বই পরিচিতি: গাভী বিত্তান্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব, রাজনীতি, স্বার্থপরতার বাইরে নিস্ক্রিয় থেকেও মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারনে একপ্রকার হঠাৎ করেই উপাচার্য নিযুক্ত হন। সেইসাথে তার নিজস্ব জীবন যাপনেও আসে আমূল পরিবর্তন।

বিভিন্ন সমস্যা নিরসন, সামগ্রিক উন্নয়ন, মিটিং মিছিল ও দলীয় সহকর্মীদের অসন্তুষ্টি সামলে উঠতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ক্ষমতা লাভের চেয়ে তার সদ্ব্যবহার করা সত্যিই কঠিন। কখনো কখনো তিনি বেশ হাপিয়ে ওঠেন। নিজের আমিকে মেলে ধরার মত একজন কাছের কেউকে খুঁজে পান না।

মিসেস জুনায়েদ বা তার স্ত্রী বানু দায়িত্ব ও নিষ্ঠাবান স্বামীর গুনমুগ্ধ না হয়ে অতীত সময় বিয়ের প্রথম জীবনের স্মৃতি রোমন্থনে বেশি ব্যস্ত!
বানুর বাবা মেয়ে জামাইকে পড়াশুনার খরচ না যোগালে আবু জুনায়েদ আজ উপাচার্য হতে পারতেন না-তা মনে করিয়ে দিতে এবং সে জন্য স্ত্রীর প্রতি সামান্য অবহেলায় আবু জুনায়েদকে নিজমনে ও উচ্চস্বরে সারাক্ষণ গালমন্দ করা তার নিত্যনৈমত্তিক কাজের মধ্যেই পড়ে। আর অবসর যেন মেয়ে ও চাকর-বাকরদের ত্রুটি খুঁজতেই কেটে যায়!

অবশ্য আবু জুনায়েদ সেসব খেয়াল না করেই নিজের দায়িত্বের প্রতি বেশি মনোযোগী হন। নিজের সততায় উপার্জিত অর্থে জমি কেনার বাসনা তার অনেকদিনের, আর একটি গাভীর স্বপ্ন। উপাচার্য হবার আগে অবসরে তিনি দালালদের সাথে জমি দেখে ও দরদাম করে কটাতেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানী ছাড়া বাড়তি উপার্জন না থাকায় সে বাসনা যেন অপূর্ণই থেকে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকাদার ব্যবসায়ী ও সম্পর্কে মিসেস জুনায়েদের চাচার পরিবারের সাথে জুনায়েদ পরিবারের হঠাৎ সখ্যতা বেশ বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ঠিকাদার ব্যবসায়ীর দামী গাড়ি, আলিশান বাড়ি, বাড়িতে জাকঁজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান ও নামীদামি অতিথিদের আনাগোনা। কিন্তু মানুষ হিসেবে বানুর চাচাকে ভীষন পছন্দ হয় আবু জুনায়েদের। তাই অকপটে মনের কথা বলেন। আর এতেই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।

উপাচার্যের বাসভবনের পেছনে তৈরি হয় গোয়ালঘর। বানুর চাচা নিজ মেয়ে জামাইকে গাভী নিবাস তৈরির দায়িত্ব দেন। নরওয়ের বাবা ও অস্ট্রেলিয়ান মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়া রূপবতী গাভী “তরনী”র ঠাঁই হয় এতে। আবু জুনায়েদ সকালে বেরিয়ে যাবার আগে কাজ শেষে বাড়ি ফিরেই চলে যান গাভী নিবাসে। তরনীও কখনো দাঁড়িয়ে, জিব দিয়ে হাত চেটে, ঘাড় নেড়ে মেনে নেয় মানুষ বন্ধুটিকে! তরণীর সাথে কাটানো সময়ে আবু জুনায়াদ ক্লান্তিহীন অনুভব করেন। মায়াকাড়া বোবা প্রাণীটিকে তার নিজেরমত ও ভীষন আপন মনে হয়।

গাভীনিবাসের পরে পাখিনিবাসও তৈরি হয়। এদের ঘিরে বসে আড্ডা। তার মতই রাজনীতি বিমুখ সহকর্মীরা যোগ দিতে থাকেন আড্ডায়। আবু জুনায়েদ নিজের প্রয়োজনীয় কাজ সারেন গাভীনিবাসে বসেই। এখানে নিজের স্বার্থোদ্ধারে চলে আসেন, তার প্রতিপক্ষ দলের সহকর্মী ও শীর্ষস্থানীয় পদহারা গুন্ডা ছাত্ররাও। তরণীকে নিজ সৌভাগ্যের চিহ্ন ভাবতে শুরু করেন।

অপরদিকে তরনীকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করেন মিসেস জুনায়েদ বা বানু। তার অলস মস্তিষ্ক, জড় হৃদয় নিজেকে অবলা, অসহায় ও নিঃসঙ্গ ভাবতে থাকে। অবশ্য বড় মেয়ে, নাতি আর জামাইকে নিয়ে বেড়াতে এলে, কিছুকাল নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠলেও তারা চলে যেতেই তিনি বড় বেশি একা হয়ে পড়েন। এদিকে গোয়ালঘরে নির্জনে নিজের ছোট মেয়ে ও “তরণী”কে উপহার প্রদানকারী চাচার মেয়ে জামাইয়ের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। আবু জুনায়েদকে বিষয়টি বলে হালকা হবেন তাও পারেন না, তরনীর জন্য। আবু জুনায়েদ ও মিসেস জুনায়েদের মধ্যে তরনী যেন বহুকাল আগের গড়া মজবুত দেয়াল হয়ে দাড়াঁয়।

মানসিক চাপ,একাকীত্ব, অহংকার ও প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে মিসেস জুনায়েদ একটি বোবা প্রাণী তথা “তরণী”র কাছে হেরে যায়। এর খাবারে বিষ মিশিয়ে অনুশোচনায় কিংবা আত্মগ্লানিতে অসুস্থ হন। এদিকে তরনীর অসুস্থতায় জুনায়েদ কেঁদে ওঠেন।

একসময় একসাথে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দেবার ডাক আসে। এর সম্মানী হিসেব করে, সৎ উপার্জিত অর্থে জমি কেনার আশায় আবু জুনায়েদ আবারো পুলকিত হন। সৌভাগ্যের খবরটি শোবার ঘরে ছুটে গিয়ে পরম ভালবাসায় ডাকতে থাকেন, ‘বানু,বানু!’
বানু নিতান্ত অনিচ্ছায় জেগে উঠে তরনীর খুনী হিসেবে নিজেকে অকপটে স্বীকার করে নেয়, আর ধিক্ দেয় তার সৌভাগ্যের।

লেখিকা : Shafquat Alam Akhi (Elsa Elsa)

akhi

Related Posts

About The Author

Add Comment