মুসলিম লীগ (১৯৪৭-১৯৫৪): জনবিচ্ছিন্নতা ও পতনের ইতিহাস

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামের ৫৯ তম পাবলিক লেকচার:

বাংলাদেশ স্টাডি ফোরামকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ উপস্থিত সকল বন্ধু, ভাইবোন – যারা আজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন।  আপনাদের সবাইকে আমার বক্তৃতায় স্বাগত, যে বক্তৃতার শিরোনাম আমি রেখেছি – মুসলিম লিগ(১৯৪৭-১৯৫৪)ঃ জনবিচ্ছিন্নতা এবং পতনের ইতিহাস। ২০১৬ সালের প্রেক্ষিতে বসে, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর কেন আমরা পূর্ববঙ্গের ইতিহাসে মুসলিম লিগের মত একটি রাজনৈতিক দলের উত্থান এবং পতনের ইতিহাস আলোচনা করবো, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আমি, আপনি, তথা আমরা সকলে যে জায়গাটিতে বসে আছি, তার স্থানিক তাৎপর্য। ডাকসু ভবন এমন একটি জায়গা, যেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের সমস্ত ক্রান্তিলগ্নে কেন্দ্রীয় নেতারা এসে জড় হতেন – ছাত্রনেতারা কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেটা জানার জন্যে। আমরা জানি, এদেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনে একদম সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে আমাদের ছাত্র জনগন সম্মিলিত ভাবে। আমরা আজ এই মুহূর্তে বসে আছি, এক কথায় বলা চলে আমাদের দেশগড়ার সূতিকাগারে। আমরা আলোচনা করবো এমন একটি সময়কাল নিয়ে যখন আমাদের শত শত বছরের দাসত্বের বন্ধন থেকে আমরা মাত্র মুক্তি পেয়েছি, দেশভাগ ও স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে আমাদের একটি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী অতিধীরে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, তাদের মধ্যে রাজনীতি সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, আমাদের বর্তমান যে ডমিন্যান্ট ন্যাশনালিস্ট আইডেন্টিটি – তথা বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, তার চেতনা মাত্র তৈরি হচ্ছে এবং পূর্ববঙ্গের জনগণ প্রথমবারের মত অনুভব করছে – দেয়ার ভোট কাউন্টস, অ্যান্ড ইট ক্যান মেইক আ ডিফারেন্স।

ইতিহাস বিজেতাদের রচনা। ডমিন্যান্ট ন্যারেটিভে তাই আমাদের দেশের ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্টগুলো হল – ৫২, ৬৬, ৬৯ হয়ে ৭১। এই ন্যারেটিভের একটু দূরবর্তী অবস্থানে নিজেকে রেখে ইতিহাসের লেন্সে চোখ রেখে যদি আমরা তাকাই তবে দেখবো, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আছে। ৫৪ র প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচন তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্নিং পয়েন্ট।

একটা রাজনৈতিক দল, যাদের সাক্ষরে পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় ১৯৪৬ সালে, যে রাজনৈতিক দলটির প্রতি, ঐতিহাসিকরা বলেন – জনগণের দৃষ্টিভঙ্গীতে শুধু শ্রদ্ধা বা কৃতজ্ঞতাই ছিল না, ছিল ভালবাসা এবং অনুরাগের এমন এক মিশ্র আবেগীয় অনুভূতি যা সচরাচর কোন রাজনৈতিক দলের জন্যে দেখা যায় না, কেন সে দলটি মাত্র ৭ বছরের ব্যাবধানে একদম মুখ থুবড়ে পড়বে রাজনীতির ময়দানে? কেন দলটি এদেশের প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ২৩৭টি আসনের মধ্যে মাত্র ১০টি আসন পাবে? এমনকি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও কেন পরাজিত হন অপেক্ষাকৃত অচেনা এক ছাত্রনেতার কাছে?

সামগ্রিকভাবে তিনটি বিষয় মুসলিম লীগের পতন সংক্রান্ত সব ধরনের গবেষণাতেই গুরুত্বের সাথে এসেছে-

এক, ভাষা আন্দোলন(বদরুদ্দিন উমর) ;

দুই, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন(আফজল) এবং

তিন, পাটের দরপতন(পার্ক)।

কিন্তু ডঃ আহমেদ কামাল, যার পিএইচডি গবেষণা অভিসন্দর্ভ এবং তার বর্ধিত এবং পরিমার্জিত সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত বই – ” ষ্টেট অ্যাগেনস্ট দা নেশনঃ দা ডিক্লাইন অফ মুসলিম লীগ ইন প্রি ইনডিপেনড্যান্স বাংলাদেশ” এ প্রাপ্ত তথ্যাবলির ওপর ভিত্তি করে আমার সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি দাঁড়া করানো- তিনি বলেন ,এটা মূল কারন নয়, বরং মূল কারন আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। মুসলিম লীগ সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জনগণের আশাআকাঙ্ক্ষা পূরণে যে গড়িমসি করেছে, তার ফল পেয়েছে তারা ‘৫৪র প্রাদেশিক নির্বাচনে। তিনি বলেন – মুসলিম লিগের পতনের ইতিহাস ব্যাখ্যায় সবাই কেন্দ্রে চোখ রাখে, তথা ঐ যে ওপরে উল্লেখিত বিষয়াদি। ডঃ কামাল নাগরিক জীবনের কেন্দ্রে নয় বরং বাংলার রাজনীতির পরিধি, তথা গ্রাম বাংলার কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে – ‘৫৪র প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লিগের ভরাডুবির সমস্ত কার্যকারণগুলি তুলে ধরেন যার মধ্যে আছে খাদ্য সংস্থান, ভু এবং পানিবণ্টনে ব্যারথতা, আমলাতন্ত্র, জমিদার এবং পুলিশবাহিনীর ঔপনিবেশিক মনোভাব বজায় থাকা এবং পূর্ববঙ্গের নেতাদের রাজনৈতিক সংস্থানে কেন্দ্রীয় মুসলিম লিগের ব্যার্থতা।

 

যে স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম  

১৪ই অগাস্ট ১৯৪৭ সাল মাঝরাত্রে পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা মাত্রই নবজাতকের শিশুর আগমনকে বরন করে নেয়ার মতই আজান দিয়ে বরন করে নেয়া হয় সদ্যস্বাধীন এই রাষ্ট্রটিকে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে জিন্নাহ বলেন –

“এই মৌলিক নীতির উপর ভিত্তি করে আমরা আমাদের রাষ্ট্রের সূচনা করছি যে – পাকিস্তান রাষ্ট্রের সকল নাগরিক পরস্পর সমান মর্যাদার অধিকারী… জাতীয় জীবনে চলার পথে আমাদের সর্বদা এটা মনে রাখতে হবে। হিন্দু অথবা মুসলিম কারো প্রধান পরিচয় হবে না। ধর্মের ভিত্তিতে নয়, ব্যাক্তিগত বিশ্বাস অবিশ্বাসের ভিতিতে নয় বরং মানবিকতার সূত্রে আমরা সকলে একত্রে গ্রন্থিত হব, এক কাতারে এসে দাঁড়াবো।”

জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী অনেকের মতে স্বাধীনতার সময়টি ছিল “ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাসের সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্ত”, কেউ কেউ আবার একে আখ্যায়িত করেন “পাকিস্তানী বিপ্লব” হিসেবে। নানা লেখা এবং বক্তৃতায় অনেকে এই বিজয়কে উদ্ধৃত করেন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশদের কাছে নবাব বাহিনীর পরাজয়ের পর থেকে নিয়ে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে – তার সবগুলোর সামষ্টিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।  কবির ভাষায় পাকিস্তানকে উল্লেখ করা হয় ‘দা ল্যান্ড অফ ইটারনাল ঈদ’ হিসেবে।

তাজউদ্দীন আহমেদ চল্লিশের দশকের শেষদিকে একজন নব্য মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক। তার ডায়রি থেকে আমরা জানতে পারি, ঢাকাকে ঢাকাবাসীরা দিনরাত খেটেখুটে তোরণের পর তোরণ খাটিয়ে- আলোকসজ্জায় ভাসিয়ে দিয়ে একদম ঝলমলে করে সাজায়- স্বাধীনতার আনন্দ উৎযাপনে। রাত্রিতে সরকারি বেসরকারি – সমস্ত দালানকোঠায় আলোকসজ্জার ব্যাবস্থা করা হত, আতসবাজির ঝলকে আলোকিত এবং প্রকম্পিত হত সদ্য প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা লাভ করা ঢাকা শহরের রাতের আকাশ। স্বাধীন দেশপ্রাপ্তির ছুটি উৎযাপনে মানুষের ঢল নামত রাস্তায়, ট্রাকের পীঠে অথবা হাতির পীঠে চেপে তারা রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়ে স্ফূর্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতো। দিনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল হিন্দু মুসলিমের সম্মিলিত মিছিল নিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কে সমবেত হওয়া যেখানে সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তৃতা দিতেন।

