বুক রিভিউ: আমার একাত্তর

বইয়ের নাম: আমার একাত্তর।

লেখক: অধ্যাপক (ইমেরিটাস) ড. আনিসুজ্জামান।

প্রকাশনী ও প্রকাশ কাল: সাহিত্য প্রকাশ। এপ্রিল ১৯৯৭।

মূল্য: একশত পঁচিশ।

উনিশশো একাত্তর একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসের এ অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়টি উঠে এসেছে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের কলমে। তাঁর রচিত ‘আমার একাত্তর’ নামক মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতি গ্রন্থে লেখক অত্যন্ত সাবলিলভাবে তুলে ধরেছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিগাঁথা। যেখানে স্থান পেয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ, শরণার্থীদের মানবেতর জীবন আলেখ্য সেই সাথে মুক্তির সংগ্রামকে তরান্বিত করার কাহিনী। যা আমাদের ক্ষণিকের জন্য নিয়ে যায় একাত্তরের রণাঙ্গনে।আমাদের আলোড়িত  করে, করে সমৃদ্ধ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবেমাত্র তিনি সদ্যজাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্থিত হয়েছেন। সহসা শুরু হলো বাঙালি জাতির উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ। মার্চের উত্তাল সময়ে, ৩১ মার্চ নবীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আশ্রয় নিলেন চট্টগ্রামের কুন্তেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের হোস্টেলে। যেখানে পূর্বেই আশ্রিত তার সহকর্মীরা। সেখান থেকে রামগড় হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগড়তলায়। সেখানে ক্রমেই বাড়তে থাকে শরণার্থী সংখ্যা, সেই সাথে বাড়তে থাকে দূর্ভোগ। এখানেই অবস্থান করছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য (প্রথম) বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. এ আর মল্লিক, উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান, বিশিষ্ট কবি সৈয়দ আলী আহসান’সহ অনেক বিশিষ্টজন।

১৫ মে কলকাতায় পৌঁছে ড. মল্লিকসহ অন্যন্য বিশিষ্টজনদের সাথে বুদ্ধিজীবীদের হয়ে কাজ শুরু করেন। পরে  প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হলে তাতে যোগ দেন। তিনি ছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের আস্থাভাজন। তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা এবং ড.মল্লিকের সঙ্গী হয়ে বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে বাংলাদেশের পক্ষে মত গড়তে কাজ করেন। লেখক তার এ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন কিভাবে ভারতের সাধারণ মানুষ  আমাদের মুক্তির সংগ্রামে একাত্মা হয়েছিল, কেউবা হয়েছিল বিরক্ত। তার এ গ্রন্থে উঠে এসেছে অসংখ্য শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক বিশিষ্টজনের নাম যারা বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামী সারথি হয়েছিল। তাদের মধ্য উল্লেখযোগ্য, মওলানা ভাসানী, কমরেড মোজাফফর, জহির রায়হান, গোলাম মুর্শিদ, মৈত্রেয়ী দেবী, ইলা মিত্র, অনিল সরকার, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ।

যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে অনকে ঝক্কি সামলাতে হয়েছে। মাঝপথে যুদ্ধকে থামিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রকে রুখতে হয়েছে দক্ষ হাতে। একাধিকবার বিভিন্ন কারনে কর্নেল ওসমানি (পরে জেনারেল) মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির পদ ছাড়তে চেয়েছিলেন তাকে নিরস্ত করেন, তাজউদ্দিন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন, সাধারন মানুষের উৎকণ্ঠা, মুজিব বাহিনীর অপতৎপরতাসহ মুক্তিবাহিনীর কতিপয় খারাপ চিত্রও লেখক তুলে এনেছেন। পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনের প্রস্তুতি, ধ্বংসস্তুপে পরিণত দেশে ফেরা, নতুন করে দেশকে গড়ার ভাবনাও চিত্রিত হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। বাংলাদেশ ত্যাগের পূর্বে ভারতীয় বাহিনী যে অসৌজন্যমূলক কাজ করেছে, সেই সাথে নতুন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নিয়ে লেখকের গভীর উৎকণ্ঠা ব্যক্ত হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের এ অনন্য দলিলে।

মো: নুরুন নবী মিল্লাত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment