মে মাসে পড়া ১৮ টি বই

বলা হয়ে থাকে বই মানুষের সব থেকে কাছের বন্ধু। যুগে যুগে মানুষের দু:খ-কষ্ট, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা এসব কিছুরই এক সুপ্ত ভান্ডার। হাজার বছরের ইতিহাস বই তার সাদা পাতায় কালো হরফের আগলে রাখে  অনন্তকাল ধরে। শুধু যে ইতিহাস তা নয় বরং হাজারো রকমের জ্ঞানের বিশাল সংগ্রহশালা এই বই। বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম তার সদস্যদের সব সময় উদ্বুদ্ধ করে জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করতে। তেমনি এক জ্ঞান প্রেমী আশিকুর রহমান গত মে মাসে পঠিত তার ১৮ বইয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরেছেন যাতে করে সাধারণ পাঠক বই নির্বাচনে খানিকটা সুবিধা গ্রহন করতে পারে।

১) আসমানী পর্দাঃ এ বইটি লিখেছেন আবুল মনসুর আহমদ। এটি মূলত একটি রচনা সংকলন। বিভিন্ন ধাচের সর্বমোট দশটি রচনার সম্মেলন ঘটেছে বইটিতে। এসব রচনাতে ব্যঙ্গ করে তুলে ধরা হয়েছে আমাদের সমাজে বিদ্যমান অসঙ্গতিগুলো। বিদ্রুপাত্মক লেখা হওয়াতে এগুলো আমাদের মনে হাসির খোরাক জোগায়। আপাতদৃষ্টিতে হাস্যকর বলে মনে হলেও এগুলোর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে নির্মম বাস্তবতা। সবমিলিয়ে বেশ ভালো মানের একটি বই এটি।

২) ফুটন্ত গোলাপঃ এ বইটি লিখেছেন কাসেম বিন আবুবাকার। লেখক হিসেবে তার নাম আগে খুব একটা না শোনা গেলেও অতি সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর লেখনীর জন্য তিনি চরম সমালোচিত হন। বিতর্কের ঝড় চায়ের টেবিল পেরিয়ে উঠে আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও। তাঁর নাম লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে অতি দ্রুত। এ কারণে কৌতূহলবশত তার লেখা বই পড়তে বসেছিলাম। বইটির মূল উপজীব্য বিষয় হলো নরনারীর প্রেম। এর সাথে সহযৌগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ধর্মচর্চা। এছাড়া প্রেমের সাথে যেসব স্বাভাবিক ব্যাপার গঠনগতভাবে যুক্ত থাকে (যেমন– হিংসা, অভিমান, অভিসার, দুর্নাম রটানো, ভুল বুঝাবুঝি ও অবশেষে পুনর্মিলন ইত্যাদি), সেগুলো অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ছিল। লেখক প্রধানত দেখাতে চেষ্টা করেছেন, একজন সচ্চরিত্র জীবনসঙ্গিনীর সংস্পর্শে এসে কীভাবে একজন পুরুষসহ তার পুরো পরিবারই পাল্টে যেতে পারে সময়ের ব্যবধানে। পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন, একটি পরিবারের আমূল পরিবর্তনে একজন নারীর ভূমিকা কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ! সবমিলিয়ে উপন্যাসটিকে আমাদের চিরাচরিত বাংলা সিনেমার এক দারুণ স্ক্রিপ্ট বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। আমার এ লেখা যদি কখনো কোনো চলচ্চিত্র পরিচালকের চোখে পড়ে কোনোভাবে, তবে আশা করি, তিনি এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ অবিলম্বেই গ্রহণ করবেন।

