মহাকাব্যের ট্রাজিক নায়ক বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুকে বুঝতে পারলে বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক চীপাগলিতে প্রবেশ করা যাবে, রাজনীতির অনেক ফাকফোকর নিয়ে ভালো বোঝ আসবে। বঙ্গবন্ধু যেমন অনেক বিশাল গুণের সমাহার আবার তার মধ্যে এমন কিছু দুর্বলতা ছিল যা তার ট্রাজিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু একদিকে আশার নাম আবার অন্যদিকে অপূর্ণতা, অতৃপ্তির নাম।তবে বঙ্গবন্ধু কখনোই অপ্রাসঙ্গিক ছিলেন না এবং তাকে অপ্রাসঙ্গিক করা অসম্ভব। বিশেষ করে আমাদের মত তরুণ প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু সবসময়ের অনুপ্রেরণার নাম।আমাদের চরম হতাশার মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর চরম সংগ্রামশীলতার মধ্য থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারি।

একটি ব্যক্তির সাথে কিভাবে একটি জাতির পুরো আবেগ, স্বপ্ন, জাগরণ, মুক্তি, ভবিষ্যত লেপ্টালেপ্টি করে থাকতে পারে বঙ্গবন্ধু তার সার্থক উদাহরণ। একটি জাতির জাতীয়তাবোধের জাগরণের শৈশব যখন ছিল তখন একটি ব্যক্তির শৈশব। তার যৌবনে জাতিটি যৌবনে পদার্পন করে। ব্যক্তিটি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হন তখন জাতিটি ও প্রাপ্তবয়সে পৌছে। এমন স্তরে দুপক্ষ পৌছে যায় যে পুরো জাতি তার স্বাধীনতার জন্য কাঙ্গাল হয়ে যায় এবং ব্যক্তিটি সেই স্বাধীনতার মহানায়ক হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু নামের অর্থ:

পাকিস্তান আমলে দেশের বরেণ্য নেতাদের ‘শেরেবাংলা’, ‘কায়েদে আজম’ বা ‘কায়েদে মিল্লাত’ অভিধায় ভূষিত করা হয়। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে যে সম্মাননার নামে ভূষিত করা হলো সে বঙ্গবন্ধু নামের জন্ম বাংলা ভাষায়। চিত্তরঞ্জন দাশকে দেশবন্ধু অভিধায় সম্মানিত করার নজির থাকলেও পদ্মা-যমুনা-মেঘনার দেশের নেতাকে সেই দেশের ভাষায় সম্মাননায় ভূষিত করার ব্যাপারটা একটা তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।

বাংলায় বঙ্গবন্ধু নামটি তাৎপর্যবহ। বাংলা ভাষাগত জাতীয়তার মাধ্যমে যে একটি জাতি একত্রিত হচ্ছে তার একটি প্রমাণ এবং এর কেন্দ্রীয় চরিত্রকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

বঙ্গবন্ধু, বেওয়ালফ্, আগামেমনন ও ওডিসি

মুজিবের সাথে বেওয়ালফ্ এর অনেক মিল আছে। অত বড় হিরো কত বড় প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করে দেশকে উদ্ধার করলও, জনগণের নায়ক হলো। আবার প্রবল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে দুর্বল সময়ে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারালো!

‘বেওয়ালফ’ হচ্ছে এংলো স্যাক্সন মহাকাব্য। এটা ইংরেজির আদিতম নিদর্শন। তবে এটা কে বা কারা লিখেছেন এটা জানা যায়নি। বেওয়ালফ এর মূল চরিত্র, প্রধান নায়ক মহাকাব্যের মহাকাব্যিক চরিত্র বেওয়ালফ্ নিজে। বেওয়ালফ্ হচ্ছেন এক মহান নায়ক।

এংলো সেক্সন বীর বেওয়ালফ্ তার প্রতিবেশী দেশ বর্তমান ডেনমার্ক এর রাজা রথগারকে উদ্ধার করতে যান। রথগারের রাজ্যে গ্রেনডাল নামে এক দানব রাতে হানা দিয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতো। এজন্য সে রাজ্যের মানুষ ও রাজা ছিল অসুখী। বেওয়ালফ্ গ্রেনডালকে খালি হাতে প্রতিহত করেন এবং গ্রেনডালের একটি একটি হাত বা কয়েকটি হাত ছিড়ে ফেলেন। গ্রেনডেল দানব প্রাণ নিয়ে পালিয়ে বাঁচে এবং গিয়ে তার আবাসস্থল পার্শ্ববর্তী জলায় আশ্রয় নেয়।

