মনীষীদের জীবনের টক, ঝাল, মিষ্টি গল্প

বিখ্যাত ব্যক্তিরা একদিনে বিখ্যাত হননি। সাফল্যের সাত সমুদ্র তের নদী পার হতে গিয়ে রীতিমত তাদেরকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সাফল্য তাদের কাছে হহাজির হয়েছে নিউটনের পাশে হঠাৎ পড়া আপেলের মত। সাফল্যের উচ্চ সিঁড়িতে আরোহণের জন্য যে ইস্পাত সদৃশ মন, হাড়ভাঙা খাটুনি ও আঁকাশছোয়া স্বপ্ন থাকতে হয় তা বিখ্যাতদের মধ্যে ছিল বলেই তাঁরা বিখ্যাত। আমরা যারা অখ্যাত তারা বিখ্যাতদের জীবনী পড়ি শুধু অবাক হওয়ার জন্য নয়, অন্যদেরকে অবাক করে দেওয়ার জন্যও। তাপস রায় “মনীষীদের মজার গল্প” নামক বইতে মনীষীদের জীবনের অনেক টক, ঝাল, মিষ্টি গল্পের আলোকপাত করেছেন। মোদ্দাকথা হল, মনীষীরা যে আসলে সাধারণ মানুষের মত ছিলেন, তারা যে দেবতা নন, তবে অমরত্ব লাভ করেছেন তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মাঝে কিছু অসাধারণ গুণের সমন্বয় ঘটিয়েছেন বলে। মনীষীদের জীবনের অনেক গল্প পাঠককে ভাবিয়ে তুলবে, অনেক গল্প আন্দোলিত করবে, অনেক গল্প উদ্বুদ্ধ করবে ভাল কাজে, অনেক গল্প হাসাবে, অনেক গল্প তাদের পাগলামির শেষ চুষিকাঠিতে পৌঁছে যাবে, অনেক গল্প তাদেরকে নিয়ে এমন মনোভাব তৈরি করবে যেন তারা অতি সাধারণ মানুষ।

বিখ্যাত বাঙালি দার্শনিক অশ্বিনীকুমার দত্তের বাবা সাব-জজ ব্রজমোহন দত্ত বাবু খুব হিসেবী ছিলেন। তিনি কম খরচ করতে পছন্দ করতেন। ছেলেদের বাবুয়ানা ভাব তাঁর খুব অপছন্দ ছিল। একদিন তিনি অশ্বিনীকুমার দত্তকে ডেকে বললেন সে(অশ্বিনী) যে পরিমাণ টাকা খরচ করে তা তিনি করেন না। এই কথার প্রত্যুত্তরে অশ্বিনীবাবু বলেছিলেন, “আপনি কে আর আমি কে? আপনি কোনো এক নন্দকিশোর দত্ত’র ছেলে। আর আমি সাব-জজ ব্রজমোহন দত্ত’র ছেলে। সুতরাং পার্থক্য তো থাকবেই।”

আমরা বিখ্যাত লেখক ও কবি অস্কার ওয়াইল্ডের কথা জানি। ছাত্র জীবনেই তিনি কবি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। একদিন কবি টেমস্ নদীর ব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি এক যুবককে দেখলেন আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছে। তিনি তাকে ধরে ফেললেন এবং কারণ আবিষ্কার করার চেষ্টা করলেন। জানতে পারলেন বেচারা এবারও পরীক্ষায় কৃতকার্য হয় নি। ওয়াইল্ড তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটলেন এবং বিদায়বেলায় স্বান্তনা দিয়ে বললেন,” এই তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা করলে লোকে তোমাকে নির্ঘাত বোকা বলবে। কারণ পরীক্ষায় উজবুকেরা এমন সব প্রশ্ন করে বসে যে, মাঝেমধ্যে বিজ্ঞরাও এর সঠিক উত্তর দিতে পারে না”।

হাজার বছরের সেরা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে আমরা কে না চিনি! প্যাটেন্ট অফিসের কেরানি থেকে হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আইনস্টাইন কথা বলা শিখেছিলেন চার বছর বয়সে আর পড়তে শিখেছিলেন সাত বছর বয়সে। তাঁর বাবা-মা একারণে খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। হঠাৎ একদিন আইনস্টাইন সবাইকে তাক লাগিয়ে বলে উঠলেন,”সুপটা খুবই গরম।” তাকে যখন সবাই জিজ্ঞাসা করল যে এতদিন সে কেন চুপচাপ! তখন সে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বাক্যটি বলল,”এত দিন তো সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল”।
আইনস্টাইন পোশাক পরার ক্ষেত্রে খুবই উদাসীন ছিলেন। তাঁর স্ত্রী তাকে নানাভাবে তাগাদা দিলেও তাকে কোনভাবে তা আন্দোলিত করতে পারেনি। তিনি বলতেন ওখানে সবাই আমাকে চেনে। সুতরাং নতুন পোশাকের প্রয়োজন কি! একবার নতুন এক জায়গায় আইনস্টাইন বক্তৃতা দিতে যাবেন, হঠাৎ তাঁর স্ত্রী তাকে ভাল কাপড় পরে যাওয়ার জন্য জারিজুরি করতে লাগলেন। তিনি তখন উত্তর করলেন, ওখানে তো কেউ আমাকে চেনে না।

আরেকদিনের ঘটনা, আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর কাছে তাঁর টেলিফোন নম্বর চাইলেন। আইনস্টাইন তাঁর টেলিফোন গাইডে নিজের নাম্বার খুঁজতে লাগলেন। এতে তাঁর বন্ধু খুব রেগে গেলেন এ কারণে যে তাঁর নিজের ফোন নম্বর পর্যন্ত তাঁর মুখস্থ নেই। তখন আইনস্টাইন বললেন, “যে জিনিসটা টেলিফোন গাইডে লেখা আছে, সেটা আমি মুখস্থ করতে যাব কেন?”

“দি ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সী” নামক সাড়া জাগানো বইয়ের লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রথম জীবনে সৈনিক হওয়ার মনোবাসনা ব্যক্ত করলেও বিবাহ পরবর্তী সময়ে স্ত্রীর সান্নিধ্যে এসে সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন। একবার এক প্রতিবেশি বন্ধুর বাড়িতে একটি বই দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি বইটি নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। তখন বন্ধুটি তাকে জানালেন যতক্ষণ খুশি তিনি বই পড়তে পারবেন কিন্তু বাসায় নিতে পারবেন না। এ কথা শোনার পর তাঁর মন খুব খারাপ হয়ে গেল। বিষণ্ণ মন নিয়ে তিনি বাসায় ফিরলেন। কয়েকদিন পর তাঁর সেই বন্ধু তাঁর বাসায় আসলেন ঘাস কাটার যন্ত্রের জন্য। তখন তিনি বন্ধুকে বললেন,” তুমি যতক্ষণ খুশি যন্ত্রটি এখানে ব্যবহার করতে পার কিন্তু বাড়ি নিয়ে যাওয়া চলবে না”।
১৯২৬ সালে তিনি স্ত্রী হ্যাডলি ও শিশুপুত্রকে ত্যাগ করে প্যারিস সুন্দরী পলিনকে বিয়ে করেন। পরে সাংবাদিকরা যখন তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন যে কেন তিনি হ্যাডলিকে ছেড়ে দিলেন, তখন তিনি বললেন,”কারণ আমি আসলেই একটি হারামজাদা!”

আমেরিকার সবচেয়ে সেরা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে আব্রাহাম লিংকন একজন। লিংকন দাসপ্রথার বিলুপ্তি সাধন করে মার্কিন মুলুকের সবচেয়ে সফল প্রেসিডেন্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। একদিন তিনি দুই ছেলে উইলি ও ট্যাডকে নিয়ে পথে হাঁটছিলেন। দুই ছেলেই উচ্চস্বরে কাঁদছিল। তুলকালাম লেগে যাওয়ার উপক্রম হল। লোকে কারণ জানতে চাইলেন। লিংকন তখন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,”সারা দুনিয়ায় যা হচ্ছে, এও তাই। আমার কাছে তিনটি আখরোট আছে, ওরা প্রত্যেকেই দু’টো করে পেতে চায়”।