৩) রাজা ঈদিপাসঃ এটি একটি গ্রীক নাটক। লিখেছেন সফোক্লিস এবং বাংলায় অনুবাদ করেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ঈদিপাস নামক গ্রীক শাসকের জীবনকাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নাটকের কাহিনী। ঈদিপাস একটি জটিল ধাঁধার উত্তর দিয়ে গ্রীসের সিংহাসনে আসীন হন। পরে তিনি অজ্ঞাতবশত নিজের পিতাকে হত্যা করেন এবং নিজের মাকে বিয়ে করেন। যখন তিনি এটা জানতে পারেন, তখন তিনি নিজেই নিজের চোখ উপড়ে ফেলেন এবং স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান।এভাবেই এগিয়ে চলে নাটকের গল্প।পুরো নাটক জুড়েই বিষাদের ছায়া চোখে পড়ে। শেক্সপীয়রের নাটকের সাথে এখানেই সফোক্লিসের নাটকের মূল পার্থক্য প্রতীয়মান হয়। কারণ শেক্সপীয়রের নাটকের ট্রাজেডির পাশাপাশি অনুপ্রেরণার ব্যাপারটিও থাকে, যা এখানে অনুপস্থিত। উল্লেখ্য যে, সফোক্লিস তার জীবন দশায় প্রায় ১০০টির মত নাটক রচনা করেন। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৭টি নাটক কালের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজও টিকে আছে। সবমিলিয়ে বেশ ভালো বই। আশা করি, সকলের ভালো লাগবে।

৪) ইলিয়াডঃ বইটি লিখেছেন হোমার। অনুবাদ করেছেন মোঃ আনোয়ার হোসেন। জন্মান্ধ এ গ্রীক মহাকবির যে দুইটি মহাকাব্য জগদ্বিখ্যাত, তার মধ্যে এটি অন্যতম। গ্রীক পুরাণ কাহিনীকে অবলম্বন করে এ মহাকাব্য রচিত হয়েছে। এখানে মুখ্য চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে গ্রীক বিশ্বসুন্দরী হেলেনাকে। বইটিতে উল্লেখিত কাহিনীতে দেখা যায়, হেলেনাকে কেন্দ্র করে গ্রীসের দুই নগরীতে ইতিহাস বিখ্যাত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ যুদ্ধে ঝড়ে পড়ে অসংখ্য বীরের প্রাণ। গ্রীক পুরাণে উল্লেখিত কাহিনী অনুযায়ী, এ যুদ্ধে দেবদেবীরাও অনেকে অংশ নেন। ধর্মকে কেন্দ্র করে অনেক ধর্মযুদ্ধ (ক্রুসেড) দেখা গেলেও এরকম ঘটনা একেবারে বিরল। কেবল একজন মানুষের জন্য পুরো ট্রয় নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। এ কাহিনী আমরা সকলেই কম-বেশি জানলেও হোমারের লিখনভঙ্গী এককথায় অনবদ্য ছিল। সার্বিক বিবেচনায় বেশ ভালো লেগেছে বইটি।


৫) সংগঠন ও বাঙালিঃ এটি লিখেছেন প্রখ্যাত বাংলা সাহিত্যিক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বস্তুত এটি একটি প্রবন্ধ সংকলন, যার মূল বিষয়বস্তু জাতিগতভাবে বাঙালির সাংগঠনিক দুর্বলতা। প্রবন্ধকার এখানে এ দুর্বলতার স্বরূপ ও কারণ খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেছেন। যুক্তিপূর্ণ আলোচনার মধ্য দিয়ে তিনি এ কথা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন যে জাতিগতভাবে আমরা বাঙালিরা বড্ড বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর। সংগঠন গড়ে তোলবার চাইতে এতে বাঁধা দিতেই যেন আমরা বেশি পরিতৃপ্তি বোধ করি। এছাড়া নিজে স্বাধীনভাবে কিছু না করে পরাধীন থাকার মানসিকতা আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে ঐতিহ্যগত কারণে। কোনো কাজ করতে গেলে আমরা অবসাদগ্রস্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়ি অতি অল্পতেই। যথাযথভাবে অর্পিত দায়িত্বপালনে আমরা অক্ষম হলে কী হবে, অযাচিতভাবে উচ্চপদ দখল করতে জাতিগতভাবে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। শুধুমাত্র এ কারণেই আমরা বৈশ্বিক উন্নয়নের যুগে অন্যান্য জাতি থেকে আজও এত পিছিয়ে আছি! এসব নির্মম বাস্তবতার নিষ্ঠুর চিত্রগুলোই অঙ্কিত হয়েছে “সংগঠন ও বাঙালি” নামক বইটির শ্বেতশুভ্র ক্যানভাসে। সার্বিক বিবেচনায়, বইটি বেশ ভালোই লেগেছে। পাশাপাশি এটাকে অনেক তথ্যবহুল ও শিক্ষণীয় একটি বই বলে মনে হয়েছে আমার। জানিনা, অন্য পাঠকদের কাছে কেমন লাগবে/লেগেছে বইটি!

৬) ফুড কনফারেন্সঃ বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট রম্য লেখক আবুল মনসুর আহমদের এক অনবদ্য রচনার নাম “ফুড কনফারেন্স “। এতে আমাদের প্রচলিত বিধি-ব্যবস্থার চরম সমালোচনা করা হয়েছে ব্যঙ্গের সুরে। বিশেষ করে আমাদের নীতিনির্ধারক মহলের স্বার্থপরতার দিকটি ব্যঙ্গভরে তুলে ধরা হয়েছে সম্মানিত পাঠকদের সামনে। এ রচনা যেমন পাঠকদের ইষৎ হাস্যরসের উদ্রেক করে, তেমনি সমাজে বিদ্যমান অসঙ্গতি তুলে ধরে আমাদের সামনে। এ দিক থেকে এটি এক অনবদ্য রচনা বললেও কম বলা হবে। সার্বিক বিবেচনায় বেশ ভালো মানের এক বইয়ের নাম “ফুড কনফারেন্স “! আশা করি, অন্য পাঠকদের কাছেও ভালো লাগবে।

৭) কৃষ্ণপক্ষঃ এটি হুমায়ূন আহমদ রচিত একটি উপন্যাস। আরো স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে এক ব্যর্থ প্রেমের গল্প। নিখাত প্রেম,পরিবারের অমতে পালিয়ে বিয়ে, বিচ্ছেদ, স্মৃতিকাতরতা—- এই চারটি বিষয়ের সমন্বয়ে এগিয়ে গেছে উপন্যাসের গল্প। পুরো বই জুড়েই হুমায়ূন আহমদের চিরাচরিত চমক ছিল।এ উপন্যাসের নায়কের মধ্যে হুমায়ূন আহমদের বিভিন্ন উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র হিমুর ছাপ অনেক বেশি স্পষ্ট ছিল।শেষ না হওয়া অবধি বইয়ের প্রতি আকর্ষণ ধরে রাখবার অদ্ভুত ক্লাইম্যাক্স এ বইতেও ছিল। প্রতিটি ঘটনার পরেই পরবর্তী ঘটনা জানবার ব্যাপক আগ্রহ ছিল একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে। সার্বিক বিবেচনায় খারাপ ছিল না বইটি।

৮) দত্তাঃ বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যেসব কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো দত্তা। মানব হৃদয়ের ঘাত-প্রতিঘাতের দিকটি অত্যন্ত চমৎকার রূপে চিত্রায়িত হয়েছে এ বইটির ক্যানভাসে। কাহিনীকল্পে দেখা যায়, এ উপন্যাসটিতে দুই প্রজন্মের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে তিন অন্তরঙ্গ বন্ধুর জীবনের গল্প দিয়ে। পরবর্তীতে এটি স্থানান্তরিত হয় তাদের পরবর্তী প্রজন্মের গল্পে। সত্যের সাথে অসত্যের, ন্যায়ের সাথে অন্যায়ের দ্বন্দ্ব চিরন্তন ও অনতিক্রম্য। এসব দ্বন্দ্বে অন্যায়, অসত্য সাময়িকভাবে জয়লাভ করলেও দীর্ঘকালীন কথা চিন্তা করলে তাদের জয়লাভের কথা চিন্তাও করা যায় না। এ উপন্যাসের গল্পে এ অমোঘ সত্যটি গল্পাকারে উঠে এসেছে। তাছাড়া, মানব হৃদয়ের অন্তঃমিল থাকলে কারো মিলনে ধর্মসহ অন্যান্য ব্যাপারগুলো যে কার্যত কোনো অপ্রতিরোধ্য প্রতিবন্ধকতা নয়, সেটার আভাসও এখানে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে ধর্মের নামে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা বা অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বরপূর্ণ আচরণের দিকটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুনিপুণ তুলির আঁচড়ে। এ সব কিছু মিলিয়ে আমার দৃষ্টিতে বেশ ভালো মানের এক সুখপাঠ্য উপন্যাসের নাম “দত্তা”!

৯) মাও সে-তুঙঃ এ বইটির রচয়িতা রাহুল সাংকৃত্যায়ন। বাংলা ভাষায় ভাষান্তর করেছেন যতীন সরকার। প্রধানত এটি একটি জীবনী গ্রন্থ। চীনা স্বাধীনতার প্রবাদপুরুষ মাও সে-তুঙ এর জীবনী এখানে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিবৃত হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে মাও সে-তুঙ ছিলেন সমাজতন্ত্রের তুখোড় সমর্থক ও একনিষ্ঠ কর্মী। ফলে এ ব্যাপারটি স্বভাবতই তার রাজনৈতিক জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে,রাজনীতির ময়দানে তিনি ছিলেন একজন কমিউনিস্ট। জাপানের হাত থেকে মুক্ত হবার পরে চীনে পুঁজিবাদের বিস্তার ব্যাপকভাবে ঘটতে থাকে। এ সময়ে অর্থ ও ক্ষমতালোভী পশ্চিমা বেনিয়া শক্তির নজর পড়ে চীনের উপরে। কেননা, বিশ্ব অর্থনীতির বাজারে চীন তখন উদীয়মান এক ব্যাঘ্র শাবক (emerging tiger). দেশের স্বার্থকে অবজ্ঞা করে এদের সাথে হাত মেলায় স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী। ফলে পশ্চিমা বিশ্ব নির্বিঘ্নে তাদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাদ সাধে দেশটির বিভিন্ন বামপন্থি দলসমূহ, যাদের নেতৃত্বদান করেন স্বয়ং মাও সে-তুঙ। অস্ত্র ও লোকবল পরিমাণে অত্যন্ত সীমিত হবার পরেও তাদের জয়লাভ করতে কোনো বাঁধাই স্থায়ী হয় না কেবলমাত্র সঠিক নেতৃত্ব ও পরিকল্পনামাফিক কাজের কারণে। এর ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানচিত্রে চীন নামক এক নব্য স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ রাষ্ট্র মাও সে-তুঙের সংগ্রামী জীবনের ফসল। আর এ কথা অনস্বীকার্য যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস মানেই এ সংগ্রামের ইতিহাস। এ দুইটি বিষয় এ অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে গ্রন্থিত। আলোচ্য বইটিতে মাও সে-তুঙের রাজনৈতিক জীবনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বইটি পড়ে একজন পাঠক মাও সে-তুঙের জন্ম থেকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চীনের যাত্রা (১৮৯৩-১৯৪৯)—- এ সময়কালের ইতিহাস, রাজনীতি ও বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন। এছাড়া রাজনীতিতে আসার আগেকার সময়ে কাটানো মাও সে-তুঙের ব্যক্তিগত জীবনের চিত্রও এ বইয়ের ক্যানভাসে চিত্রিত হয়েছে। এসব কিছু মিলিয়ে অনেক ভালো মানের একটি বই।আশা করি, কোনো পাঠক আশাহত হবেন না বইটি পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা, অনেক অজানা ইতিহাস ও তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির হালচাল সম্পর্কে জানার একটি সুযোগ রয়েছে এতে।

১০) যুবক জীবনঃ এ বইটি লিখেছেন ডাঃ লুৎফর রহমান। এটি মূলত একটি ছোট প্রবন্ধ সংকলন। যুবকদের জীবনের নানা দিক, করণীয় – অকরণীয় দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের কার্যক্রমের হালচাল বেশ ভালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। এছাড়া যুবসম্প্রদায়ের বিভিন্ন পরিহার্য দিকগুলো থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, সে ব্যাপারেও এখানে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রবন্ধ সংকলন হলেও লেখকের বক্তব্য গদ্যের ভঙ্গিতে বিবৃত হয়েছে। সবমিলিয়ে আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। শিক্ষণীয় অনেক বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটেছে এখানে। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রবন্ধের আকার আরেকটু বড় হলে হয়ত ভালো হত। আকারে একটু বেশিই ছোট হয়ে গেছে। আশা করি, অন্যদেরও ভালো লাগবে বইটি।

১১) টিনটরেটোর যীশুঃ এ বইটি লিখেছেন প্রখ্যাত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়। একটি কুকুর হত্যার ঘটনার সূত্রপাত ধরে বেরিয়ে আসে অনেক অজানা কাহিনী। বিষয়বস্তুর বিচারে এটি একটি গোয়েন্দা উপন্যাস। এর মুখ্য চরিত্রে রয়েছেন সত্যজিতের উপন্যাসের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা। এ উপন্যাসের কাহিনীর সূত্রপাত একটি কুকুর হত্যার ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও এর মূল কাহিনী এগোতে থাকে যীশুর উপরে আঁকা একটি চিত্রকর্মকে কেন্দ্র করে, যার স্রষ্টা ছিলেন ইতালিয়ান চিত্রকর টিনটরেটো। এ চিত্রকর্ম চুরি হয়ে যায়। এ চুরির ঘটনার তদন্ত করতে আবির্ভূত হন প্রদোষ মিত্র ওরফে ফেলুদা। তদন্ত কাহিনীকে ঘিরেই এগোতে থাকে এ উপন্যাসের কাহিনী। সত্যজিৎ রায়ের অসাধারণ লিখনি বইটিকে এক আলাদা অনন্যতা দান করেছে। এরপর কী ঘটলো, তা জানার অসীম আকাঙ্ক্ষা পুরো কাহিনী জুড়েই ছিল। সার্বিক বিবেচনায় অত্যন্ত ভালো লেগেছে বইটি। আশা করি, অন্য পাঠকেরা আশাহত হবেন না বইটি পড়ে।

১২) শিকড়ে শাখায় মেঘেঃ এ বইটি লিখেছেন ইফতেখার মাহমুদ। একজন গায়কের জীবনের কিছু টুকরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাসের সূত্রপাত। পাশাপাশি এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে আশেপাশের মানুষগুলোর প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের জীবন একসাথে থাকতে চাওয়া এবং না চাওয়ার দ্বন্দে ভরা। এর মধ্যেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে অসংখ্য টুকরো গল্প। আমরা জীবনে অনেক কিছুই নিজেদের চোখে দেখতে পাই। এ দেখতে পারার বাইরেও জগতে আরেক জীবন দেখতে পারা আছে। মানুষ প্রকৃত রূপ ঠিক তখনই ধরা পড়ে, যখন সে নিজেকে চোখ বন্ধ করে দেখে। অর্থাৎ অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে দেখে। এ কাজ সবাই করতে পারেনা। এ রকম দেখার কিছু ঘটনাকে সমন্বয় করেই এগিয়েছে উপন্যাসের গল্প। নবীন লেখক হলেও লিখনি তেমন খারাপ ছিল না মোটেও।বরং বেশ ভালো মানের লিখনি-ই বলা চলে। সার্বিক বিবেচনায় ভালোই লেগেছে আমার। আশা করি, অন্য পাঠকদেরও ভালো লাগবে বইটি।

১৩) গাভী বিত্তান্তঃ এ বইটি লিখেছেন আহমদ ছফা। এটি মূলত একটি বিদ্রুপাত্মক রম্য রচনা। বিদ্রুপের ছলে এখানে দেশের একটি প্রথিতযশা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়েছে পাঠকের সামনে। এ কাজটি করতে গিয়ে আহমদ ছফা প্রতীকী অর্থে একটি গরুর কাহিনীর সহায়তা গ্রহণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান কোনো অযোগ্য লোকের হাতে পড়লে কীভাবে ধীরেধীরে তার অবনতি হতে থাকে। এটি বুঝাতে গিয়ে গাভীর কাহিনীর অবতারণা পাঠকের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি নির্মল আনন্দের খোরাক জুগিয়েছে এ বিষয়টি। সার্বিক বিবেচনায়, এটি অত্যন্ত ভালো মানের সাহিত্যকর্ম বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। আশা করি, এটি অন্য পাঠকদের মাঝেও যথেষ্ট হাস্যরসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি কোনো পাঠক বইটি পড়ে নিরাশ হবেন না বলে আমার বিশ্বাস।

১৪) পৃথিবীর পাঠশালায়ঃ এ বইটি লিখেছেন বিশ্বব্যাপী জননন্দিত রুশ কথাসাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কী। বাংলা ভাষায় ভাষান্তর করেছেন রথীন্দ্র সরকার। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ শিখর হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এ সর্বসিদ্ধ কথাটিকে এ বইটিতে মিথ্যা প্রমাণিত করা হয়েছে। বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বিকাশের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে, এ জগৎসংসারে উন্মুক্ত পৃথিবীর চাইতে বড় বিদ্যাপীঠ আর কোথাও নেই…..থাকতে পারেনা! বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে যে জ্ঞান লাভ করা যায়, সে জ্ঞান বিশ্বনন্দিত কোনো সেরা বিদ্যাপীঠে অধ্যয়ন করেও লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ প্রকৃতি আমাদের সেরা শিক্ষক। পুরো বইটি জুড়েই যেন নিরবে ধ্বনিত হয়েছে সুনির্মল বসু কর্তৃক রচিত সে-ই বিখ্যাত দুটি ছত্র—- “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,/ সবার আমি ছাত্র!”

সব মিলিয়ে বইটি আমার অনেক ভালো লেগেছে। আরো বেশি যে ভালো লেগেছে, তার একমাত্র কারণ এই যে, ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও গলাধঃকরণ ও উদঃগীরণ পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী। যা হোক, আশা করি, অন্য পাঠকেরা কেউ নিরাশ হবেন না বইটি পড়লে।

১৫) একজন কমলালেবুঃ এ বইটির লেখক শাহাদুজ্জামান। রূপসী বাংলার কবি বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশের জীবনবৃত্তান্ত এ বইটির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। কবি জীবনানন্দের জীবনের সবচেয়ে করুণ পাতাটি লিখা হয়েছে এ বইটিতে। দেখানো হয়েছে, আগাগোড়া আত্মভোলা, নিজের প্রতি উদাসীন একজন ব্যক্তি কীভাবে পদে পদে লাঞ্ছিত হয়েছেন…..হয়েছেন আত্মবঞ্চনার শিকার! হৃদয়ের মণিকোঠায় একজন নারীকে আশ্রয় দিয়ে পরিবারের পছন্দে অন্য এক শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করে সুখী হতে পারেন নি। কবি চেয়েছেন, সারা জীবন লেখালেখি করে কাটিয়ে দিতে— যার কোনো মূল্য কবিপত্নীর কাছে ছিল না কখনওই। লেখালেখি করে পয়সা কামানোর পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না কখনওই। এ কারণে সারা জীবন দারিদ্র জর্জরিত জীবনযাপন করতে হয়েছে তাকে। ব্যক্তিগত জীবনে লাজুক, মুখচোরা স্বভাবের কবি জীবনানন্দ দাশ অনেক লিখেছেন তার জীবনে, যার অনেক কিছু তার জীবনদশাতে অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে। তার মৃত্যুর পরে এসব প্রকাশিত হয়েছে। জীবিত থাকতে তিনি যতটা সমালোচিত হয়েছেন, মৃত্যুর পরে ঠিক ততটাই সমাদৃত হয়েছেন লোকের কাছে। আজীবন নির্জনে বসবাস করে আসা এ কবির জীবনের মর্মান্তিক, করুণ কাহিনী অত্যন্ত দরদ ভরে বইয়ের পাতায় তুলে ধরার কাজটি চমৎকারভাবে সম্পন্ন করেছেন শাহাদুজ্জামান। এ ব্যাপারে তার জুড়ি মেলা ভার। বইটির সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীর তালিকা অনেক লম্বা। সে দিক থেকে বিবেচনা করলে এটিকে একটি প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না বলে আমার বিশ্বাস। এ বইয়ের ভালো মন্দ নিয়ে কিছু বলার নেই। এটা যেকোনো পাঠক পড়ামাত্রই অনুধাবন করতে পারবেন।

