যে কারণে বাণিজ্য যুদ্ধে চীন বিজয়ী হতে যাচ্ছে

চীনকে আরো চাপ প্রয়োগ করতে গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য যুদ্ধের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার আমদানির উপর পরবর্তী ধাপে শুল্কের পরিমাণ আগের ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ শতাংশ হবে। প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প তার সমর্থকদের আশ্বস্ত করেন যে শুল্ক মানে “আরো চাকরী ও বেশি সম্পদ।
যদি চাকরি এবং সম্পদ, বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মাপকাঠি হয় তাহলে এ যুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে উদ্ভূত হবে চীন, আমেরিকা নয় । চীন একদলীয় শাসনব্যবস্থার কারণে জয়ী হবেনা, যদিও এটি রাষ্ট্রপতি শি জিন পিংকে বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে সৃষ্ট খারাপ পরিবেশকে মোকাবেলা করতে সাহায্য করবে ।বরং, তারা জয়ী হবে কারণ তারা এই খেলা অনেক দক্ষতার সাথে খেলতেছে। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত শুল্কগুলোর বেশিরভাগ আমেরিকান কোম্পানি ও তাদের ভোক্তাদের পরিশোধ করতে হবে, অন্যদিকে চীন এটার মোকাবেলা করতে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে যাতে তাদের দেশের কোম্পানীগুলো শুল্কের ধাক্কা সামলাতে পারে যেটা তাদের দেশে বিদেশী মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।

এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে শুল্ক আরোপ করতে হবে যেটা চীনা অর্থনীতিকে খুব খারাপভাবে আঘাত করে। কারণ এটা চীনা নেতাদের আমেরিকান বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের ব্যাপারে তাদের মনোভব আরো ভালো করবে যা মার্কিন বাণিজ্যের একটি দীর্ঘদিনের দাবি। চীনের অর্থনীতিক ভালো অবস্থা মার্কিন রপ্তানি উপর নির্ভর করে, তাই বলা যায় তখন চীনা সরকার আমেরিকান চাহিদা মেনে চলতে বাধ্য হবে।

এই কৌশল বিপরীত ফলাফলও বয়ে নিয়ে আসতে পারে।
প্রথমত,যুক্তরাষ্ট্রে চীনের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি পণ্য অ-চীনা মালিকানাধীন কারখানাগুলিতে উত্পাদিত হয়। তাদের মধ্যে অনেক আমেরিকান উৎপাদনকারীদের জন্য কাস্টমাইজড ইনপুট উত্পাদন করে, যেমন কম্পিউটার রাউটার, এলইডি সামগ্রী এবং বোট মোটর। এর মানে,চীনের উপর ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত শুল্ক প্রকৃতপক্ষে চীনে অবস্থিত বহু আমেরিকান মালিকানাধীন এবং ইউরোপীয় কোম্পানিকে আঘাত করবে।

এই কোম্পানিগুলো তাত্ক্ষণিকভাবে শুল্কের জন্য চীন থেকে তাদের কার্যক্রম দ্রুত গুটিয়ে নিতে পারে না। উপরন্ত, তারা আমদানি শুল্ক হজম করবে অথবা আমেরিকান ভোক্তাদের উপর উচ্চমূল্য চাপিয়ে দিবে। এটি ইতিমধ্যে ঘটছে যারফলে, গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিং মেশিনের উপর আরোপিত ২০ শতাংশ শুলকের জন্য ভোক্তা পর্যায়ে এ পণ্যের মূল্যে ১৬.০৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং শুল্কের দ্বারা বাড়ানো অধিকাংশ রাজস্ব আমেরিকান ভোক্তাদের পকেট থেকে বেরিয়ে আসছে, চীনা কোম্পানি থেকে নয়।

চীনা পণ্যের উপর আমেরিকান চাহিদা কমালে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীনা উত্পাদনের প্রায় ৩ শতাংশ পণ্যদ্রব্য আমেরিকা আমদানি করে। যেটা শুল্কের জন্য একটি বড় অংশ ক্ষতির সম্মুখীন হবে , কিন্তু সেটা অবশ্যই বিপর্যয়কর কিছু হবে না।

উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র যেসব পণ্য বেশিরভাগ চীন থেকে আমদানি করে তার অনেক উপাদান অন্যন্য স্থানে তৈরি, এমনকি আমেরিকাতেও। উদাহরণস্বরূপ, চীন থেকে আমদানি করা আইফোনের অনেক উপাদান অন্যান্য স্থান থেকে আসে। দক্ষিণ কোরিয়াতে ডিসপ্লে তৈরি হয়, চিপস তৈরি জাপানে এবং আমেরিকাতে নকশা ও প্রোগ্রামিং হয়। তাই চীনের একটি কোম্পানির প্রতি ডলার বিক্রি কমলে আসলে চীনের অর্থনীতিত ১ ডলারের কম প্রভাব পড়ছে। কম্পিউটার এবং ইলেকট্রনিক পণ্য যা যুক্তরাষ্ট্রে চীনা রপ্তানির সর্বাধিক শেয়ার, এসব আমদানি করা প্রতিটি ডলারের পণ্যে চীনা উপাদান থাকে প্রায় ৫০ সেন্ট। কাজেই, চীনের উৎপাদনের উপর শুল্কের নেতিবাচক প্রভাব চীনা বাণিজ্যের খুব বেশি না।

যেহেতু বাণিজ্য যুদ্ধ ধাপে ধাপে বাড়ছে, তাই চীনের নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক যোগান বাড়ানোর উপর তাদের প্রতিশ্রুতি আরো ভালোভাবে প্রকাশ করতেছে। আর যেটা ট্রাম্প প্রশাসনের পুরো বিপরীত, তার কার্যকলাপ মার্কিন উৎপাদনকারীদের বিচ্ছিন্ন করার অভিপ্রায় বলে মনে হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডে, চীন তার বিদেশী মালিকানাধীন কারখানাগুলিকে শুল্কের খারাপ প্রভাব থেকে রক্ষা করে।জুনের শেষের দিকে বেইজিং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাংকিং, কৃষি এবং মটরযান ও ভারী শিল্পে প্রবেশ করতে পথ সহজ করে দেয়। জুলাইয়ের শেষের দিকে আরও শুল্ক ঘোষণার পর চীন তার অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করার জন্য তাদের ইচ্ছার কথা পু্নর্ব্যক্ত করে। সম্প্রতি টেসলা চীনে প্রথম বিদেশী গাড়ি প্রস্তুতকারক যারা কোন স্থানীয় অংশীদার ছাড়া কার্যক্রম চালানোর অনুমোদন পায়। তারা সাংহাইয়ে ইলেকট্রনিক যানবাহন উত্পাদন করার জন্য কারখানার অনুমোদন পেয়েছে। এই পদক্ষেপগুলি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি শক্ত সংকেত পাঠায় যে চীন বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝখানেও তারা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তবে নিশ্চিত যে , চীন এখনো এমন নীতিমালাগুলির মধ্যে রয়েছে যা অবাধ বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করে না। উদাহরণস্বরূপ, চীন বিদেশি অংশগ্রহণের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলি অবাধ করতে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ভারী শিল্পে ভর্তুকি দিচ্ছে যা অন্যান্য দেশে বাজারের ভারসাম্য নস্ট করছে, সেখানে দাম এবং চাকরির ক্ষতি ঘটাচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প দ্বারা আরোপিত শুল্ক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়।

অন্যদিকে, যখন পরবর্তী শুল্ক আঘাত হানবে তখন আমেরিকান পরিবারগুলো কম্পিউটার, পোশাক ও অন্যান্য হাজারো পণ্যে্র ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যের সম্মুখীন হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র নয়,বরং চীন ভবিষ্যত বিনির্মানে বিশ্বে তাদের অবস্থান আরো সূদৃঢ় করবে।

নিউইয়ার্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।
মেরি ই লাভলি, সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক এবং পিটারসন ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যশনাল ইকোনোমিক্সের ফেলো ।

ইংরেজিতে মূল আর্টিকেলটি পড়তে চাইলে: https://www.nytimes.com/2018/08/08/opinion/trump-tariffs-china-trade-war-who-will-win.html

ছবি ক্রেডিট: এপি

Related Posts

About The Author

Add Comment