মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুমিকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেতনার উন্মেষকেন্দ্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। একাত্তরের মার্চ মাসে পাকিস্তানের সামরিক ও আমলাচক্রের মুখপাত্র জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালিদের দমনের অভিযান অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণকারী পাকিস্তান বাহিনীতে ছিল ১৮ নং পাঞ্জাব, ২২ নং বেলুচ, এবং ৩২ নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বিভিন্ন ব্যাটেলিয়ন। ২৫ মার্চের রাত থেকে ২৭ মার্চ সকাল পর্যন্ত এ বিশেষ মোবাইল বাহিনী স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, ট্যাংক বিধ্বংসী বিকয়েললস রাইফেল, রকেট লাঞ্চার মার্টার ভারি ও হালকা মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে ফেলে। পশ্চিম দিক থেকে রেললাইন জুড়ে ৪১ ইউনিট, দক্ষিণ দিক জুড়ে ৮৮ ইউনিট এবং উত্তর দিক থেকে ২৬ ইউনিট কাজ শুরু করে।

২৫শে মার্চের কালরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৯ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ নং নীলক্ষেতের বাড়িতে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফজলুর রহমানকে তার দুই আত্মীয়সহ হত্যা করা হয়। ফজলুর রহমানের স্ত্রী দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পাক বাহিনী অধ্যাপক আনোয়ার পাশা (বাংলা) ও অধ্যাপক রাশিদুল হাসানের (ইংরেজি) বাড়িতেও প্রবেশ করে। উভয় পরিবার খাটের নিচে লুকিয়ে সেই যাত্রা প্রাণে বাঁচেন। ঘরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে তাঁদের কাউকে না দেখে হানাদাররা চলে যায়।

উভয় অধ্যাপক সে রাত্রে বেঁচে গেলেও, মুক্তিযুদ্ধের শেষে তাঁরা আলবদর বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে পারেননি, এমনকি বাড়ি পরিবর্তন করেও। ২৪নং বাড়িতে থাকতেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম (নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমীর সাবেক পরিচালক)। সেই বাড়ির নিচে দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তান নিয়ে আশ্রয় নেওয়ায় সিঁড়িতে রক্ত ছিল। পাক সৈন্যরা ভেবেছিল, অন্য কোন দল হয়ত অপারেশন শেষ করে গেছে তাই তারা আর ঐ বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান।

ঐ বাড়িরই নিচতলায় থাকতেন এক অবাঙালি অধ্যাপক। পঁচিশে মার্চের আগেই সেই ব্যক্তি কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার সব অবাঙালি পরিবার তা-ই করেছিলেন।

ফুলার রোডের ১২নং বাড়িতে হানা দিয়ে হানাদাররা নামিয়ে নিয়ে যায় অধ্যাপক সৈয়দ আলী নকিকে (সমাজ বিজ্ঞান)। তাঁকে গুলি করতে গিয়েও, পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং উপরের তলার ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ মুকতাদিরকে গুলি করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ২৭শে মার্চ অধ্যাপক মুকতাদিরের লাশ পাওয়া যায় ইকবাল হলে (বর্তমান জহুরুল হক হল), তাকে পরে পল্টনে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাফন করা হয়।

সলিমুল্লাহ হল এবং ঢাকা হলে (বর্তমান শহীদুল্লাহ্‌ হল) হানা দিয়ে সলিমুল্লাহ হলের হাউস টিউটর ইংরেজির অধ্যাপক কে এম মুনিমকে সেনারা প্রহার করে এবং ঢাকা হলে হত্যা করে গণিতের অধ্যাপক এ আর খান খাদিম আর অধ্যাপক শরাফত আলীকে।

জগন্নাথ হলের মাঠের শেষ প্রান্তে অধ্যাপকদের বাংলোতে ঢুকে তারা অর্থনীতির অধ্যাপক মীর্জা হুদা এবং শহীদ মিনার এলাকায় ইতিহাসের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবীরের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের নাজেহাল করে।

