বুদ্ধিজীবীর দর্শন ও দায়

বুদ্ধিজীবী কারা? তাদেরকে কি মানদন্ডে জাজমেন্ট করা যায়? সাধারণ অর্থে আমরা কিছু নিদর্শনের (symptoms) কথা বলতে পারি যেগুলো দ্বারা বুদ্ধিজীবীতার নির্দেশ পেতে পারি। সহজ ভাষায় বললে যাদের কথায় জাতি জেগে ওঠে, সঠিক দিশা পায়, কিংবা জাতির প্রয়োজনে যারা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন তারাই বুদ্ধিজীবী। বুদ্ধিজীবী নামটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে রাশভারী গোঁফওয়ালা কিংবা গুরুগম্ভীর একজনের চেহারা ভেসে ওঠে। আমরা ধরে নেই বুদ্ধিজীবী মাত্রই কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নয়ত কোন অবসরপ্রাপ্ত আমলা। তবে আদতে এটি সত্য নয়। বুদ্ধিজীবী যেকোন পেশার মানুষ হতে পারেন। তিনি সাংবাদিক হতে পারেন, তিনি গীতিকার হতে পারেন, হতে পারেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষক। অর্থাৎ এটাকে কোন পেশা কিংবা কর্মের শৃংখলে আবদ্ধ রাখা যাবে না। বুদ্ধিজীবী মাত্রই জাতির বিবেককে জাগিয়ে তোলেন জনগণের সান্নিধ্যে এসে; হোক সেটা কলমের মাধ্যমে, পাঠদানে কিংবা গানের সুরে, সৃষ্টির উল্লাসে।

বুদ্ধিজীবীর অনেক রকম সংজ্ঞা আছে যেগুলো থেকে বুদ্ধিজীবীতার দর্শন সম্পর্কে আমরা জ্ঞান পাই। একেকজন একেক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়ন করেছেন। এক্ষেত্রে আমরা এন্টোনিও গ্রামসির কথা উদ্ধৃত করতে পারি। তিনি তাঁর Selections from prison Notebooks গ্রন্থে কাজের ওপর ভিত্তি করে মূলত বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা দেন। তিনি মনে করেন যে, সমাজে বুদ্ধিজীবিতা প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে কিন্তু সবাই বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করতে পারেননা।

সমাজে তাদের অবস্থান ও আচরণ সবকিছুই উন্নত থাকবে এবং নৈতিক দিক দিয়ে তাঁরা থাকবেন প্রশ্নের ঊর্ধে । উদাহরণস্বরূপ আমরা সক্রেটিসের কথা বলতে পারি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবীদের একজন সক্রেটিস। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও উন্নত চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী। বুদ্ধিজীবীদের বিবেক দ্বারা পরিচালিত হতে হবে এটি ছিল সক্রেটিসের সারাজীবনের সাধনা। শেষ সময়ে এসে তিনি বলেছিলেন, বিদায়ের সময় উপস্থিত হয়েছে, এবং আমরা যে যার পথে চলে যাব- আমি মৃত্যুপথে, তোমরা জীবনের পথে। কোন পথ অধিকতর উত্তম তা শুধু ইশ্বরই জানেন।

 বুদ্ধিজীবীরা প্রচলিত ধারার বাইরে এসে সমাজ পরিবর্তনের জন্য উন্নত সংস্কৃতির পথ খোঁজবেন একারণে তাঁদেরকে সময় সময় রাষ্ট্রের চক্ষুরাঙানি দেখা লাগতে পারে। কখনো বা সহ্য করতে হবে নির্ম্ম পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। যেমনটি করতে হয়েছিল সক্রেটিসকে। সত্য ভাবনার জন্য খ্রিস্টপূর্ব্ ৪৬২ তে এথেন্স ত্যাগ করতে হয়েছিল এনেক্সেগরাসকে। বুদ্ধিজীবীদেরকে পাবলিক ডিসকোর্স্ নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা পালন করতে হয়। একটি উদার সমাজ গঠনে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য্। হাইডেগার তাঁর লেখায় সমাজকে মৌলিক ও নৈতিক ভিত্তির ওপরে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকার জন্য গুরুত্ব দেন। বুদ্ধিজীবীরা নতুন জ্ঞান চর্চা ও উৎপাদন এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্য নির্মাণ করে একটি পরমতসহিষ্ণু সমাজগঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। যেমনটি আমরা দেখি প্লেটোর ক্ষেত্রে। তিনি প্রত্যয়বাদের ধারণা দিয়েছেন। যদিও প্রজ্ঞা ও দক্ষতার যে বিশ্লেষণ তিনি করেছেন তাঁর সাথে বর্তমান দার্শনিক অনেকেই একমত নন।

বুদ্ধিজীবীরা মূলত দার্শনিক। তাঁরা তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করেন। ইন্টেলেকচুয়ালগণ সভ্যতার ট্রেন্ড ঠিক করেন। যুগ থেকে যুগ, কাল থেকে কালের উত্তীর্ণ্ হবার রাস্তা বাতলে দেন। সবচেয়ে উল্লেখ্য যে, বুদ্ধিজীবীরাই মূলত দর্শন ও সংস্কৃতির মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী অংগ হিসেবে তারা মানুষের মনোজগতের উন্নয়ন করেন(development of rational faculty). তবে এটি করতে গিয়ে বুদ্ধিজীবীরা নানা মত ও পথের আশ্রয় নেন। কেউ নিজস্ব সংস্কৃতি(indigenous culture) কেউবা আবার বিদেশি সংস্কৃতি ধার করার পক্ষে রায় দেন। আমরা দেখতে পাই ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপীয়রা ব্যাপকভাবে মুসলিম সংস্কৃতি, জ্ঞান , বুদ্ধির চর্চা করে এবং উনবিংশ শতাব্দীর দিকে আমেরিকানরা ব্যাপকভাবে ইউরোপীয়ানদের অনুসারী ছিলেন।

aaeaaqaaaaaaaajdaaaajdazzji2zgixlwq0njetnge0yi04mznmltk1yzjmnmu5mzgzzg

বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্বের পরিসীমা নিয়ে অনেক কথা আছে। নোয়াম চমস্কি বলেন, সত্যের প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যার উন্মোচন হল বুদ্ধিজীবীদের কাজ। বুদ্ধিজীবীদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্রের গোপন অভিলাষ , সেগুলোর কারণ ও ফলাফল নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হতে হয়। তবে এটা করতে গিয়ে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হয়। পশ্চিমা দেশ ও তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে এই ঝুঁকির পরিমাণ তারতম্য করে। একনায়কতান্ত্রিক দেশসমূহে বুদ্ধিজীবীদের সত্য প্রকাশ করতে বেশ বেগ পেতে হয়। আর গণতন্ত্রের আড়ালে যেসকল দেশে ফ্যাসিবাদ চলে সেসব দেশে বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গা থাকেনা। বুদ্ধিজীবীরা অবশ্যই সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবেন; সেই সাথে সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করা তাদের দায়িত্ব। বুদ্ধিজীবীদের আরেকটি দায়িত্ব হচ্ছে তাঁরা সংকীর্ণ্ জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে ওঠে মানবতার জয়গান গাবেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমনো অনেকে আছেন যাদের লেখা পড়লে মনে হয় কোন কালে কখনো অত্যাচারী, নির্যাতিত মানুষ ছিল না। পৃথিবীতে সবসময় সুখের ফোয়ারা বয়। আবার কিছু বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা এতটাই বিতর্কিত যে, সার্বিক কার্যক্রম বিবেচনা করলে তাদেরকে বুদ্ধিজীবী বলা যায় না। যেমন বৃটিশ পিরিয়ডে আমরা কজনকে দেখি যাদের মূল লক্ষই ছিল এশীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা এবং প্রাচ্যের হেরিটেজকে ধ্বংস করা। এবং প্রাচ্যকে অনুন্নত, অচ্ছুত সংস্কৃতির ধারক হিসেবে দেখানোই ছিল তাদের মূল এজেন্ডা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ও আমেরিকার অনেক বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ।

বাংলাদেশেও বুদ্ধিজীবীরাও কিছু কিছু গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে এতে করে জাতীয় জীবনে একটি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগেন। রাষ্ট্রের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারেন এমন লোকের সংখ্যা দিনকে দিন কমছে। রাষ্ট্রকে গঠনমূলক পরামর্শ্ দিতে পারেন এরকম ইন্টেলেকচুয়ালের সংখ্যাও কম। আমরা হয়তো আবেগে বলি যে, ৭১ এ আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেও পাকিস্তানিরা আমাদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি, কিন্তু নির্মম্ সত্য এটি যে, বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে আমোদের দেশটি এক ধাক্কায় হাজার বছর পিছিয়েছে। নইলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের যুগে আমরা উপযুক্ত দেশীয় সংস্কৃতিকে প্রমোট করতে পারতাম। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম আবহমান বাংলার চিরায়ত মূল্যবোধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না। উন্নত আমরা হব ঠিকই, কিন্তু প্রাচ্য সংস্কৃতির যে গর্ব্ আমরা করি, সেটি অদূর ভবিষ্যতে আর করতে পারব না। একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন হয় জ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চায়। রাষ্ট্রকে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আর রাষ্ট্রকে জাগিয়ে রাখার জন্য বুদ্ধিজীবীদের জেগে থাকার কোন বিকল্প নেই।।

সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

১৫ ডিসেম্বর,২০১৬

Related Posts

About The Author

Add Comment