বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দর্শন

পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে বিরাজমান সভ্যতাগুলোর মধ্যে প্রণিধানযোগ্য যে সাদৃশ্য দেখা যায় তা তাদের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য ও চিন্তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা। ভারতবর্ষের প্রাচীন কোন সভ্যতার কথা বললে আমরা স্মরণ করি নালন্দা, তক্ষশীলার মত বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রীক সভ্যতার সাথে জড়িয়ে আছে লাইসিয়াম, একাডেমি’র মত প্রতিষ্ঠান, ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে ছিল আল-আজহার, আল হাকিমের মত বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমান ইউরোপকেন্দ্রীক বিশ্বসভ্যতার শুরু থেকে অদ্যবধি যে জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো পথ দেখিয়ে চলেছে সেগুলো এগার শতক থেকে গড়ে উঠা তাঁর আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। আর হালের আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সভ্যতার কেন্দ্র হয়ে উঠার নেপথ্যেও শক্তিঘর হিসেবে কাজ করছে তার সাড়ে চার হাজারের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় (সর্বশেষ ২০১৪ সালের তথ্যে ৪৫৯৯, US Department of Education) যেগুলো নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি এবং প্রসারে অগ্রণী থেকে বিশ্বের সকল দেশ ও অঞ্চলের জ্ঞানপিপাসু কোটি (২০১৪ তথ্য মতে ২১ মিলিয়ন) বিদ্যার্থীর তীর্থস্থানে পরিণত করেছে এক সময়ের বিরান এই ভূখন্ডকে। তাই সভ্যতার ইতিহাস, প্রগতির ইতিহাস, মানুষের মানুষ হয়ে উঠার ইতিহাস আসলে  বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইতিহাস।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আর এই উচ্চশিক্ষার প্রাকশর্ত হিসেবে যে শিক্ষা লাভ করতে হয় কিংবা উচ্চশিক্ষা যে বেজমেন্টের উপর দাঁড়িয়ে ব্রহ্মাণ্ডকে উঁকি দিয়ে দেখে সেটি সাধারণ শিক্ষা। ইংরেজি General Education বা Education কে বাংলায় অনুবাদ করা হয় ‘শিক্ষা’ নামে যার অর্থ নতুন কিছুর সাথে পরিচয় লাভ, সচেতন ইন্দ্রিয় দ্বারা নতুন অভিজ্ঞতার উপলব্ধি। ইংরেজি Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Educare থেকে যার অর্থ হচ্ছে ‘to rear Children’বা শিশুর প্রতিপালন। সে হিসেবে মানব শিশুর জন্মের পর থেকেই তার শিক্ষণের কাল শুরু হয়ে যায়। শিশুর কৌতুহলোদ্দীপিত চোখ তার চারপাশে যা দেখে তাতেই বিষ্মিত হয়, আনন্দ লাভ করে এবং পরম মনযোগে বস্তুর পর্যবেক্ষণে লিপ্ত হয়। কিন্তু এক সময় তার বিস্ময়ের ঘোর কাটে, ক্লান্তি অনুভব করে, চোখ বুজে নিদ্রা যায় এবং শিক্ষণের বিরতি শুরু হয়। কিন্তু কগনিশনের এই সহজাত প্রক্রিয়াকে অনেকেই শিক্ষা বলতে নারাজ। ভারতের শিক্ষা দার্শনিক অম্লান দত্তের মতে শিক্ষা সম্ভব কেবল সচেতন জিজ্ঞাসা এবং জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে (দত্ত, ২০০০)।  আর এখানে ‘প্রক্রিয়া’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। মূলত শিক্ষা অপূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে জীবনব্যাপী গমনেরই এক প্রক্রিয়া যার গন্তব্য বা শেষ বলতে আসলে কিছু নেই। গতিপথ এবং গতির প্রকৃতি অনুযায়ী এই গমনে পার্থক্য দেখা দেয়। শিশুস্তর থেকে শুরু হওয়া সচেতনভাবে অপূর্ণতা থেকে এই পূর্ণতার দিকে যাত্রাকেই শিক্ষা বলা যায়।

সমাজবিজ্ঞানী কার্ল মাক্সের মতে, “শিক্ষা হচ্ছে সমাজের মৌল কাঠামোর উপর নির্ভরশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান।” আর সেদিক থেকে শিক্ষাকে সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অধ্যাপক রংগলাল সেন মনে করেন, “শিক্ষা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি বাহন। মানবসমাজে শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ সমাজ প্রগতির বিভিন্ন ধারার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত” (সেন, ২০০৫)। সাধারণ শিক্ষার দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিক্ষাদার্শনিক হিউস্টন বলেন, “The Purpose of General Education is Socialization of Emotiions”।দার্শনিক ফ্রোয়েবলের মতে সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে আদর্শ ধর্মীয় মানুষ বা Religious Man এ পরিণত করে গড়ে তোলা। জন ডিউই’র মতে সাধারণ শিক্ষা মানুষকে অর্থনীতি এবং সমাজ সম্পর্কে সচেতন করে গড়ে তুলবে এবং মানুষের দুই স্বত্ত্বা Economic Man এবং Social Man এর বিকাশে সার্বিক নজর দিবে। অন্যদিকে ফরাসি দার্শনিক জ্যা জ্যাক রুশোর মতে, সাধারণ শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত করে Natural Man এ পরিণত করা। ১২ শতকের আরব দার্শনিক ইবনে তোফায়েল তাঁর হাই ইবনে ইয়াকজান গ্রন্থেও এই শিক্ষার এই Natural Man তৈরির ভূমিকায় গুরুত্বারোপ করেন। গত শতকের দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল অবশ্য শিক্ষার প্রয়োজনীয় এবং আনন্দ লাভের দিক দুটোর মাঝেই সমন্বয় সাধণের চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, উপযোগবাদীতার জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা তথা প্রযুক্তিগত শিক্ষার যেমন গুরুত্ব আছে তেমনি কল্পনাশক্তির বিকাশের জন্য অলংকারিক শিক্ষা বা লিবারাল আর্টসের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না (রাসেল, ১৯১৬)।

এবার আসি প্রাচ্যের দিকে। প্রাচ্যে শিক্ষার দর্শন নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত এবং নিজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দৃষ্ঠান্ত রেখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘শিক্ষা’য় সংকলিত হয়েছে। অম্লান দত্ত রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা দর্শনের সারকে তিনটি সম্পর্কের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, একঃ মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক, দুইঃ মানুষের সাথে প্রতিবেশীর সম্পর্ক এবং তিনঃ মানুষের সাথে বিশ্বমানবের সম্পর্ক। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে শেখে ও প্রকৃতির নিকটবর্তী হয়। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ যত প্রকৃতির নিকটে যেতে থাকে তার আনন্দবোধ ততই বাড়তে থাকে। কিন্তু মানুষই এই প্রাণ প্রকৃতির কেন্দ্র এবং মানুষকে সমাজে তাঁর প্রতিবেশীর সঙ্গে বসবাস করতে হয়। শিক্ষার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য এই প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ক যেটিকে সচরাচর আত্মীয় শব্ধ দ্বারা প্রকাশ করা হয়, সেটি বিস্তৃত করা। প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে আত্নার প্রসার ঘটে এবং আত্মউন্নয়ন ও আত্নোশুদ্ধির পথ সহজতর হয়। আর শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য  দেশ-কাল-ধর্ম-বর্ণ-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে এক বৃহত্তর মানব সমাজের সাথে ব্যক্তির বৈশ্বিক আত্মীয়তা পাতানো।

এ তো গেল সাধারণ শিক্ষার লক্ষ্যের কথা। সাধারণ শিক্ষার লক্ষ্যের সাথে সুস্পষ্টভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্যের ভিন্নতা থাকবে, থাকাটাই স্বাভাবিক। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়েরই বা কি দরকার ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দর্শন নিয়ে বলার শুরুতে দেখা যাক বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার বিকাশের স্বরূপ।

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি ইংরেজি University শব্দের বাংলা রূপ যেটি আবার এসেছে ল্যাটিন universitas থেকে যার অর্থ  a whole বা সম্পূর্ণ। Universitas শব্দটি আবার নেওয়া হয়েছে  universitas magistrorum et scholarium শব্দবদ্ধ থেকে যার ইংরেজি অনুবাদ করা হয় “Community of Teachers and Scholars” (Encyclopeadia Britannica, 11th ed. 1911)। লক্ষ্য করুন, University বলতে কিন্তু এখানে কোন কাঠামোবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয় নি যেটি হালে আমরা দেখে থাকি। এটি ছিল নেহাতই গুরু শিষ্যের মিলিত Community বা Corporation বা বাংলায় সম্প্রদায়। সময়ের সাথে কলেবর বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটেই বিশ্ববিদ্যালয় একটি সংহত ভৌত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা বুঝে থাকি যেখানে বিশ্ববিদ্যার চর্চা করা হয়। “If University is not universal, it is not a university”। বিশ্ববিদ্যালয় একটি সার্বজনীন এবং সর্বপ্রকার সংকীর্ণতামুক্ত সামাজিক শিক্ষামূলক সংগঠন। এ প্রসঙ্গে হুমায়ূন আজাদ যথার্থই বলেন, “ব্যাংক, বীমাসংস্থা, আমদানি-রপ্তানি কেন্দ্র ও অজস্র পার্থিবতামুখী প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার সাথে মহত্বের, পবিত্রতার সম্পর্ক কেউ খোঁজে না। উপসনালয়ের সাথে পবিত্রতার ধারণা জড়িত হয়ে আছে প্রথাগতভাবে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তারও উর্ধে, কেননা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বমানবের, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অজস্র ধর্মাবলম্বীর, বর্ণের, গোত্রের ও শ্রেণীর” (আজাদ, ১৯৯৯)। সুতরাং বলা যায়, যে শিক্ষায় বিশ্ববীক্ষার সন্ধান এবং বিশ্বজগতের সাথে মানবাত্মার সম্পর্কের দিক নির্দেশনা সম্বলিত গভীর অভিনিবেশ থাকে সে বিদ্যায়তনই বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউরোপের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সূতিকাগার বা আঁতুড়ঘর ল্যাটিন চার্চ স্কুল বা Scholae monastice থেকে যেখানে যাজক-যাজিকাদের studia generalia’য় শিক্ষা প্রদান করা হত। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র “The Origin of Universities” এ মন্তব্য করা হয়েছে যে মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চার্চ থেকে গড়ে উঠেছে সেটা সর্বক্ষেত্রেই সত্য নয়, বরং বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই পূর্বপ্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের সম্প্রসারণের ফল।আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে Studium generale এবং উত্তর ইউরোপিয়ান দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থাকে Academy নামে ডাকা হত। University হচ্ছে রোমান Collegium এর মতো, যার অর্থ হচ্ছে a group or association of persons. আর Studium generale হল একটি অভিন্ন সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্র যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এক অভিন্ন উদ্দেশ্যে সমবেত হয়। ইউরোপে চতুর্দশ শতকে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আইনানুগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় বা university সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্র বা Studium generale এর স্থলাভিষিক্ত হয়(The Universities of the Renaisance and Reformation, Grendler P.F, 2004)।

ইউরোপের ছোট ছোট জাতিগুলোর জনগণের সম্রাট এবং চার্চের বিপরীতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার চাহিদা থেকে রোমান আইন বা ius gentium পড়ানোর মধ্যে দিয়ে ইতালির বোলগনায় ১০৮৮ সালে University of Bologna নামে প্রথম আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আশেপাশের বিভিন্ন ভূখন্ড থেকে আগত ‘Nationes’ দের সমাহার ঘটেছিল এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। W Ruegg এর ভাষায়, “The students had all the power… and dominated the masters”.  এর ৬২ বছর পরে ১১৫০ সালে ঠিক বিপরীত আঙ্গিকে প্যারিসে University of Paris নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। প্যারিসের গঠনকাঠামো ছিল ভিন্ন এবং সেখানে বিষয়বস্তু নির্ধারণ ও পাঠদান প্রক্রিয়ায় বিদ্যার্থীদের চেয়ে শিক্ষকের অধিক নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং তার সাথে প্যারিসসহ পরবর্তী উত্তর ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যবস্তুতে আর্ট এবং থিওলজি বা ধর্মতত্ত্ব প্রাধান্য লাভ করে। তারও ১৭ বছর পরে ১১৬৭ সালে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত হয় University of Oxford। এই পথ ধরে আমরা দেখি মধ্যযুগের শেষ প্রান্তে, প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪০০ বছরের মাথায় ইউরোপে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ টি। ১৫ শতকে ২৮ টি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত হয় এবং ১৫০০ থেকে ১৬২৫ সালের মধ্যে আরো ১৮ টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮ শতকের শেষ প্রান্তে এসে ইউরোপে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪৩ টি। এর মধ্যে জার্মান সাম্রাজ্যে ছিল ৩৪ টি, ইতালীয় দেশগুলোতে ছিল ২৬ টি, ফ্রান্সে ২৫ টি, স্পেনে ২৩ টি এবং বাকিগুলো ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে।

যদিও অধিকাংশ ঐতিহাসিক আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়কে একান্তই ইউরোপের কীর্তি বলে দাবী করেন, ঐতিহাসিক আর্নল্ড এইচ গ্রিন এবং হুসেইন নাসর এর মত স্কলারগণের এই দাবীতে দ্বিমত রয়েছে। তাদের মতে ১০ শতকে ইসলামিক মাদ্রাসাগুলোই প্রথম আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। জর্জ মাকদিসির মত স্কলার দাবী করেন মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আল-আন্দালুস, সিচিলির আমিরাতের মত মাদ্রাসাগুলো দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আর তাতো সত্য যে ৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, আল হাকিমের মতো বিশ্ববিদ্যালয় তখন মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রে বর্তমান ছিল। তবে শুরুটা মুসলমানদের কাছ থেকে হলেও ক্রমেই নেতৃত্বটা বর্তমান সভ্যতার কেন্দ্রগুলোতে ঘণীভূত হয়ে আবারো দূরপ্রাচ্যের মত অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিকাশের ধারা যে খুব মসৃণ ছিল তা বলা যাবে না। সতের শতকের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গতি শ্লথ হয়েছে। এবং শতকের শেষভাগে জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভবের প্রাক্কালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অধিক হারে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসতে থাকে। আর এতে করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে শিক্ষকের কর্তৃত্ত্বের প্যারিসভিত্তিক মডেল মূলধারা হতে শুরু করে যদিও তখনো শিক্ষার্থী দ্বারা পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলোও ধীরে ধীরে প্যারিস মডেল অনুসরণ করে একটি কেন্দ্রীয় কারিকুলার বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। এর মধ্যে আবার তিনটি ধারা তৈরি হয়, প্রথমটি ছিল বিশেষজ্ঞ তৈরির ধারা, দ্বিতীয়টি অক্সফোর্ড ভিত্তিক টিউটোরিয়াল বা কলেজিয়েট ধারা যেখানে শিক্ষণ এবং সংগঠন বিকেন্দ্রীভূত ছিল এবং জ্ঞান ছিল সাধারণ প্রকৃতির। তৃতীয় ধারার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছিল সমন্বয়বাদীতা। অর্থাৎ কেন্দ্রীভূত সংগঠনের মধ্যে দিয়ে কলেজিয়েট পদ্ধতি অনুসরণ।

