মানুষের অধিকারের আলাপ

থমাস পেইনের লেখা ‘মানুষের অধিকার’ ও এডমন্ড বার্কের লেখা ‘ফরাসী বিপ্লবের প্রতিফলন’ বই দুইটির তুলনামূলক পর্যালোচনা করার ইচ্ছা অনেক দিনের। কিন্তু সময়ই হয়না আর দুইটি বই-ই প্রায় তিনশ পৃষ্টা করে, মোট ছয়শ পৃষ্টার কাছাকাছি।
সহজ বাংলায় সংক্ষিপ্ত একটা রিভিউ লেখার চেষ্টা করছি। এত বড় গ্রন্থের রিভিউ করা অত্যন্ত দুরুহ কাজ, সত্যিকার অর্থে আমি যোগ্যতাও রাখিনা, তারপরেও চেষ্টা করতে দোষ কোথায়! আশাকরি আপনাদের আলোচনা, সমালোচনা ও পরামর্শ লেখাটিকে আরো বস্তুনিষ্ট ও সমৃদ্ধ করবে।
গার্ডিয়ান পত্রিকায় স্থান পাওয়া সর্বকালের ২০টি প্রভাবশালী গ্রন্থের অন্যতম ‘মানুষের অধিকার’। গ্রন্থটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম রূপকার। অর্থাৎ কিছু বিষয় যা আগে কল্পনাই করা যেতনা, এখন সেগুলো বাস্তব, যেমন প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি ধারণাগুলো। ‘মানুষের অধিকার’ আমার দেয়া বাংলা নাম। এর মূল ইংরেজি নাম, “The Rights of Man”। মজার ব্যাপার হল এটি একটি সমালোচনা গ্রন্থ; একটি লেখার বিপরীতে লেখা। আর প্রথম লেখাটি হল এডমন্ড বার্কের “Reflections on the Revolution in France”। গ্রন্থটির অনূদিত নাম ‘ফরাসী বিপ্লবের প্রতিফলন’।
এখন আসুন একটু প্রেক্ষাপটে যাই। প্রায় ২২৫ বছর পেছনে ফিরে যাই ও নতুন করে দেখি বর্তমান সময়কে।
আপনারা অনেকেই হয়ত জানেন ফরাসী বিপ্লব সংঘঠিত হয় ১৭৮৯ সালে এবং পরবর্তীতে ১৭৯৯ সাল পর্যন্ত চলে। টানা ১০ বছর। এক কথায় ফরাসী বিপ্লব হচ্ছে দীর্ঘদিনের রাজতান্ত্রিক অপশাসনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের প্রজাসাধারণের সর্বাত্মক বিপ্লব, দেয়ালে পিঠ ঠেকলে যা হয়। ফলশ্রুতিতে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র ভেঙ্গে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ দেশের মালিক রাজা-বাদশা নয়, আম জনতা। কিন্তু এই বিপ্লবের আড়ালেও আরেকটি যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধটি ঠিক মাঠে না হলেও, মাথায় হয়েছিল। তত্কালীন বুদ্ধিজীবী সমাজের মধ্যে: খোদ বিপ্লবের পক্ষে ও বিপক্ষে।
বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নেন থমাস পেইন ও তিনি লিখেন বিখ্যাত ‘মানুষের অধিকার’ (Rights of Man) বইটি ও বিপক্ষে দাড়ান এডমন্ড বার্ক তার লেখা ‘ফরাসী বিপ্লবের প্রতিফলন’ (Reflections on the Revolution in France) বইটি নিয়ে। ‘মানুষের অধিকার’ গ্রন্থটি ‘ফরাসী বিপ্লবের প্রতিফলন’ এর কড়া সমালোচনা করে। যার কারণে অনেকে বইটিকে একটি সমালোচনাগ্রন্থ মনে করে। কিন্তু ফরাসী বিপ্লবের প্রভাবে পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র গঠনের আলোচনা বইটির মৌলিকিকত্ব এনে দেয়।
থমাস পেইন ছিলেন একজন ব্রিটিশ-আমেরিকান রাজনৈতিক দার্শনিক ও বিপ্লবী। ১৭৭৪ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের সহায়তায় থমাস পেইন ব্রিটেন থেকে পালিয়ে আমেরিকায় পাড়ি জমায়, আমেরিকার বিপ্লবের ঠিক শুরুর সময় তখন। সেই সময় থমাস পাইন দুইটি প্রভাবশালী পুস্তিকা লিখে ফেলেন, ‘কমন সেন্স’ (১৭৭৬) ও ‘ক্রাইসিস’ (১৭৭৬-৮৩), যেগুলো বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। এবং ১৭৭৬ সালে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ সম্রাজ্য থেকে স্বাধীন