ভক্ষণযোগ্য পোকা সমাচার

শুরুর কথা

 মানুষের পোকা খাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ওল্ড টেস্টামেন্ট এ উল্লেখ আছে জন দ্য ব্যপ্টিস্ট লোকাস্ট জাতীয় ঘাসফড়িং খেয়েছিলেন। বিশ্বের প্রায় ৮০ টি দেশে ১০০০ এর বেশি পোকা খাওয়া হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোকার চাষ হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। সেই সাথে কম খরচে ও কম পরিশ্রমে বেশি আয় করার জন্য পোকা চাষ তরুণদের মাঝেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী। দেখে নেয়া যাক খাবার হিসেবে কিছু উল্লেখযোগ্য পোকার পরিচিতি।

এগেভ পোকা

এই পোকাটি ম্যাগুয়ে পোকা, টেকুইলা পোকা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। মূলত  Hypopta agavis এবং ‍Aegiale hesperiaris নামক মথ (এক ধরনের প্রজাপতি) এর লার্ভাগুলো খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পোকা গুলোকে সাধারণত সেন্ট্রাল মেক্সিকোতে পাওয়া যায়। লার্ভাগুলো যখন পূর্ণবয়স্ক হয়ে যায়, তখন মাংসের মত লাল রং ধারণ করে। খাবার হিসেবে উপযুক্ততা তখনই পায়। মেক্সিকান কুইজিনে খুবই পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাবার হিসেবে এ পোকার জনপ্রিয়তা রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম এগেভ পোকায় ৬৫০ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায় যা দুই প্লেট ভাতের সমান। এই পোকা রান্না করে যেমন খাওয়া হয়, কাঁচা খেতেও এর জুড়ি নেই।

ছবি- ভাজা এগেভ পোকা, সূত্র- https://interestingfactsforkids.files.wordpress.com

পিঁপড়া

আমাদের চারপাশে কতরকম পিঁপড়া আছে। এর মধ্যে অনেকগুলো খাওয়াও যায়।

মধুপাত্র পিঁপড়া

শারীরিক কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এরা তাদের পিঠে খাবার বহন করতে পারে। এ কারণে একে বলা হয় জীবন্ত ভাঁড়ার। আদিবাসী অস্ট্রেলীয়রা তাদের উৎসব পার্বনে এ পিঁপড়া খেয়ে থাকে। ২০১১ সালে বিবিসি এই পিঁপড়া নিয়ে এম্পায়ার অব দ্য ডেজার্ট এন্টস নামে একটি ডকুমেন্টারি প্রচার করে। এতে দেখানো হয় কিভাবে মানুষের খাবারের জন্য নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে মধুপাত্র পিঁপড়ার প্রজাতি বৈচিত্র।

ছবি- মধুপাত্র পিঁপড়া

সূত্র- http://www.strangeanimals.info

পাতাকাটা পিঁপড়া

দক্ষিণ আমেরিকায় বিখ্যাত এ পিঁপড়া। বলা হয়ে থাকে পেস্তাবাদাম আর শূকরের মাংসের মাঝামাঝি স্বাদ এর। কলাম্বিয়াতে  সিনেমা, থিয়েটারে পপকর্নের মত বিক্রয় করা হয়। যদিও চাষীদের জন্য এটি মারাত্নক একটি বালাই।

ছবি- পাতাকাটা পিঁপড়া

সূত্র- https://questionableevolution.com

 বাঁশ পোকা

থাইল্যান্ড, মায়ানমারের জনপ্রিয় খাবার। এরা কাঁচা বাঁশ ছিদ্র করে তার ভেতরে বাস করে। জীবনচক্রের কোন এক সময় সবগুলো লার্ভা একত্রে বাঁশের একটি নির্দিষ্ট খোঁড়লে চলে আসে। তখনই সেগুলোকে সংগ্রহ করা হয়। এদের ওজনের ২৬ শতাংশ প্রোটিন এবং ৫১ শতাংশ স্নেহ পদার্থ দিয়ে তৈরি। ইদানিংকালে বাঁশ পোকার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে।

ছবি- বাঁশ পোকা

সূত্র- http://lh6.ggpht.com

সিকাডা

একটি ব্যতিক্রমী পোকা যার কোন কোন প্রজাতি মাটির নিচে প্রায় ১৭ বছর জীবিত থাকে। যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে মাটির বাইরে আসে, তখন তাদের দেহ থাকে নরম, রসপূর্ণ। মানুষ এই কচি দেহের স্বাদ নিতে ভুলে না। প্রাচীন গ্রিস, চীনসহ বিভিন্ন জায়গায় এটি খাওয়া হতো। বর্তমানেও চীন, জাপান, থাইল্যান্ড ও মায়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে এটি বিখ্যাত খাবার।

ছবি- সিকাডা   সূত্র- https://communitytable.parade.com

সেন্টিপ্যাড বা শতপদী

যদিও সেন্টিপ্যাড খুবই বিষাক্ত এবং তাদের বিষে মানুষ প্যারালাইজড হয়ে যায়, তবুও মানুষের জিহ্বা তাকে থোড়াই কেয়ার করে। চীনের হাটবাজারে বিক্রি হয় এটি খাবার হিসেবে। যদিও এটি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না খারাপ তা নিয়ে এখনো ‍বিতর্ক চলছে।

