মুসলমানদের ঘরের কথা জানতে কাজী ইমদাদুল হক এর ‌’আবদুল্লাহ’ পড়ুন

আবদুল্লাহ উপন্যাসটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন “আমি খুশি হয়েছি বিশেষ কারণে, এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল।”

আবদুল্লাহ উপন্যাসটি মূলত তৎকালীন ‘মুসলিম ভারত’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত একটি উপন্যাস ছিল। প্রায় দেড় বছর কাল সময় ধরে কাজী ইমদাদুল হক মুসলিম ভারত পত্রিকায় এই উপন্যাসটির ৩০টি পরিচ্ছেদ প্রকাশ করেন। এরপর আকস্মিকভাবে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপন্যাসটিও অসমাপ্ত থেকে যায়। পরবর্তীতে মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলে যান কালজয়ী এই আবদুল্রাহ উপন্যাসটির লেখক কাজী ইমদাদুল হক।

উপন্যাসটিতে মোট ৪১টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। যার ৩০টি পরিচ্ছেদ ইমদাদুল হক নিজে লিখে গেলেও বাকি ১১টি পরিচ্ছেদ তার রেখে যাওয়া খসড়া থেকে উদ্ধার করে উপন্যাসটিকে পূর্নতা দেওয়া হয়। লেখকের রেখে যাওয়া খসড়া থেকে পঠোদ্ধার করে উপন্যাসটি পূর্নাঙ্গ করার দায়িত্ব পালন করেন কাজী আনারুল কাদির।

লেখকের খসড়া অনুযায়ী আনারুল কাদিরের রচিত অংশের পরিমার্জনা করেন কাজী শাহদাত হোসেন। কাজী ইমদাদুল হকের মৃত্যুর পর ১৯৩৩ সালে আবদুল্লাহ উপন্যাস প্রথম গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে আব্দুল কাদিরের সম্পাদনায় কাজী ইমদাদুল হক রচনাবলী প্রকাশিত হয়।

সমাজ ও রাজনীতি সচেতন তীক্ষ বুদ্ধিভিত্তিক সমালোচক কাজী ইমদাদুল হক বাংলা সাহিত্যে বৈচিত্রপূর্ণ অনেক সৃষ্টির অধিকারী হলেও তাঁর প্রধান কৃতিত্ব মূলত আবদুল্লাহ উপন্যাস। তাঁর অপরাপর রচনার গুরুত্ব কালের আবর্তে নিঃশেষ হয়ে গেলেও আবদুল্লাহ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের আকাশে তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

কাজী ইমদাদুল হক আব্দুল্লাহ উপন্যাসে যে বিষয় বস্তু উপস্থাপনা করেছেন সে সম্পর্কে আব্দুল কাদির মন্তব্য করেছেন “বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে বাঙালী মুসলমান সমাজে যে অবস্থা ছিল তার একটি নিখুঁত চিত্র আবদুল্লাহ উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে। ”

বিংশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলার মুসলিম সমাজে যেসব সমস্যা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা মহামারী আকার ধারণ করে আবদুল্লাহ উপন্যাসখানি তাঁর চরম দুঃসাহসী প্রতিবাদ। এ সময় বাংলার মুসলিম সমাজে আশরাফ-আতরাফ ভেদ, বিতর্কিত পীর প্রথা, কঠোর পর্দা প্রথার নামে অহেতুক ধর্মীয় গোড়ামি, আধুনিক ইংরেজী শিক্ষার বিরোধিতা, বিজ্ঞান সম্মত আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি বিরূপ ধারণা, বংশ গরিমার নামে ব্যয়বহুল অর্থহীন আচার অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য কুসংস্কার সমাজকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়েগিয়েছিল। হিন্দু মুসলমান সম্পর্কের মধ্যেও তিক্ততা বিরাজ করেছিল।

কাজী ইমদাদুল হক ছিলেন উচুমানের প্রগতিশীল চিন্তাবীদ। তৎকালীন সমাজের বিরাজমান সমস্যা তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল চরম ভাবে। তাই আবদুল্লাহ উপন্যাসে তিনি সামাজিক ব্যাধির একজন নিপুন চিকিৎসকের মত সমাজ বিশ্লেষণ করেছেন এবং রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করে গেছেন বুদ্ধিভিত্তিক উপায়ে। তিনি সমস্যা তুলে ধরে কেবল ক্ষান্ত হননি সাথে সাথে বিজ্ঞান সম্মত সমাধান দেয়ারও চেষ্টা করেছেন সাহসের সাথে।

আপাত দৃষ্টিতে ক্ষুদ্র এই উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’ তার ক্ষুদ্রতাকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। তৎকালীন সমাজব্যাবস্থার যাবতীয় অন্যায় অবিচার আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই উপন্যাসটির বিদ্রোহাত্নক আবেদন বর্তমান সময়ের সমাজ ব্যাবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় অবলীলায়।

আপনি যদি শতধাবিচ্ছিন্ন এই সমাজের একজন সচেতন সদস্য হয়ে থাকেন তাহলে সমাজ সচেতনার প্রথম পাঠ হিসেবে এই উপন্যাসটি পড়তে অনুরোধ করবো আপনাকে।

Related Posts

About The Author

Add Comment