জেলজীবনের অভিজ্ঞতায় মহান লেখকরা

‘দিবাইন কমেদি’র মহাকবি দান্তের পুরোটা জীবনই ছিল যেন একটা কারাবাস। নিজ দেসে পরবাসী, ব্যক্তিগত জীবনের করুণ অবস্থা, নরকোচিত অভিজ্ঞতাই ফুটে উঠেছে দিবাইন কমেদির অলিতে গলিতে। ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ এর লেখক দস্তোবস্কির দিকে খেয়াল করলে দেখবো একেবারে মৃত্যুদণ্ড থেকে ফেরা ব্যক্তির সাহিত্যভুবন জয় এবং সমগ্র জীবনই যেন জেলবাস বা নরকবাসের সাথে তুল্য। এত কঠিন, কঠোর ও নির্মম জীবন নিয়ে এত সৃষ্টির ফুল ফুটান কিভাবে এটা আসলেই বিস্ময়ের বিষয়।

কথিত আছে যে স্পেনিশ সাহিত্যের সেরা সাহিত্যিক মিগেল দ্য কারভানতেস এর ‘ডন কিহাতে’ এর অনেকটা নাকি জেলখানায় বসে লেখা।

‘ডন কিহাতে’ এমন একটি উপন্যাস যার সাথে তুলনা করে অন্য সাহিত্যের মান নির্ধারণ করা হয়। কিছুদিন আগে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মৃত্যুর পর তার অবস্থান নিয়ে কথা বার্তা হচ্ছিল। তার ‘শতবর্ষের নি:সঙ্গতা’ স্পেনিশ সাহিত্যের কি সেরা সৃষ্টি এই প্রশ্ন তোলা হলে দেখা যায় যে ‘ডন কিহাতে’কে প্রথমে রেখে তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয়ের তালিকা করা হয়।

স্পেনিশ সাহিত্যের এই সর্বকালের সেরা সৃষ্টিটি জন্ম নিয়েছে জেলখানায়, এটা অনেকেরই মনে বিস্ময়ের জন্ম দিতে পারে। বন্দি ও বদ্ধ জীবনে জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতাগুলোর চিরায়ত রূপ দিয়েছেন কারভানতেস। এই প্রতিকূল পরিবেশে এটি লিখতে গিয়ে তিনি সাহিত্যের অনেক প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন যা পরবর্তী শতকগুলোতে মান হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

তাহলে কি জেলখানা আশীর্বাদ?

জেলে কি বিদ্যাদেবী বর দিয়ে যান?

মহান সাহিত্য রচনা করতে কি আমরা জেল বাস করবো?

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই পছন্দের জায়গা বাছাই করার স্বাধীনতা থাকলে আমরা কেউই জেলখানা বাছাই করবোনা। স্বাধীনতা আমাদের জীবনের চেয়েও প্রিয়। তারপরও দেখা গেছে যে অনেক মহান সাহিত্য রচিত হয়েছে কষ্টকর ও ভীতিকর পরিবেশে থাকার ফলে এবং বঞ্চনার ফলে। এরকম পরিস্থিতিতে কোন মহান লেখক মানুষের আচরণ ও মনস্তত্ব নিয়ে অসাধারণ অর্ন্তদৃষ্টি লাভ করতে পারেন। মুক্তি ও বন্দিত্বের সংকট অপ্রত্যাশিত সৃষ্টিশীলতার জন্ম দিতে পারে।

‘ডন কিহাতে’নিয়ে এডিথ গ্রসম্যান তার ২০০৩ সালের অনুবাদের ভূমিকায় লেখেন, ‘ডন কিহাতে’ তে সৃষ্টিশীল উপন্যাসের সব কৌশল, ছলাকলাই ব্যবহার করা হয়েছে যা পরবর্তীতে সব লেখক, সাহিত্যিক তাদের রচনায় নিয়ে এসেছেন।’

কারভানতেস এর লেখায় বাস্তববাদ, আধুনিকবাদ, উত্তরাধুনিকবাদ, প্রকরণের মিশ্রণ এবং সব আধুনিক কলা কৌশলের যোগ ঘটেছিল। তিনি তার সময়ের চেয়ে কয়েক শতক এগিয়ে ছিলেন।

কারভানতেস এর এই মাস্টারপিসটি মনে হচ্ছে বন্দিত্বের কঠোর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নে বের হয়ে এসেছে। ‘ডন কিহাতে’কে বিভিন্ন সমালোচক, সাহিত্যিক বোদ্ধারা বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা করে এসেছে এবং বিভিন্ন সাহিত্যিক, লেখকদের লেখাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে এটি প্রভাব রেখে এসেছে। ফিয়োদর দস্তোবস্কির লেখাতে এর বেশ প্রভাব আছে এবং তিনি এটা স্বীকারও করেছেন।

কারভানতেস এর মত আরেকজন বিশ্বসেরা লেখক দস্তোবস্কিরও জেল খাটার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তার লেখাতেও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। তিনি ততদিনে ‘পুওর ফক’ নামে একটি উপন্যাস লিখে ফেলেছেন যখন তাকে জেলে পুরা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সে বামপন্থী সেন্ট পিটার্সবার্গ এর বুদ্ধিজীবিদের সাথে যুক্ত ছিলেন। জেলে কয়েক মাস কাটানোর পর তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্যদের সাথে তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড় করানো হয়। একেবারে শেষ মিনিটে রাশিয়ার মহাপ্রতাপশালী জার মৃত্যুদণ্ড মুলতবি ঘোষণা করেন। কিন্তু তাকে আরও ৪ বছর জেল খাটতে হয় এবং প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তাকে পাঠানো হয় সাইবেরিয়ান গুলাগ এলাকাতে যেখানে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা তার কয়েদী সঙ্গীদের বিরক্ত করেছিল। তার ভাইয়ের কাছে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘ভদ্রলোকদের প্রতি তাদের ঘৃণা সীমা ছাড়িয়ে গেছে’।

দস্তোবস্কির জেলখানার অভিজ্ঞতা তার লেখায় ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। তার সেরা সৃষ্টি ‘ক্রাইম এন্ড পানিশম্যান্ট ও ‘ব্রাদার কারামাযভ’ লেখার পেছনে জেলখানার জীবনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব অনেক কাজ করেছে। জেমস জয়েস দস্তোবস্কি নিয়ে লিখেছিলেন, ‘দস্তোবস্কি আধুনিক গদ্য সৃষ্টি করেছেন এবং বর্তমানের রাস্তায় তুলে দিয়ে গেছেন।’

১৮৬১ সালে প্রকাশিত তার ‘হাউস অব দি ডেড’ অথবা ‘প্রিজন লাইফ ইন সাইবেরিয়া’ জেল জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ উপন্যাসটি লেখা হয়েছে এক কয়েদির জবানিতে যে তার স্ত্রীকে খুন করেছিল। জেলের ভেতর কিভাবে ভোদকা আর তামাক বাণিজ্য চলে এবং চুরি চামারি যেন নিত্য ঘটনা এর কথাও বলা হয়েছে। উপন্যাসটির কাল্পনিক কয়েদিরা বারবার শুধু মুক্তির স্বপ্ন দেখে যেমনটা দেখতো হয়তো তার লেখক!

উনবিংশ শতকের আমেরিকার রাজনৈতিক চিন্তক হেনরি ডেভিড থরোর চিন্তার উন্মেষের ক্ষেত্রেও জেলজীবন খুব প্রভাব রেখেছিল। সরকারকে কর প্রদান করতে অস্বীকার করায় তাকে জেলে আটক করা হয়েছিল। পরে আমেরিকার তখনকার প্রধান চিন্তক, দার্শনিক, কবি এমারসনের কল্যাণে জেল থেকে বের হতে পেরেছিলেন কিন্তু জেল জীবনের ছাপ রয়ে গিয়েছিল তার লেখা ও চিন্তাতে। জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি খুব স্পষ্টই দেখেছিলাম কোন রাষ্ট্রে আমি বাস করছিলাম।’ তার জেল জীবনের এ অধ্যায়টি তার সেরা অবদান ‘সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স’ (অসহযোগ আন্দোলন) লেখতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

এই নিভৃতচারী দার্শনিকটির চিন্তার ঢেউ লেগেছিল এই ভারতীয় উপমহাদেশে পর্যন্ত। মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক মনন গঠনে যে কয়েকজন চিন্তক ভূমিকা রেখেছেন তার মধ্যে প্রথম সাড়িতে আছেন হেনরী ডেভিড থরো।

