মনের ঘা শুকাই কিভাবে?

আমাদের হাত পা কেটে গেলে বা ঘা হলে দেখবো আমাদের শরীর সেটা সাড়িয়ে ফেলতে কি চেষ্টাটাই না করে। কারো কারো খুব দ্রুত ক্ষত সেড়ে যায়। আবার কারো কারো অনেক সময় নেয়। কেউ কেউ অতি সাধারণ ক্ষতেও ভয়ানক সমস্যায় পতিত হয় বা মারাও যায়। আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বা এন্টিবডি তৈরির ক্ষমতার উপর আমাদের সুস্থ্যতা বা টিকে থাকা নির্ভর করে।2

আমাদের মনেও তো বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে কাটাছেঁড়া হয়, রক্তাক্ত হয়, ক্ষতবিক্ষত হয়, হতাশা, ভয়, ডিপ্রেশন, অনুশোচনা ইত্যাদি এসে ভর করে। শরীরের মতো মনের ক্ষত সাড়ানোর এন্টিবডিও কি তৈরি রাখতে হবে না! যাদের সেটা শক্তিশালী না তারা অল্পতেই হেরে যেতে পারে। শরীরের মাংসপেশী যেমন নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে শক্তিশালী ও নমনীয় করা যায় তেমনি আমাদের মনের পেশীও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে সবল করা যায়।

শরীর সুস্থ্য ও সবল রাখার জন্য খাবার লাগে, শরীরচর্চা ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন লাগে। মন সুস্থ্য ও সবল রাখার জন্য কি লাগে?

শরীর সুস্থ্য ও সবল রাখার জন্য খাবার লাগে, শরীরচর্চা ও শৃঙ্খলার প্রয়োজন লাগে। মন সুস্থ্য ও সবল রাখার জন্য কি লাগে? উন্নত চিন্তা, মহৎ মানুষদের সঙ্গ, ভালো কাজে অংশগ্রহণ, ক্রমাগত আত্মোন্নয়নের প্রয়োজন লাগে।

আপনার উন্নত চিন্তা বা স্বপ্ন না থাকলে আপনি ক্ষুদ্র স্বপ্ন বা চিন্তার দাস হবেন। আপনার জীবন থেকে অর্জন করতে পারবেন খুবই কম। মানুষ তার চিন্তার সমানই বড়। ভালো অবস্থান উপভোগ করা অবস্থায় বড় চিন্তা বা স্বপ্নের কথা ভুলে থাকা যাবে না। আবার দুঃসময়ে নিজের চিন্তা, স্বপ্ন বা আকাঙ্খার স্কেলটা কমিয়ে ফেলা যাবে না। সুন্দর সময় কিভাবে ম্যানেজ করতে হয় এটা যেমন শিখতে হয় তেমনি কঠিন সময় কিভাবে পার করতে হয় সেটা শেখা আরও বেশি দরকার।

আপনার উন্নত চিন্তা বা স্বপ্ন না থাকলে আপনি ক্ষুদ্র স্বপ্ন বা চিন্তার দাস হবেন।

আমরা আমাদের আশেপাশের মানুষদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হই। এজন্য আমরা কাদের সাথে চলাফেরা করি, কাদের সাথে আড্ডা মারি, কাদের চরিত্রের ছাপ আমাদের উপর পরে সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে আমাদের আয় সাধারণত আমাদের কাছের পাঁচজন ব্যক্তির আয়ের এভারেজের সমান। আমার আশেপাশে যেমন ইনকামের ব্যক্তি থাকবে তাদের ইনকামের এভারেজ বা গড়ের কাছাকাছিই থাকবে আমাদের ইনকাম। এ সূত্রটা জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমাদের জ্ঞান, আমাদের সুখ ও সফলতাও আমাদের খুব কাছের পাঁচজন ব্যক্তি বা বন্ধুর এভারেজের সমান হবে। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যও আমাদের আশেপাশের মানুষের উপর নির্ভর করে। আমরা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের অপেক্ষায় থাকি এমন বন্ধু নাকি এন্টিবডি স্বরূপ কিছু বন্ধু রাখছি সেটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। আপনার কি এমন বন্ধু আছে যার কাছে গেলে আপনার হতাশা কেটে যায়, দুঃখের পরিমাণ বেশ কমে যায়, সুখ ও আনন্দ ছড়িয়ে পরে শরীর ও মনে এবং নিজেকে সফল ও সার্থক মনে হয়? যদি না থাকে আশপাশ থেকে খুঁজে নিন। আর আশেপাশে না পেলে আধুনিক যুগের অনলাইন সুবিধা কি নেবেন না। বিশ্বের সেরা সেরা মানুষদের চিন্তা ও কথা বইয়ে, লেকচারে পাওয়া যায়। আমাদের শুধু একটু হাত বাড়ালেই হলো!

