মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময়-অসময়’

ইতিহাস অনেক সময় অস্বস্তির নাম। কারণ ইতিহাস শুধু সুখকর ও নিজের পক্ষের সুন্দর খবরই পরিবেশন করে না। অতীতের অনেক তিক্ত কথা অবলীলায় বলে দেওয়াই ইতিহাসের কাজ। নিজের বিপক্ষে, নিজেদের বিপক্ষের কটু কথাগুলো জানিয়ে দেওয়াও ইতিহাসের কাজ। মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময়-অসময়’ কেতাবটি পড়লে অস্বস্তির ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যাবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে অস্বস্তিতে পড়বে যখন দেখবে কীভাবে আওয়ামী লীগের কারণেই দেশে আরেকটি শক্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জেগে উঠা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। আবার বিএনপি কিভাবে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে মারতে বর্তমান করুণ অবস্থায় এসে পরেছে সেটা দেখে বিএনপি অস্বস্তিতে পরবে।

নিজের বিপক্ষে, নিজেদের বিপক্ষের কটু কথাগুলো জানিয়ে দেওয়াও ইতিহাসের কাজ।

সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়ে লেখা অনেক চ্যালেঞ্জের। বাংলাদেশে বেশিরভাগ লেখকই সাম্প্রতিক ইতিহাসের উপর লিখতে গিয়ে স্রেফ পত্রিকার কলামই লিখেন। সময়ের উত্তাপ সেখানে হয়তো থাকে কিন্তু গভীর ইনসাইট দেওয়া হয়ে উঠে না। মহিউদ্দিন আহমদ এই আকালের বাজারে একটি বড় আশার নাম। ইতিহাস কিভাবে বলতে হয়, ইতিহাসের দিকে কিভাবে তাকাতে হয় তিনি তার বইগুলোতে বলার চেষ্টা করে আসছেন। মহিউদ্দিন আহমদের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করার অনেক জায়গা থাকলেও তাকে সাধুবাদ জানাতে কার্পণ্য করা ঠিক হবে না। কারণ পক্ষ-বিপক্ষ সীমানার বাইরে দাড়িয়ে তিনি তার সময়কে ধারণ করতে চেয়েছেন। তিনি কতটুকু সফল হয়েছেন সেটাও ইতিহাস নির্ধারণ করবে।

মহিউদ্দিন আহমদের ‘বিএনপি সময় অসময়’ বইটিতে বিএনপির ভ্রুণাবস্থা থেকে শুরু করে একেবারে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী ও ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী বিএনপিকে নিয়ে কথাবার্তা এসেছে। মহিউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ধারা ও উপধারার মধ্যে পার্থক্য সূচিত হচ্ছিল এবং স্বাধীনতার পর সে পার্থক্য বড় আকারে দেখা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় জাসদের উত্থান-পতন হয় এবং দেশে বিএনপি নামে আরেকটি বড় রাজনৈতিক প্রপঞ্চের বিকাশ ঘটে।

বিএনপি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে তার মধ্যে একটি হচ্ছে ক্ষমতার কেন্দ্রে ও সামরিক বাহিনীর সহায়তায় বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলেও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশে পাকাপোক্ত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজনীতির মাঠে তেমন কোন পূর্বাভিজ্ঞতা না থাকলেও গৃহবধু থেকে রাজনীতির মাঠে বেশ কারিশমা দেখিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।