শুরুর দিকের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মধ্যযুগের উদ্ভাবিত বিষয়বস্তুই প্রচলন করে রেখেছিল। প্রাকৃতিক দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা, ধর্মতত্ব, গণিত, জ্যোতিষবিদ্যা, আইন, ব্যকরণ এবং রেটরিক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সবগুলো বিভাগের অধ্যয়নেই আধুনিক মানবতাবাদের ছোঁয়া ছিল। এই মানবতাবাদী স্কলারদের যদিও প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল প্রাচীণ ভাষা, পুস্তকাদি এবং স্ক্রিপ্টগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্য অনুসন্ধান, আবিষ্কার, গবেষণা করা তবুও তাঁদের চিন্তা-চেতনা প্রাচীনমুখী ছিল না, বরং তাঁরা প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার বিকাশে প্রভাব ফেলছিলেন। আর এই মানবতাবাদের ছোঁয়ায় জন্ম নিল Humanities বা মানবিকবিদ্যা নামের জ্ঞানের নতুন শাখা। আর এই প্রগতিতে সহযোগিতা করেছিল প্রিন্টিং প্রেসের আবিষ্কার এবং ফলত গবেষণা ও জ্ঞান বিতরণের আনুসাঙ্গিক ব্যয় কমে আসা। ইউরোপের শিল্প বিপ্লবে যে এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেতৃত্ব দিয়েছিল তা বোঝা যাবে একটি তথ্যের মাধ্যমে। শিল্প বিপ্লবের প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং নিয়ামক ছিল নতুন নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪৫০ থেকে ১৬৫০ সালের ‘ডিকশনারি অব সায়েন্টিফিক বায়োগ্রাফি’ত অন্তর্ভূক্ত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের ৮০ শতাংশের উপরে ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিত এবং এর মধ্যে ৪৫ শতাংশ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

প্রাক আধুনিক যুগের শেষদিকে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠন ও কর্মপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন লক্ষ্যনীয় হয়। এরিস্টটলের নন্দনতত্ত্ব এবং পদ্ধতিগত ফোকাসের স্থলে অধিক প্রযুক্তিগত ফোকাস সামনে চলে আসে। ধর্মতত্ত্বের জায়গা দখল করে মানবিকবিদ্যা এবং জ্ঞান তৈরি এবং বিস্তারের উম্মুক্ত ক্ষেত্রে জ্ঞান একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হয়ে আধুনিক রাষ্ট্র গঠণের ক্ষেত্র তৈরি করে।

১৮ শতকের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজস্ব জার্নাল প্রকাশনা শুরু করে এবং ১৯ শতকের মধ্যে জার্মান এবং ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে দুই ধরণের বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল তৈরি হয়। জার্মান মডেলে উদার চিন্তার প্রাধান্য ও স্বাধীনতা, সেমিনার এবং গবেষণাগারের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। অন্যদিকে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শক্তিশালী শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণবাদিতার মধ্যে চলে যায়। ১৯ শতকে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করে এবং জার্মান মডেল সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯ এবং ২০ শতকের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে শিক্ষা ক্রমান্বয়ে আম-জনতার ধরাছোয়ার মধ্যে চলে আসে এবং ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লব থেকে Modernity বা আধুনিকতাবাদের স্তরে সিভিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভব ঘটে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দর্শন এবং এর কাঠামো নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের সূত্রপাত হয়। সে প্রেক্ষাপটে সিভিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা স্বীকারপূর্বক এর মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ইংল্যান্ডে ১৯৬৩ সালের রবিন্স রিপোর্টসিভিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেনঃ ১) দক্ষতার উপর নির্দেশনা ২) মনের সাধারণ ক্ষমতার অগ্রগতি সাধন যাতে করে ব্যক্তি নিছক বিশেষজ্ঞ না হয়ে মার্জিত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ৩) রিসার্চ এবং শিক্ষকতার মধ্যে ভারসাম্য করা ৪) একটি কমন সংস্কৃতি এবং কমন স্টান্ডার্ড অব সিটিজেনশীপ।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দর্শনঃ

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোগত স্বরূপ বিবর্তনের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার দর্শনেরও কিছুটা বিবর্তন হয়েছে। মধ্যযুগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল সনাতন ঐতিহ্যের ব্যাখ্যা এবং বংশপরম্পরায় সেটাকে অবিচল শ্রদ্ধায় বাঁচিয়ে রাখা। এই রক্ষণশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘ সংগ্রামে যুক্ত থাকতে হয়েছে এবং সময়ে সময়ে প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হয়েছে। ১৮ ও ১৯ শতকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের নেতৃত্বের মাধ্যমে শিল্পায়িত সমাজ-বাস্তবতায় সমাজের দৃষ্টিকোণ পাল্টেছে, এনলাইটেনমেন্টের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ধরণও পাল্টেছে। তার সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বও বেড়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় “তুফান উঠেছে বলেই হাল আরো শক্ত করে ধরতে হবে”। আধুনিক যুগের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও প্রধান কাজ এমন এক শ্রেণীর প্রাজ্ঞ মানুষ তৈরি করা যাঁদের কাজ হবে জ্ঞানবিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করা, আগামী বিশ্বের বীক্ষা রচনা করা এবং প্রগতির পথে মানবসমাজকে পরিচালিত করা।

সাধারণ শিক্ষার সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পার্থক্য করা যায় এভাবে- সাধারণ শিক্ষা ব্যক্তিকে একটি অর্থপূর্ণ জীবনযাপনে সক্ষম করে তোলে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যক্তিকে ব্যক্তিসমূহের সামগ্রিক বা ম্যাক্রো অর্থপূর্ণ জীবন কীভাবে অর্জন সম্ভব সে চিন্তার সক্ষমতা দান করে। আর তাই আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং তার পরিচালনার মূলনীতির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে এক নিগূঢ় সম্পর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিদ্যাশিক্ষার চর্চা হয় তার আলোকেই সমাজ ও রাষ্ট্র গতিময়তা লাভ করে। দেশের বা ভূখন্ডের প্রাকৃতিক সীমানা থাকলেও রাষ্ট্র তো আদতে একটি ধারণামাত্র। আর যে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা নাগরিকের প্রতিদিনের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে সে ধারণার উদ্ভবে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল তেমনি তার বিকাশ, বিস্তার ও প্রাণসঞ্চারেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা থাকতে হয়। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র কোনটাই চলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্যম্ভাবিতা তৈরি হয়েছে তার চিন্তাশিক্ষা পদ্ধতি এবং নিয়ত জ্ঞানসাধনার মাধ্যমে মানবসমাজের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গতিধারার পথ নির্ণয় করার মাধ্যমে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব নিহিত থাকে মূলত এর সত্য অনুসন্ধান ও সত্য অভিমুখিতায়। তার অস্তিত্ব নির্ভর করে চিন্তা ও মতামতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের উপর। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ একটি জাতির সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চূড়ায় অবস্থান করে। জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তার মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সর্বমুখী বিকাশ নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বঘোষিত অঙ্গীকার। মানুষের সাথে মহাজগতের সম্পর্কের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে দুটি পথরেখার দ্বারা ব্যখ্যা করা যায়, ১)  উলম্ব বা ভার্টিক্যাল পথরেখা ২) সমান্তরাল বা হরিজোন্টাল পথরেখা।  উলম্ব পথরেখা বলতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস চর্চা ও বর্তমানকে অতীতের আলোকে ব্যখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যত প্রগতির পথ নির্দেশ করে মহাকালের স্রোত তৈরির ভুমিকাকে নির্দেশ করছি। সমান্তরাল পথরেখা বলতে এখানে চলমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সকল প্রগতিশীল মানবপ্রচেষ্টার সঙ্গে ব্যক্তি এবং সমাজের সংযোগ ও একাত্বতা ঘোষণা করার দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। প্রগতি অভিমুখী বিভিন্ন আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধীতা ও শান্তি প্রচেষ্টা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণ-প্রকৃতি গবেষণা সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কর্মকান্ডের সাথে একবিংশ শতকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামষ্টিক সংবেদন দেখা যায়। এটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন পরিচয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানব পরিবারের সদস্যগণের মধ্যে সংহতি প্রতিষ্ঠা করে ভারসাম্যপূর্ণ একটি হারমনিক বিশ্বসমাজ তৈরিতে অংশ নেয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল অর্জিত জ্ঞানের সংগ্রহশালা নয়। সংরক্ষিত জ্ঞানের আলোকে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং বিতরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য কাজ। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সমানভাবে অংশ নিতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষার্থী থেকে শুরু হলেও বর্তমান শিক্ষকরাই এই প্রক্রিয়ার অগ্রনায়ক হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। শিক্ষক হবেন সামাজিক মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, দৃষ্টিভঙ্গিতে নৈর্বক্তিক ও প্রসারিত, স্বপ্নে উদার এবং সঞ্চারী, প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় এবং উন্নত, কর্মে দক্ষ এবং সাধক ও সর্বোপরি বৃহৎ মানবসমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। একজন শিক্ষকের মধ্যে এই গুণাবলির সমন্বয় ঘটলে তিনি শিক্ষার্থীর হ্রদয় ও চিন্তায় দীর্ঘকালীন ছাপ রাখতে পারেন। এটি শিক্ষার্থীর মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ন্যায়নিষ্ঠতার প্রদীপ জ্বালিয়ে দেয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর এই মিলিত শিখায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ আলোকিত হয়ে উঠে। সে আলোক ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। ঠিক এই বিষয়টি চিন্তা করেই বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয়েছিল ‘Community of Scholars’। চিন্তার অনুশীলন ও সমাধানের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিনব পদ্ধতির উদ্ভাবন করবে এমন চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক তৈরি করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার অনন্য বৈশিষ্ট্য তার মানবিকতায়, তার সমাজ সম্পৃক্ততায়। সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে সামাজিক-মানবিক, মানুষের জন্য জ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবিচ্ছিন্নতা যেমন অবাস্তব এবং আত্মঘাতী তেমনি সামাজিক অন্যান্য উপযোগবাদী প্রতিষ্ঠানের ন্যায় একে প্রাত্যহিক জীবন-জীবিকার আশ্রয়স্থল করে তোলাও বিধ্বংসী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিদিনের রঙ্গমঞ্চে সরাসরি অংশগ্রহণ করে না, এর অবস্থান রঙ্গমঞ্চের বাইরে। রঙ্গমঞ্চের তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মহাকালের স্রোতে ঢেউ তৈরি করে। যুক্তিকে বিচারক মেনে সত্যনিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, সমতা, সম্প্রীতি, উদারতা, সহানুভূতি ও সততা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার মৌলনীতি।বাইরের হতাশা, উত্তেজনা, আন্দোলন ও কর্মব্যবস্থার ঝড়ে নুইয়ে না পড়ে মনের গহনে নিভৃত শান্তির আশ্রয় রেখে বিদ্যাচর্চার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। এই কাজ ভিন্ন মানুষ মানুষ হয়ে উঠে না, সভ্যতা টেকে না, সমাজ প্রগতি পায় না। এটি বিশ্বমানবতার আশ্রয়স্থল।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উদ্দেশ্যঃ