জগন্নাথ হলে হামলা করার সময় আক্রান্ত হয় হলের প্রাক্তন প্রাধ্যক্ষ ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবের বাস ভবন। পাক হানাদাররা হত্যা করে অধ্যাপক দেব এবং তার পালিত মুসলমান কন্যা রোকেয়ার স্বামীকে।

পরে জগন্নাথ হল সংলগ্ন বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টারে হত্যা করা হয় পরিসংখ্যানের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান তার পুত্র ও আত্মীয়সহ। আক্রমণে মারাত্বক আহত হন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা পরে তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী চিৎবালী ও জনৈকা রাজকুমারী দেবী তথ্য প্রদান করেন যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকরা চিনতে পেরে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে মর্গের কাছে গাছের নিচে খুব অল্প পরিসরে চিরদিনের জন্য শুইয়ে রেখেছেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ও অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে পাশাপাশি দাড় করিয়ে হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হলে আরো নিহত হন হলের সহকারী আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য।

এ তথ্য পাওয়া যায় শহীদ বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক আনোয়ার পাশার মার্চ থেকে ডিসেম্বর নাগাদ লেখা আত্মজৈবনিক উপন্যাস রাইফেল রোটি আওরাত গ্রন্থে।

১৯৭১ এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের দিনগুলিতে “স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের” কর্মকান্ড পরিচালিত হত ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরূল হক হল থেকে)। পাকিস্তানি অপারেশন সার্চ লাইটের ১নং লক্ষ্যবন্তু ছিল জহুরুল হক হল।

২৫ মার্চের মধ্যরাতের পূর্বে ছাত্র লীগের প্রায় সব নেতাকর্মী হল ছেড়ে যান। সেদিন রাত থেকে ২৬ মার্চ সারা দিন রাত ঐ হলের উপর নীলক্ষেত রোড থেকে মার্টার, রকেট লঞ্চার, রিকয়েলস রাইফেল এবং ভারী মেশিন গান ও ট্যাংক থেকে প্রচন্ড আক্রমণ পরিচালিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এ মুনিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭১-৭২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, শুধু জহুরুল হক হলেই প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হন।

রাত বারটার পর ইউওটিসি এর দিকের দেয়াল ভেঙ্গে পাকবাহিনী ট্যাংক নিয়ে জগন্নাথ হলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং প্রথমেই মর্টার ছোড়ে উত্তর বাড়ির দিকে। সাথে সাথে অজস্র গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তারা ঢুকে পড়ে জগন্নাথ হলে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে বাড়ির প্রতিটি কক্ষ অনুসন্ধান করে ছাত্রদের নির্বিচারে গুলি করে। সে রাতে জগন্নাথ হলে ৩৪ জন ছাত্র শহীদ হয়। জগন্নাথ হলের কিছু ছাত্র তখন রমনার কালী বাড়িতে থাকত। ফলে, প্রায় ৫/৬ জন ছাত্র সে রাতে সেখানে নিহত হয়। এদের মধ্যে শুধু অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র রমনীমোহন ভট্টাচার্য ব্যতীত অন্যদের নাম জানা যায় না।

এছাড়া বহু সংখ্যাক অতিথিও নিহত হয় এদের মধ্যে ভৈরব কলেজের হেলাল, বাজিতপুর কলেজের বাবুল পাল, জগন্নাথ কলেজের বদরুদ্দোজা, নেত্রকোনার জীবন সরকার, মোস্তাক, বাচ্চু ও অমরের নাম জানা যায়।

১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকার মার্কিন কনসাল আর্চার কে ব্লাডের লেখা গ্রন্থ, “দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ” থেকে জানা যায় সে রাতে রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করা হয়।

২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথোপকোথন হয় তা থেকে জানা যায় ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০০ ছাত্র নিহত হয়।

গভর্ণর টিক্কা খান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের ২১ এপ্রিল ও শিক্ষকদের ১ জুন থেকে কাজে যোগ দিতে আদেশ দেন। তার ঘোষণা মতে ২ আগস্ট থেকে ক্লাস শুরুর কথা ছিল।

স্বাভাবিক অবস্থা দেখানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগে পরিষ্কার করার নামে ইকবাল হল, সলিমুল্লাহ হল, এবং জগন্নাথ হলের ঘরে ঘরে ছাত্রদের ফেলে যাওয়া বই পুস্তক, কাগজ পত্র, বিছানা পত্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তখন সকল পরীক্ষা স্থগিত ছিল।

ঐ সময় ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতি ছিল খুব কম। প্রতিদিনই প্রায় কলাভবনে গ্রেনেড বিস্ফোরন হত। সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে ক্লাসে ছাত্রদের উপস্থিতিও বাড়ে। ক্লাস করা ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ায়, তারা গ্রেনেড ফাটিয়েই ক্লাসে ঢুকে যেত। ফলে, সেনাবাহিনী কাউকে ধরতে সক্ষম হত না।

পাক সৈন্যরা ঐ সময় কলাভবনের বটগাছটি কেটে ফেলে এবং মধুর ক্যান্টিন উড়িয়ে দিতে যায়। উর্দুর অধ্যাপক আফতাব আহমদ সিদ্দিকী তাদের বাঁধা দিয়ে জানান, ১৯০৬ সালে ঐ ভবনে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষককে টিক্কা খান সরকার বন্দি করে। তদের মধ্যে ছিলেন ড. আবুল খায়ের, ড. রফিকুল ইসলাম, কে এ এম সালাউদ্দিন, আহসানুল হক, গিয়াসুদ্দিন আহমদ, জহুরুল হক এবং এম শহীদুল্লাহ।

মার্শাল ল গভর্ণর লে. জেনারেল টিক্কা খান অধ্যাপক মুনির চৌধুরী, অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক এনামুল হককে লিখিত ভাবে সতর্ক করে দেন। ড. আবু মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে পদচ্যুত্য করা হয়।

ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে পদচুত্য করে ছয় মাসের আটকাদেশ দেওয়া হয়, তবে পাকিস্তান বাহিনী তাকে ধরতে পারে নি। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে তার অনুপস্থিতিতে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল উপাচার্য বিহীন। ঐ সময় উপাচার্য ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী দেশের বাইরে জেনেভাতে “জাতিসংঘের মানবাধিকার সম্মেলনে” ছিলেন।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে জেনেভার পত্রিকায় ঢাকায় দুইজন ছাত্রের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে, বিচারপতি চৌধুরী পাকিস্তান প্রাদশিক শিক্ষা সচিবকে লিখিত ভাবের তার পদত্যাগ পত্র দেন এবং মানবাধিকার সম্মেলনে ছেড়ে লন্ডনে পৌছেন। তিনি বিদেশে প্রবাসী সরকারের বিশেষ প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মল্লিক মুজিবনগর গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রাখেন।

পাকিস্তান বাহিনী তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইনকে তাদের কনভয়ে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদে বসান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয় ড. আবদুল বারীকে। এদের সহায়তা করেন ড. হাসান জামান, ড. মোহর আলী, ড. এ কে এম আবদুর রহমান, ড. আবদুল বারি(রাবি), ড. মকবুল হোসেন (রাবি), ড. সাইফুদ্দিন জোয়ারদার (রাবি)। এরা সকলেই টিক্কা খানের বিশ্ববিদ্যালয় “পুনর্বিন্যাস কমিটির সদস্য” ছিলেন।

বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত “পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই” এই সংবাদের প্রতিবাদ করে বাঙালি শিক্ষাবিদ ড. সাজ্জাদ হোসায়েন এবং ড. মেহের আলীর একটি পত্র ১৯৭১ সালের ৮ জুলাই লন্ডন টাইমস্‌ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

উপাচার্য ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন তার সহযোগী ড. মোহর আলী ও ড. হাসান জামান স্বাধীনতার পর গ্রেফতার হন এবং আটক থাকেন। ১৯৭৩ সালের ১ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের তিনজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment