মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি দ্বৈতাদর্শঃ কপটতার আদর্শ নিদর্শন

মাসুদ রানা

সমাজ-পরিচালিত মাদ্রাসাসমূহের বিদ্যার্থীদের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। কারণ, তাঁরা প্রধানতঃ সমাজের বঞ্চিত শ্রেণী থেকে আসা। তবে, আমি মাদ্রাসা শিক্ষার সমর্থক নই। আমি তাঁদের বঞ্চিতবস্থার নিরসন চাই বলেই মাদ্রাসা শিক্ষা সমর্থন করি না। আমি বঞ্চিতদের জন্যে বিশ্বমানের আধুনিক শিক্ষা চাই।

আর, যাঁরা নিজের সন্তানদেরকে দেশের ইংরেজি-মাধ্যমের ব্যয়বহুল স্কুলে পাঠিয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত জীবনের বিপুল সম্ভাবনা নিশ্চিত করে বিত্তহীন শিশুদের জন্যে মাদ্রাসা শিক্ষাকে মেনে নিয়ে সেই শিক্ষার প্রশংসা করেন, আমি তাঁদেরকে কপট মনে করি। দুর্ভাগ্যবশতঃ বঙ্গীয় সমাজে কপটতাই প্রধানতঃ প্রশংসিত।

আমি আগেও বলেছি এবং এখনও বলছি, স্বাধীন বাংলাদেশের উচিত ছিলো ১৯৭২ সাল থেকেই শিক্ষাকে ১ নং অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয়করণ করে সমগ্র জাতির সকল শিশুকে ৫ থেকে অন্ততঃ ১৬ বছর পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষার আওতায় নিয়ে এসে একটি অভিন্ন ন্যাশনাল কারিকুলাম বা জাতীয় শিক্ষাক্রমের অধীনে শিক্ষিত করে তোলা। সেদিন তা শুরু করলে, আজ আমরা তিন রকমের শিক্ষায় শিক্ষিত, তিন প্রকারের মানুষের ত্রিবিধ আত্মপরিচয়ের সংঘর্ষে বিভক্ত ও সঙ্কটগ্রস্ত জাতি দেখতাম না।

আমি মাদ্রাসা শিক্ষার বিরোধী হলেও, তাঁদের বিপরীতে দাঁড়াই যাঁরা মাদ্রাসার বিদ্যার্থীদেরকে ঘৃণার চোখে দেখেন কিংবা তুচ্ছ জ্ঞান করেন। কারণ, মাদ্রাসার বিদ্যার্থীগণও অন্যান্য বিদ্যার্থীর মতো শিশু ও কিশোর; অন্য কারও চেয়ে এক বিন্দু কম নয় তাঁদের নাগরিক অধিকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত এবং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে বিদ্বেষিত ও ঘৃণিত। এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা দুর্ভাগ্যবশতঃ পাল্টা বিদ্বেষ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। বিদ্বেষ ও ঘৃণার ধর্মই তাই।

যাঁরা  বঞ্চিতের মর্মবেদনা, বোধ, আবেগ, প্রেষণা, মনোভঙ্গি ও আচরণ দার্শনিক ও তাত্ত্বিকভাবে বুঝেন এবং এই বঞ্চনার বিহিত ভাবনায় পরিচালিত, তাঁদের উচিত হবে বঞ্চিত শ্রেণীর মধ্যে জগত ও জীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ভাবনা গড়ে তোলা। অধিকার বঞ্চিত মানুষের পশ্চাৎ অবস্থানের প্রতি আমাদের সহানুভূতি থাকতে পারে কিন্তু এই অবস্থানকে সমর্থন করা চলে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে মাদ্রাসা বিদ্যার্থীদের ওপর রাষ্ট্র ও সরকারী দলের যে নির্যাতন হয়েছে, আমি তার তীব্র প্রতিবাদ করি এবং বিচার চাই। কিন্তু তার সাথে আমি সমান তীব্রতায় প্রতিবাদ করি মাদ্রাসা বিদ্যার্থীদের দ্বারা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর অমূল্য স্মৃতি ধ্বংস হওয়ার ঘটনায়।

আমি জানি, মাদ্রাসা বিদ্যার্থীগণ শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত বিষয়ে আলোকিত নন। আলোকিত নন শুধু মাদ্রাসা বিদ্যার্থীগণ নন, বস্তুতঃ সমগ্র সমাজের অধিকাংশ মানুষই আলোর বাইরে রয়েছেন। তাই বলে কি ঐ মানুষেরা শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের নিকেতন নিদর্শন ধ্বংস করেন?

বস্তুতঃ মাদ্রাসায় যে ভুল শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তাতে আলোর বিপরীতে অন্ধকার বাড়ছে। কারণ, সেখানে মানুষের শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীতের মতো মানবিক বিদ্যাসমূহ থেকে শিশু-কিশোর-তরুণ বিদ্যার্থীদের বঞ্চিতই করা হচ্ছে না, এ-সব বিদ্যার প্রতি ঘৃণা শিক্ষা দিয়ে তাঁদের মনকে বিষময় করে তোলা হচ্ছে। আমরা এই সত্যটি অস্বীকার করতে পারি না।

এই বিষময় শিক্ষার ফলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা আক্রমণের শিকার হয়, বিমানবন্দরের প্রবেশপথে বাউল ভাষ্কর্য্য আক্রান্ত হয়, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর নিদর্শন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আমি মাদ্রাসা বিদ্যার্থীদের প্রতি সর্বতোভাবে সহানুভূতিশীল হওয়ার পরও তাঁদের এই অপকর্মের প্রতিবাদ করবো।

নিঃসন্দেহে আমি মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে দ্বৈতাদর্শবাদীদের ভুল চিন্তার বিনাশ চাই। কারণ, তাঁদের দ্বৈতাদর্শিক চিন্তা জাতির সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথক ক্রমশঃ আলো-আধাঁরিতে অগম্য করে তুলেছে। আমি তাঁদের মধ্যে শুভ ও সঠিক চিন্তা অভ্যুদয় চাই।

পরিশেষে, আমি সমগ্র জাতির সকল শিশুকে একটি অভিন্ন ন্যাশনাল কারিকুলাম অধীনে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধীনে জীবনমুখী ও সুখী দেখতে চাই।

রোববার ১৭ জানুয়ারী ২০১৬

লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

Related Posts

About The Author

Add Comment