হয়। সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জ়ন এডামস যথার্থই বলেন থমাস পেইনের লেখনি ছাড়া জৰ্জ ওয়াশিংটন আমেরিকাকে কোনদিন স্বাধীন করতে পারতেন না। আদতে তিনি ব্রিটিশ হয়েও বৃটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। কারণ উদারবাদী পেইন মনে করতেন আমেরিকার স্বাধিনতা আমেরিকার জনগনের জন্মগত অধিকার। তিনি এও বিশ্বাস করতেন মানবাধিকার শব্দটি আসলে বহুজাতিক। অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্র ভেদে মানবাধিকার সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য। হোক ব্রিটেন কিংবা এশিয়া, আমেরিকা,আফ্রিকা।
দেখলেন ত ফরাসী বিপ্লব আলোচনা করতে গিয়ে কিরকম আমেরিকার বিপ্লবে চলে গিয়েছি। সে অনেক ঘটনা। অন্য আরেকদিন নিশ্চয় আলোচনা করব। এবার চলুন দেখি ফরাসী বিপ্লবের সাথে লেখক পেইন কিভাবে জড়িত। গোড়া থেকেই পেইন ফরাসী বিপ্লবের একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। এবং তার লেখা ‘মানুষের অধিকার’ বইটি অষ্টদশ শতাব্দীর ফরাসী বিপ্লবের বৈধতা দেয় এবং এই নবজাগরনকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরতে সহায়তা করে।
এডমন্ড বার্কের কথা কি আমরা ভুলে গেলাম? আইরিশ রাষ্ট্রনায়ক এডমন্ড বার্ক ছিলেন একজন রাজনৈতিক থিওরিষ্ট। তিনি বহু বছর লন্ডনে হাউজ অব কমন্সের সদস্য ছিলেন। ফরাসী বিপ্লবের বিরোধিতার জন্য তিনি বহুল সমালোচিত হলেও বিংশ শতাব্দীর গোড়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক দর্শনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা বলে বিশ্বাস করা হয়। ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টি, টরি পার্টি অথবা আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি (জর্জ বুশ বা ডোনাল্ড ট্রাম্প) ইত্যাদি কনজারভেটিভ রাজনৈতিক দর্শনের জনক হচ্ছেন এই এডমন্ড বার্ক।
বার্ক এনলাইটেনমেন্টকে বা আলোকিত সমাজকে প্রচন্ড ভয় পেতেন তাই ঘৃণাও করতেন। তার মূলবক্তব্য সরলীকরণ করলে দাড়ায়–সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও জ্ঞানচর্চার প্রবণতা বিপজ্জনক। এতে শাসক সমাজের শোষণকার্য ঝুকির মুখে পরে যেতে পারে। তবে বার্কের জন্য কি আর গণমানুষের নবজাগরণ থেমে থাকতে পারে!? রুশো ও ভল্টেয়ারের কল্যাণে অতদিনে বুদ্ধিভিত্তিক আন্দোলন সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীর ইউরোপে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এনলাইটেনমেন্টের মূলবক্তব্য হচ্ছে ঈশ্বর, প্রকৃতি, মানুষকে ও সমাজকে যুক্তিতর্কের আলোকে মূল্যায়ন করে সবধরনের অহেতুক গোড়ামির অবসান ঘটানো। এই আলোকিত চিন্তাধারার প্রভাবে আজকের শতাব্দীর শিল্পকলা, দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীত–এর সকল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। এবং যুক্তিবাদকে বলা হল জ্ঞান, মুক্তি ও সুখ।
যাই হোক এডমন্ড বার্কও কিন্তু একেবারেই ভুল ছিলেন না। ফরাসী বিপ্লব সম্মন্ধে বার্কের বিশ্লেষণ হল প্রত্যেক বিপ্লবের মধ্যেই বিপ্লব-বিরোধী উপাদান রয়েছে; যেমন সহিংসতা ও নৈরাজ্যর আশংখা অথবা নতুন শাসকদের দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পরার ঝুকি, তাই বিপ্লব বা কোনো রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সাধারণত জনসাধারণের খুব একটা মঙ্গল বয়ে আনেনা। এমনকি তিনি ফরাসী বিপ্লবের পরে একনায়কতন্ত্র উত্থানের ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। পরবর্তিতে অবশ্য একনায়ক নেপোলিয়ান বোনাপার্তের উত্থান তার সেই সত্যতা প্রমান করেছিল। তাতে বোধহয় কিছু আসে যায় না। কারণ ফরাসী বিপ্লবের প্রভাবে যা হবার ততদিনে হয়েই গেছে। নতুন বিশ্বব্যবস্থা, জনগনের বিশ্ব, ‘সবার উপর মানুষ সত্য’।
