মানুষের অধিকার আলাপ : ৬১ তম পাবলিক লেকচার

গতকাল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ৬১ তম পাবলিক লেকচার। এতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘দি বাংলাদেশ টুডে’ পত্রিকার ফিচার উপ-সম্পাদক রকিবুল হাসান। তিনি এ বছর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘কুইন্স ইয়ং লিডার’এবং ২০১৪ সালে ভারত থেকে ‘গ্লোবাল ইউথ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।

আজকের লেকচারের বিষয়বস্তু ছিল ‘ মানুষের অধিকার আলাপ’। তিনি অধিকার বলতে মানুষ, শ্রমজীবী, নারী সর্বোপরি সকলের প্রাপ্য মর্যাদা বুঝিয়েছেন। শ্রোতাদের প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ফরাসি বিপ্লব কেন সংঘটিত হয়েছিল?
যখন মানুষের ন্যূনতম অধিকার ছিল না,তখনই ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়।

১৭৮৯ সালে এটি সংঘটিত হয়। তখনই গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রভৃতি নতুন জিনিসগুলো আসে। এ বিপ্লবে মানুষ অধিকার আদায়ে রাস্তায় নেমে আসে। তখনই রিপাবলিক জন্ম নেয়। একটি বিপ্লব যখন হয় এর সফলতা নির্ভর করে এটি কতদিন স্থায়ী হবে তার ওপর। যদি লেখকগণ দায়িত্ব না নিতেন,তাহলে এ বিপ্লব তখনই থেমে যেত। তবে বিপ্লবের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় পক্ষে লেখক ছিলেন। এডমন্ড বার্ক বলছিলেন, যে ক্ষমতায় আসবে সে তার মত করে শাসনব্যবস্থা করে নিবে। এর কারণ ছিল তিনি ছিলেন কনজারভেটিভ (গোঁড়া)। থমাস পেইন ছিলেন তার বিপরীত। থমাস পেইন বিপ্লবটি ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে আর বার্ক এটিকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়েছিলেন। তখন তুমুল বিতর্ক শুরু হয় – ‘বিপ্লবটি হবে না থেমে যাবে?’, ‘সবাই বিপ্লবটি সম্পর্কে জানতে পারবে কি পারবে না?’। থমাস পেইন মানুষকে জানাতে চেয়েছিলেন।সেজন্য তিনি শুধু লেখনী ধারণ করে ক্ষান্ত হন নি, আমেরিকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। এতে দেশের ভুল কাজে লেখক সমাজের দায়িত্ব উপলব্ধি করা যায়।এক্ষেত্রে উদীয়মান লেখকদের তখন অগ্রসর হতে হয়। তখন একজন ইংল্যান্ডের নাগরিক হয়েও ব্রিটিশ শাসনাধীন আমেরিকায় মানুষের অধিকার নিয়ে ১৭৭৪ সালে তিনি ‘Common… ‘ এবং ‘ ‘Crisis ‘ নামক এ দুটি বই লিখেন। তিনি বিপ্লবী,সৈনিক,শ্রমজীবী সকলের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি তার দেশ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লিখেন।

তিনি মানবাধিকার নিয়ে লিখেন।মানুষ জন্মমাত্র সকল মানবিক অধিকার ভোগ করবে। মানুষ হিসেবে জন্মে সে সর্বোচ্চ অধিকার পাওয়া উচিত। মানষকে ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা না করে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা উচিত।মানবাধিকার ঠিক সে কাজটিই করে।
বাংলাদেশে আমরা সব সময়ই ক্রাইসিস এর মধ্যে আছি। প্রতিদিনই নতুন নতুন ক্রাইসিস সৃষ্টি হচ্ছে।আমরা কি স্বাধীন?
আমি যে কোন কিছুর জন্য ইচ্ছেমতো কাজ করার অধিকার ভোগ করি?

না। করি না। লিগেসি হিসেবে ক্ষমতাপ্রাপ্তরা আমাদের শাসন করছে। মানুষ হিসেবে আমাদের এ বোধগুলো আসা উচিত।আমাদের সচেতন হওয়া দরকার আমাদের জন্য কোনটি আসলে দরকার। পুরুষতান্ত্রিকতা না নারীবাদ আসতে দেয়৪ উচিত? ‘ ফুল সুয়িং গণতন্ত্র ‘ আনতে চান? সেজন্য আমরা সক্ষম কি না বুঝতে হবে।

১৯৯০ সাল আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় রাজনীতির অন্ধকারতম সময় থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে আনন্দিত করেও পরবর্তীতে দুঃখই দিয়েছে। কেননা, তখন থেকেই ডাকসু বন্ধ করে দেয়া হয়, যেখানে যোগ্য ও মেধাবীরা রাজনীতিতে আসত।

ডাকসুর মৃত্যু হল।২৬ বছর পর নতুন উদ্যোগ -বাংলাদদেশ স্টাডি ফোরাম। জ্ঞানার্জন ও জাতিকে কিছু দিতে তরুণরা আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তা।তিনি আরও বলেন,’ আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে’।

গত বছরের মানবাধিকার কীভাবে আসে? মানুষে মানুষে হয় জ্ঞানের চর্চা। এ চর্চা থেমে গেলে সহযোগিতাও থেমে যায়। সহযোগিতা থেমে গেলে,থেমে যায় মানুষের অধিকার। সরকার ‘No VAT Movement ‘ থামাতে পারে নি। এটা আমাদের সফলতা। বাংলাদেশে শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে হবে। ৭ভাগ হারে বৃদ্ধি মোটামোটি আমাদের অগ্রসর পথযাত্রাকেই নির্দেশ করে।

এডমন্ড বার্ক তার ‘ Reflection on French Revolution ‘ গ্রন্থে কেন বিপ্লবে পরিবর্তন ঘটেছিল আলোচনা করেছেন। তার মতে, যে শাসনে আসবে তার ওপর সেটি নির্ভর করে। সমাজে যখন মাইনোরিটিরা শাসন করবে তখন সমাজ স্থিতিশীল থাকবে। এটা প্র্যাকটিস করতে হবে। সমাজ বৈিচত্র্যময়। আমরা বিভিন্ন সম্প্রদায়, যথাঃ হিন্দু,খ্রিস্ট্রান,বৌদ্ধ প্রভৃতি সমাজে একসাথে বাস করি। গ্রামেও বাস করি। সমাজে বামপন্থী,ডানপন্থী প্রভৃতি সংখ্যালঘুরা শাসন করলে মেনে নিতে হবে। এজন্য দায়িত্ব নিয়ে আমাদেরকে পরিবর্তনের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে হবে।

ফরাসি বিপ্লবে একসাথে দুটি বিষয় ওঠে আসে। যথাঃ
১. Enlightenment ও
২.Conservatism.
রিপাবলিকানরা ‘enlightened ‘। আর কনজারভেটিভরা বন্যপশুর ন্যায়, এদের দমন করতে আমাদের নিয়ম প্রবর্তন করতে হয়। এদের কোন ভাল বৈশিষ্ট্য নেই।

থমাস পেইন ‘Enlightenment’ নিয়ে লিখেছেন। তার ২০০ পৃষ্ঠার একটি বই এক মাসে ২০০০ কপি বিক্রি হয়। সব ধরনের মানুষ, যথা-শ্রমিক,কৃষক,সেনাবাহিনী এবং গ্রামের সবার সাথে কথা বলে লিখেছেন। তাই লেখায় সবার কথা এসেছে। তাই আমাদেরও কিছু না কিছু লিখে যাওয়া উচিত।

আমাদের বহুজাতিক এই দেশে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী, সেকুলারিস্ট,মৌলবাদী বাস করে। জঙ্গিবাদী,নাস্তিক বা ইসলামিস্টদের হত্যা না করে সমাজে মতামত প্রকাশ করার অবস্থান তাদের থাকতে হবে। নারীদের ‘teasing’ না করে তাদের স্বাভাবিকভাবে বাস করার অধিকার দিতে হবে।