পরবর্তীতে গ্রেনডেলের মা আরেক ডাইনী ছেলের প্রতিশোধ নিতে আসে এবং জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে, রাজার প্রধান উপদেষ্টাকে হত্যা করে। বেওয়ালফের নেতৃত্বে প্রতরোধ গড়ে তুলে এবং ডাইনীর পেছনে দাওয়া করে তার আবাসস্থল জলাবদ্ধ জায়গায় চলে আসে। সেখানে বেওয়ালফ একা প্রবেশ করে এবং ডাইনীকে মেরে আসে। আসার পথে তার ছেলে আহত গ্রেনডেলের দেখা পায়। সে গ্রেনডেলের মাথা কেটে নিয়ে আসে। এটা রথগারের রাজ্যে খুশির বান নিয়ে আসে। রাজা রথগার একবার বেওয়ালফের বাবাকে কোন এক বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। বেওয়ালফ্ তার বাবার বন্ধুর রাজ্যকে উদ্ধার করে দিয়ে যায়। বৃদ্ধ রাজা রথগার বেওয়ালফকে রাজা ঘোষণা করে।

রথগারের মৃত্যুর পর প্রায় ৫০ বছর বীর বেওয়ালফ দেশের মানুষকে শান্তি ও সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়। ৫০ বছর শান্তিপূর্ণ শাসনের পর নতুন করে আরেক দানব হানা দেয়। বেওয়ালফের কোন বীর যোদ্ধা তার সাথে পেরে উঠতে পারছিলনা। অনেক দেশবাসী এবং বীরযোদ্ধা ঐ দানবের সামনে নিহত হয়। শেষে বীর বেওয়ালফ্ নিজেই দানবের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। বন্ধু বান্ধব, পরিবার, উপদেষ্টা এবং দেশবাসীর অনুরোধ উপেক্ষা করে যুদ্ধে নামে বেওয়ালফ্। বেওয়ালফের মানসিক শক্তি আগের মতই ছিল কিন্তু সে যে তার সেরা সময় ৫০ বছর আগেই পেরিয়ে এসেছিলো। বীর বেওয়ালফ্ এক মরনঘাতী যুদ্ধে ঐ দানবকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয় কিন্তু এটা করতে গিয়ে নিজেও দানবের হামলায় মারাত্মক আহত হয় এবং মৃত্যু হয়। নিজের জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করলো বুড়ো বীর বেওয়ালফ্।

বেওয়ালফ্ এর এই ট্রাজিক পরিণতি দেশবাসীর জন্য এতই দু:খের ছিল যে তারা কয়েকবছর টানা বীর বেওয়ালফের জন্য শোক প্রকাশ করে যাচ্ছিল এবং নারীরা বিলাপ করে যচ্ছিল। বেওয়ালফের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য সমুদ্র পাড়ের কাছাকাছি সবচেয়ে বড়, লম্বা ও উঁচু সমাধিসৌধ বানানো হয় যেটা অনেক দূর থেকেও দেখা যেতো। দেশের মানুষের কাছে সে স্মৃতি আরও দীর্ঘ ও লম্বা ছিল।

আমরা মুজিবকে যদি দেখি তাহলে দেখবো ৪৬ বছর বয়সে ৬ দফা দাবির ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানী সামরিক দানবদের হাত কেঁটে নিয়েছিল। এবং ৬৯ ও ৭১ দানবদের মা (আইয়ুব খান) ও ছেলেকে (ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও সামরিক জান্তা) নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল এবং একটি স্বাধীন দেশের বীরপুরুষ, মহান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল।

তারপর ক্ষমতায় থেকে মানুষের ভালোবাসা, ঘৃণা, আলোচনা-সমালোচনার বৃন্ত পেড়িয়ে আগস্টের কালো রাতে ট্রাজিক পতন। সেই লোমহর্ষক রাতে পরিবারের দুই সদস্য বাদে আর সবাই নিহত হয়। এ সব কিছুই মুজিবকে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের প্রধান চরিত্র, ট্রাজিক হিরো বানিয়ে দিয়েছে।

আবার আরেক দিক দিয়ে সে গ্রীক রাজা আগামেমননের মতো। পুরো গ্রীককে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব লাভ করে আগামেমনন্। শক্ত প্রতিপক্ষ ট্রয়কে ট্রয় যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয়ী বীর হিসেবে দেশে ফিরে আগামেমনন্।

কিন্ত দেশে ফেরার পর আগামেমনন অত্যন্ত নিরাপদ জায়গায়, অত্যন্ত কাছের মানুষের হাতে ট্রাজিক মৃত্যুবরণ করেন। গ্রীকবাসীকে এত বড় অর্জন এনে দেয়ার পরও তার এই ট্রাজিক পরিণতি ছুঁয়ে যাবেই।

