বুক রিভিউ: আমি বিজয় দেখেছি

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো কত বইই লেখা হয়েছে; কিন্তু সব বই কি সমানভাবে দাগ কাটতে পেরেছে। পারেনি। কোনটার আবেগ, আবেদন ছিল বেশি আবার কোনটা ছিল বিতর্ক সৃষ্টিকারী।মুক্তিযুদ্ধকে একেকজন দেখেছেন একেক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তবে একই সাথে মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গণ ও প্রশাসনকে যুগপত দেখার সুযোগ পেয়েছেন খুব কম মানুষই। এম আর আখতার মুকুল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি “চরমপত্রের” কথা কে না জানে। তবে তিনি শুধু চরমপত্রের লেখকই ছিলেননা; স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠনের সাথে আদ্যোপান্ত যুক্ত ছিলেন এবং ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রেস ও তথ্য বিভাগের পরিচালক। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর বই “আমি বিজয় দেখেছি”। যদিও তিনি এ বইটিতে অনেক প্রশ্নের উত্থান করেছেন এবং কিছু প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন।

বইটির বিশেষত্ব এই জায়গায় যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস উপহার দেয়ার জন্য তিনি শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের কিংবা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হন নি বরং সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটসহ বামপন্থী দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেছেন।

বইটি শুরু হয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ উদ্ধৃতির মাধ্যমে। এর পর তিনি অবসান করেছেন স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত বিতর্কের। রবার্ট পেইনের ম্যাসাকার গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তিনি। যেখানে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু ডিকেটশন দেন, “ the Pakistani army has attacked police lines at Razarbagh and East Pakistan Rifles Headquarters at Pilkhana at midnight. Gather strength to resist and prepare for a War of Independence.”

এই বার্তাটি প্রথমে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে পাঠ করেন এমএ হান্নান এবং পরে অধ্যাপক আবুল কাশেম সন্দ্বীপ। এরপর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র প্রচার করেন তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান। লেখক বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে এসবই হচ্ছে ঐতিহাসিক ও বাস্তব তথ্য।

বইয়ের পরের অংশে নানারকম তথ্য সন্নিবেশ করেছেন লেখক। যেটি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকের জন্য মিনি এনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস। এই অংশে প্রায় ৪৮ পৃষ্ঠা তিনি মুজিবনগর সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন জোনের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, রণাঙ্গণের ১২ টি সেক্টর, ফোর্স, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী সহ মুজিব বাহিনীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন।

৬৯ টি অনুচ্ছেদে মূল আলোচনা করেছেন। মূলত এই অংশেই ফুটে ওঠেছে একাত্তেরর পূর্বাপর নানা ঘটনা, রটনা সহ তাঁর জীবন দর্শন, মনোভাব, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের স্বরূপ। হুমায়ুন আহমেদ তাঁর জোছনা ও জননীর গল্পে বলেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বইগুলো বেশিরভাগই কোননা কোন মতাদর্শ ভিত্তিক। এ কারণে অনেক সময় সত্যকে পাশ কাটিয়ে ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। কিন্তু “আমি বিজয় দেখেছি”র ক্ষেত্রে দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলা যায় যে, এম আর আখতার মুকুল ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে কখনো একদেশ দর্শী হোন নি, সত্যকে পাশ কাটিয়ে যান নি, বিনা দ্বিধায় সমালোচনা করেছেন প্রাপ্যদের।

বইয়ের শুরুতেই একটি বাস্তবতার কথা উল্লেখ করেছেন; ৪৭ পূববর্তী বাঙালি হিন্দু মুসলমানের বিভেদের বাস্তবতা। আশ্চর্যজনক ভাবে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও একই ধরনের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। লেখক খুব স্পষ্টভাবেই কলকাতা বাসীদের বলেছেন, জাতিতে আমরা বাঙালি হলেও এপারের আমরা বাংলাদেশি আর আপনারা ভারতীয়। সুতরাং আমাদের এই পার্থক্য বজায় রেখেই চলতে হবে।

লক্ষ লক্ষ ঢাকাবাসীর মত তাঁকেও ঢাকা ছাড়তে হয় শরণার্থী হয়ে। ঢাকা থেকে নিজের বাড়ি যাওয়ার কাহিনী যেমন রোমাঞ্চকর, বাড়ি থেকে কলকাতা যাওয়ার ঘটনা ছিল তাঁর চেয়েও বেশি রোমহর্ষক। তিনি দেখেছেন কিভাবে নিরীহ বাঙালি ও বিহারীদের হত্যা করা হয়েছে। এরই মধ্যে বগুড়ার সিভিল এডমিনিস্ট্রেশনের দায়িত্বও নিয়েছিলেন।

৯ নং অনুচ্ছেদ থেকে শুরু করেন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের কথন। যেভাবে তিনি হয়ে ওঠলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন অনস্বীকার্য ব্যক্তি। ভারতের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে মাত্র ৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার দিয়ে গেয়েছেন মুক্তির জয়গান । তিনি সহ জনাকয়েক ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ২৫ মে কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের। এর পরের টা তো ইতিহাস। এম আর আখতার মুকুলের অসমান্য সৃষ্টি চরমপত্রের মাধ্যমে একদিকে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙ্গা হতো অন্যদিকে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সকল কূটনৈতিক ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের যোদ্ধারা কি অমানুষিক পরিশ্রম করে কাজ করেছেন, আমি বিজয় দেখেছি বইটি তাঁর জলজ্যান্ত প্রমাণ।

বেতার কেন্দ্রের বর্ণনা দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে বইটিতে তিনি কিছু অপ্রিয় সত্যের বয়ানও দিয়েছেন। এরমধ্যে মুজিব-মোশতাক বিরোধ, মুজিব-ভাসানী বিরোধ, মুজিবনগর সরকার-মুজিব বাহিনীর তৎকালীন দ্বন্দ্বের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা নিয়ে বলেছেন। কানাডার টরেন্টোতে আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবীদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। টরেন্টো ঘোষণা নামে পরিচিত সম্মেলনটির বিশ্বের সমস্ত দেশের প্রতি জানানো ৫ দফা ছিল নিম্নরূপ-

১. পাকিস্তানকে দেয় সমস্ত সমরাস্ত্র বন্ধ ঘোষণা       

২. পাকিস্তানকে দেয় সমস্ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ ঘোষণা

৩. জাতিসংঘের তত্তাবধানে পূর্ব বাংলার অভ্যন্তরে দুর্ভিক্ষ পীড়িত জনসাধারণের মাঝে সম্ভাব্য সকল সাহায্য বিতরণ করা।

৪. শরণার্থীদের জন্য ভারতকে প্রয়োজনীয় রিলিফ প্রদানের ব্যবস্থা করা

৫. শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করা।

লেখক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক জয় হয়।  শেষদিকে ভারতের স্বীকৃতি প্রদান, মিত্রবাহিনীর মিলিত আক্রমণ, নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবিরাম ভেটো প্রদান আমাদের বিজয়কে ত্বরাণ্বিত করেছিল। মূল আলোচনার শেষদিকে তিনি অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পত্রিকার উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। ফলে আমরা ঐ সময়ে বাইরের মহলের মনোভাব বুঝতে পারি।

আত্মসমর্পণের দিন কর্নেল ওসমানীর অনুপিস্থিতর সঠিক কারণ আজো অজানা রয়ে গেল। লেখক সাপ্তাহিক বিচিত্রার উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন, “ ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজীর আত্মসমর্পণ কেন তাঁর কাছে হলো না- এ প্রশ্ন করলে তিনি জবাব এড়িয়ে যেতেন। বলতেন, মুক্তিযুদ্ধের এমন অনেক ঘটনা আমি জানি যাতে অনেকেরই অসুবিধা হবে। আমি একটি বই লিখছি, তাতে সব ঘটনাই পাবেন”। যদিও তিনি বই লিখে যেতে পারেননি।

মূল অংশের পরে তিনি আবারো নানারকম তথ্য দিয়েছেন। যুদ্ধ পূর্বাপর বামপন্থী দলগুলোর অবস্থান ও পরিণতি বর্ণনা করেছেন।

বইটি পড়ে পাঠক ধন্ধে পড়ে যেতে পারেন। কারণ লেখক বইটিতে দিন তারিখের সিলসিলা ঠিক রাখতে পারেননি(তিনি নিজেও এটা স্বীকার করেছেন)। তবে সেদিনের সেই বিপন্ন ও অসহায় কিন্তু বীরত্বব্যঞ্জক মুহূর্তে সাধারণ মানুষের মনের কথাকে যিনি জীবন্ত ও মূর্ত করে তুলেছিলেন, লেখার ধারাবাহিকতা রক্ষা করার দায় তাকে দেয়া যায় না। তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন নিরন্তর।

“আমি বিজয় দেখেছি” বইটি পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।।

Related Posts

About The Author

Add Comment