বুক রিভিয়্যু ও বই সমালোচনা : চাঁদের অমাবস্যা

শুরুতেই লেখক যুবক শিক্ষককে রাতের চাঁদের ফুটফুটে আলোতে বাশঝাড়ে মৃত নারীকে দেখায়। যা তাকে হতচকিয়ে দেয়। সে জীবনে অনেক মৃত্যু দেখেছে কিন্তু এমন মৃত্যু কখনো দেখেনি। তারপর লেখক আস্তে আস্তে পূর্বের ঘটনার বর্ননা দেন। কিভাবে যুবক শিক্ষক সেখানে পৌছায়। পথে কলাপাতাকে মানুষ মনে হয়। বাতাসে পাতার কড়কড় শব্দকে হাটার শব্দ মনে হয়। চাঁদের আলোতে কিছু ছায়াকে প্রাণের সঞ্চার বলে ভাবে পরক্ষণে ধারণা ভু্ল প্রমানিত হয়। যুবক শিক্ষক মৃত নারী দেহটি দেখার পর প্রথমে বিশ্বাস করেনি। পরে তাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে। কিন্তু গোলযোগ বাধে তিনি যাকে অনুসরন করতে করতে নদীর ধারে এসে মনুষ্য শব্দটি পান সেই কাদের তার পিছন থেকে বেরিয়ে আসেন হঠাৎ করে। যুবক শিক্ষক ভাবতে লাগেন কাদের বোধহয় তাকে দোষী ভাবছে। তিনি দ্রুত প্রস্থান করেন।
এরপর তার মাথায় নানা চিন্তা ঘুরতে থাকে। ক্লাসে পড়াতে অমনোযোগী হয়ে যায়, শিক্ষকের শরীর খারাপের বিষয়টি ধরতে পেরে চির কোলাহলপ্রবণ শিক্ষার্থীরাও চুপ হয়ে যায়। দাদাসাহেব হিসেবে যিনি পরিচিত তার কিছু ধর্মকর্ম নিয়ে বর্ননা দেয়া হয়। কাদের কে দরবেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এক অযৌক্তিক উপায়ে।
পরের রাতে কাদের এসে তাকে নিয়ে মৃত নারী দেহটি নদীতে ফেলে আসে। এতে কাদেরের প্রতি তার একটুও সন্দেহ হয়না বরং তার প্রতি তার শ্রদ্ধা বেড়ে যায় এই ভেবে যে কাদের নারীর সম্ভ্রম এবং নৃশংস পরিণাম থেকে নারীকে বাঁচিয়েছে।
তার মনের মধ্যে নানান প্রশ্ন বাধতে থাকে নারী দেহটি এমন হবে কেন, কাদের কি তাকে সন্দেহ করে। এমন প্রশ্ন বাধতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি কাদেরের কাছে বিষয়টি তুলবেন এবং তার ব্যাখ্যা দিবেন। কাদের তার ঘরে আসে এবং তাকে বলেন আপনি কি কিছু বুঝেন না।
এরপর যুবক শিক্ষকটির টনক নড়ে। তিনি বুঝতে পারেন কাদেরই নারীটিকে হত্যা করেছে। তিনি খুব শক্ত হন। কাদের বলেন চার মাস আগে…. যুবক শিক্ষক তাকে থামিয়ে দেন। তিনি বুঝতে পারেন তার প্রেম ছিলো।
যুবক শিক্ষকের মনে নানা প্রশ্ন উঠে একবার ভাবেন তিনি প্রকাশ করবেন আবার ভাবেন বড় বাড়ির আশ্রয় আর স্কুলের শিক্ষকতা তিনি কোথায় পাবেন! তাদের খেয়ে তাদের পড়ে তাদের নামে বদনাম করবেন। তিনি ভাবতেই পারছেন না কি করবেন।
একবার ভাবেন দাদাসাহেব কে বলবেন আবার ভাবেন দাদা সাহেব যাকে দরবেশ বলে ভাবেন তার ব্যাপারে এটা মেনে নিবেন!। দাদাসাহেবের নানা প্র্রশ্নে তিনি নির্বাক থাকেন। যুবক শিক্ষকের সত্য অসত্য ভাবনায় এগিয়ে যায় চাঁদের অমবস্যা।
তিনি নিজের মনে কিছু প্রশ্ন তৈরী করেন আবার উত্তর নিজেই খুঁজেন। কিছু উত্তর পান কিছু পান না। বারবার কাদেরের জড়িত থাকার ব্যাপারটা প্রকাশ করবেন বলে ভাবেন। কিন্তু কে বিশ্বাস করবে তার কথা। তাছাড়া কাদের দরবেশ মানুষ এদিক ওদিক ঘুরে কিন্তু যুবক শিক্ষক কি করে বাশঝাড়ে গেল। এমন প্রশ্নে জাগে। কাদের তাকে ভয় দেখায় অন্য উপায়ে। এক পর্যায়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে মৃত্যু কি জীবনের চেয়ে দামী! যদি নারীর মৃত্যু রহস্য প্রকাশ করেন তাতে তার উপর প্রশ্নবান চলে আসতে পারে।