পাকিস্তানের সাথে মুজিবের ২৪ বছরের সংগ্রামশীল জীবনটা অনেকটা গ্রীক বীর ওডেসিয়াসের মত। হোমারের মহাকাব্য ওডেসিতে আমরা এই গ্রীক বীরের সংগ্রামী সমুদ্র ভ্রমণের বর্ণনা পাই। উত্তাল সমুদ্রে প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করে, সব সহযোগীদেরকে হারিয়ে নিজ দেশে এসেছিলেন ২০ বছর পর। এজন্য কারও সংগ্রামশীল জীবন বুঝাতে পাশ্চাত্যে ‘ওডেসিয়ান জার্নি’ phrase টি ব্যবহার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর নাতিদীর্ঘ জীবনকে আমরা অধ্যয়ন করলে এই শব্দযুগলটি ব্যবহার করতেই হবে। এজন্য মুজিবকে বহুল প্রচলিত গ্রীক ট্রাজেডির নায়কের সাথে যে তুলনা করা হয় তার পেছনে যথেষ্ঠ যুক্তি আছে।

বঙ্গবন্ধুর মাঝে মহাকাব্যিক নায়কের বৈশিষ্ট্য বিরাজমান। মহাকাব্যের মহানায়কের মত তার মধ্যে মহান গুণের সমাহার যেমন ঘটেছে তেমনি মহানায়কের কিছু ট্রাজিক ফ্লস্ও আছে। যেসব মহাকাব্যিক গুণাবলী তাকে বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের নায়ক বানিয়েছিল আবার যেকারণে তার করুণ ও মহাকাব্যিক পতন ঘটিয়েছিল তা জানার চেষ্টা করা যাক।

তার আগে সাহিত্যের সংজ্ঞায় যাই। চলুন মহাকাব্যের নায়কের কি কি গুণাবলী দরকার তার বর্ণনা পড়ি এম এইচ আব্রামস এর গ্লোসারি অব লিটারেরি টার্মস্ এ:

প্রথমত, একজন নায়ক হচ্ছেন জাগতিক ও মহাজাগতিক ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র যার উপরে একটা জাতি এমনকি মানবজাতির ভাগ্য নির্ভর করে। যেমন ভার্জিলের ঈনিডে মহাকাব্যের নায়ক ঈনিস এর উপর পুরো ট্রোজান জাতির ভাগ্য নির্ভর করেছিল। ইলিয়াদে একিলিস হচ্ছেন গ্রীক বীর যে ট্রজান নায়ক হেক্টরবদ করে গ্রীক বিজয় তরাণ্বিত করেন। প্যারাডাইস লস্টে এডাম ও ইভের উপর পুরো মানবজাতির ভবিষ্যত নির্ভর করে। মহাভারতের দুজন মহাকাব্যিক নায়ক হলেন অর্জুন এবং কর্ন। যেখানে অর্জুন হচ্ছেন বিজয়ী বীর। সেখানে মহাবীর কর্ন মানব এবং দেবতাদের ষড়যন্ত্র ও পক্ষপাতিত্বে ট্রাজিক পরিণতি লাভ করেন।

দ্বিতীয়ত, মহাকাব্যের সেটিং বিশাল এবং বিস্তৃত এবং স্কোপও বিশাল

তৃতীয়ত, নায়ক কিছু সুপার হিউম্যানের মত কাজ করেন যা সাধারণ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এম এইচ আব্রামস এর ইংরেজিটা তুলে ধরলাম:

 “The action involves superhuman deeds in battle, such as Achilles’ feats in the Trojan war, or a long, arduous, and dangerous journey intrepidly accomplished, such as the wanderings of Odysseus on his way back to his homeland, despite the opposition of some gods.’’

চতুর্থত, মহাকাব্যের নায়কের ভাগ্য শুধু নিজের হাতেই থাকেনা। ঈশ্বর বা সুপারন্যাচারাল কোন শক্তি পক্ষ নিয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু এখন কত প্রভাববিস্তারী চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন তার একটা নিদর্শন যদি আমরা নেই সেটা হলো বিশ্বের আর কোন নেতার নামে এত প্রতিষ্ঠান, এত সংগঠন গড়ে উঠেনি। বেওয়ালফ্ এর মৃত্যুতে যেমন সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে উচু সমাধি তৈরি করেছিল তার দেশবাসী তেমনি মুজিব ভক্তরা তাকে নিয়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, সংগঠন গড়ে তুলছে! এটাকে আপনারা চাটুকার শ্রেণীর অতি উল্লম্ফন বলতে পারেন বা তার প্রভাবের বিস্তার বলতে পারেন, সেটা হোক পজিটিভ বা নেগেটিভ।

আর মহাকাব্যের নায়কের চারটি বৈশিষ্ট্যের উপর আলো ফেললে শেখ মুজিবুর রহমানকে একজন মহাকাব্যের ট্রাজিক নায়ক হিসেবে অনায়াসে স্বীকৃতি দিতে পারেন। মহাকাব্যটি হচ্ছে বাংলাদেশ, মুজিব হচ্ছেন ট্রাজিক নায়ক।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)

মেইল: [email protected]

Related Posts

About The Author

Add Comment