ছবি- শতপদী পোকা

সূত্র- http://www.followmefoodie.com

তেলাপোকা

ঠিক শোনছেন। তেলাপোকাও খাওয়া হয়। অবশ্য আপনি যেগুলো ডাস্টবিনে দেখছেন ওগুলোর কথা চিন্তা করলে আর খাওয়ার রুচি হবে না। কিন্তু যেগুলোকে আলাদাভাবে চাষ করা হয়, তাজা শাক সবজি ফলমূল খাইয়ে বড় করা হয়, তারা ভক্ষণের উপযুক্ত বৈকি। তেলাপোকা ভেজে, রোস্ট করে, সিদ্ধ করে এমনকি চচ্চরি করে খাওয়া হয়।

ছবি- তেলাপোকা সূত্র- https://edibug.files.wordpress.com

ঘাসফড়িং-
দেখতে সুন্দর খেতে সুস্বাদু এ পোকাটিকে খাওয়া হয় দক্ষিণ মেক্সিকোতে। টর্টিলা নামক এক ধরনের রুটির সাথে চিলি সস দিয়ে পরিবেশন করা হয়। শুধু কি মেক্সিকো! ইন্দোনেশিয়া, চীন, লাতিন আমেরিকার প্রচুর মানুষের খাবারের টেবিলে থাকে এই ঘাসফড়িং। বাইবেলে বর্ণিত আছে ব্যপ্টিস্ট জনও নাকি জঙ্গলে মধু ও একজাতীয় ঘাসফড়িং খেয়েছিলেন।

ছবি- ঘাসফড়িং সূত্র- http://english.vietnamnet.vn

মৌমাছি-
মৌমাছির লার্ভা এক দারুণ খাবার। এই লার্ভা গুলো রয়েল জেলি খেয়ে বড় হয়। চিন্তা করে দেখুন আপনিও রয়েল জেলি খাচ্ছেন যার এক কেজির দাম গড়ে ২২-২৩ হাজার টাকা। মাখনের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয় এই লার্ভা। অবশ্য প্রাপ্ত বয়স্ক মৌমাছিও খাওয়া যায়। বড় মৌমাছি গুলোকে রোস্ট করে এক ধরনের গুঁড়া ময়দা করা হয়। চীনে এই ময়দা দিয়ে গলার ক্ষতের চিকিৎসা করা হয়।

ছবি- মৌমাছির লার্ভা সূত্র- http://i.imgur.com/Acgz4w6.jpg

জুমিলি বা স্টিংক বাগ

ভাবা যায় এই পোকা খাওয়ার জন্য মেক্সিকো তে আলাদা ভাবে উৎসব হয়। স্টিংক বাগের যে প্রজাতিগুলো খাওয়া যায় সেগুলো কে একত্রে জুমিলি বাগ বলে। মোটামুটিভাবে সব উপায়েই একে খাওয়া যায়। তবে এটি সিদ্ধ হতে দেরি হয়, তাই লোকে অনেকসময় কাঁচা জীবিত জুমিলিও খেয়ে ফেলে। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি আছে এবং বেদনানাশক হিসেবেও এর সুখ্যাতি রয়েছে। স্বাদ অনেকটা দারচিনির মত।

ছবি- জুমিলি পোকা সূত্র- https://www.chicagoreader.com

মোপেন পোকা
জাম্বিয়া এবং এর আশেপাশের দেশগুলোর মানুষের খুব প্রিয়। মোপেন গাছে থাকে বলে পোকার এই নাম হয়েছে। এর পুষ্টিগুণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে গরুর মাংসের চেয়েও বেশি। যেমন গরুর মাংসে আয়রন কন্টেন্ট মাত্র ৬ শতাংশ, কিন্তু মোপেন পোকায় তা ৩১ শতাংশ। তাছাড়া ও পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির পরিমাণও বেশি।

ছবি- মোপেন পোকা সূত্র- https://theculinarylinguist.files.wordpress.com

স্যাগো গ্রাব

বাংলায় একে সাগু পোকাও বলতে পারেন, স্যাগো নামক এক ধরনের তাল জাতীয় গাছে এ পোকা দেখতে পাওয়া যায়। এটি হচ্ছে মূলত পাম উইভিল( এক ধরনের বিটল) এর লার্ভা। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া তে স্যাগো ডেলাইট নামে এই পোকার রেসিপি রয়েছে। কাঁচা খেলে এর স্বাদ ক্রিমের মত আর রান্না করলে শূকরের মাংসের মত। স্নেহ বা চর্বি জাতীয় পদার্থ প্রচুর পরিমাণে থাকে এতে।

ছবি- স্যাগো গ্রাব সূত্র- https://gfb.global.ssl.fastly.net 

শেষ কথা

সামাজিক ভাবে পোকা খাওয়া নিয়ে আমাদের দেশে ট্যাবু প্রচলিত আছে। তবুও খুব সম্প্রতি বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে পোকা চাষের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে এই ভক্ষণযোগ্য পোকার চাষ। ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এর ভূমিকা যথেষ্ট আলোচনার দাবি রাখে।

 

তথ্য সূত্রঃ

১. https://edibug.wordpress.com/list-of-edible-insects/

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Entomophagy

লেখক

সাইফুল্লাহ ওমর নাসিফ

Related Posts

About The Author

Add Comment