বুক পলিটিক্স

13535630_1094734457236209_295569277_n

বর্তমান সময়ে বইয়ের উপযোগিতার সব থেকে বড় দিক হল সুদূর অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ছাপিয়ে মানুষের চিন্তা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় কী চলছে তাকে আয়ত্তে নিয়ে আসা। সেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে কেউ যখন অ্যাকাডেমিক, নন অ্যাকাডেমিক, গল্পের বই, ইসলামি বই কিংবা ধর্মীয় বইয়ের ক্লাসিফিকেশন করে ও সেই সাথে চলমান রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির খপ্পরে মোটা দাগে দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি কিংবা ধর্ম প্রভৃতির মধ্যে সেকুলার টেক্সট ও রিলিজিয়াস টেক্সট ক্যাটাগরি করে, তবে বিষয়টা কেমন? একটা বিশেষণ লাগানো উচিৎ ছিল। কিন্তু এই বিশেষণের দায়ভারটা পাঠক সম্প্রদায়ের ওপর ন্যস্ত করাটাই শ্রেয়।

আমাদের বিদ্বৎ সমাজের অনেকেই খুব সহজে রেফারেন্স দিয়ে মতামত প্রকাশ করেন। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ও বটে। কিন্তু সকল কিছুর কী রেফারেন্স পাওয়া যায়? আদতে যে বিষয়ে গবেষণা হয়নি বা কোন বই লিখিত হয়নি, সে বিষয়ে রেফারেন্স দেয়া যায় না। এক্ষেত্রে ওই বিষয় সংক্রান্ত সোর্স থেকে সকল কিছু সংগ্রহ করে কনস্ট্রাক্ট করতে হয়। কখনো সে বিষয়ে নতুন কিছু আনতে গেলে রিকন্সট্রাক্টও করতে হয়।

নানা বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে ও হবে। পৃথিবীর তাবৎ বিষয় এখনও পড়ে আছে। সেদিক থেকে একটা বই ও পূর্বানুমানের ওপর সিদ্ধির আলোকে সবকিছু ব্যাখ্যা করা ও অকাট্যতা জাহির করা, একটা গোঁড়ামি। আর বইয়ের এ বিভাজন সাধারণের মধ্যে যতটা না প্রবল, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের চিন্তার মধ্যে আরও প্রবল। যেমন- আমাদের সেকুলার স্কলারগণ তাদের ব্যাখ্যা ইসলামের ওপর আরোপ করতে চান। বিশেষ করে ইসলামিক টেরোরিজমের বিষয়ে। (বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের দেশে সেকুলারিজম যারা বোঝে ও এই সুরে বয়ান হাজির করেন, তারাই সেকুলার স্কলার )। এটা যে পশ্চিমের ফেব্রিকেটেড, এটা তারা স্বীকার করতে চান না। এক্ষেত্রে জঙ্গি দমনে সাঁড়াশি অভিযানের পদক্ষেপ তো নিতেই হয়।

সেকুলার স্কলারগণ, যারা রিলিজিয়ন ও রিলিজিয়াস বইয়ের হালকা জেনেই, কমেন্ট ছুড়ে দেন, তাদের জন্যে এ বিষয়টা বলা নিজের জন্যে দায়িত্ব বলে মনে করছি। যে ইসলাম নিজেদের সাবজেক্টিভ জায়গা থেকে ব্যাখ্যার বিষয় নয়, ইসলামকে ইসলামের মত করে বুঝতে হবে। আমরা এ মুহূর্তে যে সমস্যা মোকাবেলা করছি, তা আদতে ইসলামের কোন সমস্যা নয়। ইসলামকে না জেনে না বুঝে ব্যখ্যা করার সমস্যা।

আমাদের চলমান বাস্তবতায় রাজনীতির ধরপাকড়ে একদল অপর দলকে তার দলীয় কর্মতৎপরতায় (ধর্মীয় দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য), ব্লেইম করে, তখন পরিণতি আরো খারাপ হয়। বাংলাদেশে ধর্ম প্রশ্নে ইসলাম, এটা স্বাভাবিক। বিশেষ করে মৌলবাদী, জঙ্গিতৎপরতার দাবিতে বইয়ের ক্যাটাগরি করে যখন ধর্মীয়ের বই কথা বলে, সেটা আরেক ব্যাখ্যার দিকে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য যে, ইসলামি বই পাওয়া গেছে, তখন এরকম উল্লেখ করা হয় না। কিন্তু তাৎপর্যের দিক থেকে ইঙ্গিত ওই দিকেই। অর্ধ জানার দেশে পুরো লেখা না পড়েই যখন, কাউকে মৌলবাদী কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে দাবি করে, সেটা কুৎসা রটানোর মত আরেক কালচার হিসেবে সমাজে আবির্ভূত হয়।

