মাসুমের লাশ এবং জন্মনিবন্ধন কার্ড


বয়স নিয়ে ঝামেলা শুরু হল। মেয়ের বয়স কেবল পনের বছর সাত মাস। এমেয়ের বিয়ে রেজিস্ট্রি করলে কাজী সাহেবকে জেলের ভাত খেতে হবে। আর এর মধ্যেই এনজিও’র লোকজন খোঁজ পেয়ে গেলে তো বিয়ে হতেই দেবে না। এমন ঝামেলার মাঝে লতিফা খাতুন বসে বসে সময় নষ্ট করতে পারেনা। তাই, বিয়ের মঞ্চেই হ্যান্ডনোট বের করে পড়তে শুরু করল। পোর্শু থেকে পরীক্ষা। তারপর দিন থেকে রোজা। দ্রুত রোজা শুরু হচ্ছে- আর এর আগেই বিয়ের পর্বটা সেরে ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দুই পক্ষই।

লতিফার বয়স পনের পার হলেও বাচ্চাকালের মত শব্দ না করে পড়তে পারেনা। সে চুপ করে পড়তেও চায়না। পড়তে আরম্ভ করল। সাধারণ বিজ্ঞান এর জনসংখ্যা অধ্যায় পড়ছে। ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য বাল্যবিবাহ রোধ করতে হবে।’ বরপক্ষের লোকজন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অবিভাবকেরা লতিফার পড়া দেখে মুগ্ধ হচ্ছে আর ভাবছে- বাড়ির অলস ছেলেটারে উচিৎ শিক্ষা দেব। কী পড়ার দম! আহারে। আর আমার ব্যাটা পড়তেই চায় না। বাড়িত যাই আগে, দেখাব মজা।

ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার দৃষ্টি অন্য দিকে নেয়ার চেষ্টা করছে। ‘কী ফাজিল মেয়ে! বিয়ের সময় পড়তে বসে ভাব দেখাচ্ছে।’ মেরুন রঙের শার্ট পরা একটা ছেলে তার মাকে বলেই বসল।

কিছু মানুষ দেখছে মেয়েটিকে। প্রদর্শনীর জন্য রাখা মেয়েটিকে দেখছে যেন। চোখ টিপটিপ করে শব্দ করে পড়তেই গালে টোল পড়ছে। টোল দেখার পরে অনেকে ভাবল- এটা দেখার জন্যেই আমার জন্ম হয়েছে। আজ আমি সার্থক।

কাজী সাহেব তাকাচ্ছেন সবার দিকে- বিশেষভাবে লতিফার বাবার দিকে। এখনই উঠে যাবেন তিনি। বাল্যবিবাহে তার কোন মত নেই। সাহায্য করাও নৈতিকতা বিরোধী বলে মনে করেন। তবে বিয়ে বাড়ির লোকজন যদি অনুরোধ করে, আর সে অনুরোধ যদি শর্তসাপেক্ষে হয়, সেটা না রেখে পারেন না। তিনি এখন অপেক্ষা করছেন অনুরোধের। কিন্তু কেউ অনুরোধ করল না। শেষে বলেই ফেললেন- জন্ম নিবন্ধন কার্ডে বয়স বাড়িয়ে নিলে আমার বিয়ে রেজিষ্ট্রি করতে আপত্তি থাকবে না। আর একাজ করতে কিছু টাকা-পয়সাও খরচ হতে পারে।

শফিক আহমেদ শফা মেয়ের বাবা। তিনি অনুরোধ না করে বড় ছেলে মালেককে পাঠালেন ওয়ার্ড কমিশনারের অফিসে। কাজী উঠে দাঁড়ালেন।
– আমি গেলাম। শাহিনকে পাঠাচ্ছি। ও আসলে সব লিখে নিয়ে যাবে। আমি সাইন করে দেব।
কাজী সাহেব হাঁটতে আরম্ভ করলেন।

রোজার মধ্যে মারা গেল নতুন বর মাসুম বিশ্বাস।

এক সপ্তাহ পরে মাসুম এল দেওয়ান রোডের বাড়িতে। চোখে মুখে ঘাম। কবরের মাটিও লেগে আছে। কিন্তু ঘাম আর মাটির মিশ্রণটা পানির মত সাদাটে না। লাল কিংবা লালচে। কুলি করে থুথু ফেলে- সেটা লাল। আবার যার সাথে হ্যান্ডশেক করছে, তার হাতে ক্ষত চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, রয়ে যাচ্ছে- সেটাও লাল।

বিয়ের পাঞ্জাবীটা এগিয়ে দিল মা। সেটা গায়ে দিতে না দিতেই ঝাপসা হয়ে সাদা হয়ে গেল। তারপর লাল।

মাসুম মানেই আতঙ্ক। মাসুম মানেই লাল। সবাই পালাচ্ছে, আর কাউসার আসছে ওকে ধরতে। চুমু খেল পাগলা কাউসারের গলায়। অবাক হয়ে সবাই দেখল- একটা পাগল একজন মানুষ হয়ে উঠল।


– আব্বা, জন্মনিবন্ধন কার্ড পাচ্ছি না।

সবার চোখে মুখে বিস্ময় আর বিরক্তির চিহ্ন। মরেও মানুষগুলিকে মুক্তি দেয়নি। একটু আরামে শোক করবে কি, তা না। মরার পরেও উঠে এসেছে আবার। বাবা এবার মুখ খুললেন।
– ক্যান, কাফনের সাথে সব কাগজই তো দিছি। খুঁজে দেখিসনি?
– হুম। দেখছি। অন্যগুলা আছে। শুধু জন্মনিবন্ধন কার্ডই পাচ্ছি না।

সারা বাড়ি খুঁজে কোথাও পাওয়া গেল না। মা খুঁজল। তিনিও পেলেন না। শ্বশুরবাড়িতে বাবা, মা- দুজনেই গেলেন।

কান্নায় চুপসে থাকা লতিফা বেগম (সাবেক লতিফা খাতুন) বেরিয়ে এল। ‘আমি জানি- ওগুলো কোথায় আছে। কিন্তু কাকে বলব? কেনই বা বলব?’

মাসুমের বাবা-মা সবাই অনুরোধ করল। কিন্ত রাজি হয় না। বিশ্বাসই করতে চাইল না যে- মাসুম কবর থেকে উঠে এসেছে শুধু জন্মনিব্ধন কার্ডের জন্য।

মাসুম শ্বশুর বাড়িতে আসতে পারছে না। এতোদিনে গায়ে পঁচন ধরেছে। নতুন বিয়ে করা শ্বশুর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এ অবস্থায় ওদের বাড়ি যাওয়া মোটেও সমীচিন না।

– সারা বাড়ি খুঁজছি। তোর শ্বশুর বাড়ি। বন্ধুদের বাড়ি। কেউ পাচ্ছে না। সবাই ক্লান্ত এখন। এ ব্যাপারে কেউ কিছু বলতেও পারছে না।

এটা বলেই কবরের মাটি সরাতে শুরু করল মাসুমের বাবা। মাসুমের দেহ তখনো কাফনে জড়ানো। চকলেটের মত দুু-মাথায় মোড়ানো কাপড়। মাথার দিকের ভাঁজ খুললেন। না, নেই। এবার পায়ের দিকে। বাম পায়ের দিকে নিচে কিচু কাগজ। পাওয়া গেল সার্টিফিকেট। তার নিচে জন্মনিবন্ধন কার্ড। সেগুলো ঝেড়ে হাতে নিয়ে ছুড়ে দিল মাসুমের মুখে। কাগজগুলো সাদা, তারপর লাল হয়ে গেল।

জন্মনিবন্ধন কার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকল মাসুম, কাফনের কাপড় তুলে লাশের কপালে চুমু দিলেন বাবা।

সাফি উল্লাহ্
গল্পকার
লেখক, সাত নম্বর বাস

Related Posts

About The Author

Add Comment