জ্ঞান সৃষ্টিঃ

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং প্রধান উদ্দেশ্য জ্ঞান সৃষ্টি। জ্ঞান যদি সৃষ্টিই না হল তাহলে বিতরণ হবে কি? বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান সৃষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, “… শিক্ষার প্রকৃত ক্ষেত্র সেইখানেই যেখানে বিদ্যার উদ্ভাবনা চলিতেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য কাজ বিদ্যার উৎপাদন, তাহার গৌণ কাজ সেই বিদ্যাকে দান করা। বিদ্যার ক্ষেত্রে সেই সকল মনীষীদের আহ্বান করিতে হইবে যাঁহারা নিজের শক্তি ও সাধনার দ্বারা অনুসন্ধান ও আবিষ্কার এবং সৃষ্টির কার্যে নিবিষ্ট আছেন। তাহাঁরা যেখানেই নিজের কাজে একত্র মিলিত হইবেন সেখানে স্বভাবতই জ্ঞানের উৎস উৎসাহিত হইবে, সেই উৎসধারার নিঞ্চারণী তটেই দেশের সত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা হইবে।”জ্ঞান সৃষ্টির সাথে রাষ্ট্রের জেগে উঠা, টিকে থাকা, মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকার একটা সম্পর্ক রয়েছে। এটা বোধ হয় কেউ অস্বীকার করবে না যে আধুনিক বিশ্বে জ্ঞান ভিন্ন কোন সমাজের টিকে থাকা সম্ভব নয়। কোন সমাজ যদি নিজের চিন্তার আলোকে, নিজেদের সচেতন প্রচেষ্টালব্ধ জ্ঞান দ্বারা তাঁর উপযোগী ব্যবস্থা না দাঁড় করাতে পারে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে নির্ভর করতে হবে অন্যের অর্জিত জ্ঞানের উপর। আর অন্য বাস্তবতার, অন্য পরিকল্পনার, অন্যের অভিজ্ঞতালব্ধ কোন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে কোন রাষ্ট্র কিংবা সমাজ নিজেদের স্বাধীন-সার্বভৌম ঘোষণা করতে পারে না। আমরা যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন দিনগুলোতে ফিরে যাই তাহলেও দেখি কেবল উত্তাল ছাত্র-জনতার আন্দোলন নয় বরং ‘দ্বৈত অর্থনীতি’র আলোকে ছয় দফার তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে বিশ্ব মজলিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে নতুন রাষ্ট্রের যৌক্তিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। তাই এটা জোর দিয়েই বলা যায়, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্র ভাঙ্গতে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় দরকার তেমনি রাষ্ট্র গড়তেও বিশ্ববিদ্যালয়েরই দরকার হয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দরকার হয় নিত্যনতুন জ্ঞান সৃষ্টির তাগিদে।জ্ঞান সৃষ্টির এই প্রক্রিয়াকে গবেষণা বলা হয়। এই গবেষণা মানুষের বিকাশের উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে সমাজের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম প্রযুক্তি আবিষ্কার এবং দৈনন্দিন জীবনে সেই প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক স্বচ্ছলতা অর্জন এবং সেই স্বচ্ছলতার টেকসই বন্টন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও কর্মপন্থা প্রয়োজন। এই দুইয়ের সমন্বয়ে সমাজে ক্ষুধার দারিদ্র দূর হয়, মানুষ ভুক-পিপাসা থেকে মুক্তি লাভ করে। অন্যদিকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাসের গবেষণার মাধ্যমে জাতি তাঁর আত্মপরিচয় খুঁজে পায়।