অতি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন লিংকন। কোন এক সভায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সি. ডগলাস তাঁকে হেয় করার জন্য বলতে লাগলেন যে তার সাথে যখন লিংকনের পরিচয় হয় তখন লিংকন মুদিখানা চালাতেন। অন্যান্য জিনিসের সাথে মদ আর চুরুট বিক্রি করতেন। তখন সবাই কটাক্ষের হাসি হাসতে লাগলেন। লিংকন তাদেরকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বলেছিলেন,” মিঃ ডগলাস ঠিকই বলেছেন। আমার একটা মুদিখানা ছিল। আমি হুইস্কিও বিক্রি করতাম। আমার বেশ মনে আছে, ডগলাস ছিলেন আমার সেরা খদ্দেরদের একজন। বহুবার আমি কাউন্টারের ওপাশ থেকে এপাশে ডগলাসকে হুইস্কির বোতল এগিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আজ তাঁর সঙ্গে আমার তফাত এই যে, আমি ওপাশ থেকে এপাশে এসেছি। আর উনি যেখানে ছিলেন সেখানেই গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।”

হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রবর্তনে অসামান্য ভূমিকা রাখা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন রসিক মানুষ। একদিন বিদ্যাসাগর গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটছিলেন। পথিমধ্যে একজন সমবয়সী ব্যক্তির সাথে তাঁর দেখা। ঐ ব্যক্তি রসিকতার ছলে বললেন,”পন্ডিত মানুষ, আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছ। দেখো পায়ে আবার বিষ্ঠা না লাগে!” তখন রসিকতার ছলে বিদ্যাসাগরের উত্তর,” এ গ্রামে বিষ্ঠা আসবে কোত্থেকে? এখানে তো দেখছি সব গোবর।”

বিদ্যাসাগরের প্রিয় শখ ছিল বই পড়া ও যত্ন করে বই বাঁধিয়ে রাখা। একদিন এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন। ভদ্রলোক বই বাঁধিয়ে রাখাটাকে ভালভাবে নিতে পারেন নি, পাছে অনেক টাকা খরচ হয়। বিদ্যাসাগর তখন তামাক খেতে খেতে ভদ্রলোকের শালের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন শালটি তিনি কোত্থেকে কিনেছেন। শালের প্রশংসা শুনে ব্যক্তিটি বললেন, শালটি পঁচিশ টাকা দিয়ে কেনা। তখন বিদ্যাসাগরের কথা ছিল এমন, “পাঁচ সিকের কম্বলেও তো শীত কাটে, তবে এত টাকার শালের প্রয়োজন কী? এ টাকায়ও তো অনেকের উপকার হতে পারত।”

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন দারুণ অর্থকষ্টে ভুগছিলেন তখন বিদ্যাসাগর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। একদিন এক মাতাল বিদ্যাসাগরের কাছে এসে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। বিদ্যাসাগরের সাফ সাফ জওয়াব তিনি কোন মাতালকে সাহায্য করবে রাজি নন। তখন ঐ মাতাল জানালো যে বিদ্যাসাগর তো মধুসূদনকে সাহায্য করে! কিন্তু মধুসূদনও তো মদ খায়। তখন বিদ্যাসাগরের জবাব ছিল এমন,”তুমি ওর মতো ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য লিখে আনো। তোমাকেও সাহায্য করব।”

সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এক জনসভায় বক্তৃতা করছিলেন। জনসভায় অনেক লোকের সমাগম ঘটেঝিল। বক্তৃতা শেষের পর এক ভদ্র মহিলা তাঁর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন,”মিঃ চার্চিল, আপনার জনসভায় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এতে কি আপনি পুলকিত হন না? চার্চিল মুচকি হেসে বলেছিলেন,”কিন্তু ম্যাডাম, এও মনে রাখতে হবে যে, রাজনৈতিক বক্তৃতা করার বদলে আমি যদি ফাঁসিতে ঝুলতাম তাহলেও এর দ্বিগুণ ভিড় হত”।

চার্চিলের মেয়ে সারা যে ছেলেটির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল তাকে চার্চিল দু চোখে দেখতে পারতেন না। একদিন মেয়ে জামাইকে নিয়ে তিনি হাঁটতে বেরিয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে জামাই শ্বশুর মশাইয়ের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,” যুদ্ধে আপনি প্রশংসা করার মত কাউকে পেয়েছিলেন কি?” প্রায় গর্জন করে চার্চিল জবাব দিয়েছিলেন,” হ্যাঁ, একজনকে পেয়েছি। মুসোলিনি। তিনিই একমাত্র লোক যে কিনা নিজের মেয়ে-জামাইকে গুলি করে মারার সাহস দেখিয়েছেন”।

চার্চিলের শত্রুর কোন অভাব ছিল না। এক জনসভায় তাঁর বক্তৃতা শুনে বিরোধীপক্ষের এক ভদ্রমহিলা নাক সিঁটকিয়ে পাশের জনকে বলেছিলেন যে চার্চিল তার স্বামী হলে তিনি চার্চিলকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতেন। এ কথা শোনার পর চার্চিল মহিলার দিকে চেয়ে মৃদু স্বরে বলেছিলেন,” ম্যাডাম, আপনি যদি আমার স্ত্রী হতেন তাহলে আমি নিজেই বিষ খেতাম।”

শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হকের কাছে কেউ যদি তদবিরের জন্য আসতেন তাহলে সফল হতেন। তিনি তদবিরওয়ালার সামনেই ফোনে বলে দিতেন। একদিন তিনি এক তদবিরওয়ালাকে সামনে রেখেই ফোনে বলে দিলেন। ঠিক সে সময়ে আরেকজন ব্যক্তি ঘরে ঢুকল। তখন হক সাহেব ফোন রেখে তার কাছে জানতে চাইলেন তার সমস্যা কি। তখন ঐ লোকটা বলল,” স্যার, আমি টেলিফোনের লোক। আপনার লাইনটা গতকাল থেকে কাটা। ঠিক করতে এসেছি।”

নির্বাক চলচ্চিত্রের পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের অনুকরণে একবার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। গোপনে চার্লি চ্যাপলিনও নাম দিলেন সেই প্রতিযোগিতায়।প্রতিযোগিতা শেষে দেখা গেল তিনি তৃতীয় হয়েছেন।

জি বি এইচ নামে পরিচিত জর্জ বার্নার্ডশ এইচ জি ওয়েলস-এর সাথে একদিন রাস্তায় হাঁটছিলেন। ওয়েলস হাতের লাঠিটা এমনভাবে ঘুরাচ্ছিলেন যে তা শ-এর নাকে লাগার উপক্রম হল। শ ওয়েলসকে লাঠি ঘোরানো বন্ধ করতে বললেন কারণ তা যে কোন সময় তাঁর নাকে লাগতে পারে। ওয়েলস তখন তাকে বললেন,” রাস্তায় লাঠি ঘুরিয়ে হাঁটা আমার নাগরিক অধিকার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা। তুমি সেই স্বাধীনতা খর্ব করতে পার না”। তখন শ বললেন,” তা আমি জানি। তবে এ কথা জেনে রাখ, আমার নাকের ডগা যেখানে শেষ তোমার নাগরিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা সেখান থেকেই শুরু।”

শ ছিলেন খুব কদাকার চেহারার শীর্ণকায় মানুষ। বিখ্যাত নাট্যশিল্পী ইসাডোরা ডানকান একবার শ-কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে লিখেছিলেন,” আমাদের বিয়ে হলে সেটা হবে আদর্শ বিয়ে। কারণ আমাদের সন্তান দেখতে হবে আমার মত, আর বিদ্যাবুদ্ধিতে হবে তোমার মতো।” চিঠির উত্তরে শ তাকে লিখেছিলেন,” উল্টোটাও তো হতে পারে। যেমন ধরো, বিদ্যাবুদ্ধিতে তোমার মত, দেখতে আমার মতো।”