থরোর চিন্তা লিউ টলস্টয় থেকে শুরু করে, গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং ও নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনে অনেক প্রভাব রেখেছিল। এর মধ্যে অনেকেরই আবার দীর্ঘ জেল জীবনের অভিজ্ঞতা আছে। মার্টিন লুথার কিং সিভিল রাইটস্ মুভমেন্ট পরিচালনার সময় তিনি বার্মিংহাম জেলে আটক হয়েছিলেন। ঐ আটকাবস্থায় একটি চিঠিতে পর্যন্ত হেনরি ডেবিড থরোর অবদানের কথা উল্লেখ করেন যে, ‘হেনরি ডেভিড থরো ছাড়া এই ধারণাটি আর কেউ এতটা পরিস্কার করে বলতে পারেনি। তার লেখা ও ব্যক্তিগত অবিজ্ঞতার কারণে আমরা তার সৃষ্টিশীল প্রতিবাদের উত্তরাধিকারী।’

নাজিম হিকমত এর ‘জেলখানার চিঠি’ পড়লে বা আবৃত্তি শুনলে যেকোন ভোতা পাঠক, শ্রোতার শরীরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যায়। আবেগের এত ঘন বয়ান, হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা, শব্দ ও কথার ঝংকার নিয়ে ‘জেলখানার চিঠি’ যেন সকল যুগের বিপ্লবী ও বিদ্রোহীর কাছে এক প্রাণ সঞ্জীবনী কবিতা। কার্ল মার্ক্সের সবচেয়ে অগ্রসর বয়ান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন ইতালির অ্যান্তোনিও গ্রামসি তার ‘প্রিজন নোটস’ এ।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন রাষ্ট্রনায়ক জওহারলাল নেহরুর সব বড় লেখাই জেলখানায় বসে লেখা হয়েছে। তার ‘আত্মজীবনী’, ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’, ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’, ‘মেয়ের কাছে বাবার চিঠি’ এ সবগুলোই জেলে বসে লেখা। তার লেখাগুলো জওহারলালকে ভারতের একজন সেরা লেখকে পরিণত করেছে। তার ইংরেজি গদ্যও যে পুরো ইংরেজ মুল্লুকে অন্যতম সেরা এ কথাও উল্লেখ করেন অনেক পণ্ডিতজন। পণ্ডিত জওহারলাল নেহরু যদি জেলে না যেতেন তাহলে কি আমরা তার কাছ থেকে এমনতর লেখা পেতাম? রাজনৈতিক ব্যস্ততায় হয়তো এত বড় লেখার সময় বের করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়তো। সে যাই হউক তার জেলবাসের সুবিধাভোগী আমরা এবং আগামী প্রজন্ম!

এটা নিয়ে একটি বাস্তব গল্পও আছে! স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চরম ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন নেহরু। একের পর এক বিভাগ শক্তিশালী করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একবার এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কোন বিদেশী সুহৃদ যিনি তার লেখার মুগ্ধ পাঠক। জিজ্ঞেস করলেন-তিনি ইদানীং লিখছেন না কেন? বেশ রসালো উত্তরই দিলেন নেহরু-‘ইদানীং তো আর জেলবাস হচ্ছে না তেমন!’

মহাত্মা গান্ধীও অনেক জেল খেটেছেন এবং জেলে বসে অনেক কিছু লিখেছেন। কাজী নজরুল ইসলামের জেলবাসের ভালো অভিজ্ঞতা আছে। জেলবাস যে তার সৃষ্টিশীলতায় ভূমিকা রেখেছে সেটা বলাই বাহুল্য।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি লেখা হয়েছে সেটি তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। তার জেলবাসকে সাধুবাদ না জানিয়ে পাঠককুল যাবে কোথায়? বঙ্গবন্ধুর এত কাছের পরিচয় আমরা কোথায় পেতাম?

এটা নিয়ে তর্ক করা যেতেই পারে কারভানতেস, দস্তোবস্কি, থরো, গ্রামসি, নেহরুরা যদি জেলবাস না করতেন তাহলে এমন অসাধারণ লেখা হয়তো লেখতে পারতেন না। বন্দিত্ব অনেক কষ্টকর কিন্তু এর ক্ষতিপূরণের দিকও আছে। উপরের লেখকরা সহ আরও অনেকের জীবনে সৃষ্টিশীলতার পেছনে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে জেলজীবন।

তাহলে কি এ কথা বলা যায়, ‘যদি বড় লেখক হতে চান তবে জেলে যান!’

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

[email protected]

 

তথ্যসূত্র:

বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত জন সিয়াবাতারি এর প্রবন্ধ

 

Source link:

http://www.bbc.com/culture/story/20140327-can-prison-unlock-creativity

 

Related Posts

About The Author

Add Comment