রাজনীতির মাঠে ‘আপোষহীন’ খুবই অর্থহীন শব্দ।

তবে খালেদা জিয়া এরশাদ বিরোধি আন্দোলনে যেসব অস্ত্র ও কর্মসূচী ব্যবহার করেছেন সেটা আজও কন্টিনিও করার কারণে রাজনীতির মাঠে হাল পাচ্ছে না বলে মনে হলো। রাজনীতির মাঠে ‘আপোষহীন’ খুবই অর্থহীন শব্দ। একজন ভালো শাসক বা নেতাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আচরণ করতে হয়, অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয় আর নিজেকে সময়ের সেরা অস্ত্র ও আইডিয়া দিয়ে আপডেট করতে হয়। বইটি পড়ে মনে হলো বেগম খালেদা জিয়া একই অস্ত্র, একই রাজনৈতিক ভাষা, একই রাজনৈতিক কর্মসূচী এরশাদ বিরোধি আন্দোলন থেকে শুরু করে এখনো ব্যবহার করে আসছেন।

ইতিহাস খালেদাকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ দিলেও প্রথম টার্ম ও দ্বিতীয় টার্মে ফেইল করেছেন।

ক্ষমতায় থাকাকালে বেগম খালেদা জিয়া ও তার দলের অবস্থা ভিন্ন থাকে। গণতান্ত্রিকভাবে প্রথমবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হয়ে অনেককিছু করতে পারলেও ক্ষমতায় পাকাপোক্তভাবে থাকার খুটি অনুসন্ধান ছাড়া বড় কিছু করতে পারেননি। ইতিহাস খালেদাকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার সুযোগ দিলেও প্রথম টার্ম ও দ্বিতীয় টার্মে ফেইল করেছেন। দলীয় চেলা-চামুণ্ডাদের পকেটভারি করা সহ জিয়া পরিবারের বিপুল অর্থ-বিত্ত সমাগম ঘটলেও রাজনীতিতে ভালো কিছু সংস্কৃতির প্রচলন করতে পারেননি।

১৯৯১ এ ক্ষমতায় আসার পর মাগুরা উপনির্বাচন দিয়ে শুরু করে নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে জেতার যে প্রচেষ্টা শুরু করেন সেটা চালিয়ে যান ২০০৬ সালেও। কিন্তু ইতিহাস খুব নির্মম! ক্ষমতায় থাকাকালে নিজেরা যেভাবে ক্ষমতায় আকড়ে থাকার চেষ্টা করেছিলেন, নামেমাত্র নির্বাচন, নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে জেতার চেষ্টা করেছিলেন তাদের প্রতিপক্ষ আজ তাদের বিপক্ষে একই অস্ত্র ব্যবহার করছে।

১৯৯৬ এর নির্বাচনে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ঠেকানোর জিহাদে নেমেছিল ক্ষমতাসীন বিএনপি আজ সেই নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতেই প্রায় অর্ধযুগ ধরে আওয়াজ তুলছে বিএনপি।

‘বিএনপি ভালো না খারাপ, সম্ভাবনাময় না একেবারে শেষ হয়ে গেছে, এই তর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দ্বিদলীয় রাজনীতিতে নাগরিকদের জন্য ‘স্পেস’ থাকে।

ইতিহাসের বিভিন্ন সুন্দর, তিক্ত অভিজ্ঞতার পালাক্রমে বিএনপি এখন কঠিন সময়ে। এ অবস্থায় বিএনপি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদের সিদ্ধান্ত লক্ষণীয়। তিনি বলেন: ‘বিএনপি ভালো না খারাপ, সম্ভাবনাময় না একেবারে শেষ হয়ে গেছে, এই তর্কের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দ্বিদলীয় রাজনীতিতে নাগরিকদের জন্য ‘স্পেস’ থাকে। একটি দল যদি নির্বাসনে যায়, অন্যটির তখন যা খুশি করার প্রবণতা পেয়ে বসে। তৈরি হয় একচেটিয়া দলতন্ত্র। বিএনপির বর্তমান অবস্থা এরকম একটা অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে। আখেরে এটা কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না। বিএনপি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তার ওপর দেশের আগামী দিনের রাজনীতি অনেকাংশে নির্ভর করছে।’ (পৃ ৩১৫, বিএনপি সময়-অসময়, মহিউদ্দিন আহমদ)      

Related Posts

About The Author

Add Comment