বিশ্ব নেতা হওয়ার পথে চীন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে এক টেবিলে বসিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যতটা না দুইদেশের কৃতিত্ব তার চেয়ে বেশি কৃতিত্ব চীনের এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। এশিয়ার উদীয়মান অপর পরাশক্তি ভারত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কোন আকর্ষনে চলে গেলেন চীনে? নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট গঠনে কোন দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে? মার্কিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বলয়ের কোন দেশটি নতুন বলয়ে নের্তৃত্ব দিচ্ছে-উত্তর হবে চীন। নিজের অর্থনৈতিক ক্ষমতা শক্তিশালী করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে এখন রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়ানোর দিকে মনোযোগ চীনের।

বৈশ্বিক অর্থনীতি সংস্কার বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার পাশপাশি বিশ্বে প্রভাবশালী উপস্থিতি জানান দিতে চাচ্ছে চীন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত জুনে জানিয়েছিল চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কূটনীতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) জাতিসংঘে (ইউএন) নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে চাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং ছবি: গেটি ইমেজেস

সর্বশেষ চলতি সপ্তাহে আরব বিশ্বে বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সংকটপূর্ণ অঞ্চলটিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করার দিকে আগাচ্ছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পে আরব দেশগুলোকে হাজার কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে

গত মঙ্গলবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল সম্মেলন কেন্দ্রে চীনআরব সহায়তা ফোরামের অষ্টম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় ওই আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিস্তারিত না জানিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় থাকা আরব দেশগুলোতে ইতিবাচক সামাজিক প্রভাব রাখতে ওই ঋণ দেয়া হবে

সম্মেলনে শি আরো জানান, ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন শিল্প খাত পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে গৃহীত চীনের একটি বিশেষ কর্মসূচির অংশ এটি

এছাড়া আরব অঞ্চলেরস্থিতিশীলতা রক্ষায় সক্ষমতা বাড়াতে বেইজিং আরো ১০০ কোটি ইউয়ান সহায়তা করবে বলে জানিয়েছেন শি সাধারণত পুলিশি কাজ নজরদারির ক্ষেত্রে পরিভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে

চীনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্য আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন শি এরই মধ্যে আরব লীগের সদস্য রাষ্ট্র জিবুতিতে প্রথম সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে চীন

এছাড়া চীন এরই মধ্যে আরব দেশগুলোয় প্রচুর পরিমাণ অর্থ সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চায়না আফ্রিকা রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রাক্কলিত হিসেবে শুধু জিবুতিকেই ১৩০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে চীন

বার্তা সংস্থা এএফপির খবর অনুসারে চীনের এমন আর্থিক বদন্যতার বিষয়টি বিভিন্ন দেশের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ বিশাল ঋণের ভারে গরিব দেশগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে গত বছর ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দরের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে হস্তান্তর করেছে শ্রীলংকা

শি জিনপিংয়ের ভিশনের বড় অংশ জুড়ে রয়েছেবেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাচীন সিল্করুটকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এক ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছেন শি এককালে এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের বস্ত্র, মশলা অন্যান্য পণ্য আমদানিরফতানিতে গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল সিল্করুট

ঐতিহাসিক রুটটির কেন্দ্রে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যকে চীনেরস্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট সম্মেলনে শি আরো বলেন, তিনি আশা করছেন পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপারে ঐকমত্যের মাধ্যমে সম্মেলনটি শেষ হবে

সিল্করুটের ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রসঙ্গ টেনে শি বলেন, ‘দূরত্বের দিক থেকে চীন আরবরা অনেক দূরের হলেও তারা পরিবারের মতোই কাছের

চীনের সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে বন্দর, সড়কপথ রেলপথ স্থাপন করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি অনেকের আগ্রহ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এটাকে অনেকে চীনা সম্প্রসারণবাদের বিস্তার হিসেবে দেখছেন

চীনা প্রেসিডেন্ট শি অবশ্য বাণিজ্যের দিকটিতেই ইঙ্গিত দিচ্ছেন সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আরব দেশগুলোয় বন্দর রেলওয়ে নেটওয়ার্ক স্থাপনে অংশগ্রহণের সুযোগকে স্বাগত জানাচ্ছে চীন এর মাধ্যমেমধ্য এশিয়ার সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকার সংযোগ, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের সংযোগ স্থাপিত হবে

২০১২ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিচ্ছেন শি জিনপিং প্রতিষ্ঠা করেছেন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো চীনের প্রভাবাধীন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এছাড়া ঐতিহাসিক বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন সিল্ক রোড শুরু করেছেন