পেইনের ‘মানুষের অধিকার’ বইটি দুই দফা প্রকাশিত হয়, ১৭৯১ ও ১৭৯২ সালে। নব্বই হাজার শব্দের বইটি প্রকাশ হওয়া মাত্রই এক মিলিয়ন অনুলিপি বিক্রি হয়ে যায়। বাজারে বইয়ের প্রকট সঙ্কট দেখা দিল। বইয়ের পাঠকরা ছিলেন মূলত সংস্কারবাদী, ভিন্নমতাবলম্বী, গণতন্ত্রবাদী, শ্রমশিল্পী, কল-কারখানার শ্রকিক-মজুরসহ আম জনতা।
“সরকার যখন জনগণের সহজাত অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় সেক্ষেত্রে জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিপ্লব অনুমোদনযোগ্য” এটাই ‘রাইটস অব ম্যান’ বইয়ের মূল বক্তব্য।
‘মানুষের অধিকার’ স্পষ্টতই ঘোষণা করে ‘গণমানুষ ও রাজার স্বার্থ এক ও অভিন্ন হতে হবে’। ফরাসী বিপ্লবের ব্যাখ্যা আসে এভাবে, ‘বিপ্লবটি হয়েছিল মূলত তত্কালীন ফরাসী রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারী চরিত্রের বিরুদ্ধে, ব্যক্তি রাজার বিরুদ্ধে নয়’।
গ্রন্থটির ধারণাগুলো আজকে পুরোপুরি বাস্তব মনে হলেও, তত্কালীন সময়ে ছিল পুরোপুরি কাল্পনিক।
যেমন, মানুষের মানবিক অধিকার জন্মগত, জন্মের সাথে সাথেই অধিকারগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত হয়। সময়ের প্রয়োজনে এখন অধিকারের বিস্তারিত দলিলপত্র তৈরী হয়েছে, কিন্তু এগুলো আসলে লিখিত দেওয়ার কিছু নেই। রাজনৈতিক সনদ লিখে অধিকারের যেমন স্বীকৃতি দেয়া যায়, ফের সনদ করে অধিকার হরণও করা যায়। এর উদাহরণ বাংলাদেশ থেকেই দেয়া যেতে পারে।
বাস্তবতা হচ্ছে মুষ্টিমেয় ক্ষমতাসীন মহল এই অধীকারপত্র লিখেন, আপনার আমার, অর্থাৎ গণস্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, শাসকদের চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য, তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার মাত্র।
গ্রন্থটি স্বীকার করে সরকারের একমাত্র কাজ জনসেবা। এবং সে কারণেই রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র অবৈধ ও সেকেলে।
পেইনের এই লেখনীর উপর অনেকেরই প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হয়। যেমন দার্শনিক জন লকের লেখা ‘সরকারের দ্বিতীয় চুক্তি’ উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। পেইন ফ্রান্সের শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে রাতদিন ঘোরাঘুরি করতেন। ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের মধ্যে তিনি থমাস জেফারসনের সাথে প্রায়ই সন্ধ্যার আলাপচারিতায় নিমগ্ন থাকতেন। সম্ভবত মার্কিজ ডি’লাফায়েতর সাথেও তার চলাচল ছিল। লাফায়েত ছিলেন একজন ফরাসী অভিজাত ও আমেরিকার বিপ্লবের সেনাকর্তা। এভাবেই তিনি প্রজাসাধারণ, শ্রমিক-মজুর, বিপ্লবী, সৈনিক, ব্যবসায়ী অথবা প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। নিজে উদারপন্থী হলেও তিনি ফিলাডেলফিয়ার ‘রক্ষণশীল’ রাজনীতিক জেমস উইলসনের সাথেও পেইন উঠাবসা করতেন। জেমস উইলসন সর্বপ্রথম বৃটিশ সরকার ব্যবস্থাকে সংস্কার করে আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা এনেছিলেন। বইটি তিনি জর্জ ওয়াশিংটন ও মার্কুইজ ডি’লাফায়েত উত্সর্গ করেছিলেন। পেইন সবার সাথে মিশতেন এবং তার লেখা অধিকাংশ মানুষের আশা-প্রত্যাশার প্রতিনিধিত্ব করত।