শ খুব খুব রোগা পাতলা ছিলেন। তাঁর লেখক বন্ধু চেস্টারটন ছিলেন তেমনি স্বাস্থ্যবান। একদিন তাদের আড্ডায় হঠাৎ দুর্ভিক্ষ প্রসঙ্গ উঠলো। ইংল্যান্ডে তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল। দুর্ভিক্ষের কারণ নিয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হল। এক পর্যায়ে চেস্টারটন বার্নার্ডশর দিকে তাকিয়ে বললেন,”বুঝলে শ, দেশে যে দুর্ভিক্ষ চলছে তা তোমাকে দেখলেই বোঝা যায়।”
একথা শুনে বার্নার্ডশ গুরুগম্ভীর হয়ে বললেন, “হুঁ, লোকে এটুকুও বুঝবে যে, দুর্ভিক্ষের কারণটা তুমিই”।

শ একদিন নাটক লেখার কাজে মগ্ন আছেন। এমন সময় দুই ভৃত্যের কথোপকথন তাঁর কানে এল। প্রথম ভৃত্যঃ হ্যারে, সাহেব খুব ব্যস্ত রয়েছেন তাই না?
দ্বিতীয় ভৃত্যঃ ধুর! মোটেই তিনি ব্যস্ত নন। ক’দিন ধরেই তো দেখছি কেবল লিখেই যাচ্ছেন।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এক পার্টিতে গেছেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন যে তাঁর এক সচিব গোগ্রাসে একটি মুরগির রোস্ট গিলছেন। তিনি সচিবের কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বললেন,”অত তাড়াহুড়ো করছ কেন? মুরগিটা তো মৃত, পালাবে না।”

পন্ডিতজী একবার এক মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শনে বের হলেন। প্রোটোকলের বাইরের সফর ছিল এটি। হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে তিনি ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ এক রোগী তাঁর সাথে কথা জমাবার চেষ্টা করল। এক পর্যায়ে নেহেরুর পরিচয় জানতে চাইলেন তিনি। নেহেরু জানালেন যে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সেই রোগী তখন চিৎকার দিয়ে অন্য রোগীদেরকে ডাকতে লাগলো আর বলতে লাগলো, “ওরে দেখে যা, আমার মতো আরেকজন রোগী এসেছে।” সে রোগীদের উদ্দেশ্যে বলল,” সে আবার নিজেকে প্রধানমন্ত্রী বলে পরিচয় দিচ্ছে! হি… হি…হি…”

“টেকচাঁদ ঠাকুর” ছদ্মনামে পরিচিত প্যারীচাঁদ মিত্র বিখ্যাত ধনী দেবনারায়ণ দে’র মেয়ের বিয়েতে গেছেন। দেনা-পাওনার কথাবার্তা চলছে। প্যারীচাঁদ বাবু পাত্র পক্ষের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য বারবার দেবনারায়ণ দে কে অনুরোধ করতে লাগলেন। এমন অনুরোধ শুনে দেব বাবু বললেন, “আপনি তো বেশ লোক মশাই, আমাকেই শুধু দিয়ে যেতে বলছেন?” প্যারীচাঁদ তখন কৌতুক করে বললেন,” আপনি দেবেন না তো কে দেবে? আপনার আগে ‘দে’ পরেও ‘দে’। সুতরাং আপনাকেই দিতে হবে”।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন বেনেটোলার ডেপুটি অধর সেনের বাড়িতে। অধর সেন তখন রামকৃষ্ণের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমকে। বঙ্কিমকে দেখে রামকৃষ্ণ বললেন,” বঙ্কিম কার হাতে পড়ে বেঁকলে গো?” বঙ্কিম তখন হাসতে হাসতে বললেন,”বেঁকেছি ইংরেজের বুটের ঠোক্করে।”

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরির জন্য বঙ্কিমকে ভাইভা দিতে হল। তাকেও যথারীতি বাংলার উপরে পরীক্ষা দিতে হল তবে সেখানে পরীক্ষক একজন জাত ইংরেজ। প্রথমেই তিনি বঙ্কিমকে প্রশ্ন করলেন, “ওয়েল! বলতে পারো, হোয়াট দ্য ডিফারেন্স বিটুইন বিপড অ্যান্ড আপড?” বঙ্কিম বাবু হেসে বলেছিলেন,” অবশ্যই, একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে বলছি। পদ্মায় একবার স্টিমারে করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ শুরু হল ঝড়। সেটা হল বিপদ। আর এই যে আজ আমাকে একজন বাঙালি হয়ে তোমার মত ইংরেজের কাছে বাংলা ভাষার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে- এটা আপদ।”

ইংরেজ লেখক মার্ক টোয়েন একবার তাঁর এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বন্ধুকে বললেন, বছর দশেক লেখালেখি করার পর বুঝলাম, এ ব্যাপারে আমার কোন প্রতিভাই নেই”। বন্ধু তখন বললেন যে এর পরেও কেন টোয়েন লেখা চালিয়ে গেছেন। তখন টোয়েনের জবাব,” কী করব বল, ততোদিনে আমি বিখ্যাত হয়ে গেছি যে!”

বই চুরি করাকে নিয়মিত কাজে পরিণত করেছিলেন মার্ক টোয়েন। তাঁর বইপত্র ঘরে ছড়ানো ছটানো অবস্থায় থাকতো। একদিন এক বন্ধু তাঁর বাসায় এসে তাঁর বইয়ের অবস্থা দেখে তাকে বললেন,” বইগুলো সেলফে তুলে রাখতে পার না?” তখন ত্বড়িত গতিতে টোয়েনের উত্তর,” কি করে পারব? বইগুলো যেভাবে সংগ্রহ করেছি, শেলফগুলো তো আর সেভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন। জাহাজের অনেক যাত্রীই তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। একজন বাঙালি তাঁর সাথে কথা বলা শুরু করলেন বাংলা-ইংরেজিকে মিশিয়ে ফেলে। তখন কবিগুরু খুব বিরক্ত হলেন। তিনি তার কথাতে শুধু হু- হ্যাঁ করে যাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে সে কবিকে বলল,” গুরুজি, কিছু মনে করবেন না, দীর্ঘদিন ইংল্যান্ডে বাস করছি তো তাই বাংলাটা প্রায় ভুলে গেছি।” কবির এবার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি তখন বললেন,” বাংলা ভুলে গেছ সেজন্য আমার কোনো দুঃখ নেই, কিন্তু ইংরেজিটাও তো ভাল করে শিখতে পারলে না।”

শান্তিনিকেতনে রবীঠাকুর ছাত্র পড়াচ্ছেন। ক্লাসের বাইরে একটা ছাত্র হাতে নিমের ডাল নিয়ে আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তখন কবি তাকে ‘নিমাই’ সম্বোধনে ডাকলেন। এই কথা ক্লাসের উপস্থিত ছাত্ররা শুনলো। একজন শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়িয়ে বলল,” গুরুদেব, কাল থেকে আমি যদি জাম গাছের ডাল নিয়ে ক্লাসের বাইরে ঘুরে বেড়াই আমাকে কি বলে ডাকবেন?” তখন রবীঠাকুর তাকে বললেন,”তখন তোমাকে আর ডাকা চলবে না বাপু”। সেদিনের সেই প্রত্যুৎপন্নমতি ছাত্রটিই প্রমথনাথ বিশী।

আমরা সকলেই কম বেশি অবগত যে, যে সকল সাহিত্যিক তাদের জীবদ্দশায় খুব খ্যাতি পেয়েছিলেন তার মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অন্যতম। তিনি ‘চরিত্রহীন’ লিখে বেশ বাহবা পেয়েছিলেন। বহুদিন পর এক বন্ধুর সাথে শরৎবাবুর দেখা। বন্ধু তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। তখন শরৎবাবু তাকে বললেন,” কি হে, চিনতে পারছ না? আমি শরৎ।” বন্ধুটি চিনতে পেরেও রসিকতার ছলে তাকে বললেন,” কোন্ শরৎ? আজকাল তো সাহিত্যাঙ্গনে দু’জন শরৎচন্দ্র দেখা যায়।” শরৎবাবু মুচকি হেসে বললেন,”আমি ‘চরিত্রহীন’ শরৎ।”

শরৎবাবুর কাছে দুজন ব্যক্তি এসেছেন। তারা শরৎচন্দ্রের লেখার ভূয়সী প্রশংসা করলেন আর রবীন্দ্রনাথের লেখার সমালোচনা করলেন কারণ তা নাকি দুর্বোধ্য। তখন শরৎ বাবু বললেন, “আমি লিখি আপনাদের জন্য। আর রবিবাবু লেখেন আমাদের জন্য।

পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী ছাত্রদের পড়াচ্ছেন। স্কুলে ড্রাম ভর্তি রসগোল্লা এসেছে। কখন শাস্ত্রী সাহেব বললেন,”এই ড্রামের সব রসগোল্লা তোমাদের মধ্যে কে সাবাড় করতে পারবে?” তখন সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। হঠাৎ একজন শিক্ষার্থী চিৎকার করে বলল,” স্যার, আমি পারব।” পরমুহূর্তেই চাপাস্বরে বলল, “তবে একদিনে নয়।” সেদিনের সেই ছাত্রটির নাম ছড়াকার সুকুমার রায়।

রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের কাছে ধর্মসভায় হেরে গিয়ে এক সাধু রাগ করে বললেন,” আমি ত্রিশ বছর সাধনা করে এখন হেঁটে নদী পার হতে পারি। আপনি কী পারেন?” তখন রামকৃষ্ণ একটু হেসে বললেন,” যেখানে এক পয়সা দিলেই মাঝি আমাকে নদী পার করে দেয় সেখানে এর জন্য ত্রিশ বছর নষ্ট করার পক্ষপাতী আমি নই।”

বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমা তৈরি করার সময় একটা দৃশ্যের জন্য পাখি খুঁজছিলেন। তখন এক বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলেন আসলে তিনি কোন পাখি খুঁজছেন। সত্যজিৎ রায় জানালেন যে পাখির নাম ‘হিমালয়ান বার্ড’। বৃদ্ধ জানালেন ঐ নামে কোন পাখি নেই। তখন সত্যজিৎ রায় খুব বিরক্ত হয়ে সহকারীকে নির্দেশ দিলেন বুড়ো লোকটাকে সরিয়ে দিতে। পরে অবশ্য তিনি সহকারীর থেকে জেনে খুব লজ্জা পেয়েছিলেন যে ঐ বুড়োটা যেমন তেমন বুড়ো নয়, ভারতের বিখ্যাত পক্ষীবিশারদ সলিম আলি।

গোরক্ষিণী সভার সভাপতি গিরধারী লালের সাথে একবার স্বামী বিবেকানন্দের দেখা হলে স্বামীজী কৌতুহলী হয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন,” আপনাদের সভার উদ্দেশ্য কী?” তিনি জানালেন গো- মাতাদের রক্ষা করাই তাদের ধর্ম। তখন স্বামীজি বললেন,” আর মানুষ অনাহারে মরে গেলে তার মুখে অন্ন তুলে দেওয়া বুঝি আপনাদের ধর্ম নয়?”। তখন সভাপতি গিরধারী বললেন,”কিন্তু শাস্ত্রে আছে গাভী তো আমাদের মাতা।” তখন বিবেকানন্দ ধমকের সুরে বললেন,”গাভী যে আপনাদের মাতা তা বেশ বুঝতে পারছি। তা না হলে এমন সব ছেলে জন্মাবে কেন?”

“লা মিজারেবল” নামক বিখ্যাত উপন্যাসের স্রষ্টা ভিক্টর হুগো উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর একটি বড় কাগজে শুধুমাত্র একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে প্রকাশকের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রকাশকের চিঠির উত্তরে ঠিক সেরকমই এক বড় কাগজে বিস্ময়বোধক চিহ্ন এঁকে পাঠান। প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে লেখক জানতে চেয়েছিলেন তাঁর বইয়ের কাটতি কেমন? প্রকাশক জানিয়েছিলেন যে বিস্ময়করভাবে চলছে।

তাপস রায়ের “মনীষীদের মজার গল্প” বইটি শিক্ষকদের কাছে অত্যন্ত চমৎকার বই বলে বিবেচিত হবে। ক্লাসে সেন্স অব হিউমার তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের গ্রন্থ আকর গ্রন্থ হিসেবে কাজ করবে আশা রাখবে। আর সাধারণ পাঠকও এটা উপলব্ধি করবে যে, মনীষীরাও দোষে-গুণে সাধারণ মানুষের মত, তারা ফেরেশতা নন।

Related Posts

About The Author

Add Comment