একটি দেশের এরকম চালচিত্র দেখে স্পষ্ট হয় সেদেশে বইয়ের বাজার আর বই পড়ার হাল কেমন। বাংলাদেশে বইয়ের বাজার সীমিত। প্রকাশনাগুলো ঢাকার বাংলাবাজার, ইসলামপুর, ফকিরাপুল বা পুরানা পল্টন গড়ে উঠেছে। সিলেটেও দুয়েকটি রয়েছে। বাজারের মধ্যে নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, আজিজ সুপার, বায়তুল মোকাররম সংলগ্ন বইয়ের দোকান ও বাংলাবাজার এদেশের উল্লেখযোগ্য বইয়ের বাজার। এছাড়া জেলা শহরগুলোতে স্কুল, কলেজে পঠিত টেক্সট বুক, গাইড বই ছাড়া তেমন বই পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও উপন্যাসধর্মী, সব জায়গায় নয়। ঢাকায় প্রতি ১৫ মিনিটের দূরত্বে একটি লাইব্রেরি পাওয়া যাবে। কিন্তু গ্রামে তো লাইব্রেরির ব্যবস্থা নেই। তাছাড়া গ্রামে বই সরবরাহের যোগাযোগ ব্যবস্থা আশাব্যঞ্জক নয়। তবে সম্প্রতি গ্রাম পাঠাগার নামে একটি আন্দোলন গড়ে উঠেছে। যারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাগারের ব্যবস্থার পথ সুগম করছে।

এই ধারণা আরো সুস্পষ্ট হয় একটি দেশে বিতর্কিত কিংবা নিষিদ্ধ বই কিভাবে সাড়া জাগায়, সে হিসেবে । ১৯৯৪ সালে হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ বইটি গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। এরপরেও ২০১৪ সালে আরও কয়েকটি বই বিতর্কের মুখোমুখি হয়। এ.কে. খন্দকারের ‘ভিতরে বাহিরে’ ও শারমিন আহমেদের ‘নেতা ও পিতা’। জানা যায় তখনকার প্রেক্ষাপটে ‘ভিতরে বাহিরে’ বইটি ৮৫০ কপি ও শারমিন আহমেদের বইটি ৩৫০ কপি বিক্রি হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে ষোল কোটি মানুষের দেশে এত অল্প মানুষের পড়ার মধ্য দিয়ে বই নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি কিংবা নিশেধাজ্ঞা আরোপ করা, সত্যি এটা বলার মত কি? আর এই ধারাবাহিকতায় সেকুলার টোন থেকে বেরিয়ে আসা বয়ান রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ? এতে প্রকৃতই গণতন্ত্রের চর্চা হয় কি?

যখন গণতন্ত্র চর্চায় প্রতিনিয়ত ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির মতবিরোধের জায়গা থেকে কারো ওপর কিছু চাপিয়ে দেয়া হয়, তাকে ব্লেইম করা হয় সে ধর্মীয় বই পড়ে এবং একই সাথে সেই সমাজ সম্পর্কে রিলিজিয়াস ইন্টলারেন্স থেকে উদ্ভূত সাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে এগুলো কোন সমস্যা থেকে উদ্ভূত, এটা কি কেউ ভেবে দেখেছে ? ইসলামী কোন বিষয়ে পড়তে যাওয়া মানে হয় কোন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ট্যাগ, ইজ দ্যাট নট ভায়োলেশন অব ফান্ডামেন্টাল রাইটস, ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন ফর অ্যা ম্যান?

একদল নিজেও জানবে না, অন্যকেও জানতে দেবে না, বই নিয়ে পলিটিক্স করে অপরের ওপর মতামত চাপাবে, এরকম হয় না। বইয়ের বিষয়ভিত্তিক ক্লাসিফিকেশন করা যায়, কিন্তু যে কোন রিলিজিয়াস বই দেখে তাকে সেকুলার ভার্সাস রিলিজিয়াস নাম দেয়া ও অপরের প্রতি ধর্মীয় দলের ট্যাগ দিয়ে তাকে হ্যস্তন্যস্ত করা, ও বিরাজমান বাস্তবতায় জঙ্গি হিসেবে ব্যাখ্যা করা আরেক মৌলবাদীতার শামিল। কাজেই এ ব্যাপারে কী সিদ্ধান্তে আসা যায়, তা প্রত্যেকের ভাবার বিষয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment