মে দিবস ও মানবিক দুনিয়ার সংগ্রাম

আমরা বাঙ্গালীরা সিজনাল বাঙ্গালী। ৩৬৪ দিন শহীদ মিনারে জুতা পায়ে যাতায়াত অথচ ২১ শে ফেব্রুয়ারী তে বাসা থেকেই খালি পায়ে হেঁটে শহীদ মিনারে যাই।

বাংলা ভাষা কি শুধুমাত্র ২১ শে ফেব্রুয়ারী’র জন্যই অর্জিত হয়েছে? ২১ শে ফেব্রুয়ারী বাদে সারা বছর বাংলা, ইংরেজী, হিন্দি, উর্দু আরবী, ফার্‌সী যে ভাষায় খুশি ইচ্ছামত কথা বলা যায়। কি হাস্যকর ব্যাপার, ২১ শে ফেব্রুয়ারী-ই কি শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য? এই একটা মাত্র দিনের জন্যই কি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার’রা জীবন দিয়েছিলেন? হয়তোবা।

যখন ১৪ এপ্রিল আসে, সেই কি পান্তা আর ইলিশ খাওয়ার কাড়াকাড়ি। আফসোস করি এক হালি ইলিশের দাম কেন ৪০০০০ টাকা। অথচ এর আগে বা পরে KFC বা যেকোন ফাস্ট ফুডের দোকানে মুরগীর পা চিবানো আর পিৎজা খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। ঐ একটা দিনেই কেবল আমাদের মনে হয় আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী। এই কথাটা শুধু আজ বইয়েই মানায়। বাস্তবিক জীবনে এর কোন প্রতিফলন নেই।

আমরা বাঙ্গালী বলে নিজেদের দাবী করি এবং এটাও মনে করি যে আমি বাঙ্গালী হতে পেরে সার্থক। যদি প্রশ্ন করি, জীবনে কতদিন খাঁটি বাঙ্গালীর মত জীবন যাপন করেছেন, পান্তা ভাত ১৪ এপ্রিল বাদে জীবনে কতবার খেয়েছেন, কি উত্তর দিবেন তখন? আপনি এই বাংলার ইতিহাসই বা কতটুকু জানেন? না জানতে পারেন, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কখনও কি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন নিজের দেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ আপনার কতটুকু?

নির্দিষ্ট কিছু দিনেই আমরা সেই দিনটাকে পালন করি। গতকালের দিনটাই হিসেব করে দেখি। মে দিবস। কি জানি মে দিবস সম্পর্কে? কিভাবে এল এই দিনটা? আপনি কি বলতে পারেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কতজন কোট আর টাই পরে অস্ত্র হাতে নিয়েছে? কেউ না। এটা আমি হলফ করে বলতে পারি। তাহলে যুদ্ধটা করল কে? উত্তর একটাই। চাষা ভুষা আর শ্রমিকরাই। এদের আত্মত্যাগের জন্যই আমরা আজ স্বাধীন একটা দেশ পেয়েছি। কিন্তু আমরা তাদের কতটুকু মূল্যায়ন করেছি? এই দেশ থেকে তারা কি পেয়েছেন? লাঞ্ছনা গঞ্জনা ছাড়া কিছু না। প্রায় দেখা যায় ৬০/৭০ বয়সোর্ধ্ব কিছু মানুষ পেটের দায়ে রিক্সা চালাচ্ছেন। এছাড়া আরও কিছু মানুষ অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকেন। এগুলো দেখার মানুষ আমরা নই। বাংলাদেশে জাতীয় আর আন্তর্জাতিক দিবস গুলোতে দেশের হর্তা কর্তারা কিছু বাণী দিয়েই খালাস। আর কোন দায়বদ্ধতা নেই। পৃথিবীর যেকোন দেশের শ্রমিকরা যদি অন্তত একটা দিনের জন্য কর্মবিরতি দেয়, কত টাকা লোকসান হবে? ভেবে দেখার কোন প্রয়োজন আছে কি? অনুমান করে নিলেও তো হয়।

একটা দেশের উন্নতি কিছুতেই সামান্য কিছু মানুষের উন্নতির উপর নির্ভর করে না। দেশ তখনই উন্নত হবে যখন সামগ্রিকভাবে সারা দেশের মানুষের উন্নতি হবে। একটা উদাহরণ দিই। আপনাদের পরিবারে মা-বাবা সহ সদস্য সংখ্যা ৫ জন। ধরে নিলাম আপনারা তিন ভাই। আপনি বাবার বড় ছেলে। স্বভাবতই কিছু বাড়তি সুবিধা আপনি পাবেন। আর সেটা যদি মধ্যবিত্ত পরিবার হয়, তাহলে আপনার প্রতি আপনার বাবা মার যতটুকু আকাঙ্ক্ষা থাকে, চাহিদা থাকে, আপনার ছোট ভাইদেরও সমান অধিকার থাকে আপনার উপর। কিন্তু আপনি স্বার্থপরের মত আপনার উন্নতির দিকেই নজর দিলেন আর বাবা মাকে ফকির করে যথেষ্ট টাকা পয়সা নিয়ে আপনি উন্নতির শিখরে উঠলেন। এর পর বেমালুম সব ভুলে গেলেন। খেয়াল করুন, উন্নতি কিন্তু আপনার একার হল। আর বাকিরা? ৪ জন সেই আগের অবস্থাতেও নেই বরং কিছুটা অবনতি হয়েছে কারণ আপনার অভিভাবকরা অতশত না ভেবে একপ্রকার আপনার উপর নির্ভরশীল ছিল। কি লজ্জা…! নিজের উন্নতি করতে গিয়ে একটা পরিবারের কি হাল আপনি করেছেন।

আমি আর কিছু বলতেও চাইনা। কথায় চিড়া ভিজে না। চিড়া ভেজাতে হলে চাই যথেষ্ট পরিমাণ পানি। আমাদের কি করা উচিত আর কি করা উচিত না, সেটা ভাবার জন্য যথেষ্ট পরিপক্কতা আমরা অর্জন করেছি। চলুন, দেশটাকে আপন করে নিয়ে দেশটাকে কিছু দেয়ার চেষ্টা করি।

Related Posts

About The Author

Add Comment