‘মনের মানুষ’- এক মহাত্মার জীবন দর্শন

বুক রিভিউ: মনের মানুষ

লেখক: ওমর ফারুক কোমল

 

কুষ্টিয়া অঞ্চলের একটি কায়স্থ (হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি উপর্বণ বিশেষ) পরিবারে জন্ম নেয় লালু নামরে একটি ছেলে। শৈশব কালেই বাবাকে হারিয়ে মায়ের আঁচলে বড়ো হতে থাকে সে। প্রায় কিশোর বয়সেই করতে হয় বিয়ে। কাজে কর্মে কোনো মন নেই। গানকে সে অনেক ভালোবাসে। একদিন গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে একটি দলের সঙ্গে বহরমপুরে যাত্রা করে লালু। পথিমধ্যে বসন্ত রোগের কবলে পড়তে হয় তাকে। সঙ্গী-সাথীরা তাকে মৃত ঘোষণা করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দয়ে। তবে ভাগ্যের চরম লীলাখেলায় লালু প্রাণ ফিরে পায় এক মুসলমান মায়ের সেবায়। এমন সময় তার সাথে পরিচয় হয় সিরাজ সাঁই নামক এক সাধকরে সাথে। সুস্থ হয়ে যখন লালু তার আপন গৃহে ফিরে যায় তখন তাকে শুনতে হয় ধর্মচ্যুত হওয়ার অপবাদ। নিজের গর্ভধারিনী মাও যখন এই অপবাদে তাকে ছিটকে দিয়ে ঘরে ঠাই না দিলে রাগে অভিমানে লালু চিরদিনের জন্যে গৃহত্যাগ করে। গৃহত্যাগের পরে লালু এক জঙ্গলে নিজের আবাসস্থল তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজের অতীতের সবকিছু মাটি চাপা দিয়ে লালু থেকে লালন নামে তার নিজের জীবন শুরু করে।

এরকম একটি প্রেক্ষাপট দিয়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসটি রচনা করছেনে। উপন্যাসটিতে তিনি লালনের জীবনের মূলভাব ও আর্দশ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেনে। লালন সবসময় প্রচার বিমুখ থাকায় তার সঠিক জন্ম ইতিহাস কিংবা তার জীবদ্দশার তথ্যাবলি তেমন একটা পাওয়া যায় না। তবে তার বিভিন্ন গান যেমন “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে? লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে” কিংবা “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়?” অথবা “মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষের সনে” ইত্যাদি গানগুলোতে তার জীবনদর্শন অনেকটাই উপলব্ধি করা যায়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানের বিশেষ ভক্ত ছিলেন। মূলত তিনিই আধুনিক সমাজের সাথে লালনের গানের পরিচয় করিয়ে দেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে লালনের কখনও প্রত্যক্ষ আলাপ-পরিচয় হয়ছেে বলে কোনো প্রমাণ গবষেণায় পাওয়া যায়নি।

উপন্যাসের শেষে লেখক ‘লেখকের বক্তব্য’ নামক অংশে এই উপন্যাসটির ব্যাপারে কিছু গুরুত্বর্পূণ কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি অকপটেই বলছেনে এটি লালনের কোনো জীবনকাহিনী নয়। লোকশ্রুতি অনুযায়ী এবং কিছু লালন গবষেণামূলক বইয়ের উপর নির্ভর করে কাল্পনিক এবং বাস্তবিক কিছু চরিত্র নিয়ে তিনি তার এই উপন্যাসটি রচনা করেছেন। সেখানে তিনি লালন গবষেক আবুল আহসান চৌধুরী এবং সৈয়দ শহীদ নামক জৈনক ব্যক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেনে। পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাতে লেখক বইয়ের শেষে লালনের বেশ কিছু গানও সংযোজন করেন। শুধু তাই নয়, লালনের জীবনর্দশন এবং সমসাময়কি কাল সর্ম্পকে যারা জানতে আগ্রহী তাদের উদ্দেশ্যে লেখক অতি প্রয়োজনীয় কিছু বইয়ের নামও উল্লেখ করেন।

সবশেষে বলব, উপন্যাসটিতে লেখক খুব সহজভাবে লালনের জীবন-দর্শন ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। একজন লালনভক্ত হিসেবে আমি তাঁর সর্ম্পকে অনেক কিছুই এই বইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। বইটি আমাকে লালন ও তাঁর জীবনদর্শন সম্পর্কে আরও আগ্রহী করে তুলেছে। চাইলে আপনিও পড়ে ফেলতে পারেন এক মহাত্মার জীবনদর্শনের এই র্দপণ।

Related Posts

About The Author

Add Comment