মা’র মহিমাঃ বন্দিনীর শৃঙ্খল!

মাসুদ রানা
 
‘মা’ শুধু একটি জৈবিক প্রজনন সত্তাই নয়, এটি একটি সৌশ্যাল কনষ্ট্রাক্ট বা সামাজিক নির্মাণও বটে। মার্ক্স বলবেন, এটিও একটি উৎপাদন সম্পর্ক।
 
আমার মনে হয়, এই উৎপাদন সম্পর্কে কিংবা সামাজিক বিনির্মাণে মা’র গ্লৌরিফিকেশন বা মহিমাকীর্তন হচ্ছে তাঁর প্রাণীসত্তা ও নারীসত্তায় আরোপিত একটি শৃঙ্খল। মা একজন কারাবাসিনী।
 
সন্তান (পুত্র) যেভাবে মা’র মহিমাকীর্তন করেন, সন্ততি (কন্যা) নারী হিসেবে মা’র নারীসত্তা বুঝেন বলে এতো মহিমাকীর্তন করেন না।
 
মা’র মহিমাকীর্তন তাঁকে বশ্যতায় রাখার একটি সামাজিক পৌরুষিক কৌশল। পুরুষ-শাসিত সমাজে মাকে সম্পত্তি হিসেবে উত্তারাধিকার সূত্রে লাভ করেন তাঁর পুত্র।
 
মা’র কোনো উত্তারাধিকার থাকে না, কিংবা থাকলেও অতি সামান্য, যা সাধারণতঃ তাঁকে দেওয়া হয় না। কারণ, মা হচ্ছেন ত্যাগী। তাই, মা’র সবটুকু সন্তানের, কিন্তু সন্তানের সবটুকু মা’র নয়।
 
মা তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া মহিমা সংরক্ষণে নিজের প্রাণীসত্তা ও নারীসত্তা বিসর্জন দিয়ে আরও মহিমান্বিত হয়ে উঠেন।
 
তাই সধবা মা’র চেয়ে বিধবা মা আরও মহান। তিনি মাতৃত্বের জন্য তাঁর জীবত্ব ও নারীত্ব অবদমন – অন্ততঃ লোকচক্ষে – করেছেন। কারণ, মা’র যৌন প্রেষণা থাকতে নেই। মা’র নিজস্ব শখ আহল্লাদ থাকতে নেই।
 
মা’র মূর্তি হট্টহাসিতে ফেটে পড়ার নয়। মা’র মূর্তি সাধারণতঃ বিষন্ন ও অশ্রুসিক্ত। মা’র প্রয়োজন শ্রদ্ধার, প্রেমের প্রয়োজন নেই তাঁর। কারণ, তিনি মহান। তিনি এতোই মহান যে, তাঁর পদতলে সন্তানের স্বর্গ।
 
মা যদি প্রেমে পড়েন এবং আবার মাতৃত্ব ধারণ করেন গর্ভে, তাহলে তাঁর নব-মাতৃত্ব হয়ে ওঠে তাঁর কলঙ্ক। তিনি হয়ে উঠেন পাপিষ্ঠা – নরকের কীট।
 
সুতরাং, মাতৃত্ব মানেই মহান নয়। এটি শর্ত-সাপেক্ষ। বলাই বাহুল্য, এই শর্তগুলো গঠিত হয়েছে পুরুষের স্বার্থে।
 
….
 
গত বছর মা দিবসে আমার মা ছিলেন। এ-বছর মা দিবসে আমার মা নেই। আমি আবেগে আর্দ্র হতে চাই না। কিন্তু গভীর সত্তায় অনুভব করি মাকে আমার সেই শৈশব থেকে তাঁর মহাপ্রায়ণের নিশ্চুপ ক্ষণটি পর্যন্ত। আমার মাকে আমি সম্ভবতঃ সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলাম এবং এখনও বাসি।
 
রোববার ১০ মে ২০১৫
লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

Related Posts

About The Author

Add Comment