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছে বেইজিং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসা, ইরান চুক্তিকে ছুড়ে ফেলা এবং ব্রেক্সিট অন্যান্য বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েনের ফলে আস্থার জায়গা নেয়ার চেষ্টা করছে চীন

এ বিষয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে একটি সুন্দর প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড। সেখানে চীনের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যত উচ্চাকাঙ্খা (অ্যামবিশন) তুলে ধরেছেন রুড। আর্টিকেলটির লিংক: https://www.project-syndicate.org/commentary/xi-jinping-has-a-coherent-global-vision-by-kevin-rudd-2018-07

গত জুনে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চ পর্যায়ের সদস্যদের নিয়ে দুদিনব্যাপী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে শি বলেন, চীনকে অবশ্যই নিজেদের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করতে হবে এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের পথ দেখাতে হবে এবং তা পরিবর্তনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে

চীনা প্রেসিডেন্টের বরাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এর মাধ্যমে একটি আধুনিক শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক চীন গঠনের শর্ত তৈরি হবে। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, দুদিন ব্যাপী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন চীনের পররাষ্ট্র বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তি, সেনাবাহিনী, প্রোপাগান্ডা বিভাগ চীনের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস কর্মকর্তারা

প্রস্তাবিত নতুন ধারার আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সব পক্ষের জন্য উইনউইন পরিস্থিতি সবার পারস্পরিক লাভের কথা বলা হয় তবে দক্ষিন চীন সাগরে চীনের বিতর্কিত অবস্থানকে উন্নত বিশ্ব সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখছে

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুতের আকাঙ্খার কথা জানান শি যাদেরকে তিনি স্বাভাবিক মিত্র হিসেবে বর্ণনা করেন একই সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের কাছ থেকেও শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন 

চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে নিজের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছেন শি জিনপিং ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ, উত্তর কোরিয়া নিয়ে সরাসরি কোন মন্তব্য করেননি চীনা প্রেসিডেন্ট এছাড়া শি স্বশাসিত তাইওয়ান নিয়েও মন্তব্য করেননি যাকে চীনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ভৌগলিক কূটনৈতিক ইস্যু মনে করা হয়

এদিকে সিএনএন মানির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে অস্বস্তিকর সময়ে এসে পড়েছে চীন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা গেছে চীনের প্রবৃদ্ধি আশঙ্কার চেয়েও দ্রুতগতিতে দুর্বল হচ্ছে দেশটির দুর্বল প্রবৃদ্ধি তার বড় বাণিজ্য অংশীদারদের জন্য মারাত্মক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসবে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করা বৈশ্বিক কোম্পানীগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হবে

এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র বিরোধ সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে গত সপ্তাহে উভয় পক্ষই একে অন্যের পাঁচ হাজার ডলার মূল্যের পণ্যে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সংকট আরেক ধাপ বাড়িয়ে গেলো সোমবার বিশ হাজার কোটি মূল্যের চীনা পণ্যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন

গত সপ্তাহে একটি রিসার্চ নোটে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীফ এশিয়া ইকোনমিস্ট মার্ক উইলিয়ামস বলেন, বাণিজ্য উত্তেজনা ঠিক সময়টাতে তীব্রতর হচ্ছে যখন দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে

সরকারী উপাত্ত অনুসারে গত বছরে চীনের অর্থনীতি বেশ ভালোই কাজ করেছে এবং ছয় দশমিক ৯০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে চলতি বছরেরও শুরুতেও সে গতি অব্যাহত ছিল কিন্তু বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ আশঙ্কা করছেন গতি থাকবে কী না নিম্নমুখী গতির নিদর্শন সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে

গত মাসের সরকারী উপাত্তে দেখা যায় রফতানি, বিভিন্ন কোম্পানীর বিনিয়োগ এবং ভোক্তাব্যয় গত বছরের একই মাসের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে

গবেষণা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এশিয় অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান লুই কুইজিস বলেন, উপাত্তগুলো দেখে বিস্তৃত মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবং আমরা আশা করছি এটি অব্যাহত থাকবে।’

উচ্চশিক্ষার জন্য চীন এখন মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকর্ষনের কেন্দ্রে জায়গা করে নিচ্ছে। কোন একটি দেশকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে জায়গা পেতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রসর উদাহরণ স্থাপন করতে হয়। চীন ধীরে ধীরে এদিকে পা বাড়াচ্ছে। এছাড়া আধুনিক সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে চীন তার দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি চীন কীভাবে মোকাবেলা করবে এবং এর সমাপ্তি কীভাবে ঘটায় বা বাণিজ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলে নিজেদের অবস্থান কীভাবে ঠিক রাখে তার উপর নির্ভর করছে চীনের বিশ্ব নেতা হয়ে উঠার বিষয়টি।

Related Posts

About The Author

Add Comment