হঠাৎ খবর পায় নদীতে কোম্পানী জাহাজের সারেং নারী দেহটি আবিস্কার করেন।এবং সন্তানহীন নারী থাকতেন তার বৃদ্ধ মা, তার কানা বোনের ঘরে। এবং বৃদ্ধ মা বলে বেড়ায় তার উপর অনেক আগে থেকে জ্বিনপরি আছর করেছে তাকে তারাই নিয়ে নিছে। কিন্তু যুবক শিক্ষক তো সত্যটা জানে সে প্রকাশ করবে এমন চিন্তায় আবার নিজের মধ্যে প্রশ্ন করতে থাকে। এভাবে এগিয়ে যায় গল্প।
পুরো গল্পতেই যুবক শিক্ষকের বিবেকের সাথে দ্বন্ধকে বেশ সাজানো হয়েছে। সমাজের মানুষের নানান চিন্তা ভাবনাও ফুটে উঠেছে গল্পে। শেষ পর্যায়ে লেখক অস্পষ্ট রেখেই যুবক শিক্ষককে দাদাসাহেবের কাছে পাঠিয়েছেন এবং যুবক শিক্ষক প্রকাশ করেন যে কাদের ই নারীটিকে হত্যা করেছেন এবং তিনি এ বাড়ী থেকে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তারতো আরো একটি কাজ বাকি থানায় জানানো, কেননা দাদাসাহেব নিজের ভ্রাতাকে বাঁচাতে নানা কূটচালের আশ্রয় নিতে পারেন। তাই তিনি থানায় ছুটেন।
এরপর লেখক আবারো কিছুটা অস্পষ্ট রেখে যুবক শিক্ষক আর পুলিশ অফিসারের বাক্যালাপ তুলে ধরেন। পুলিশের কড়া প্রশ্ন “চালাকি করবেন না সত্যটা তুলে ধরুন নইলে নিজে বাঁচতে পারবেন না”। যাকে ফাঁসাতে এসেছেন তাকে ফাঁসানো অতটা সহজ নয় পুলিশ অফিসার সেটাও বুঝালেন। কয়েকদফা প্রশ্ন করার পরও যুবক শিক্ষকের সমান উত্তর অর্থাৎ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা কিন্তু পুলিশের কাছে বৃথা সময় নষ্ট করা বৈ আর কিছুই নয়।
চাঁদের অমাবস্যায় লেখক সমাজের ভালো মানুষির আড়ালে অন্যায় কে তুলে ধরেছেন। সমাজের নিগৃহীত মানুষদেরই যেন সব অন্যায়, এটা সমাজের প্রচলিত নিয়ম। সমাজের নিরীহ মানুষগুলোর বিবেক জাগলেও তা প্রকাশ করতে নেই যদি প্রকাশ করা হয় তাতে মৃত্যুর চেয়ে জীবনের মূল্য কম হয়ে যায়। থানা পুলিশের নিত্যনৈমিত্তিক কর্মের বর্ননা দিয়েছেন। তাদের মনে যুক্তি খাটে কিন্তু সত্য খাটেনা সেটাও তুলে ধরেছেন লেখক।
বই সমালোচনা: লেখক মাত্র চারটি চরিত্রকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আলোচনা করেছেন। যুবক শিক্ষকের বিবেকের তাড়নাকে বারবার উল্লেখ করেছেন। তিনি একই কথাকে বারবার উল্লেখ না করে সমাজের আরো কিছু বর্ণনা দিতে পারতেন তাহলে পাঠক হৃদয় আরো বেশি তৃপ্তি পেত। তিনি নারী পরিবারের আরো সুস্পষ্ট বর্ননা করতে পারতেন তাহলে হয়তো লেখাগুলো আরো নিশ্চিন্তে ধারনা সমেত পড়া যেত। কিছু অস্পষ্ট বিষয়কে তিনি খন্ডন করে দেননি হয়তো চতুর পাঠক ধারনা করে পড়বেন কিন্তু যেই সমাজ যেই যুবক শিক্ষকের বর্ননা তিনি দিয়েছেন তারা কতটুকু বুঝবেন এ ব্যাপারে সন্ধিহান।

 

লেখক: মাহমুদুল হাসান

Related Posts

About The Author

Add Comment