ভালো লাগার বই : দ্য আর্ট অব ওয়ার

“মানবজাতির ইতিহাস আসলে যুদ্ধের ইতিহাস। মানবজাতি সবসময়ই কোনো যুদ্ধ পরবর্তী, যুদ্ধকালীন অথবা যুদ্ধের আগমুহূর্তে অবস্থান করে। যুদ্ধের কারণ কি, যুদ্ধের ফলাফল কীভাবে নির্ধারিত হয়, যুদ্ধে কোনো দল কেন জেতে আবার কোনো দল কেনইবা হারে তা বুঝতে পারা জটিল কোনো কাজ না হলেও অতি সরল কোনো ব্যাপার নয়।”

আপাতত কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আমার না থাকলেও বইটি পড়ে শেষ করলাম। কেননা কোনো এক মহান দার্শনিক একদা বলিয়া গিয়াছিলেন যে জীবন মানেই যুদ্ধ। আর জীবনযুদ্ধে তো পরাজিত হওয়া চলে না! কিন্তু তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, জীবনের যুদ্ধ আর শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ কী এক??

সান জু অবশ্য এক করেই দেখিয়েছেন। তাই তো আড়াই হাজার বছর আগে লেখা হলেও এই বই এখনো তুমুলভাবে জনপ্রিয়। সাধারণ মানুষ তো রয়েইছে, সান জু’র এই “আর্ট অব ওয়ার” বিশেষভাবে খ্যাতি লাভ করেছে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, খেলোয়াড় আর আমলাদের মাঝে।

সান জু আসলে কে? ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন চীনের চী রাজ্যের একজন সমরবিশারদ। তবে অন্যান্য মহান লোকের মতন তাঁর জীবন আর কর্ম নিয়েও এত এত মিথ গড়ে উঠেছে যে সেখান থেকে এখন আর আসল সান জু’কে খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। অনেকে তো এও বলেন যে সান জু আসলে এই আর্ট অব ওয়ার লেখেনই নি। আর্ট অব ওয়ার আসলে অনেকের সম্মিলিত প্রয়াস (অনেকটা শেক্সপীয়রের কিংবদন্তীর মতন। শেক্সপীয়র নামে যাকে আমরা চিনি তিনি আসলে মুসলমান ছিলেন, তাঁর আসল নাম শেখ পীর)। তবে অধিকাংশ গবেষকদের মতেই, সান জু’র জন্ম খ্রিষ্টের জন্মের পাঁচশ বছর পূর্বে!

বইটি আমি পড়েছি সাবিদিন ইব্রাহিমের অনুবাদে। অনুবাদ অতি চমৎকার! মাঝে মাঝে বাংলা ভাষার যে ব্যবহার তিনি দেখিয়েছেন তাতে ব্যাপক আনন্দ পেয়েছি। যেমন এক জায়গায় তিনি সান জু’র সমর কৌশলের নীতির জায়গায় অনুবাদ করেছেন,

“আদেশ তামিল করতে পারবে না জেনেও নিজের সেনাদলকে সামনে এগিয়ে যাওয়া বা পপশ্চাদপসরণের আদেশ দেয়ার মানে হল সৈন্যদলকে মাইনক্যা চিপায় ফেলে দেওয়া।” (জ্বী, এই মাইনক্যা চিপা ওয়ার্ডটাই তিনি ব্যবহার করেছেন অনুবাদের ক্ষেত্রে)।

আবার অনুবাদ করেছেন, ” আসলে যুদ্ধক্ষেত্রে সেরা ওস্তাদি ফলানোর ব্যাপারটা হচ্ছে কোনো ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ না চালিয়েই শত্রুদেশের পুরোটা দখল করা। কোনো দেশকে তছনছ করে দেয়া ভালো কোনো কাজ নয়, এতে আসলে লাভ নেই। ঠিক এইভাবে কোনো সেনাদলকে তছনছ করে দেয়ার চেয়ে পুরো সেনাদলকে অক্ষত করা অনেক বেহতর।” (শব্দটা খেয়াল করুন, বেহতর।)

বইয়ের শুরুতে অনুবাদকে দীর্ঘ (প্রায় ৩৩ পৃষ্ঠার) একটা ভূমিকা সংযুক্ত রয়েছে (যেখানে মূল বইটাই ৭৮ পৃষ্ঠার)। ভূমিকায় অনুবাদক বুঝাতে চেয়েছেন কীভাবে কোন সময়ে কত উপায়ে এই সান জু’র “দ্য আর্ট অব ওয়ার” কাজে লেগেছে। দেখিয়েছেন বর্তমানের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো কীভাবে সান জু’র এই সমর কৌশল কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশীয় শিল্পকে ধ্বংস করেছে। দেখিয়েছেন কীভাবে খেলোয়াড়েরা খেলার মাঠে কীভাবে এই কৌশলগুলো কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে মাঠে শুইয়ে দেয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে সান জু আর তার যুদ্ধের শিল্প ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা এই ভূমিকাটুকু পড়লে জানতে পারবেন। এই ভূমিকাটুকু পড়ে মূল আর্ট অব ওয়ার পড়তে গিয়ে দেখি অবচেতনভাবেই কলাকৌশলগুলোকে বিজনেস ট্রিক্স হিসেবে দেখছি।

অনুবাদকের সম্ভবত ব্যক্তিগত পর্যায়ের ভালো লাগা ছিল এই বই নিয়ে। তাই তিনি কেবল সান জু’র বইই পড়েন নি, বই নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে অন্তর্জালে, ইউটিউবে সেগুলোও দেখেছেন, পড়েছেন। বইয়ের শেষে সেসবের সংযুক্তিও আছে।

দ্য আর্ট অব ওয়ার ইতোমধ্যেই বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে গেছে বেশ কয়েকটা প্রকাশনী থেকে। তবে সর্বপ্রথম মনে হয় প্রকাশিত হয়েছিল বাতিঘর থেকে। “আধুনিক দৃষ্টিকোণে সান জু’র দ্য আর্ট অব ওয়ার” এই নামে। এবারের বইমেলায় কিনতে গিয়ে দেখি এডর্ন পাবলিকেশন্সও এই বই প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাদের বইয়ের সাইজ দেখে চক্ষু চড়কগাছ! এত মোটা বানাইলো কেমনে এই বই?? যেখানে সাবিদিন সাহেবের অনুবাদে মাত্র ৭৮ পৃষ্ঠা!!! বই খুলে নাড়াচাড়া করতেই আসল ফাঁকি বেরিয়ে পড়ল। এরা বাংলা অনুবাদ তো করেইছে সাথে মূল চাইনিজটাও তুলে দিয়েছে। ভাবখানা এমন যে আমাদের অনুবাদ যে কতটা মূলানুগ নিজেই মিলিয়ে নিন মূল মান্দারিন থেকে!

শেষ কথা, সান জু’র এই বই পড়ে যে আপনি বন্ধ করে রাখবেন, “একটা বই পড়া হল” বলে তেমনটা নয় এই বই, আপনাকে বারবারই ফিরে আসতে হবে এই বইয়ের কাছে।

বইটি প্রকাশ করেছে ঐতিহ্য প্রকাশনী। সবাইকে সান জু’র “দ্য আর্ট অব ওয়ার” পড়ার আমন্ত্রণ জানালাম।

Related Posts

About The Author

Add Comment