শিক্ষাকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। শিক্ষাখাতে ভর্তুকি দেয়া ও স্কুল/কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে অধ্যয়ণে সুযোগ দেয়া। শিক্ষাব্যবস্থা মুক্তজ্ঞান চর্চার মাধ্যম করা, যাতে জনসাধারণের আত্ম উপলব্ধি হয়, জাগ্রত হয় ঘুমিয়ে থাকা সত্তার। উদ্ভাবন ও আর্থ-সামাজিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। জেগে উঠা মানুষ প্রতিবাদ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য করপ্রথা বিলোপ করা। তত্কালীন জমিদারী তালুক অথবা আজকের মুষ্টিমেয় টাকার কুমিরদের উপর প্রগতিশীল আয়কর আরোপ করে বংশগত আভিজাত্য রোধ করা। ধনীর দুলাল যেন শুধু পৈত্রিক সম্পদের জোরেই বংশপরম্পরায় আজীবন ধনী থেকে না যায়। একসময় জমিদারের বড়ছেলে জন্মসূত্রে জমিদার হত, এখন সিইও হয়, এর সবই অভিজাততন্ত্রের খামখেয়ালী চরিত্র, গণরাষ্ট্রের গণস্বার্থ বিরোধী আচরণ। এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যখন মুষ্টিমেয়র হাতে কব্জা হয়ে পরে, তখন আপনার আমার অধিকার জিম্মি হয়ে যায়। এই কারণেই মানুষের অধিকার গ্রন্থটি সম্ভ্রান্ত/খানদানি উপাধিগুলোর বিরুদ্ধে। অনেকটা আমাদের দেশের জমিদার, চৌধুরী, খন্দকার ইত্যাদি বংশপ্রথার মত। গণতন্ত্রের সাথে এই শ্রেণীগত পদবি বেমানান, কারণ এতে পারিবারিক স্বৈরতন্ত্র মাথাচাড়া পায়।
ঠিক একই চরিত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিদ্যমান। পারিবারিক সরকার ব্যবস্থা, যেমন বাবার মেয়ে প্রধানমন্ত্রী অথবা সাবেক স্বৈরশাসকের স্ত্রীরা প্রধান বিরোধীদলীয় নেত্রী। বিদেশে পলাতক অথবা পালিত সন্তানরা এখন সুযোগের অপেক্ষায়, এসেই দেখবেন কেমন করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাচ্ছেন। এগুলোই হচ্ছে জন্মসুত্রে পাওয়া তালুকদারি। পারিবারিক গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। কারণ পরিবারগুলো মনে করে তাদের পূর্বপুরুষগণ কোনকালে দেশ জন্ম দিয়েছিল অথবা কিনে নিয়েছিল, এখন বংশধররা বসেবসে খাজনা খাবে, ছড়ি ঘুরাবে। স্বাধীনতা অর্জনে জনগণ তখন ভূমিকা রাখলেও, আমাদের পরিবারই পরীক্ষিত, অতি ভুমিকা রেখেছে, অতি দেশপ্রেমিক। সাধারণ জনসমাজকে বিশ্বাস করা যায় না, দেশরক্ষার ভার তাদের হাতে দিতে নাই। আমরাই আমরা, চৌদ্দগোষ্ঠী। আমরা থাকলে কমদূর্নীতি হবে, জনগণ আসলে গণদূর্নীতি হবে। কতিপয় ব্যক্তিবর্গ মহান ও শ্রদ্ধেয় হলেও তাদের বর্তমান প্রজন্মরা চূড়ান্তভাবে অগ্রহণযোগ্য ও হাস্যকর।
বুদ্ধিপাপী এডমন্ড বার্ক হলেন এই বংশতন্ত্রের অন্যতম প্রবক্তা। ‘ফরাসী বিপ্লবের প্রতিফলন’ বইটিতে তিনি অভিজাততন্ত্রের বৈধতা দেন। তিনি বলেন সত্যিকারের সামাজিক স্থিতিশীলতা আসবে যখন সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগুরুদের উপর ছড়ি ঘুরাবে। উদাহরণ দিয়ে বললে, মুষ্টিমেয় অভিজাত বা লুটতরাজ সমাজ যখন বৃহত্তর নিম্নবিত্ত বা কর্মজীবী মধ্যবিত্তদের শাষণ করবে তখন সমাজে শান্তি প্রতিষ্টা হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন এই প্রথাকে যেকোন মূল্যে টিকিয়ে রাখতে হবে। অতপর বংশাসী/মাংশাসী এই অভিজাতপ্রথা উত্তরাধুনিককালে বৈধতা পেল…..। অর্থাৎ আইনগতভাবে অভিজাতের ছাওয়াল অভিজাত হবে। পুরো রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে এই দুষ্টচক্র রাষ্ট্রের সম্পদ, ধর্ম ও সরকার এর সবকিছুর অলিখিত মালিকনা ক্রয় করে নিয়েছে।
বংশধরবাদ/পরিবারতন্ত্র কতটুক যৌক্তিক? ‘মানুষের অধিকার’ বইয়ে প্রশ্নটি তুলেন থমাস পেইন। পেইন স্পষ্টতই বলেন রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার জন্মগত হতে পারেনা। কারণ জ্ঞান-প্রজ্ঞা ব্যক্তিগত, জেনেটিক বা বংশগত নয়। অর্থাৎ জ্ঞানী পিতার সন্তান জ্ঞানী হবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। নির্বোধ পিতার সন্তানও জ্ঞানী হতে পারে।
অষ্টদশ শতাব্দীর দুইটি মহান রাজনৈতিক বিপ্লবের উপর পেইনের লেখনীর প্রত্যক্ষ প্রভাব আছে। এবং ফরাসী ও আমেরিকার বিপ্লব আধুনিক গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা কি হবে এর ভিত নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
গ্রন্ত্রটি আজকের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের প্রধান ভিত্তি। যেমন মানুষ জন্ম থেকেই মুক্ত ও অধিকার ভোগে আমরা সবাই সমান। জাতিই সার্বভৌম শক্তির প্রধান উত্স। এই সার্বভৌমত্বের অভিবাবক আমরা নাগরিকগণ যেকেউই হতে পারি। জনগণই পারে যেকোনো ব্যর্থ সরকারকে উত্খাত করতে।
দুই বছর লেগে যায় বইটি লিখতে। চাহিদা আকাশচুম্বী। দ্রুত ছাপাতে থাকা বইটি ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ল। এডমন্ড বার্কের মিথ্যে প্রচারণা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পরতে লাগল।
তিনি আরো বলেন রাজতন্ত্র/বংশতন্ত্র হল নৈতিক আইনের অসভ্য লঙ্ঘন। তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য পূর্বশর্ত। সরকারব্যবস্থা হল কৃত্তিম, সুতরাং সরকারের ভূমিকাও নগণ্য হওয়া উচিত। আর সমাজব্যবস্থা হচ্ছে প্রাকৃতিক। দেশ ও জাতি টিকিয়ে রাখতে দরকার একটি সুস্থ্য সমাজব্যবস্তার বিকাশ।
প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের সংবিধান কি হবে? রাষ্ট্রীয় অর্থের বিজ্ঞ ব্যবস্থাপনা। একচেটিয়া মুক্তবানিজ্য রোধ, নিম্ন আয়ের নাগরিকদের উপর থেকে করপ্রথার বিলোপ সাধন, দারিদ্রবিমোচনের পরিকল্পনা। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা, বেকারদের জন্য ভাতা প্রধান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বইটি লেখার দায়ে পেইনের ফাসির হুকুম হল। রাজদ্রোহী বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ। কিন্তু পেইন ফ্রান্স ও আমেরিকা ছেড়ে কোনদিনই তার স্বদেশ ইংল্যান্ডে ফিরে যাননি। ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সে তিনি একবার গ্রেফতারও হন। গিলোটিনে শিরচ্ছেদ করে মিত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। কিন্তু এবার ফ্রান্সে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের হস্তক্ষেপে ছাড়া পেয়ে যান….
লেখক: Rakibul Hasan

(Rakibul Hasan is Queen’s Young Leader 2016 at University of Cambridge, Women Deliver Fellow in USA, recipient of ‘Global Youth Award-2014, India, Feature sub-Editor, The Bangladesh Today.)

Related Posts

About The Author

Add Comment