আপনার কি এমন বন্ধু আছে যার কাছে গেলে আপনার হতাশা কেটে যায়, দুঃখের পরিমাণ বেশ কমে যায়, সুখ ও আনন্দ ছড়িয়ে পরে শরীর ও মনে এবং নিজেকে সফল ও সার্থক মনে হয়?

আমরা যদি আমাদের চারপাশে আমাদের চেয়ে সেরা ও উত্তম মানুষদের রাখি তাহলে আমরা আমাদের সাধারণ লেভেলের চেয়ে বেশি অর্জন করতে পারবো। এজন্য ভালো হয় সফল ও সেরা মানুষদের আশেপাশে রাখা।

mental-physical

আর আমরা যে পেশা বা যে কাজ করে থাকি সে পেশা বা কাজের সেরা সেরা লোকদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তারা নিজেরাই অনেক লিখে গেছেন বা তাদের জীবনের উপর অন্যরা লিখেছেন। আমরা সেগুলো পড়ার মাধ্যমে সেইসব মানুষদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারি।

এজন্য আমাদের হিরো বা রুলমডেল এবং মেন্টর নির্ধারণ করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাড়ায়। আমরা কেমন হিরো নির্ধারণ করি এবং তাদের অনুসরণ কাজ করি আমাদের অর্জন তাদের মতোই বা কাছাকাছি হয়ে থাকে।

Sanzio_01_Plato_Aristotle

Plato-Aristotle

ভালো কাজে অংশগ্রহণ ও ক্রমাগত আত্মোন্নয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বেশিরভাগ দুঃখের মূলেই রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা। আমরা যখন শুধু আমাদের নিজেদেরকে নিয়েই ভাবি তখন আমরা দুঃখ বা হতাশায় পতিত হতে পারি। আমরা যখন অন্যকে নিয়ে ভাবি, অন্যকে সুখ দেওয়ার চেষ্টা করি তখন আমাদের দুঃখের পরিমাণ কমে যায় এবং সুখের পরিমাণ বেড়ে যায়। বেশিরভাগ মানুষই এটা না বুঝে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সমুদ্রে হাবুডুবু খায়। এবং নিজে বুঝেও উঠতে পারে না কিভাবে সে অজান্তেই সুখের বদলে অসন্তুষ্টি এবং দুঃখে পতিত হয়।

You stop growing when you stop learning.

আপনার শেখার প্রক্রিয়া যখন বন্ধ হয়ে যায় তখন আপনার বড় হওয়ার হওয়ার প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেরই কেবল শারীরিক বয়স বাড়ে কিন্তু মানসিক বা চিন্তা শক্তি শৈশব বা কুড়িতেই পরে থাকে। আধুনিক শিক্ষা কাঠামোতে আমরা আমাদের আত্মোন্নয়নের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাই না। এজন্য স্বশিক্ষা (সেল্ফ এডুকেশন) বা বিশেষায়িত শিক্ষা (পার্সোনালাইজড এডুকেশন) অনেক দরকারী। আমাদের সার্টিফিকেট অর্জন প্রক্রিয়া শেষ হলেও শিক্ষাগ্রহণের প্রক্রিয়া যেন শেষ হয়ে না যায়। তাহলে আমরা কিন্তু পিছিয়ে যাবো। বা নিজেকেই বারবার পুনরোৎপাদন করেই বেড়াবো। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই নিজেকে বিকশিত করার এবং ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গুণাবলী থাকে। কেউ কেউ সেই চারাগাছে পানি দেয় আবার কেউ কেউ মেরে ফেলে। আমরা কোন প্রক্রিয়াটা নেবো সেটা একান্তই আমাদের নিজেদের চয়েস।