আত্মার ক্ষুধা জাগ্রত করাঃ

ক্ষুধা পেলেই না অন্নসংস্থান! জ্ঞান সৃষ্টির পূর্বে তাই যে কাজটি করতে হয় সেটি হল আত্মার ক্ষুধা জাগ্রত করা। সাধারণ শিক্ষা মানুষের মনোরাজ্যের সহজাত কৌতুহলকে উসকে দেয়। কিন্তু তা ক্ষুধা পর্যন্ত নাও পৌছাতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অবশ্যম্ভাবী উদ্দেশ্য আত্মার ক্ষুধা জাগিয়ে তোলা। সত্যের জন্য, সুন্দরের জন্য এক অক্লান্ত ক্ষুধা তাঁকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাতর করে তুলবে আর সে কাতরাতে কাতরাতে ধাবিত হবে প্রাণ-প্রকৃতি, গুরু-পুস্তকের দিকে, সমাজের দিকে, বিশ্বের অভিমুখে। তন্ন তন্ন করে খোঁজাখুঁজি শেষে আবার হাজির হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের স্মরণ রাখতে হবে প্রতিটি আত্মাই শিক্ষা নামক বৃক্ষের কিছু না কিছু রস আস্বাদন করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে এসেছে। যার কাছে এই রস তেতো ঠেকেছিল সেও উপযুক্ত রসিকের তত্বাবধানে পুনঃর্বার চেখে দেখতে পারে আর যদি সে সুস্বাদ পেয়েই যায় তাহলে সেও চাতক হবে বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখি অনেক মেধাবী এবং মনোযোগী শিক্ষার্থী এসেও খুব মাঝারি মানের হয়ে যায় আবার অমনোযোগী উদাসীন শিক্ষার্থীও ধ্যানী সাধকে রুপান্তরিত হয়। এটা হয় মূলত শিক্ষক এবং সহপাঠীদের ধরণের উপর নির্ভর করে। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ এমন পরিবেশ তৈরি করা যাতে প্রাঙ্গণে আসা মাত্রই কোন নবীন অভিযাত্রী জ্ঞানের পর্বতমালায় আরোহণের নেশায় কাতর হয়ে পড়ে।

বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব সৃষ্টিঃ

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল কেরানী তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়। কারিগরি জ্ঞানের জন্য কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যায়, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দরকার পড়ে না। বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র যেটি কিনা এখনো তার ২৯ শতাংশ মানুষের সংবিধানে প্রতিশ্রুত মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি সেটিও তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য মোটা অংকের পয়সা ব্যয় করে থাকে। ২০১২ সালের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীপ্রতি রাষ্ট্রের বার্ষিক ব্যয় ৮৮,৮১৭ টাকা, জাহাঙ্গীরনগর ৫৭,৪২৯ টাকা, চট্টগ্রাম ৪৭২৬৭ এবং রাজশাহী ৪৩,৯১৪ টাকা। শ্রমজীবী, মুটে, মজুর, কুলির ছেড়া পকেটের পয়সা কেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পেছনে ব্যয় করার যৌক্তিকতা কোথায়? বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র বানিয়েছে, আমলাতন্ত্র চালাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করছে এই কারণে? অবশ্যই নয়। অম্লান দত্তের ভাষায় “বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য এমন মানুষ তৈরি যিনি গৃহীত জ্ঞানকে সমালোচকের দৃষ্টিতে বিচার করতে পারেন, বর্ধিত বিজ্ঞানের সাথে পা মিলিয়ে চলতে পারেন, যাকে ছাড়া দেশের দৃষ্টি প্রসারিত হয় না, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির উন্নতি হয় না”(দত্ত, ২০০০)। তবে এটা স্বীকার্য যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আধুনিক সমাজ বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয় কোন শিক্ষার্থীকে তার বিস্তৃত আঙ্গিনায় প্রবেশের সুযোগ সীমিত করতে পারে না। সেক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়া এবং বাজার বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্য এবং প্রকৃত আগ্রহী জ্ঞানসাধককে হয়ত বাছাই করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। তাই ভর্তিকৃত সব শিক্ষার্থীকেই বিশ্ববিদ্যালয় তার কারিকুলাম চাপিয়ে দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্য ঐ শিক্ষার্থীর পছন্দের জায়গা খুঁজে বের করে সে মাপে তার বিকাশের ব্যবস্থা করা। বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ, স্টিভ জবস বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করতে পারেননি কিন্তু তাঁদের অবদানের দরূণ পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার পদ্ধতিই পালটে গিয়ে রীতিমত বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কিন্তু এটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার বাই-প্রডাক্ট মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌল উদ্দেশ্য সেই আগ্রহী পিপাসু অংশ (সেটি যত কম অনুপাতেই হোক না কেন) তাঁর আগ্রহ ধরে রাখা এবং তাঁদের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব তৈরি করা। অনেকটা জুডিশিয়াল এথিক্স ‘ শত অপরাধী ছাড়া পাক, একজন নিরাপরাধও যেন শাস্তিভোগ না করে’। ৯০ জন উদাসীন শিক্ষার্থী তাঁদের মত করে জীবন রচনা করুক কিন্তু কোনক্রমেই একজন পিপাসুও যাতে জ্ঞানতৃষ্ণার জলবঞ্চিত না হয়।

জাতীয় শক্তির উম্মেষঃ

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মূল লক্ষ্য একটি জাতির মধ্যে আত্মবিশ্বাসের স্ফুলিঙ্গ সঞ্চার করা। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা ও বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় একটি সমাজের জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা-সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার শক্তির জাগরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। হুমায়ূন আজাদের ভাষায় “বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র, দেশের ভেতরে সবচেয়ে মুক্ত, স্বাধীন ও স্বায়ত্ত্বশাসিত পরিমন্ডলের নাম বিশ্ববিদ্যালয়।” মূলত একটি রাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ কেমন তার উপর নির্ভর করে রাষ্ট্রটি কত শক্তিশালী কিংবা দূর্বল হবে। রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্বভারতী-২ তে জাতীয় শক্তির উম্মেষে কেমন বিশ্ববিদ্যালয় দরকার তা বলেছেন এভাবে- “[আমাদের] …শিক্ষাপদ্ধতির সবচেয়ে সাংঘাতিক দোষ এই যে, এতে গোঁড়া থেকেই ধরে নেওয়া হয়েছে যে আমরা নিঃস্ব। যা কিছু সমস্তই আমাদের বাইরে থেকে নিতে হবে- আমাদের নিজের ঘরে শিক্ষার পৈত্রিক মূলধন যেন কানাকড়ি নেই। এতে করে যে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে তা নয়, আমাদের মনে একটা নিঃস্ব ভাব জন্মায়।” এই নিঃস্ব ভাব কাটানোর দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের। যুগে যুগে বিশ্ববিদ্যালয় সভ্যতার নেতৃস্থানীয় জাতিগুলোকে আত্মবিশ্বাসের এই অস্ত্র ধরিয়ে দিয়েছে এবং এই আত্মবিশ্বাসের বলেই এক এক সময় এক এক জাতি বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়েছে।

তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের সমন্বয়ঃ

পূর্বে আমরা দেখেছি সময়ের প্রয়োজনে পাশ্চাত্যে ‘সিভিক বিশ্ববিদ্যালয়ে’র বিকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্বিক জ্ঞান এবং গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা প্রয়োজন। শিল্পায়ন পরবর্তী দুনিয়ায় ‘নলেজ ইকোনমি’ প্রতিষ্ঠা ভিন্ন কোন অর্থনীতিই টেকসই উন্নতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। ১৯৭৯ সালের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ থিওডোর শুলজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মান এবং জাপানের আশ্চর্যজনক রিকভারিকে ব্যাখ্যা করেছেন এই দুই রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষিত এবং স্বাস্থ্যবান জনগণের প্রাচুর্য দ্বারা। তাঁর তত্ব পরবর্তীতে Human Capital Theory বা মানবসম্পদ তত্ব নামে প্রচলিত হয় যেটি মূলত মানুষের উৎপাদনক্ষমতার বিকাশ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে (শুলজ, ১৯৭০)। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়োগিক জ্ঞানকে অবহেলা করা যাবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য রাষ্ট্রের জনগণকে জনসম্পদে রূপান্তরের উপায় বাৎলানো এবং নিজেও সেই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দুই প্রকার জ্ঞানের কার্যকর সমন্বয় সাধন করতে হবে।

শেষ করছি অর্থনীতির প্রসঙ্গ দিয়ে। বিকাশমান বুর্জোয়া অর্থনীতির একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্যই সর্বক্ষেত্রে একটা সামগ্রিক অরাজগতা। এটা কেবল বাংলাদেশে নয়, অধুনা উন্নত বিশ্বের প্রায় সব রাষ্ট্রই এই পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে। সে তুলনায় আমি বলব বাংলাদেশ বরং সহনশীলতার চরম পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। যাই হোক, এই ট্রাঞ্জিশনাল সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন। নতুন উৎপাদন সম্পর্কের আলোকে সামাজিক সম্পর্কের নতুন মাত্রার উদ্ভব এবং ব্যাক্তির সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি নিয়ে ধোঁয়াশা ধারণা। বংশ, ধনসম্পদ, প্রভাবপ্রতিপত্তি, ক্ষমতা, বিদ্যা ইত্যাদির কোনটা পারদের কোন মাত্রায় তা নিয়েও আছে বিভ্রান্তি। এই মোহাচ্ছন্নতা কাটিয়ে আমরাও ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করছি শিক্ষার মূল্যায়নে। তাই বলতে দ্বিধা নেই শিক্ষার সুপ্রিমেসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপ্রিমেসি অতীতের মত এখনো লোপ পায়নি এবং ভবিষ্যতে ও পাবে না। কবি অন্নদাশংকর রায়ের মতে “ডক্টরেট কেউ পড়াশোনা করে পান, কেউ সম্মানস্বরূপ। কারণ সম্মানের চূড়াটা সভ্যতা নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে, শিক্ষা দিয়ে”(অন্নদাশংকর রায়, ১৯৯৩)।

Related Posts

About The Author

Add Comment