সদ্যভূমিষ্ঠ রাষ্ট্রটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আশা ছিল – তারা স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে নিজের জায়গা আবাদ করতে পারবে, জমিদারদের অত্যাচার থাকবে না, পুলিশ পেয়াদাদের দ্বারা গুম-খুন- লুণ্ঠিত – নির্যাতিত হবার ভয় থাকবে না। এখান থেকেই ক্রমশ মোহভঙ্গের সূত্রপাত। কিন্তু তার আগে দেখে আসা যাক যে দলটির হাতে পাকিস্তান চালনের ভার পড়লো, তারা কেমন ছিল।

১৯০৬ সালে জন্ম নেবার পর থেকে মুসলিম লিগের নেতাকর্মীদের মধ্যে খুব একটা কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি ১৯৩৫ সালেও মুসলিম লীগ ছিল একটি ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক দল। জিনকিনসের ভাষ্য মতে ১৯৪০ সালেও তাদের পক্ষে মুসলমানদের জন্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন কল্পনাতেও ছিল না।

দল হিসেবে মুসলিম লীগের কখনোই কংগ্রেসের মত জনগন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী দিনগুলোতে মুসলিম লীগের প্রধানতম চেষ্টাই ছিল ইসলামভিত্তিক জাতীয়তার চেতনায় দক্ষিন এশিয়ার মানুষদের উদ্বুদ্ধ করে পৃথক একটি পরিচয়, পৃথক একটি রাষ্ট্র চাওয়া। মুসলিম লীগ কখনো দল হিসেবে ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার কট্টর সমালোচকও ছিল না, আবার নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠনআঙ্গিক কি হবে এটা নিয়েও তারা বিশেষ কোন আলোকপাত করে নি কখনো।

১৯৪৩ সাল পর্যন্ত মুসলিম লীগের কোন প্রাদেশিক বা জেলাভিত্তিক শাখা ছিল না। ১৯৪৪ সালের ৯ এপ্রিলে ধাকার ১৫০ মোগলটুলিতে মুসলিম লীগের পূর্ববঙ্গ শাখার উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা জেলা মুসলিম লীগ ছিল “নবাব বাড়ি”তে, ঢাকাস্থ নবাব পরিবারের এখতিয়ারভুক্ত। ওতে সাধারণ মানুষের তেমন আসাযাওয়া ছিল না। মেরামতকারীর পরিভাষা ব্যাবহার করলে, ঢাকা জেলা মুসলিম লীগের কাজ ছিল কেবল নিজেদের মধ্যে ষড়যন্ত্র করা, নিজেদের মধ্যে দলাদলি মারামারি ,নিলাম ডাকা এসবই।

লাহোরে ২৩ মার্চ ১৯৪০ সালের সমাবেশে এই পৃথক জাতিস্বত্বার জন্যে পৃথক রাষ্ট্রের দাবি পরিষ্কার ভাবে উত্থাপিত হয়। ১৯৪০ সাল থেকে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা বিপুলাকারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৩০ সালেও যে রাজনৈতিক দলটি ছিল মূলত কাগজে কলমেই- ১৯৪৪ সালে এসে সেই রাজনৈতিক দলটির পাঁচ লাখ নিবন্ধিত সদস্য সংখ্যার বড়াই নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করে সবাইকে। বেঙ্গল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেনের মতে ১৯৪৬ সাল নাগাদ মুসলিম লীগের সদস্য সংখ্যা দশলাখ অতিক্রম করে। যদিও উক্ত রাজনৈতিক দলের ক্রমবর্ধমান সদস্য সংখ্যা দলটির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বা সদস্যদের মধ্যে শক্তিশালী গণসংযোগ নির্দেশ করে না। ওটা ছিল শুধুই তাদের পূর্ব পাকিস্তানের আমজনতার মাঝে জনপ্রিয়তা পরিমাপের একটি মাপকাঠি মাত্র।

১৯৪৬ সালের ভোটে মুসলিম লীগ তাদের কথার সত্যতা প্রমাণ করলো। প্রমাণ করলো যে মুসলিম লীগই ভারতীয় মুসলমানদের মুখপাত্র রাজনৈতিক দল।  বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তাদের সমর্থনের কোন অভাব ছিল না। ঐ নির্বাচনে তারা মুসলমানদের জন্যে পৃথকভাবে সংরক্ষিত ১২১টি সিটের মধ্যে ১১৩টি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যু হলে দলের অভ্যন্তরের এমন কিছু শক্তি আত্মপ্রকাশ করে যা দলের ভাবমূর্তি এবং কার্যকারিতা বিনষ্ট করে, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে। জিরিং এর ভাষ্য মতে – সে ছিল এক রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রের মত পরিস্থিতি। পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই এর তিনটি ধারা তৈরি হয়ে যায় – এক, ঢাকাস্থ নাজিমুদ্দিনের ধারা; দুই, আবুল কাশেম ফজলুল হকের ধারা; তিন, হোসেইন শহিদ সোহরাওয়ার্দির ধারা। ঢাকার গ্রুপটি ছিল রক্ষণশীল ধারা যাদের প্রধান চিন্তা ছিল জমিদার এবং জমির মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষা। সোহরাওয়ার্দির দলটি ছিল আধুনিক মনস্ক। তারা স্বাধীনতাউত্তর পূর্ববঙ্গের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে দলের সাম্প্রদায়িক চেতনাকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিল। ফজলুল হক ছিলেন গ্রামীণ রাজনীতিবিদ। তার ধারার সাথে সংযুক্ত ছিল নানা পেশার পেশাজীবী মানুষ। এছাড়াও ছিল মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে আসাম মুসলিম লীগ। পূর্ববঙ্গের প্যাঁচঘোঁচের ধারাবিভক্তির রাজনীতিতে আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে তার রাজনৈতিক ধারার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। দেশভাগের পর কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের স্নেহপুষ্ট হয়ে নাজিমুদ্দিনের ধারার মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গের ক্ষমতায় বসে।

ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সনে মুসলিম লীগের করাচী কাউন্সিলে গৃহীত অনেক সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট হবার সম্ভাবনার দ্বার রুদ্ধ করে দেয়া হয়।

মুসলিম লীগের সমস্ত কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল ছিল তিনটি – এক, মুসলিম লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানের কেন্দ্র আহসান মঞ্জিল; দুই, মুসলিম লীগের সমস্ত কার্যক্রম প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বে থাকা দৈনিক আজাদ পত্রিকাটি এবং তিন, মুসলিম লীগের অর্থনৈতিক ভিত্তি ইস্পাহানী পরিবারের বাড়ি। খুব সংক্ষেপে চিত্রিত করতে গেলে এই হবে উত্তর উপনিবেশিক পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতা হাতে পাওয়ার প্রাথমিক দিনগুলোতে মুসলিম লীগের চেহারা।

কি অবস্থায় পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ দেশটিকে পায়?

এ বছরের গোড়াতেই, তথা ৪ জানুয়ারি সমস্ত দেশে একটি বৃহৎমাত্রার ভুকম্পনের মাধ্যমে নূতন বছরের যাত্রা শুরু হয়। মুসলিম লিগের শাসনামলের শুরুর সময়টা ছিল অনেকটাই সেরকম।

১৫ই অগাস্ট ২০১৪ থেকে যাত্রা শুরু করা নূতন রাষ্ট্রটিতে চারকোটি বিশলক্ষ জনগণের ২.৯৪ কোটি মুসলিম, ১.১৭ কোটি হিন্দু, প্রায় ৫৭ হাজার খৃষ্টান এবং ১১৭৯ জন শিখ জনগোষ্ঠী ছিল।প্রতি বর্গ মাইলে ৭৭৫জন মানুষের বসবাস, পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি মাত্র ৫০০মাইলের সড়কপথ, এবং এঁকেবেঁকে বয়ে চলা অগণিত নদীনালা খালবিলের ওপর ভিত্তি করেই পুনর্গঠন করতে হয় এই রাজ্যের শিল্প ও ব্যাবসাবাণিজ্য।

ভারতের ৪০০টি তুলা কারখানার মধ্যে মাত্র ১০টি ছিল পূর্ব বাংলায়। বঙ্গপ্রদেশের ১০৬টি পাটের কারখানা মাত্র একটি ছিল এ অঞ্চলে।ছিল না কোন লোহা-ইস্পাত-কাগজ-রাসায়নিক দ্রব্যাদির কারখানা, অথবা কয়লার খনি। মাত্র ৪৯টি মৌসুমি পাটকল (তাও ২০ শতাংশ কার্যকরী), ৫৮টি সংক্ষিপ্ত ধানের মিল, চারটি চিনিকল, ছয়টি টেক্সটাইল মিল এবং একটি সিমেন্টের ফ্যাক্টরি নিয়ে এই প্রদেশের বানিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন এবং ব্যাবসায়িক লেনদেনের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনা কার্জের শুরুর দিনগুলো সরকারী নথিতে অধিভুক্ত আছে- “সমস্যা সংকুল সময়” হিসেবে। নূতন শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসীন হবার মাত্র পক্ষকাল পূর্বে চিটাগং এবং নোয়াখালীর উপর দিয়ে বয়ে যায় বিধ্বংসী বন্যা, যাতে আক্রান্ত হয় ৫০০ বর্গ মাইলের এলাকার অভ্যন্তরীণ প্রায় দশলক্ষ মানুষ। হাজার হাজার ঘরবাড়ি একদম বিধ্বস্ত হয়, গৃহপালিত পশুপাখি বানের তোড়ে ভেসে যায়, ফসল ধ্বংস হয়। বন্যার রেশ কমতে না কমতেই পূর্ব বাংলার দক্ষিণ উপকূল জুড়ে কক্সবাজার এলাকায় বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন, যাতে আক্রান্ত হয় একলক্ষ মানুষের জীবন।

কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকা ভারতের সমস্যা সংকুল প্রদেশ গুলির উদাহরণ দিতে তুলনা টেনে আনে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে- আমাদের কিছু কিছু প্রদেশ তাদের যাত্রা শুরু করেছে – পূর্ব পাকিস্তানের মত দেউলিয়া এবং প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়াই।

খাদ্য – ও দুর্ভিক্ষের রাজনীতি

মুসলিম লীগের পতনের পিছে প্রধান যে কয়টি কারন ডঃ কামাল উল্লেখ করেন, তার প্রথমটি মুসলিম লীগের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যারথতা এবং দুর্ভিক্ষের অবস্থা আনায়ন। ধরুন আপনি সাংঘাতিক ক্ষুধার্ত। না খেয়ে আছেন দিনকয়েক। আমার দায়িত্ব আপনার খাদ্যের সংস্থান করার। আপনি আমার কাছে যতবারই আমি আপনাকে ক্ষুধার প্রকারভেদ বোঝাচ্ছি। বলছি – খালি পেটের ক্ষুধার কথা চিন্তা করলে হবে? শারীরিক ক্ষুধার পাশাপাশি আছে মানসিক ক্ষুধা, আত্মিক ক্ষুধা, এগুলোরও তো দেখভাল করতে হবে নাকি? আপনি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারবেন ব্যাপারটা?

একজন মুসলিম লীগের সদস্যই সংসদে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন যে তিনি যে দেশের দুর্ভিক্ষের কথা স্বীকার করতে চান না – এর কারণ কি এটা যে দুর্ভিক্ষের ঘোষণা দেয়া মাত্রই সরকারের তরফ থেকে ত্রাণ সরবরাহ করা আরম্ভ করতে হবে , যেটা তার পক্ষে সম্ভব না? জবাবে মন্ত্রী আবার সেই শব্দের অর্থগত তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন – দুর্ভিক্ষ শব্দটির বেশ কিছু অর্থ আছে। প্রথম পর্যায়ে সেটা খাদ্য সরবরাহ নিয়ে একটি অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি, দ্বিতীয় পর্যায়টি হল খাদ্যের অভাব, আর তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে সেটাকে আক্ষরিক অর্থে দুর্ভিক্ষ বলা চলে। এর চেয়ে বড় নির্মম রসিকতা আর কি হতে পারে?

মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে ৫৪র নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্তফ্রন্ট প্রচার করে কৃত্তিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির অভিযোগ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে, অর্থাৎ ১৯৪৩ সনের দুর্ভিক্ষ জনজীবনে এমন নাড়া দিয়ে গিয়েছিল যে, মুসলিম লীগ সরকার সরাসরি দমনপিরন চালাত যে দুর্ভিক্ষের নাম মুখে আনত তাদের ওপর। সমস্ত পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল খাদ্যের অভাব সংশ্লিষ্ট কোন খবর প্রচার করার ব্যাপারে। ১৯৪৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর আত্রাই অঞ্চলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী মফিজুদ্দিন আহমেদ বলেন – “যারা এ কথা বলে যে এ দেশে বর্তমানে ১৯৪৩ সালের মত খাদ্য সংকট বিরাজ করছে তারা এ জাতির নৈতিক দিককে আহত করতে চায়। তারা এই রাষ্ট্রের শত্রু।”

১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, ময়মনসিং, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চিটাগং এবং সিলেট জেলায় খাদ্যশস্যের ব্যাপক অভাব পরিলক্ষিত হয়। ৪৭ সালের শেষ দিকে, সরকারী তহবিলে নূতন খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মৌজুদ জমা পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু ‘৪৮এর মাঝামাঝিতে এসে আবার তার দাম বাড়তে থাকে।

সরকার এবার নূতন পন্থা চালু করে। সরকারের তরফ থেকে নূতন করে জানানো হয় বড় কৃষক যারা, যাদের ফসলের চাষ এবং উৎপাদন অনেক বেশী – তাদের বাধ্যতামূলকভাবে একটি সরকারী ট্যাক্সের আওতায় আনা হবে। “দা ইস্টবেঙ্গল লেভি অফ ফুড গ্রেইনস অর্ডার ১৯৪৮” নামে প্রস্তাবিত এই আইন ঢাকা গেজেটের বিশেষ সংখ্যায় (১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৮) প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয় রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিং (কিশোরগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল ছাড়া), সিলেট, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া এবং বাকেরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) – এই সমস্ত উদ্বৃত্ত ফসলের অঞ্চলকে এই আইনের আওতায় আনা হবে। খাদ্যশস্যের অভাবে ভুগতে থাকা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় ফরিদপুর, পাবনা, চিটাগং, নোয়াখালী, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বর্তমান কুমিল্লা অঞ্চলকে।

সরকারী ঘোষণার অধীনে সমস্ত অবস্থাসম্পন্ন কৃষক ও ফসল উৎপাদনকারীদের (অবস্থাসম্পন্ন কৃষক হিসেবে এমনসব কৃষক পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়, যারা ১০ একর বা তারও অধিক জমিতে পরিবারের সদস্য বা দিনমজুর ভাড়া করে জমিতে ধান বা অন্যকোন ফসল চাষ করাতো) তাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দিতে বলা হয় উক্ত ট্যাক্স। যে ভাষা সরকারী ঘোষণাপত্রে ব্যাবহার করা হয়, তা ছিল খুবই স্বৈরতান্ত্রিক। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার বদলে সরকার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে এই ঘোষণা।

এছাড়াও কর সংগ্রহের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সীমা ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে নালিশ করা হয় যে –  অধিকাংশ ফর্ম দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মনগড়া তথ্য দিয়ে নিজেরাই পূরণ করে খাজনা ধার্য করে, ফলশ্রুতিতে দেখা যায় অনেক মৃতব্যাক্তির নামেও খাজনা প্রদানের দায়ভার পড়েছে। এক অঞ্চলে থাকে, অথচ অন্য জায়গায় ফসল চাষ করেছে – এমন চাষিদের ভাগে দ্বিগুণ খাজনা পড়ে। যেসব অঞ্চলে খাজনা আদায়ের খসড়া তালিকা তৈরি হয়, সেসব তালিকা ছিল ভুলে ভরা। অন্যান্য অনেক ইউনিয়নে খাজনা জমা দেবার দিন শুরু হবার আগে ঠিকমত খাজনা দেবে যারা তাদের তালিকাও ঠিকমত প্রস্তুত করে শেষ করা হয় নি। ফলস্বরূপ- খাজনা দেবার সময় শুরু হলেও অতি সামান্য কয়েকজনই ঠিকঠাকমত খাজনা আদায় করে শেষ করতে পারে। আর যারা তালিকার মধ্যে সমস্যা থাকার কারণে সময়মত সরকারী কোষাগারে খাজনা জমা দিতে পারে নি – তারা যে কোর্টে অভিযোগ দাখিল করবে সময়ের স্বল্পতায় তাও সম্ভব হয় নি। যারা অভিযোগ দাখিল করার সুযোগ পান, তাদের কেস কোন রকম তদন্ত ছাড়াই মুলতুবী রাখা হয়।

উৎকোচ দিলে খাজনা মাফের অভিযোগ ওঠে।  যশোর জেলার নড়াইলের একটি ইউনিয়নের খতিয়ান পাওয়া যায় যেখানে উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদনকারী সকল কৃষক মিলে খাজনা আদায়কারি অফিসারকে ৫০০ রুপি ঘুষ দিলে পরে সে বছর সে ইউনিয়নের কেউই উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদন করেনি, তাই কাউকেই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করা লাগবে না – এমনটা বলে ঘোষণা দেয়া হয়।

যে ভাষায় সংসদে তারা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এ সকল সরকারী কর্মকর্তার পক্ষে সাফাই প্রদান করে, তা ছিল খুবই মজাদার। একজন সাংসদ অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে বলেন যে তাদের “পুত্রসম” – দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তারা কোনভাবেই খাজনা নিয়ে দুর্নীতি করতে পারে না! এমনকি মন্ত্রী নিজেও এই অভিযোগকে নিতান্ত মামুলি একটা ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, যে সমস্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে তারা তার পুত্র, আত্মীয়, প্রতিবেশীর মত।

স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে নিয়ে ১৯৪৯ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সর্বমোট ৪২ জন সিভিল সাপ্লাই অফিসারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়, তার মধ্যে ২৭ জনকে উক্ত ডিপার্টমেন্ট থেকেই সাজা দেয়া হয়। ৪৫০ টি কেস কোর্টে ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল, ৩০৩টি কেস ছিল পুলিশের কাস্টাডিতে।

কৃষকদের কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল নিজেদের ফসল নিজেদের খেয়াল খুশী মত খরচ করবার সুযোগ, সরকারের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল নূতন রাষ্ট্র গঠনের নিমিত্তে ত্যাগ তিতিক্ষা। কিন্তু সেই সাধারণ কৃষকেরা স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকারের কাছেও উদ্বৃত্ত ফসল জমা দিতে চায় নি। তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে ছিল কোন স্বৈরাচারী দাবীর সামনে শির নত না করা।

কার্ল ভন ভরিসের মতে পূর্ব পাকিস্তানের বেশীর ভাগ মানুষের কাছেই এই “জাতীয় স্বার্থ” ব্যাপারটা যে কি – সেটাই ছিল অস্পষ্ট। প্রত্যহকার টানা পোড়েনে নিজের ব্যাক্তিগত সুবিধা অসুবিধার চেয়ে অস্পষ্ট “জাতীয় স্বার্থ” – ব্যাপারটাকে বড় করে দেখবে এরকম দৃষ্টান্ত ছিল খুবই কম।

১৯৫০ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোপালস্বামী আয়াঙ্গের বলেন যে ১৯৪৭ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়ে ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সর্বমোট ৪,৫০,০০০ মুসলমান ভারতের আসামে প্রবেশ করেছে। চিটাগং মুসলিম লীগের এক সাংসদের প্রশ্নের জবাবে সরকার স্বীকার করে যে ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সর্বমোট ১০,০০০ জন বাঙ্গালী বার্মায় চলে গেছে। কারণ বার্মার আকিয়াব শহরে খাদ্যশস্যের ছড়াছড়ি এবং সেখানে আবাসস্থলের ও অভাব নেই। কাজেই দেশত্যাগকৃত মানুষের সর্বমোট সংখ্যা খুব বেশী না হলেও সংখ্যাটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

এই ঘটনাটি পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে “পায়ের ভোট” – নামে অভিহিত করা হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ব্যালট পেপারে বা আন্দোলন সংগ্রামের দ্বারা সরকারের বিরোধিতা করার সুযোগ না পেয়ে হাতের বদলে পা দিয়ে ভোট দেয়, অর্থাৎ দেশত্যাগ করে।

খাদ্য ব্যাবস্থাপনার ক্রমাগত দুর্গতি মুসলিম লীগের নেতাদের একদিকে যেমন আত্মশ্লাঘায় আঘাত করে, তেমনি তাদের মনে দেশে বলশেভিক বিপ্লবের আশঙ্কা তৈরি করে। মার্চ ১৯৫২’র অধিবেশনে মুসলিম লীগের এক সাংসদ বলেন – যে কমিউনিস্টদের ভয় তাদের মনে সদা বিরাজমান, তাদের আর মস্কো থেকে আমদানি করে আনতে হবে না। দেশের অর্থনীতির এই অবস্থা চলতে থাকলে সমাজের ভুখা-নাঙ্গা শ্রেণীর মানুশগুলিই একএকটি পাক্কা কমিউনিস্ট হয়ে উঠবে।

জনগনের ভুবণ্টন এবং কৃষি ব্যবস্থাপনা

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারন হিসেবে আসে – ভুবন্টন এবং কৃষি ব্যবস্থাপনায় মুসলিম লীগের ব্যারথতা। স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের সাথে রাজনৈতিক স্বাধীনতার যে আশা জন্মেছিল দেশটির উপজাতি, দরিদ্র নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় এবং দরিদ্র মুসলিমদের মধ্যে তা তিক্ততায় পর্যবসিত হয় দ্রুততার সঙ্গে। অজানা যে শঙ্কা তাদের মধ্যে কাজ করছিল, তা বাস্তবে পরিণত হয় স্বাধীনতার চাকা এক বছর গড়াতে না গড়াতেই। সরকারের দেশ গঠনের পরিকল্পনার সাথে সামাজিক ও ভৌগলিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত হানে। স্বার্থে আঘাত লাগার ফলশ্রুতি গড়ায় মিছিল মিটিং থেকে নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম- প্রতিরোধ পর্যন্ত। ১৯৫০এর শুরু থেকে ১৯৫১র মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে এ অরাজক অবস্থা বিরাজ করে।

কমিউনিস্ট কর্মী এবং ইতিহাসবিদেরা এই আন্দোলনের নাম দেন – হাজং, নানকার এবং নাচোল বিদ্রোহ। হাজংরা ময়মনসিংএর উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী। নানকারেরা ছিল কাজের বিনিময়ে থাকা খাওয়ার বরাদ্দ পাওয়া সিলেটের অধিবাসি। আর নাচোল বিদ্রোহের নামকরণ করা হয় রাজশাহী জেলার নাচোল পুলিশ স্টেশনের ওপর যেখানে ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে সাঁওতাল এবং স্থানীয় দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে পুলিশের সংঘর্ষ বাঁধে। এই সমস্ত অঞ্চলই ছিল ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে।

প্রতিক্রিয়াশীল ইতিহাস লিপিবদ্ধকারীরা এই বিদ্রোহগুলির ইতিহাস সংকলন করতে গিয়ে একটি বড় ধরণের ভুল করেন। এই বিদ্রোহগুলি- যা সরকারীভাবে কমিউনিস্ট পার্টির কুকীর্তি বলে চালানো হচ্ছিল, এগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তর রাজনীতির অংশ হিসেবে না ধরে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে একটি চটজলদি উপসংহারে পৌঁছানোর চেষ্টা করা। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চিন্তার ধ্বজাধারীরা এই বিদ্রোহীদেরকে সমাজের একদম প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের কাতারে ঠেলে দেয়।

তেভাগা আন্দোলনের মুখ্য দাবী ছিল – জমির মালিক এবং বর্গাচাষিদের মধ্যে উৎপন্ন ফসলের ভাগাভাগি সমান সমান হবে না। চাষিরা পাবে উৎপন্ন ফসলের দুই তৃতীয়াংশ আর জমির মালিক পাবে এক তৃতীয়াংশ।আন্দোলন চলা কালে প্রায় পাঁচ হাজার আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়, পঞ্চাশজনের মত আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়। অপরদিকে কোন জমিদার বা জোতদারের মারা গেছে বা তাদের কাচারিঘরে আগুন দেয়া হয়েছে – এমনটি শোনা যায় নি।

নানকার বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের অতিরিক্ত গায়ে খাটানোর যে ছক জোতদার এবং জমিদারেরা কষেছিল- সেটা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা। এই পদ্ধতিতে প্রত্যেক বর্গাচাষিকে মাসে পাঁচ থেকে সাতদিন পর্যন্ত বিনিমাগনার খাটুনি দিতে হত জোতদার বা জমিদারের বরাদ্দকৃত জমিতে। এই রুটিনওয়ারী কাজ করাটা নানকারদের জন্যে অনেক কঠিন হয়ে যায়। তাদের প্রত্যেকের যে ছোট্ট একটুখানিক জমি ছিল তাতে মোটেও সময় দিতে পারতো না বিধায় তার ফলনও একদম কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে চলতে গিয়ে যদি কোনভাবে ভূস্বামীর জমিতে বরাদ্দ সময় অনুযায়ী কাজ করতে নানকারদের কেউ ব্যার্থ হত তবে তার ওপর নেমে আসতো শাস্তির খাঁড়া। দুস্থ নানকারদের পরিবার থেকে স্ত্রী-কন্যা-ভগ্নীদের জমিদার এবং ভূস্বামীর পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সম্ভ্রমহানী করতো অহরহ।

তেভাগা আন্দোলনের দাবী মেটানোর সাথে জমিদারী প্রথার রদ, তানকা, নানকার পদ্ধতির বিলুপ্তিতে সরকারের গড়িমসির ফলে জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছিল ক্রমশ। ভূস্বামীর স্থাবর সম্পত্তির ওপর বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায়। ময়মনসিংএর উপজাতি  হাজং, দালু এবং দরিদ্র মুসলিমেরা মিলে জমিদারের গোলাঘরে লুটতরাজ চালায়। তারা নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে এইসব লুটপাটের কাজ করতো। জমিদারদের কাছে তারা ছিল সন্ত্রাসী দল।

বিদ্রোহীরা প্রায় ৪০০ গ্রাম জুড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে সে সমস্ত অঞ্চলের জমি ছিনিয়ে নেয় এবং দরিদ্র কৃষকদের আবাদ করার জন্যে বিলি করে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিবিধ প্রতিষ্ঠান থেকে ফসল ছিনিয়ে নিয়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িত জনসাধারণের মধ্যে বণ্টন করা হয়। উপনিবেশিক সরকারের ছায়া বহন করে চলা সরকারী কোর্ট কাচারি অমান্য করে তারা জনতার আদালত স্থাপন করে। জমিদার এবং সরকারকে অতিরিক্ত কোন খাজনা দেয়া থেকে তারা বিরত থাকে।

রাজশাহীর নাচোল এবং নবাবগঞ্জ এলাকায় সাঁওতালী আদিবাসী কৃষকেরা তাদের নেতা মাতলা সর্দার এবং কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ইলা মিত্র ও তার স্বামী রমেন মিত্রর অধীনে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

পুলিশের সাথে সাঁওতালীদের সাথে একটি অ্যামবুশে সাঁওতাল কৃষকেরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং তাতে পাঁচ পুলিশ অফিসার মারা যায়। ঘটনার ফলাফল হয় ভয়াবহ। ঐ অঞ্চলে শতশত পুলিশ পাঠানো হয় যারা পুরো অঞ্চল জুড়ে তাণ্ডব চালায়। আদিবাসীদের ওপর গুলি চালানো হয়, ২২ জন আদিবাসীকে তারা পিটিয়েই মেরে ফেলে। অসংখ্য সাঁওতালী আটক হয়। তাদের ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন। ফলশ্রুতিতে শতশত সাঁওতালী আদিবাসী এবং দরিদ্র হিন্দু উক্ত স্থল ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যায়। ইলা মিত্রও অন্যান্য সাঁওতালদের সাথে আটক হন। পরবর্তীতে কোর্টে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে জেল হাজতে তারওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

সরকার এবং জমিদার – উভয়পক্ষই আবিষ্কার করে, পূর্ব পাকিস্তানের গোত্রবদ্ধ এ সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আন্দোলন থামিয়ে দেবার সবচে মোক্ষম পদ্ধতি হল জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে দেয়া। সরকার এবং মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে বলে বেড়াতে লাগলো – “খাজনা- তানকা এগুলো দিতে না চাওয়া বাহ্যিকভাবে ভালো মনে হলেও এর ফলে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে”

ফলশ্রুতিতে প্রচুর মুসলমান পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু- আদিবাসী এমনকি দরিদ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ করে তাদের সম্পত্তি লুটপাট করে। দেখা যায় ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় যে পরিমাণ হিন্দু ভারতে দেশান্তরী হয়, ১৯৫০এ এসে তারচেয়ে বেশী সংখ্যক সংখ্যালঘু ধর্মালম্বিরা দেশত্যাগ করে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মুসলিম লীগ সরকার কতটা ব্যার্থ ছিল – এটা তারই প্রমাণ।

যাই হোক, ১৯৫০ সালের ১৬ই ডিসেম্বর, আড়াই বছরের দাবী দাওয়া, আন্দোলন সংগ্রামের শেষে পূর্ব বাংলা ভূমি মালিকানা এবং কৃষক অধিকার আইন পাশ হয়। কিন্তু সেই আইন কার্যকর করতে করতে আরও ছয়মাস লেগে যায়। তানকা পদ্ধতিও একই সাথে বিলুপ্ত হয়, কিন্তু তাতে কোন লাভ হয় নি। হাজংদের জোরপূর্বক তাদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয়ে গিয়েছে ততদিনে। ভারত থেকে আসা মুসলিম অভিবাসীরা তাদের জমিজমা দখল করে নেয়। তানকা বাতিলে বিজয় উৎসব করার জন্যে তেমন হাজং আদিবাসী আর বাকি থাকে নি।

পানির রাজনীতি

মুসলিম লীগের পতন ডেকে আনে তাদের তৃতীয় যে ভুল, তা হল পানি ও জলাশয়ের সংস্কারে গড়িমসি।  বঙ্গপ্রদেশের নদীপথের নাব্যতা সংরক্ষণ, রাস্তাঘাট সংস্কার, পুল ও বাঁধ নির্মাণ, খাল খননসহ জনহিতকর কাজগুলি নিয়ন্ত্রণে মুঘল আমলে “চৌকি” এবং “পুলবন্দী দফতর” ছিল। ব্রিটিশরা সেটা উঠিয়ে দেয়। জমিদারেরাও পুলবন্দীর দায়িত্ব থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। স্থানীয় হাট-বাজার চলা কালে সেখান থেকে হাট-বাজারের সংরক্ষণ এবং নদীপথের নাব্যতা সংরক্ষনের জন্যে যে টোল তোলার ব্যাবস্থা ছিল সেটা বন্ধ করে দেয়া হয়।

ব্রিটিশরা তো সেচ কাজের ব্যাপারে কোন ধারণাই রাখতো না। যুদ্ধের পর এসকল খাল-বিল অযত্নে পড়ে থাকতে দেখে তারা ভেবেছিল শুধুমাত্র যাতায়াতের কাজেই এ সমস্ত জলপথ ব্যাবহৃত হয়। কাজেই ও নিয়ে তারা আর মাথা ঘামায় নি। এত বিশাল সংখ্যক জলাভূমি সংরক্ষনে যে একটা বিস্তারিত এবং যত্নশীল পরিকল্পনার প্রয়োজন হতে পারে তা ব্রিটিশ রাজের শেষ দিন পর্যন্ত মাথায় আসে নি।

কিন্তু কৃষিকাজের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পানি সেচের কাজে প্রয়োজন পড়তো নদী থেকে পানি আনার। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগন নবগঠিত মুসলিম লীগ সরকারের কাছে সাহায্য চাইলে মন্ত্রী আবার ঘুরে ফিরে তাদের স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হবার পরামর্শ দেন। কারণ মূল নির্দেশনাটা ছিল সংবিধানেই। সংবিধানের ২৫ নম্বর সেকশনের বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী ডিসট্রিক্ট কালেক্টর, তথা জেলা প্রশাসকের হাতেই ছিল বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত সমস্যায় সকল সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার। তদুপরি ব্রিটিশ আমলে গড়ে তোলা সমস্ত রেল লাইন এবং পাকা রাস্তা পানির স্বাভাবিক গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে বন্যার সৃষ্টি করে।

মাদারশায় হালদা নদীর বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হাজার লোকের জমায়েতে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্তটি ছিল হালদার নদীর পানি ব্যাবস্থাপনা সংক্রান্ত সরকারী যে সিদ্ধান্ত, তার সাথে সাংঘর্ষিক। মাদারশার জনগণের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের একটি রাজনীতি সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। তারা সংশ্লিষ্ট বিশয়ক মন্ত্রীকে একদম দাওয়াত দিয়ে এনে নিজেদের এলাকার দুঃখ-দুর্দশা প্রদর্শন করে এবং চট্টগ্রামের হালদা নদীতে আর একটি বছর বন্যা পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকার অর্থই ছিল আরও একবছরের বন্যায় অন্তত তিনটি থানার পুরো এক বছরের ফসল ধ্বংস হওয়া এবং জনদুর্ভোগ।

মৌসুমি বায়ু চলে গেলে, সেপ্টেম্বর মাসে আক্রান্ত এলাকার লোকজনের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। ঢেঁড়া পিটিয়ে এ সংবাদ জানিয়ে দেয়া হলে এক বিশাল গণজাগরণের সৃষ্টি হয়। সরাসরি প্রশাসনকে এড়িয়ে গিয়েই নিজেদের মত করে বন্যা পরিস্থিতি উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হয়।

