যে কারণে ট্রাম্পকে পছন্দ ভারতের

(খালিজ টাইমসে প্রকাশিত রাহুলি সিংয়ের এ আর্টিকেলটি বাংলায় তর্জমা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির  হাসান।)

গ্রেট ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকেই দু-এক বছর ছাড়া বেশিরভাগ সময়ই আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক খারাপ ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন কারণে তিনি ঠাট্টা ও উপহাসের পাত্র হয়েছেন, এমনকি মিত্রদের দ্বারাও কোণঠাসা হয়েছেন তারপরেও ট্রাম্পকে যেন ভারত বেশ পছন্দ করছে।

“তিনি ভারতের জন্য সর্বকালের সেরা আমেরিকান রাষ্ট্রপতি” এমন একটি ধারণা যেমন আম জনতার মাঝে বিরাজ করছে তেমনি অনেক বুদ্ধীজীবীর ভাবনাও এমন।

অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে চিত্রটা ভিন্ন হতে যাচ্ছে। ইস্পাত ও অ্যালুমেনিয়াম আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে এবং রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছে। মূলত চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও নাফটাভুক্ত দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে এরকম একমুখী ও সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি গ্রহণ করলেও তার ধাক্কা লাগবে ভারতীয় অর্থনীতিতেও। তবে মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতির বারো ভাগের একভাগ। নয়াদিল্লীর চেয়ে ট্রাম্পের সংরক্ষামূলক পদক্ষেপের ব্যাপারে বেইজিংয়ের আরো অনেক বড় চিন্তার কারণ রয়েছে । এ কারণেই বেইজিং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চীনে আসা আমেরিকান পণ্যগুলির উপর শুল্ক প্রয়োগ করে তাদের প্রতিহিংসা প্রতিহত করার হুমকি দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন সোয়াবিন পণ্যের বড় ভোক্তা সুতরাং এটির রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে তারা। অন্যদিকে নয়াদিল্লী বেইজিংয়ের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে, তারা কেবল চুপ করে আছে এবং এখন পর্যন্ত কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

ট্রাম্পের ভারতে তারকা খ্যাতির জন্য এমন আরো অনেক কারণ আছে। প্রায় চল্লিশ লাখ জাতিগত ভারতীয় এখন আমেরিকায় কাজ করছে ও বসবাস করছে যারা আমেরিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম অ-আমেরিকা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা। ভারতীয়রা যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ অর্থনৈতিক জায়গা দখল করছে এবং বেশ কয়েকজন মার্কিন রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। জাতিগত ভারতীয়রা এখন আমেরিকান জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে। নিকি হেলি জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। আছেন ফরিদ জাকারিয়ার মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত অত্যন্ত সম্মানিত টিভি উপস্থাপক এবং ধারাভাষ্যকর।

ভারতীয়রা তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) খাতে সফল উদ্যোক্তার পরিচয় দিচ্ছেন। এছাড়া পুরো আমেরিকা জুড়ে কাজ করা ভারতীয় ডাক্তারদেরও রয়েছে অনেক সুনাম। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়রা অত্যন্ত সফল পাশাপাশি তাদের কঠোর পরিশ্রম ও উদ্যমের জন্য আমেরিকানদের কাছে অত্যন্ত প্রশংসিত। এমনকি তাদের অবস্থান এতই সবল যে তারা নিজস্ব একটি রাজনৈতিক বলয় নির্মাণ করতেও সক্ষম হয়েছেন।

ভূ-রাজনীতিতেও ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জওহরলাল নেহেরুর সময়ে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লীর ‘জোট নিরপেক্ষ’ নীতির বিরোধিতা করেছিল, যার অর্থ ছিল সোভিয়েত ও আমেরিকান ব্লক থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা। স্নায়ুযুদ্ধের দিনগুলিতে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি  প্রধানত তাদের কঠোর সেক্রেটারি অব স্টেট জন ফস্টার ডুলস দ্বারা পরিচালিত ছিল। তিনি বলতেন “যদি আপনি আমাদের সাথে না থাকেন তবে আপনি তাদের (সোভিয়েত ইউনিয়নের) সাথে আছেন”। সুতরাং তার মতে ভারত ও অন্য ‘জোট নিরপেক্ষ’ দেশগুলো সোভিয়েতের সঙ্গে ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে  পুরোপুরি একাত্মতা প্রকাশ করে এবং সোভিয়েতের বিপক্ষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থা (SEATO)সামরিক চুক্তিতে অংশ নেয় যার পরিবর্তে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র এবং অর্থনৈতিক সাহায্য পেয়েছে। সেই সময়ে অদ্ভুত ব্যাপারটি ছিল যে মার্কিন গণতন্ত্র অন্য গণতান্ত্রিক দেশের চেয়ে সামরিক স্বৈরশাসকের সাথে ভালো ছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধী যখন তার মায়ের হত্যার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তখন এই সমীকরণ পরিবর্তিত হতে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তার প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। এটি রাজীবের জন্য একটি বড় বিজয় ছিল এবং তারপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হতে শুরু করে। বুশ সিনিয়র এবং বুশ জুনিয়র প্রশাসনের অধীনে ভারতীয় অর্থনীতি উদারীকরণ ও পরমাণু চুক্তি উভয় দেশকে আরও কাছে  নিয়ে এসেছিল।

এদিকে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের জন্য তারা নিজেদের ভূতদের সাথে যুদ্ধ করছে। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা হওয়ার কয়েক বছর পর মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলা হলে, ওয়াশিংটন ও দিল্লীকে একসাথে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরো কাছে নিয়ে এসেছে। যখন ট্রাম্প বলেছিলেন যে পাকিস্তান সন্ত্রাসী দমনের জন্য যথেষ্ঠ কাজ করছে না, তখন ভারতীয়দের জন্য তা ছিল মধুর সঙ্গীত। যদিও ট্রাম্প কোন মহান বক্তা নয় কিন্তু তার ভারত সম্পর্কে  বিভিন্ন বক্তব্য  ও আফগান নীতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র এখন একসাথে এগিয়ে চলার অনেক জায়গা খুঁজে পেয়েছে।

আমরা আর অন্যদের গনতন্ত্র নির্মাণের জন্য আমেরিকান সামরিক ক্ষমতা ব্যবহার করব না, অথবা আমাদের ভাবমূর্তিতে অন্য দেশগুলি ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করবো না। সেই দিন এখন শেষ হয়ে গেছে। আমরা অন্যদেরকে তাদের জীবনধারার পরিবর্তন করতে বলতে চাই না, কিন্তু আমদের একসাথে কাজ করার ভালো জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেটা আমাদের ছেলেমেয়েদের ভাল ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা করবে।

খালিজ টাইমস থেকে নেওয়া । ইংরেজি থেকে অনূদিত ।

রাহুল সিং খালিজ টাইমসের সাবেক সম্পাদক ও ভারতীয় সাংবাদিক ।

ফিচার ফটো ক্রেডিট: রয়টার্স

Related Posts

About The Author

Add Comment