ইউরোপে মেয়েরা স্বাধীন। আর আমাদের দেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। অথচ এটি নিয়ে আলোচনা আর দুই শতাব্দী পিছিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু নয়।

আমাদের এ সমাজে হিন্দু,মুসলিম,খ্রিস্টান,সেকুলার, ইসলামিস্ট,ফ্যামিনিস্ট সকলের মানবাধিকার চর্চার অধিকার রয়েছে।

বক্তার সর্বশেষ আলাপ শ্রোতাদের উদ্দেশ্য-
‘ইউ ডো নট হাইট ইউরসেলফ, হোয়াই ডোন্ট ইউ পার্টিসিপেট?’

এবার শ্রোতা ও বিডিএসএফ সদস্যদের বক্তব্য,মতামত ও প্রশ্ন করার পালা। প্রথমেই বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের একজন সদস্য প্রথম,দ্বিতীয় ও তৃতীয় জেনারেশনের কথা উল্লেখ করেন। প্রথম জেনারেশনে ধর্মকেন্দ্রিকতা, চার্চের অর্থনৈতিক, সামাজিক শোষণ ও রাজা নিজেকে ঈশ্বর থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত মনে করত। কিন্তু তারা কখনো মানুষ খাদ্য,বস্ত্র,শিক্ষা না পেলে কীভাবে ধারণ করবে ভেবে দেখে নি। আর তৃতীয় জেনারেশনে মানবাধিকারের ঘোষণা আসল।
তিনি প্রত্যেকে ধর্মে মানুষকে বলা হয়েছে যে, আগে তুমি মানুষ।

এরপরে বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের আরেকজন সদস্য বলেন, একটি বৃক্ষের প্রধান বাহন বীজ, যা থেকে সেটি একসময় মহীরুহ ধারণ করে। একটি শিশু জন্মের পর চিৎকার করে তার ক্ষুধা নিবারণের অধিকারের তার মায়ের নিকট জানান দেয় । জন্মের সাথে সাথে তার অধিকার চেতনা জন্মে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে অধিকার আদায়ে সংগ্রাম, প্রয়োজনে বিপ্লব ঘোষণা করে। ১৯৭১ সালে ২৩ বছর শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অধিকারের কথা অবচেতন থেকে প্রথম, চেতন থেকে দ্বিতীয় বার আসে। অধিকার প্রথমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, তারপর ক্রমান্বয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সর্বশেষ পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত হবে। কোন অঞ্চল অন্য কোন অঞ্চলের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে না।

তৃতীয়জন ছিলেন একজন শিক্ষক অধিকার ও মানবাধিকারের কথা উল্লেখ করেন। সিরিয়ার শরণার্থী সংকটের প্রসঙ্গ এনে অধিকারকে মানবাধিকার ও নাগরিকাধিকারে বিভাজনের অসাড়তা তুলে ধরেন। নাগরিক এক ধরনের অধিকার আর আমজনতা অন্য ধরনের অধিকার ভোগ করবে -সেটা অমানবিক ও অদ্ভূত। যে কোন দেশের নাগরিক, সে কোন ধরনের অধিকার ভোগ করবে ? ভাসমান রোহিঙ্গারা কোন ধরনের অধিকার ভোগ করবে ? ব্রাজিলের আমাজনের সৌন্দর্য কিংবা বাংলাদেশের সৌন্দর্য দেখার হক সবার আছে। বর্ডার দিয়ে আলাদা করলে মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন আসে। কারণ। মানুষকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার দেয়া হচ্ছে না। ইউরোপে মানুষের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীতে বিভাজনকে সমালোচনা করেন। চারপাশের পরিবেশ ভাল হলেও পেটে ভাত না থাকলে এর কোনই মূল্য নেই। এজন্য ক্রমান্বয়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজ আসার কথা বলেছেন। রাশিয়া সিভিল অধিকার অস্বীকার করে। এ প্যাকেজে সংবিধানে আইনের শাসন, ফান্ডামেন্টাল অধিকার ও মর্যাদার (dignity) নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