১৬) হারকিউলিস এবং গ্রীক পুরাণের অন্যান্য গল্পঃ এ বইটি লিখেছেন অনল চৌধুরী। এটি একটি গল্প সংকলন। গ্রীক পুরাণে উল্লেখিত বিভিন্ন গল্প এ বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রীক পুরাণে উল্লেখিত কাহিনী অনুযায়ী, হারকিউলিস গ্রীকের সবচেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী বীর ছিলেন। গ্রীক পুরাণ মূলত গ্রীক বীরদের দুঃসাহসিকতার গল্পকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। এসব গল্পগুলোই এ বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। বেশ ভালোই লেগেছে বইটি। গ্রীক সভ্যতার বেশ কিছু অজানা ইতিহাস জানা সম্ভব হয়েছে বইটি পড়ে। আশা করি, অন্যদেরও ভালো লাগবে।

১৭) জহির রায়হানের গল্পসমগ্রঃ বইটি কে লিখেছেন বা এটি কী ধরনের রচনা, সে ব্যাপারে আলাদাভাবে বলবার কিছুই নেই।কেননা, বইয়ের নাম দেখেই এসব ব্যাপার সহজেই অনুমেয়। ছোটবড় নানা ধাঁচের বিভিন্ন গল্প দিয়ে এ সংকলনটি সাজানো হয়েছে। সিনেমা নির্মাণ ও উপন্যাস লেখবার পাশাপাশি গল্প লেখাতেও জহির রায়হান যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। তার লেখা গল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি গল্পের সমাপ্তি এমনভাবে টানা হয়েছে, যেন গল্পটি পড়ে আরো জানবার আগ্রহ জাগে। অর্থাৎ জানবার আগ্রহ অপূর্ণ-ই রয়ে যায়……যা কোনো সার্থক ছোটগল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এসব বিবেচনাপূর্বক বেশ ভালো মানের একটি বই। আমার কাছে বেশ ভালোই লেগেছে।

১৮) ক্রাচের কর্ণেলঃ এ বইটির লেখক প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক ও গবেষক শাহাদুজ্জামান। কর্ণেল তাহেরের জীবন কাহিনীকে কেন্দ্র করে এ বইটি রচিত। কর্ণেল তাহেরের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি এ দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত সুন্দরভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন লেখক। তুলে ধরা হয়েছে রাজনীতি ও ক্ষমতার স্বার্থে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার গল্প, যা কোনো সাধারণ গল্প নয়; বরং ঐতিহাসিক সত্য। এক কথায়, কর্ণেল তাহের ও তাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরার একটি প্রয়াস চালিয়েছেন লেখক মহাশয়। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস আমরা সচরাচর কোথাও পাই না। যেসব পাই, তার অধিকাংশ কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতদুষ্ট লেখা। এ দিক থেকে এ বইটি অনন্য। সে বিবেচনায় এটি নবীন প্রজন্মের কাছে দেশের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার ব্যাপারে সহায়ক হবে বলে আমার বিশ্বাস। আশা করি, বইটি সকলেরই অনেক ভালো লাগবে।

লেখক: আশিকুর রহমান খান অভি

Related Posts

About The Author

Add Comment