আমাদের সার্টিফিকেট অর্জন প্রক্রিয়া শেষ হলেও শিক্ষাগ্রহণের প্রক্রিয়া যেন শেষ হয়ে না যায়।

আধুনিক সময়ে আমাদের সংকট বহুমুখী এজন্য আমাদের সেল্ফ ম্যানেজমেন্ট বা আত্ম ব্যবস্থাপনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আজ থেকে ৫০০ বছর বা তার আগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেই প্রায় দেখা যেতো একজন মানুষ জন্ম সূত্রেই কোন কোন পেশা লাভ করে। জমিদারের ছেলে জমিদার হচ্ছে, কৃষকের ছেলে জমি চাষ করছে, মুচির ছেলে মুচিগিরী করছে, কামারের ছেলে কামার হচ্ছে, তাতীর ছেলে তাতী হচ্ছে। এই যে চক্র তা থেকে বেশি পরিবর্তন করার সুযোগ ছিলো না। কিন্তু বিশ শতক ও একুশ শতকের দুনিয়া ভিন্ন রকমের। এখন এক পেশার পরিবারে জন্ম নিয়ে বিভিন্ন পেশাতে সুইচ করা যাচ্ছে।

আগে যেখানে কাজের ক্ষেত্র হাতে গুণা কয়েকটা সেক্টরে বিভক্ত ছিল এখন একজনের সামনে কম পক্ষে কয়েকশতো কাজের সুযোগ অপেক্ষা করছে। এটা যেমন কিছু বিশেষ সুবিধা নিয়ে এসেছে আবার অনেক অসুবিধাও নিয়ে এসেছে। এই বেশি দরজায় প্রবেশ করার সুযোগ আমাদের জন্য সেরা কোনটা হবে সেটা বাছাই করতে অসুবিধায় ফেলে দিচ্ছে। অনেকেই এমন কাজ করছে যেখানে তার পরিপূর্ণ বিকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে না। আবার নিজের মধ্যে যে সেরা জায়গাটা ছিলো সেটা এক্সপ্লোর করার সুযোগ পায় না। একজন মানুষ তার জীবনে সর্বোচ্চ অর্জন তখনই করতে পারে যখন সে খুঁজে বের করতে পারে তার ভেতরকার সেরা পটেনশিয়ালিটিটা এবং সেটার পরিপূর্ণ বিকাশ করার জন্য সুপরিকল্পিত উপায়ে কাজ করে যায়। আর নিজের সেরাটা বাদ দিয়ে অন্য জায়গায় কাজ করলে পরিশ্রম করে হয়তো মাঝারি মানের সফলতা আসতে পারে কিন্তু সেল্ফ এক্সচুয়ালাইজেশনটা আর হবে না।

শরীরের মাংসপেশী যেমন খাবার দাবার ও চর্চায় সবল হয় তেমনি আমাদের মানসিক শক্তিও চর্চায় এবং মানসিক খাবারে সবল হয়।

শরীরের মাংসপেশী যেমন খাবার দাবার ও চর্চায় সবল হয় তেমনি আমাদের মানসিক শক্তিও চর্চায় এবং মানসিক খাবারে সবল হয়। এখানে কিছু মানসিক খাবার দেয়ার চেষ্টা করলাম। আপনাদের কাজে লাগলে আমার সুখের পরিমান বাড়বে এবং মানসিক সবলতাও বাড়বে। কারণ অন্যের জীবনে পরিবর্তন এবং অগ্রগতি নিয়ে আসতে পারলে আমার সুখের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং আমার জীবনে উন্নতি চলে আসে।

happiness_workout-with-url

Related Posts

About The Author

Add Comment