যমুনার চরগুলোর সমস্যা ও সম্ভাবনা

যমুনা, বিশ্বের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের প্রশস্ততম নদী। হিমালয়ের মানস সরোবর থেকে উৎপন্ন হয়ে হাজার হাজার মাইল চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে কুড়িগ্রামের ভিতর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নাম নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে যেখান দিয়ে যমুনা নদী প্রবাহিত হচ্ছে। পূর্বে সেখান দিয়ে প্রবাহিত হতো না। ১৭৮১ সালের রেনেলের মানচিত্র তার সাক্ষ্য বহন করে। ১৭৭৮ সালে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ব্রহ্মপুত্র তার গতিপথ পরিবর্তন করে যমুনা নাম নিয়ে বর্তমান ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে।

এই নদীর একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাঙ্গনশীলতা। বর্ষায় সে প্রমত্ত হয়ে উঠে। দুই পারের গ্রাম, মাঠ, জমিকে নিয়ে নেয় তার উদরে। ফলে বর্ষার শেষে তার বুকে  জেগে উঠে বিশাল বিশাল চর। সেই চরে ঘর তোলে মানুষ। গত বর্ষায় যাদের ঘর ভেঙ্গেছিল। হয়তো আগামী বর্ষায় আবার ভাঙবে। আবার বসতি গড়ে তুলবে নতুন জেগে উঠা কোনো চরে। বর্ষায় যে নদী ফুলে উঠে সমুদ্রের মতো বর্ষার শেষে তাই হয়ে যায় রুক্ষ মরুভূমি। প্রকৃতির বৈরিতার সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় তাদের।

দেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠির বাস এই চরে। প্রকৃতির চরম বৈরিতার মধ্যে তারা গতি আনে কৃষিতে। সচল রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা। অথচ অচল তাদের জীবনযাত্রা। যাপন করতে হয় তাদের মানবেতর জীবন। বন্যা-খরায় বিপর্যস্ত তাদের জীবন । দেশের মূল জনগোষ্ঠি থেকে তারা রয়ে যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন। সরকারের সময় নেই তাদের দিকে নজর দেয়ার। বিভিন্ন সহযোগী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর খপ্পরে পরে তারা আরো সর্বস্বান্ত হচ্ছে। খুদ্রঋণের  নাম করে রক্ত চুষছে একধরনের এনজিও।

অর্জুনা অন্বেষা পাঠাগারের উদ্যোগে গত ১০ বছর ধরে আমরা নৌকা ভাসিয়েছি যমুনায়। রৌমারি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত চরাঞ্চলে আমরা ঘুরেছি। চরের মানুষজনের সাথে মিশেছি, তাদের সাথে খেয়েছি, রাত্রি যাপন করেছি। ফলে একটা অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে আমরা কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছি এবং তার সমাধানকল্পে কিছু প্রস্তাবনা নিচে উপস্থাপন করছি।

 

সমস্যা

১. কৃষির বৈচিত্র্যহীনতা : ধান, পাট, তিল, কাউন, ভিন্ন অন্য কোনো ফসলের চাষ হয় না বললেই চলে। এই ফসলগুলো তারা চাষ করে কারণ এগুলো চাষ করতে বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয় না।

২. পুঁজির স্বল্পতা : রবি শস্য এবং সবজি চাষে ব্যাপক লাভের সম্ভাবনা থাকা স্বত্ত্বেও তারা এগুলো চাষে আগ্রহী হয় না। কারণ পুঁজির স্বল্পতা। এগুলো চাষ করতে প্রথমে মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। যা তাদের পক্ষে সংগ্রহ করা অসম্ভব।

৩. যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা : যমুনা নদীর একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার ভাঙ্গন প্রবণতা। ফলে সেখানে স্থায়ী কোনো অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য তাদের গঞ্জের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। গঞ্জগুলো গড়ে উঠে ৮/৯ কি.মি. দূরে নদীর ওপর পারে মানে বীর এলাকায়। যেখানে নদী ভাঙ্গনের সম্ভাবনা থাকে না। গঞ্জে যাতায়াতের  জন্য বর্ষা মৌসুমে একমাত্র মাধ্যম হলো নৌকা আর শুকনো মৌসুমে হাঁটা এবং গুদারা পারাপার ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। যোগাযোগের সহজ কোনো মাধ্যম না থাকায়  অনেকটা বাধ্য হয়েই মূল ভূ-খ- থেকে তারা বিচ্ছিন্ন থেকে যায়।

৪. বাজার সুবিধা না থাকা : যদি কখনো কৃষি বহুমুখী করা যায় বিশেষ করে সবজি চাষ করা যায় তখন একটা বড় সমস্যা হবে তার বাজার পাওয়া। একজন কৃষকের পক্ষে দু’একদিন পরপর সবজি তুলে নিজে গঞ্জে গিয়ে বিক্রি করা একটা অসম্ভব কাজ।

৫. অন্য কোনো পেশার সুযোগ না থাকা : কৃষি ভিন্ন অন্য কোনো পেশার সুযোগ না থাকায় ফসল বোনার পরে কেনো কোনো মৌসুমে  বিশেষ করে কার্তিক-আগুন মাসে তাদের বেকার থাকতে হয়। কর্মহীন থাকার  ফলে তাদের অভাবে পড়তে হয়। কোনো কোন এলাকায় তা দুর্ভিক্ষের রূপ নয়, স্থানীয় ভাষায় যাকে মঙ্গা নামে ডাকা হয়।