সরকারী নথিপত্রে পাওয়া যায় যে বুঝিয়ে শুনিয়ে জনগণকে রাজি করতে ব্যার্থ হলে সরকার বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেয়। উক্ত এলাকায় তারা ১৪৪ ধারা জারি করে। জনগণ তা ভঙ্গ করলে পুলিশ গুলি চালায় এবং দশ ব্যাক্তি এতে নিহত হয়। তাদের একজন ছিল আবুল খায়ের চৌধুরী- ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার এবং স্থানীয় স্কুল কমিটির সম্পাদক। আরেকজন ছিলেন আব্দুল জব্বার বলি- স্থানীয় মুসলিম লীগের কর্মী। একই বছরের ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া অঞ্চলের ইয়োচিয়া খাল পুনঃ খননের সময় পুলিশের গুলিতে ১১ জন সাধারণ মানুষ নিহত হয়। সেচ মন্ত্রণালয় এবং জনগণের মধ্যে ইয়োচিয়া খাল পুনঃখনন সংক্রান্ত বিরোধ সৃষ্টি হয় পুনঃখননের স্থান নিয়ে।

খাদ্য, ভুবণ্টন এবং পানির – সংস্কার ও বণ্টনের পর আরও কিছু আনুসাঙ্গিক বিষয় ১৯৫৪র প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের পতন ত্বরান্বিত করে। উক্ত ইস্যুগুলি নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করা চাইছি। তন্মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দুর্বৃত্তায়ন, পুলিশের ঔপনিবেশিক মেজাজ বজায় রাখা, জমিদারদের ক্ষমতা সঙ্কুচিত করে আনায় প্রাথমিক ভাবে মুসলিম লীগের গড়িমসি এবং বামপন্থীসহ পূর্ববঙ্গের অন্যান্য বড় নেতাদের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রাপ্য মর্যাদাটুকু না দেয়া।

প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণ

সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশ পাকিস্তানে মুসলিম লিগের নেতারা দেশ পরিচালনার অনেক কিছুই সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তাদের সাহায্য করার জন্যে পাঞ্জাব থেকে ছোট একটি বিমানে করে একদল লোক কোলকাতা দমদম এয়ারপোর্টে নামে ১৫ই অগাস্ট ১৯৪৭ সালে, যাদের হাতে চলে যায় পুরো পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব।

কেমন ছিল এই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তাদের মনোভাব? সেই যে খাদ্যশস্যের সংকটে অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে মন্ত্রীরা সংসদে দাঁড়িয়ে বলছিলেন খাদ্যশস্যের ট্যাক্স সংগ্রহকারী সরকারী কর্মকর্তারা তাদের পুত্রসম, উল্টোদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কি আচরণ করতে স্থানীয় জনগণ এবং তাদের নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের সাথে?

সাংবাদিক জিনকিনস মহাসচিব আজিজ আহমেদকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনে সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতে বলেন। পাঞ্জাবী মহাসচিব আব্দুল আজিজ বলেন – ‘হি ইজ অ্যান অ্যাস অ্যান্ড এ বেঙ্গলি। হোয়াট মোর কেন ইউ এক্সপেক্ট ফ্রম হিম?’ একজন সচিব দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে একজন বিদেশি সাংবাদিকের কাছে বলছেন যে প্রধানমন্ত্রী একজন গাধা, তদুপরি সে একজন বাঙ্গাল গাধা, তার কাছে কি উচ্চাশা রাখবো আমি?

মুসলিম লীগ নেতা কামারুদ্দিন আহমেদ বলেন – এই আজিজ আহমেদ প্রায়ই বলতেন – গভর্নমেন্ট আবার কি? আমিই গভর্নমেন্ট।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই মানসিকতাই প্রতিফলিত হয় নীচের কর্মকর্তাদের ওপর। যেমন খুলনা জেলা প্রশাসক একদা বলে বসেন – “আমার চিন্তা কেবল এখানকার স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে নয়, মুসলিম লীগের এই আকাট মূর্খগুলোর ভালোমন্দের চিন্তাভাবনাও আমাকে করতে হয়।”  এ যেন সেই ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের মুখের বুলি, যারা বেরিয়েছিল সাড়া দুনিয়া জবর দখল করে তার অধিবাসীদের শিক্ষিত করে তুলতে।

জেলা প্রশাসন ছিল মূলত একটি স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে জেলা প্রশাসকের কর্মক্ষেত্রে এবং ব্যাক্তিগত জীবনযাপনের পদ্ধতি ছিল এককথায় রাজসিক। প্রায় সকল জেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই ছিল অপেক্ষাকৃত কমবয়স্ক এবং অনভিজ্ঞ। থাকার জন্যে শক্তপোক্ত বাংলো, প্রয়োজনেরও বেশী আসবাবপত্র এবং থরে বিথরে সাজানো খাদ্যদ্রব্য তাদের জীবনকে প্রাচুর্যময় করে রেখেছিল। ঐ সময়ে উক্ত শহরের কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকলেও জেলা প্রশাসকের বাংলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল। একজন সাংসদ অভিযোগ করে বলেন – প্রাক্তন ইংরেজের বাংলোতে থাকতে গিয়ে এই সরকারী কর্মকর্তারা নিজেদের ইংরেজ ঠাউরে বসছে।

১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসের মত প্রাথমিক পর্যায়েই শেখ মুজিবুর রহমান এবং নাইমুদ্দিন আহমেদেরা আমলাতন্ত্রকে ব্রিটিশদের এজেন্ট বলে আখ্যা দেন এবং সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর চাপ কমানোর জন্যে তারা প্রশাসনের উপরের দিকের অনেক শক্তিশালী পদ  ছেঁটে ফেলার পরামর্শ দেন।

পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ

যুক্তফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় পুলিশকে ‘খুনি’ বলে আখ্যায়িত করে এবং বলে যে তারা ক্ষমতায় গেলে পুলিশের ক্ষমতা কমিয়ে আনবে, যেটা তাদের ব্যালটে অনেক ভোট সংযুক্ত করে। পুলিশকে খুনি আখ্যা দেয়ার কারন ছিল। পুলিশকর্তৃক সংঘটিত সবচে জঘন্য অপরাধ ছিল, অভিযোগে অস্পষ্টতা থাকা সত্যেও কথায় কথায় বন্দুকের ব্যাবহার এবং গুলি চালানো। সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সাল থেকে নিয়ে অগাস্ট ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত, স্বাধীনতার ১ বছরে ৫৮টি ঘটনায় গুলি। ১৯৪৯ সনে পূর্ববঙ্গ প্রদেশ জুড়ে সর্বমোট ৯০টি গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন এবং আত্মরক্ষার জন্যে গুলি চালানো লাগে বলে তারা ব্যাখ্যা দেয়। যেমন মানিকগঞ্জের বিল গজারিয়ায় মাছ ধরতে আসা সাধারণ জনগণের ওপর তারা গুলি চালায়। ১৯৫২ সালের ২২ জানুয়ারি পুলিশ সাভারের একটি গ্রাম্য মেলায় গুলি চালায় এবং একজন ব্যাক্তিকে হত্যা করে।  সেখানে সক্রিয় দুটি জুয়াড়ি দলের মধ্যে একটি পুলিশকে ঘুষ দিলে পুলিশ অন্যটির সদস্যদের তাক করে গুলি ছোড়ে।পুলিশের সাথে যোগসাজশ রেখে নারীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ আসে ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা স্টেশনে। গোপালগঞ্জের স্থানীয় নেতা অভিযোগ তোলেন তার এলাকায় রাত হলেই পুলিশ নিজেই ছিনতাই করতে বের হত। রাস্তায় যাকে পেত তার কাছ থেকেই সবকিছু ছিনিয়ে রেখে দিত।

পুলিশের বিরুদ্ধে জনগনের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে। যোগেন মণ্ডল, কেন্দ্রীয় সংসদের একজন মন্ত্রী, দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান অত্যাচারের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। তাতে তিনি খুব গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন হিন্দু বা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের অভিযোগের ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের বধিরের মত আচরনের ব্যাপারটি। তিনি অভিযোগ করেন যে পুলিশদের মধ্যেই হিন্দু বিদ্বেষী মনোভাব ছিল ষোলআনা এবং সুযোগ পেলেই তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর অত্যাচার চালাত। সত্য কথাটি হচ্ছে পুলিশকে যে ই অর্থ এবং উৎকোচ প্রদান করতো পুলিশ তার বশবর্তী হয়ে রইত।

পুলিশের ওপর আঘাত করা এবং জেল থেকে আসামি ছুটিয়ে নিয়ে যাবার প্রবণতা দেখা যায় জনগণের মধ্যে। জেল পলাতক আসামি একজনকেও স্থানীয় জনগন পুলিশের কাছে ফেরত দিয়েছে, এমন ইতিহাস নেই বললেই চলে। ১৯৪৯ সনে পুলিশের উপর আক্রমণের সংখ্যা ছিল সর্বমোট ১৫৫টি, যাতে ২ জন মারা যায়। ১৯৫০ সালে পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে ১৫১টি, যাতে ৫ জন মারা যায়।১৯৫১ সালে পুলিশের ওপর আক্রমণের ১১১টি ঘটনা ঘটে, ১৯৫৩ সালে আক্রমন ঘটে ১১২টি, যার মধ্যে ২ জন মারা যায়। তাদের ওপর এই আক্রমন নেমে আসার কারন তাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা। উল্লেখ্য যে কক্সবাজারে পুলিশ সদস্যদের রাস্তায় নেমে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়- ” শালারা! পাকিস্তান এখনও কায়েম হয় নি। ব্রিটিশ পুলিশ এখনও জীবিত আছে।”  

জমিদার প্রথা রদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প   

পূর্ব বাংলার মুসলিম তৃণমূল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী যুগে যুগে প্রেষণের স্বীকার হয়ে এসেছে শ্রেণী বিভাজনের জন্যে এবং ধর্মীয় কারনে। আর পূর্ববঙ্গে দেই বিভাজনটি মূলত জিইয়ে রাখে পূর্ববঙ্গের উচ্চবর্ণের সনাতন ধর্ম্যাবলম্বি জমিদারেরা। তাদের অত্যাচারের সমানভাবে শিকার হত মুসলিম এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। ১৯৪৭ সালে ২২৩৭ জন বড় মাপের জমির মালিকদের মধ্যে মাত্র ৩৫৮ জন ছিল মুসলিম, বাকি সবই হিন্দু। বণিক এবং তেলি সমাজের টাকার খাতক- যারা মোটা অঙ্কের সুদের বিনিময়ে টাকা ঋণ দিত, তাদের চক্রবৃদ্ধি সুদের করাল গ্রাসের আটক ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ দরিদ্র মুসলিম জনগোষ্ঠী।  সেই সুদের হার ১২ শতাংশ থেকে ২৮০ শতাংশ বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশী ছিল।

জমিদার ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের আবওয়াব খরচা যুক্ত হত এর সাথে। খাল ভরাট, দাখিলা খরচ, পোল খরচ, ডাক মাশুল, ভাণ্ডারী খরচ সহ সমাজসেবামূলক কাজ তথা স্কুল কলেজ স্থাপন, মন্দিরের সুসজ্জা- পূজাপার্বণ, ঔষধের ডিসপেনসারি স্থাপন, প্রজাদের বাড়িতে ঘুমানোর জন্যে পালঙ্ক ব্যাবহারের জন্যে ১০থেকে ২৫ রুপি, বড়মাপের ছাতা ব্যাবহার করলে বা জমিদারের রাজ্যের মধ্যে হাতি ব্যাবহার করলে ২০ থেকে ৪০ রুপি এবং প্রজাদের জন্যে পানির কুপ খনন করার জন্যে যে ট্যাক্স চালু করা হয়েছিল তার নামছিল – বিলাসব্যাসনের দেয়।

খাজনা দিতে দেরী হলেই গুমখুন, বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া, ক্ষেতখামার বিনষ্টিকরণ – ইত্যাদি অত্যাচারের স্বীকার হতে হত। কেউ যদি অত্যাচারের ভার সইতে না পেরে কথায় বা কাজে কোনরূপ অসন্তোষ বা বিদ্রোহী মনোভাব দেখাতো তবে তার ওপর অত্যাচারের আর কোন সীমা থাকতো না। আমিনুল ইসলাম উল্লেখ করেন – বদরপুর অঞ্চলে আইন ভঙ্গকারী দরিদ্র কৃষককে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করা হত বা বেত্রাঘাত করা হত। মুসলমানদের সে সকল হিন্দু জমিদার ও তাদের পাইক পেয়াদারা প্রকাশ্যেই ছোটলোক বলে ডাকতো, জমিদার বংশের ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চারাও মুসলিম প্রজাদের নাম ধরে ডাকতো, যেটা ছিল অপমানের। হিন্দু জমিদার বাড়িতে কোন মুসলিম প্রজা আসলে তাকে বসার জন্যে সর্বোচ্চ মাটিতে চট বিছিয়ে দেয়া হত। কোন ব্রাহ্মণের বাড়ির ছায়াও যদি কোন দরিদ্র মুসলিম মাড়িয়ে যেত তবে পানি আর গরুর গোবর লেপে মুসলমানের পদচারনায় বিনষ্ট বাড়ির পবিত্রতা পুনরুদ্ধার করা হত। জমিদারের জমির সীমানার ভিতরে কোন প্রজাকে প্রয়োজন সত্যেও মিঠা পানির পুকুর বা কূপ খন করতে দেয়া হত না। দেয়া হত না পাকা বাড়ি তুলতে। বেশীর ভাগ হিন্দু জমিদার তার মুসলিম প্রজাদেরকে গরু জবেহ করে কোরবানি করার অনুমতি দিতেন না। আমিনুল ইসলাম এবং কামাল সিদ্দিকি – উভয়েই এই উপসংহারে পৌঁছান যে জমিদারদের তরফ থেকে চাপিয়ে দেয়া এই বৈষম্যমূলক সমাজ কাঠামোই পূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিমদের দুটি পৃথক ধারার রাজনীতিতে বিভক্ত করে দেয়।

দেশভাগের সময় মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিটি খেলে নিপুন ভাবে।  মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একদা এদেশের মানুষজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন – “পাকিস্তান কায়েম না হলে কখনোই এই অঞ্চল জমিদারি প্রথার প্রভাব মুক্ত হবে না”।  চিটাগং এর একটি জনসমাবেশে উপস্থিত মুসলিম জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে পূর্ব বাংলার ভাবী মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন – “যদি আমাদের স্বাধীন পাকিস্তানের দাবী আদায় হয় তবে আপনাদের ছেলেপেলেরা মুন্সেফ হবে, তাদের ছেলেপেলেরা হবে ম্যাজিস্ট্রেট, ডেপুটি এবং দারোগা।”

পাকিস্তান রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থান কি – এই প্রশ্নের উত্তর না থাকলেও, কিন্তু আদর্শ কোনটা নয় – সে প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার ছিল। পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদকে সরাসরি উপনিবেশবাদ এবং হিন্দুত্ববাদ বিরোধী আদর্শ হিসেবে দাঁড়া করানো হয়। তারা মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ এবং কয়েকশ’ বছর পেছনে ফেলে আসা মুসলিম খেলাফতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের রোম্যান্টিক আইডিয়া ব্যাবহার করে মানুষকে বশে আনতে সক্ষম হয়। এই উদ্দেশ্যে বহু মুসলিম চেতনাধারী লেখক- সাহিত্যিক এবং কর্মীদের বক্তৃতা এবং লেখা মানুষের মাঝে ছড়ানোর হয়।

পাকিস্তানের জন্মকেই পূর্ববাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা তাদের পরাজয়ের বিষয়বস্তু, হতাশা, এবং বিশ্বাসভঙ্গের চিহ্ন হিসেবে ধরে। এক হিন্দু নেতার লেখনীতে স্পষ্ট হয় ব্যাপারটি – “হিন্দুরা কখনোই পাকিস্তান চায় নি। বরং পাকিস্তান তাদের মাথার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে”। ঢাকা নিবাসী প্রবীণ মার্ক্সিস্ট জ্ঞান চক্রবর্তীর বয়ানে জানা যায় – হিন্দুরা একদম গোড়া থেকে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবীর বিরোধিতা করেছে। দেশভাগের পরপরই তার ফলশ্রুতিতে বিশাল সংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠী পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমায়। তার সূত্র মতে প্রায় সকল হিন্দু সরকারী কর্মকর্তা ভারতে দেশান্তরী হয়। কিছু কিছু স্থলে হিন্দুদের মদ্যে প্রতিক্রিয়া এত তীব্র হয় যে তারা দেশত্যাগের পূর্বে পূর্ব বাংলার সরকারী সম্পত্তির প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে যায়। অজয় ভট্টাচার্যের বয়ানে জানা যায় যে সিলেট হসপিটালের হিন্দু এমপ্লয়িরা সিলেট ছেড়ে যাবার আগে সরকারি হসপিটালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে যায়। মুন্সিগঞ্জের জেলখানার হিন্দু কর্মকর্তা এবং জেলে বন্দী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পাকিস্তানের জন্ম উপলক্ষে সবার জন্যে যে অতিরিক্ত রেশন বরাদ্দ করা হয় সরকারের তরফ থেকে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এইতো সেদিওন যে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা অর্থে-বিত্তে, প্রভাব- প্রতিপত্তিতে পূর্ব বাংলার শীর্ষে অধিষ্ঠিত ছিল, একদম হুট করেই যেন রাজনীতির পাকেচক্রে নিজদেশে তারা অপমানিত হয়ে সে শীর্ষপদ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। লাহিড়ীর লেখায় অধিকাংশ হিন্দুদের এই সেন্টিমেন্টটা খুব পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে যে , তখনও তারা সামাজিকভাবে এবং অর্থের দিক থেকে পূর্ব বাংলার সবার থেকে এগিয়ে আছে, অথচ তাদের সামাজিক সে মর্যাদা আর নেই। অপরদিকে দলিত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা, যারা  এতদিন বিবিধ সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল তারা মুসলিম লীগের রাজনীতির ব্যাপারে নিজেদের অকুণ্ঠ সমর্থন জ্ঞাপন করে। তবুও বহু আদর্শবাদী হিন্দু রাজনীতিবিদ পাকিস্তান ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এই অবস্থাতেই দেশে থেকে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে যাবেন বলে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এমনি একজন হিন্দু রাজনীতিবিদ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী লেখেন –

“সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমি পাকিস্তান ছাড়ছি না। আমার এদেশেই থাকতে হবে। এদেশের মানুষের আনন্দ বেদনার সারথি হতেই আমার এখানে থেকে যেতে হবে। পূর্ব বাংলা আমারই তো দেশ… কেন আমি আমার জন্মভূমিকে ছেড়ে যাব?”

তারমত আরও অনেক রাজনৈতিক আদর্শধারী হিন্দুই এই দেশে থেকে যান, যাদের ওপর পরবর্তীতে নানামুখী নিপীড়ন চলতে থাকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থার ফেরে পড়ে।

বামপন্থী নেতা ও অন্যান্য বড় নেতাদের প্রতি আচরণ

দেশভাগের আগে ভারতের কমিউনিস্ট দলগুলো মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে ভারতীয় মুসলিমদের জন্যে পৃথক রাষ্ট্রের দাবী ইতিবাচক হিসেবেই নিয়েছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম এবং মুসলিম লীগের হাতে ক্ষমতা এসে পৌঁছানো মাত্রই যেন এদের ঘোর ভাঙ্গে। মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের সাথে তাদের সম্পর্ক এতটাই তিতকুটে পর্যায়ে পৌঁছায় যে মুসলিম লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া তাদের গতি থাকেনা। সম্পর্ক ছিন্ন হবার পর তারা একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে একে অপরের দিকে অস্ত্রও তাগ করে।

কিছু কিছু তীব্র প্রতিক্রিয়াশীল মার্ক্সবাদী এককাঠী এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মকে অন্ধকার যুগের প্রত্যাবর্তন হিসেবে আখ্যা দেয়। ১৯৭১ সালে, দেশভাগের ২৪ বছর পর ধনঞ্জয় দাস নামের খুলনা প্রবাসী এক পূর্বতন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য উল্লেখ করেন যে তার “লজ্জা” বোধ হয় , যখন তার স্মরণ হয় যে তিনি ১৯৪৭এর অগাস্তে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের আনন্দ আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন। এক কমিউনিস্ট কর্মী অবস্থা বর্ণনে রগড় করে লেখেন – “হ্যাঁ, ব্রিটিশরা দেশ ছেড়ে যাবার পর কিছু পরিবর্তন তো এসেছে। এই যেমন ধরুন- আগে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশেবাহিনী দমনপীড়ন চালাত, এখন নিজ দেশের পুলিশের হাতে গুঁতো খাই।”

 

অপরদিকে জিন্নাহ তার স্বভাবসুলভ ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গীতে একবার পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনে মুসলিম লীগের ভূমিকা সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন – “মুসলিম লীগ নিয়ে আমার সামনে কোন কথা বলবে না, আমি আর আমার শ্রুতিলেখক মিলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছি”। মুসলিম লীগ দলটি নিয়েই যেখানে তার একরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মনোভাব ছিল, সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি তার মনোভাব কি হতে পারে, সেটা সহজেই অনুমেয়।

অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দি মুসলিম লীগের কার্যক্রমের সাথে সকল রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে পূর্ব পাকিস্তানে দেশভাগের পর প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠ্যাকা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক উন্নয়নে সচেষ্ট হন।

আবুল কাশেম ফজলুল হক, পূর্ব বাংলার আরেক জাঁদরেল মুসলিম লীগ নেতা দেশ বিভক্তির পর কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে জিন্নাহের কাছে চরমভাবে পরাস্ত হয়ে কলকাতায় নিজ বাসভূমে বসে মনের ক্ষত শুকোচ্ছিলেন।

মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম যিনি কোন দলগত আদর্শের ভিত্তির অভাবে প্রায় ধুঁকতে থাকা দলটিকে প্রাদেশিকভাবে হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা এবং প্রাদেশিকভাবে  দলীয় নীতি ও আদর্শ স্থাপন করে দলটিকে পথ দেখান, মুসলিম লীগের নিষ্ক্রিয় ছাত্র সংগঠনকে সক্রিয় করে তুলবার চেষ্টা করে দলটির ভিত্তি মজনুত করার চেষ্টা করেন – তিনিও দেশভাগের ফলে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েন। সোহরাওয়ার্দির অনুসরণে তিনি তার পুরো শক্তি নিয়োগ করেন অবিভক্ত বাংলা অর্জনের লক্ষ্যে। সে দাবী আদায়ে ব্যার্থ হবার পর তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় নিজ গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান এবং আবুল মনসুর আহমেদ দেশভাগের পর কলকাতায় অবস্থান করেন।

আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমেদ, শামসুল হোক – সকল গুরুত্বপূর্ণ ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম লীগ নেতা আহসান মঞ্জিলে অবস্থিত ক্ষমতার তখৎ হতে নিজেদের দূরত্ব মাপছিলেন।

সিলেটকে ভারতের আসাম হতে ছুটিয়ে এনে অবিভক্ত বাংলার অংশ করার পেছনে যার ভূমিকা ছিল অপরিসীম, সেই মহান নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানিকেও কোন সম্মানজনক জায়গা দিতে পারে নি নবগঠিত পাকিস্তান। খুব্ধ মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামি মুসলিম লিগের জন্ম হয়।  নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যে দলের হাত ধরে ৭১ এ স্বাধীনতা আসে আমাদের দেশে।

 

উপসংহারে এসে বলা যায় – যুক্তফ্রন্ট যে শুধুমাত্র তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ব্যার্থ হয় তা ই নয়, দলটি অনেক দ্রুত ভেঙ্গে যায়। আওয়ামী লীগ ছিল যুক্তফ্রন্টের সবচেয়ে বড় অংশীদার, যারা সাংসদীয় গনতন্ত্রের পক্ষে কথা বলত, পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে থেকে কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতায় যেতে পারে নি। ১৯৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের হাতে ধরে দেশে সামরিক শাসন এলে মুসলিম লীগ সামরিক শাসকদের তল্পিবাহক এবং ভূতপূর্ব মুসলিম লীগের প্রেতে পরিণত হয়।

৭১ এ স্বাধীনতা আসে আর ধর্মের ভিত্তিতে নয়, একই ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বন্ধনের ভিত্তিতে। কিন্তু আওয়ামি লীগ সরকারের পতন হয় মুসলিম লীগের চেয়েও দ্রুত গতিতে, মাত্র চার বছরে।

এরপর আসে সামরিক শাসন, সামরিক শাসনের পর সামরিক শাসকের এক নায়কতন্ত্র, ১৯৯১ সাল থেকে দীর্ঘদিন দেশে গনতন্ত্র বজায় থাকার পর ২০০৭ সালে দেশে পুনরায় সামরিক অভ্যুত্থান হয়। যেটার অবসান ঘটে বর্তমান আওয়ামি সরকারের ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার হিসেবে ক্ষমতার মসনদ দখলের মাধ্যমে, যদিও তাদের দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকেই।

আমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে গৌরবোজ্জ্বল অংশ যতটুকু, অন্ধকার অংশও ঠিক সমপরিমাণ। এর মধ্যে কোন আশার বানীটি নিয়ে আমরা আজ এখান থেকে পৃথক হব? আমরা এটা জেনে এখান থেকে আজ বাড়ি ফেরত যাবো যে, বাংলার ইতিহাস বলে – যে রাজনৈতিক দল ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠে, তাদের পতন অনিবার্য, তা তারা যত শক্তিশালীই হোক না কেন। জনগণ সমস্ত ক্ষমতার উৎস এবং মালিক, এখানেই গনতন্ত্রের সৌন্দর্য।

 

 

 

 

 

 

 

 

Related Posts

About The Author

Add Comment