এরপরের শ্রোতা বলেন, অধিকার গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত বিষয়। বেঁচে থাকার অধিকার সবচেয়ে বড় অধিকার। খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা ফান্ডামেন্টাল অধিকার বলা হলেও আমাদের দেশে এটি মূলত বেসিক (basic) অধিকার। আর মানবাধিকার কমিশন হল মিজানাধিকার কমিশন।

তারপর বিডিএসএফের সাংগঠনিক সম্পাদক ইপ্সিতা রাষ্ট্রেরর পাওয়ার হরণ করে একই সাথে কথা বলার জন্য বলাকে সমালোচনা করেন। কারণ কথা বলতে গেলে দেবে না, এমনকি গলা কেটে দিতে পারে। মানবাধিকার চর্চা করতে হলে Equality ‘র ব্যবস্থা থাকতে হবে। হেফাজতে ইসলামকে যেমন জায়গা দিতে হবে তেমনি গণজাগরণ মঞ্চকেও সেরকম জায়গা দিতে হবে। উনার বক্তব্য যেন মূল বক্তার বিচিত্র সম্প্রদায়, মতাদর্শের লোকের কথা বলার জায়গা দেয়ার কথার প্রতিধ্বনি।

তারপরই বিডিএসএফের এএসএম ইউনূস বিডিএসএফের ‘টি২০: ২ মাসে বিশটি বই পড়া’ প্রোগ্রাম সম্পর্কে সকলকে অভিহিত করেন। জ্ঞাননির্ভর জাতি গঠনে স্টাডি ফোরামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য উপস্থিত সকলের সামনে তুলে ধরেন।
পরেরজন পৃথিবীতে বিদ্যমান অনেক সমাজ isolated বলেন। কারণ এ নামগুলো পাশ্চাত্যে জনপ্রিয় হলেও আমাদের এখানে দূষিত হয়ে গেছে।
এরপরে একজন শিক্ষক অধিকারের কথা বললে গিয়ে লেকচারে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলা নিয়ে তার আশঙ্কা ব্যক্ত করেন।

তারপর আবারও প্রধান বক্তা প্রশ্নোত্তর দিতে আসেন। তিনি বলেন, সমালোচনা না করলে নতুন আইডিয়া আসবে না। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় জেনারেশন দিয়ে কিছু হবে না। মানুষ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। গ্রামে সকলে একত্রে বসবাস করছে। তাদের কি মানবাধিকার শেখানো হয়েছে। এজন্য frank হতে হবে। আমাদের। ব্যক্তিগত অধিকার আছে। তবে অধিকারকে দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ(confined) না রেখে ‘গ্লোবালাইজেশনের সেন্স’ এ দেখতে হবে। আমাদের থেকে কোন সিদ্ধান্ত আসে না। কারণ – ‘We do not think globally ‘.
‘So we have to adopt it’.
আর শিক্ষা, অধিকার প্রভৃতি ফ্রি হবে।
সর্বশেষে আমাদের জাতি সম্পর্কে বক্তার আস্ফালন –
‘We can not response,we can not able to response’
(এ আস্ফালন আফসোসের সাথে হৃদয়ে চরমভাবে অনরণিত হবে যখন দেখবেন ভারত সহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্য ছাত্র যখন রকিবুল হাসান ভাইকে শেয়ার করে। আফসোস এই ভেবে যে মেধাকে আমরা কতভাবে অবমূল্যায়ন ও ধ্বংস করছি। সর্বশেষ কথা বলার সময় তিনি এই ব্রেইনগুলো কাজে লাগানোর তাগিদ দেন। কনজারভেটিজম পরিহার করতে বলেছিলেন।)

সবশেষে ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে সকল কার্যক্রমের শুভ সমাপ্তি ঘটে ।

Writer : Tanzir Sarker

Related Posts

About The Author

Add Comment