যদি ব্রিটিশরা ভারত দখল না করতো!

আজকের আড্ডায় আলোচ্য বিষয়বস্তু এবং দীপ্তিমান আলোচকদের উপস্থিতি আড্ডাকে একটি স্মরণীয়, উদ্দীপক ও প্রাণবন্ত সন্ধ্যাতে পরিণত করেছিল। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের নাম পরে বলবো, প্রথমে কি কি প্রশ্ন নিয়ে ঘন্টা দুয়েক আলোচনা হয়েছে সেসব প্রশ্ন ও আলোচ্য বিষয়গুলো সংক্ষেপে তুলে আনি।

প্রথমেই আলোচনা চলতেছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাদমান শাকিলের একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। শাকিলের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল আহমেদ দীন রুমি। শাকিলের প্রশ্নটি ছিল-‘ব্রিটিশরা যদি বাংলাকে দখল না করতো তাহলে কি বাংলার উন্নতি হতো না?’

ইতিহাস আলোচনায় যদিও এই ‘যদি’ ‘কিন্ত’, ‘হয়তো’ ইত্যাদি আমাদের বেশিদূর আগাতে দেয় না কিন্তু আমাদের তরুণ সেই বন্ধুর প্রশ্নটি উপস্থিত সকলেই সাদরে গ্রহণ করলো এবং এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলো। আমার উত্তরটি ছিলো ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহরু থেকে ধার করা। নেহরু তার ‘ডিসকভারি অব ইনডিয়া’ বইটিতে এ ধরণের অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। তার সারকথা ছিল ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে আসার বহু হাজার বছর আগেই সভ্যতার আলোয় আলোকিত ছিল। এখানে নিজস্বভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, ধর্ম-দর্শন ছিল। ব্রিটিশরা ভারত দখল না করলেও ভারতবর্ষ তার নিজস্ব উপায়ে হয়তো এগিয়ে যেতো। শুধু ভারতবর্ষকে সভ্য করে তোলা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো দেওয়ার কথা বলে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হয় সেগুলো অসার হয়ে যায় তাদের দীর্ঘ দুইশত বছরের শোষণমূলক ও লোটপাট নীতির কাছে। রাজনৈতিক চর্চার বিকশিত করণ দূরে থাক দীর্ঘ সময় ধরে মেরুদণ্ডহীন ও দাশসুলভ প্রজা তৈরির দিকেই মনোযোগ ছিল। রেললাইন ও মোটরগারির কথা যা বলা হয় তার সাথে কয়েকটি বড় বড় দুর্ভিক্ষও দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে অল্প যা পাওয়া গেছে তার তুলনায় বিসর্জনের পাল্লাটি অনেক ভারি।

memsaheb

মেমসাহেব এর খেদমতে কয়েকজন ভারতীয়

ভারতবর্ষ ইউরোপীয় মডেলে না হলেও হয়তো কোন একটা উপায়ে দাড়াতো, শিল্পায়নও হতো। ভারতবর্ষে কয়েক হাজার বছর ধরে যে সভ্যতা ছিল তার উদাহরণ চলে আসে।

এভাবে আলোচনা যখন চলছিলো তখন অনেকগুলো প্রশ্ন আাসে-কোন এম্পায়ার যখন দুর্বল হয়ে পরে তখনই সম্ভব সেখানে বহি:শত্রুর আক্রমণ করা এবং ভারতবর্ষ নিশ্চয়ই দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং বহি:শত্রু বা বহি:শক্তি সে সুযোগটা নিয়েছে।

mirjafor

মীর জাফর ক্লাইভের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন গোপন আঁতাতের জন্য

ভারতবর্ষে ছয় হাজার বা সাত হাজার বছর আগে সভ্যতা ছিল এমন কথা উঠে আসলে আসিফ বিন আলী সেটা পিক করেন এবং এই নোশনটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন। বিজেপি বা মেইনস্ট্রিম ডানপন্থী ভারতীয় ইনটেলেজেনশিয়ার এই সব আরিয়ান কনস্ট্রাকশন আমরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেই কেন সে বিষয়ে প্রশ্ন ছুড়েন। পুরান ভারত নামে যে মিথ আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয় তার ঐতিহাসিক শক্ত প্রমাণাদি নাই এরকম তর্ক ছুড়ে মারা হয়।

মুসপানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুর রহমান সরকার সোহেল মনে করেন বাঙালীদের শরীর ও চিন্তার বল ছিলো না। তাদের দ্বারা কোন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা বা বড় কিছু করা সম্ভব ছিলো না। এজন্য তাদের চেয়ে গায়ে-গতর ও রাজনৈতিক সক্ষমতায় শক্তিশালী ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়দের হাতে পরাই তাদের পরিণতি ছিল।

বুয়েটের সাবেক এই মেধাবী ছাত্রের মতে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীরা যা খায়, যে পরিবেশে থাকে তাদের দিয়ে বড় কিছু করা অনেক কঠিন। তারা তো গায়ে-গতরেই সবল নয়! তাদের কাছ থেকে সবল চিন্তা আসবে কি করে। তার পরও যা আসে সেটা তো বিস্ময়কর।

এদিকে আরও কয়েকটি বিষয় তর্কে জায়গা করে নেয়। সাকার মুস্তাফা বাকি কিছু ইনট্রিগিং প্রশ্ন নিয়ে বিতর্কের সূচনা করেন-পরিবার প্রথার ভবিষ্যত কি? কেউ আত্মহত্যা বা আত্মহনন করতে চাইলে তাকে সে সুযোগ দেওয়া হবে না কেন, সুখ-সমৃদ্ধি-সফলতা ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় জায়গা পায়। এ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ উত্তপ্ত আলোচনা চলে।

শেষদিকে আলাউদ্দিন ভাই ও আসিফ বিন আলী আলোচনা চালিয়ে যান জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিসটমোলজি নিয়ে। আসিফ মনে করেন জ্ঞানতত্ত্ব ইভ্যুলূশনের মধ্য দিয়ে আগায়। এখানে ‘আদার’ ও ‘আস’ এর মধ্যে ফারাক করা অনেক জটিল। আলাউদ্দিন ভাই বলার চেষ্টা করছিলেন কোন একটা কাঠামোর ভেতরে দাড়িয়ে, হৃষ্টপুষ্ট হয়ে তার প্রতিপক্ষ নয় বরং সহায়কই হতে হয়। নতুন কোন চিন্তা, নতুন কোন কাঠামো আসতে চাইলে তাকে নিজ পাটাতনের উপর দাড়িয়েই আসতে হবে।

আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ আমলা থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা, শিক্ষক থেকে গবেষক, তরুণ চিন্তক বা শিক্ষার্থী। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তপন কুমার নাথ এসে যুক্ত হন আমাদের সাথে। ছিলেন মুসপানার এমডি আতিকুর রহমান সরকার সোহেল ভাই। ছিলেন ময়মনসিংহের কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যমী শিক্ষক সাকার মুস্তাফা বাকি। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ভাই ছিলেন আড্ডার অঘোষিত কম্পাস হিসেবে। আসিফ বিন আলির প্রাণবন্ত ও ইনসাইটফুল আলোচনা যথারীতি আড্ডার জৌলুশ বাড়িয়ে দেয়।

মাঝে মাঝে আহমেদ দীন রুমির ফুটনোট বা মাহফুজা মাহদির প্রশ্ন আলোচনাতে মশলা দিয়েছে এবং সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। সাগর বড়ুয়া আর ঈপ্সিতা আজকে নীরব শ্রোতা হিসেবে ছিলেন অনন্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনার ফানুইভি আজকে সময় করে চলে এসেছেন আড্ডার অংশ হতে। সব মিলিয়ে যেসব প্রশ্ন ও বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলোর সহজ উত্তরে পৌছার কোন উপায় নেই। বিষয়গুলো ভাবার, বিষয়গুলো প্রস্তুতি নেয়ার, বিষয়গুলো এগিয়ে যাওয়ার, এগিয়ে নেওয়ার। নিয়মিত এমন প্রাণবন্ত আড্ডা হউক এই কামনায় আজকে এখানেই ইতি।

আমরা আলোচনায় এতই মগ্ন ছিলাম যে আমাদের ছবি তোলা আর হয়নি। ভালো হয়েছে। কিছু কিছু আলোচনা শুধু ছবিতে নয়, মনে-মগজেও রাখতে হয়। ভালো হয় মনের অডিও টেপে যদি রেকর্ড রাখা হয়।  এই নোটে পুরো আলোচনার অংশবিশেষ বা কংকালের নমুনা আসলো। যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সেটা থেকে আড্ডার রূপটা তুলে আনতে পারবেন। অন্যরা কষ্ট করে বুঝতে পারলে সেটা আপনাদেরই সফলতা, আমার নয়! আমার চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও অল্প সময়ে পুরো আড্ডাটা নিয়ে আসতে পারবো না!

Related Posts

About The Author

Add Comment