৬. শিক্ষালাভের সুযোগহীনতা : চরে প্রায় ১০ বর্গ কি.মি. জায়গার মধ্যে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া যাবে  না। ফলে ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও অনেকে শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

৭. প্রশাসনের অনুপস্থিতি : রৌমারি থেকে আরিচা পর্যন্ত এই বিস্তৃর্ণ চরাঞ্চল কড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ জেলার অংশ বিশেষ পড়েছে। দেখা গেছে কোন থানার কিছু অংশ বা একটা বৃহৎ অংশ এই চরাঞ্চলে অবিস্থিত।আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় জেলা শহর নদীর একপাশে উপজেলা পড়েছে নদীর অন্যপাশে। যেমন কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারি, রাজিবপুর পড়েছে নদীর পূর্বপাড়ে আর বাকি উপজেলাসহ জেলা সদর পড়েছে নদীর পশ্চিমপাড়ে।ফলে প্রশাসন এই রকম অঞ্চলগুলোতে নজর দিতে পারছে না তাদের সম্পদ ও জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে। এই কারণে হত্যা, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ সহ নানা অপরাধই হচ্ছে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে।

 

সমাধান

১. কৃষিতে বৈচিত্র্য আনয়ন : প্রচলিত ফসল চাষের পাশাপাশি অপ্রচলিত কিন্তু লাভজনক ফসল চাষে উৎসাহিত করা। যেমন বিভিন্ন রকম সবজি চাষে উৎসাহিত করা।

২. পুঁজি সরবরাহ : অপ্রচলিত ফসল চাষে কৃষককে উৎসাহিত করার জন্য কৃষককে ঋণ সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু সেটা হতে হবে বিনা সুদে কিংবা নামমাত্র সুদে এবং  দীর্ঘমেয়াদি। ফসল তুলে বিক্রি করার আগ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কিস্তির টাকা নেওয়া যাবে না। অর্থ্যৎ কমপক্ষে চার মাস পর থেকে কিস্তির টাকা নেয়া যাবে।

৩. যোগাযোগ সহজিকরণ : যমুনা নদীর বাস্তবতা মাথায় রেখেই চরে কোনো রাস্তাঘাট তৈরি করা যাবে না। খুঁজতে হবে বিকল্প যানবাহন। এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাব হলো ঘোড়া ও গাধার ব্যবহার জনপ্রিয় করা কিংবা শ্যালো মেশিন চালিত ছোট ছোট লরি।

৪. সমবায় ব্যবস্থা জোরদার করা : দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কৃষক/কৃষাণী উৎপাদিত ফসল নিয়ে আসবে পাড়ার একটা নির্দিষ্ট বাড়িতে। সব পাড়ার ফসল আবার একটা দল সংগ্রহ করবে। সেগুলো তারা গঞ্জে বিক্রি করার ব্যবস্থা করবে। এই পদ্ধতির একটা বড় দুর্বলতা হলো এখানে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল তৈরি হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে।

৫. বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা : চর এলাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যেমন সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলে তাঁতশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সেখানকার ঘুঠাইল বাজারে টিনের বাঙ্ক তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে  জেনারেটরের  উপর নির্ভর করে।

৬. দক্ষ জনশক্তি উৎপাদন করা : এলাকার লোকজনের বিদেশ গমনের একটা প্রবণতা আছে। এদেরকে যদি ছয় মাস/এক বছরের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশ পাঠানো যায় তবে একদিকে দেশ যেমন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে একই সাথে তাদেরও ভাগ্য উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে তারা যেন দালালের খপ্পরে না পড়ে। প্রয়োজনে জনশক্তি এজেন্সিগুলোর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে। এবং সহজ কিস্তিতে ঋণদানের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই জন্য চর এলাকায় একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। যেটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে এবং এজেন্সিগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবে।

৭. চরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটা করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই চরের সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড- পরিচালিত হবে।

৮. প্রশাসনের পুর্নবিন্যাস করণ: আমার মতে রৌমারি থেকে আরিচা পর্যন্ত বিশাল এই চরাঞ্চল নিয়ে একটা বিশেষ জেলা ঘোষণা করা উচিৎ।সহজেই স্থানান্তর করা যায় বা ভাসমান অবকাঠামো নির্মাণ করে সরকারি অর্থের অনেক অপচয় রোধ কারা যায়। নদীর নাব্যতা রক্ষা, শিক্ষা, স্বাথ্য, কৃষি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দিবে এই জেলা প্রশাসন। সম্ভব হলে অতিদ্রুত রৌমারি ও রাজিবপুরকে জামলপুরের সাথে আর চৌহালিকে টাঙ্গাইলের সাথে যুক্ত করে প্রশাসনের পুর্নবিন্যাস করলে এই এলাকার মানুষ বিশেষ সুবিধা পাবে। আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে ৭১ সালে আমাদের ১০ নম্বর ছিলো একটি ব্যতিক্রম সেক্টর। ৭১ সালে রণকৌশলের কারণে যদি আমরা সেটা করতে পারি তাহলে এখন কেন সম্ভব হবে না পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠির জন্য স্বতন্ত্র একটা জেলা বা বিভাগ স্থাপন করতে।

এই সমস্ত কার্যক্রম তদারকি করার জন্য গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনকে সংগঠিত করতে হবে। যারা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এলাকায় কাজ করবে। যে কোনো সমস্য সমাধানের চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে নানা ধরনের উদ্ভাবনী উপায় তারা আবিষ্কার করবে। যা সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

 

গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন

Related Posts

About The Author

Add Comment