত আছে তা হলঃ ‘Publish or Perish’. হয় প্রকাশনায় থাকো, না হয় হারিয়ে যাও। এই কথার আঙ্গিকে বলা যায় আমরা হারিয়ে গেছি। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষিতে যদি বলা হয় তাহলে আমরা ডুবে গেছি। দেশের সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে একটু নজর দিলে আমরা বুঝতে পারব আমরা কিভাবে ডুবে গেছি। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সুচারূভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার গলদ গুলো ফুটিয়ে তুলেছেন। এটা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সাহসের কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শন নিয়ে আলাউদ্দীনের সন্দেহ যেন আমার সন্দেহ। এখানকার শিক্ষা দর্শন স্পষ্ট নয়, বিসিএস নামক ব্যাধিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রবলভাবে আক্রান্ত। ভাইরাসের মত আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরকে বশ করেছে এই ভাইরাস। তাই উদ্ধারের পথ মেলানো ভার। সকাল হতে না হতেই শিক্ষার্থীদের ঐকতানে মুগ্ধ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এখানে প্রাণের মেলা বসে যেন। তবে এ কথা অত্যন্ত দুঃখের সাথে স্মরিত হয় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় এখন বিসিএসের কারখানা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বলতে যা বোঝায় তা এখানে একেবারে শূন্য। এ যেন বিশাল কোচিং সেন্টার! এখানে লাইব্রেরীতে সকাল-সন্ধ্যা বিসিএস বিসিএস খেলা হয়। প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে নেই, তারা লাইব্রেরীতে হানা দিচ্ছে ক্লাসের বইয়ের মধ্যে বিসিএসের বই নিয়ে। গবেষণায় তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় পঙ্গু। লেখকের গবেয়ণায় ফুটে উঠেছে এর স্পষ্ট হালচাল। বইটির ৩৩ নং পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন,”ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মাথায় ১৯২৬ সালে এর প্রকাশনা সংস্থা যাত্রা শুরু করে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির মোট প্রকাশনার সংখ্যা ১৬৩ টি। এর মধ্যে বাংলা বইয়ের সংখ্যা ৫৬টি এবং ইংরেজি বই ১০৭ টি।” কতই নাজুক আমাদের গবেষণার হালহকিকত! আমরা যতই গলা ফাটিয়ে বলি না কেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড! আসলে আবেগে আমরা হরহামেশাই অনেক কথা বলি কিন্তু বাস্তব অনেক কঠিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ছিল না। অনেককেই এটা পীড়া দিলেও বাস্তবতা আসলেই এমন। তবে হ্যাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুদ্ধদেব বসু, মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী(ম্যাক), আহমদ ছফা, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, প্রফেসর আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, ড. আসাদুল্লাহ আল গালিবের মত শিক্ষার্থীর জন্ম দিয়েছে। ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. হুমায়ূন আজাদ, ড. মুনীর চৌধুরী, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. সত্যেন বোস, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. আনিসুজ্জামান, ড. আহমদ শরীফের মত শিক্ষকের জন্মদাতা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন আন্দোলন বাস্তবায়নে সবচেয়ে সেরা নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দলিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য মানবিক শক্তি সম্বলিত মানুষ তৈরি করা। ক্ষুধা মেটানোর জন্য মানুষ খাবার খায়, মনের খাবারের চাহিদা মেটানোর জন্য মানুষ বই পড়ে। মানুষের মননশীলতার প্রতীক হয়ে রাজসাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ব্যতিক্রম নয়। তবে কথা হল, এই প্রতিষ্ঠানটি যদি বিসিএসের কারখানায় পরিণত হয় তাহলে জাতি কোথায় যাবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখবে। রাজনীতির এক আশ্রয়স্থল এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তরুণ রাজনীতিবিদদের পরম সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন রাজনীতির ভয়াল আড্ডাস্থল। হলের গেস্টরুম নামক ‘আবু গারীব’ সম কারাগার থেকে তৈরী হয় কুপা শামসুরা। প্রশাসন নিরব, দেখার কেউ নেই। অসহায়তার নির্মম প্রতীক হয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান থেকে এখন আর পন্ডিত তৈরি হয় না। “Pundit begets pundit” এটা প্রশাসন ভুলে গেছে। হলের নাজুক অবস্থা দেখে কান্না পাই। এই ঘুনেধরা গোষ্ঠী থেকে কিভাবে তৈরি হবে সুস্থ জাতি? আমরা কি আসলেই রুগ্ন জনগোষ্ঠী? জাতির কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ আর কত ঘুমাবেন? জঘন্য রাজনীতির করালগ্রাস থেকে আগে জাতিকে বাঁচাতে হবে। গরিব অসহায় পরিবারের শিক্ষার্থীদের বিশাল এক অংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়ে। ওদের দিকে একটু নজর দেওয়ার মত সময় কি প্রশাসনের হবে না? রুগ্ন জাতি নিয়ে কি বিশ্বের দরবারে মাথা তোলা যায়? আমি জানি যায় না, অন্যরাও হয়তো তাই বলবেন। বড় বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, দার্শনিক, পন্ডিত, বিজ্ঞানী, রাজনীতিক তৈরি করতে গেলে যে পরিবেশ দরকার তা কি আমাদের হয়েছে? বুদ্ধবৃত্তিক চর্চার সময় কি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হবে? লাইব্রেরীতে বিসিএসের বইয়ের পাশাপাশি অন্য বইয়ের জায়গা হবে কি? বিসিএস নামক ব্যাধি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি না দিলে এ জাতি যে পঙ্গু হয়ে যাবে। প্রশাসনের সময় হবে ভাবার? লাইব্রেরীর বইগুলোতে শিক্ষার্থীদের হাত পড়ুক। আলাউদ্দীন জাদুকরী চেরাগ নিয়ে এসেছেন জাতিকে পথ দেখানোর জন্য। কিন্তু একটি জায়গায় জাদুকর ম্যুরদের কাছে আমরা ধরা খেয়ে যায় কিনা সন্দেহ দানা বাধে মনে। তবু আমরা স্বাপ্নিক, তবুও আমরা সাত্ত্বিক। এপিজে আব্দুল কালামের মত জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি।

“বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোচিং সেন্টার” নামক বইটিতে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে লেখক আলাউদ্দীন মোহাম্মদের দারুণ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে, জীবনমুখী দর্শন আছে, অভিজ্ঞতার শিকড়সন্ধানী মনের বহিঃপ্রকাশ আছে, সমকালীন সমাজচিত্র আছে, আক্ষেপ আছে, ভিন্নভাবে চিন্তা করে তরুণদের উস্কে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। নানা বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এই বইটির জন্য তরুণ লেখক প্রশংসার দাবীদার।

 

Writer : Mehadi Arif

Related Posts

About The Author

Add Comment