রং ফর্সা করার ক্রিম-ফেয়ার এন্ড লাভলিদের কথা

ফেয়ার এন্ড লাভলির একটা বিজ্ঞাপন ছিল ‘ফেয়ার এন্ড লাভলি পাঁচ কোটি টাকার চ্যালেঞ্জ’। একটা সুন্দরী মডেল কন্যা হেসে হেসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন ৩০০ টাকার বিদেশি ক্রিম আর নতুন ফেয়ার এন্ড লাভলি ব্যবহার করে দেখা যায় কোনটিতে রং ফর্সা হয় বেশি। হাতে ফেয়ার এন্ড লাভলি এবং ৩০০ টাকার আরেকটি বিদেশি ক্রিম ঘষে দেখা গেল ফেয়ার এন্ড লাভলিতে চামড়া ফর্সা হয় বেশি। মেয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় ফেয়ার এন্ড লাভলির চেয়ে অন্য ক্রিম ব্যবহার করে যদি বেশি ফর্সা হয় তাহলে ৫ কোটি টাকা দেবে। কেউ বোকামি করতে চাইলে এই চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখতে পারতেন!

এর আগে ফেয়ার এন্ড লাভলীর একটি বিজ্ঞাপন ছিল- ‘নাইট ফেয়ারন্যাস ট্রিটমেন্ট’। এটা মেখে ঘুমাইলে পরীর মত অনেকগুলো কার্টুন বা এমন কিছু জিনিস এসে ড্রিল মেশিন দিয়ে চামড়ার পাঁচ স্তর গভীর পর্যন্ত গিয়ে ‘পরিষ্কার’ করে ‘সৌন্দর্য’ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আবার আরেকটা  বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়েছিল- ফেয়ার এন্ড লাভলী আরেকটা ক্রিমের কাছে হেরে গেছে। ফেয়ার এন্ড লাভলীর কোনো একটা ল্যাবে একজন সুন্দরী মডেলকন্যা এই সুখবর নিয়ে আসেন উপস্থিত অন্য নারী সহকর্মীর কাছে। লাস্যময়ী মডেলকন্যা সহকর্মীদের মেকি টেনশনে ফেলে রহস্য উন্মোচন করে দেখান- নতুন ফেয়ার এন্ড লাভলীর কাছে পুরাতনটা হেরে গেছে।

ফেয়ার এন্ড লাভলী’র কত ঢং, কত রং! একই মসলা বোতলের পর বোতল পাল্টাইয়া আসে আমাদের এই শ্যামবর্ণের দেশগুলোতে। এখানেই তারা ফর্সাকরণ কেমিক্যাল বেচে। আচ্ছা, সাদা চামড়ার দেশে কি বেচে ফেয়ার এন্ড লাভলী? কি কুসংস্কার ফেরি করে ডলার-পাউন্ড লুট করে তারা? শ্যামবর্ণের দেশগুলোর বোকাসোকা মেয়ে আর ভেবাচেকা ইসমার্ট পোলাকে ফর্সা হওয়ার মিছিলে নামাইছে এই লাভলী!

ঐশ্বরিয়া লাক্স সাবান গায়ে ডলতো, এজন্য সে লাক্সের ছোঁয়ায় ‘স্টার’ হয়ে গিয়েছিল। প্রিয়াঙ্কা চোপড়াও লাক্স মাখেন, এজন্য তিনি এত সুন্দর (সুন্দরী) আর স্লিম! আহা! ক্যাটরিনা কাইফ এত সুন্দর করে লাক্স মাখেন, যে কারো দেখা মাত্র লোভ লাগবে। সেখানে সাবানের ঘ্রাণে না ক্যাটের ঘ্রাণে যেন বলিউড কিং শাহরুখ খান দৌড়াইয়া চলে আসলো এবং কাপড়-চোপড় খুলে বাথটাবে নেমে পড়লা। (অবশ্য ওখানে তখন সুন্দরী কন্যা ক্যাট ছিলেন না)। কি আর করা? তখন বাথটাবের পাশে থাকা লাক্স সাবানই গায়ে মাখতে বেচারা শাহরুখকে!

কি সুন্দর বিজ্ঞাপন! সুন্দরী হতে পাগল মেয়েরা নিজেদের ক্যাটরিনা মনে করে আর শরীরে লাক্স ঘষে। ও মাই গড! শাহরুখ খানও লাক্স সাবান বলতে পাগল, এজন্য এত্তো যত্ন করে শরীরে ডলে। ইসমার্ট পোলাপাইনও লাক্স সাবান ঘষে। এই ঘষাঘষি দেখে লাক্স সাবানের ঘষাঘষি বেড়ে যায় সবার মাঝে।

virat

এদিকে, ‘ব্যস, একটুখানি লাক্স’… তারপর বাঙালি রূপসী মেহজাবিন অন্ধকারে জ্বলে উঠেন। তার রূপের আলোতে চোখ ঝলসে যায় উপস্থিত সব বিশিষ্ট অতিথিদের। এই ‘একটু খানি’ লাক্সের সৌজন্যে দীপিকা পাড়ুকোনও ইমরান খানের মত সুদর্শন নায়ককে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারেন।

এরা ব্যবসা বোঝে ব্যাপক। মানুষের মূর্খতাকে পুঁজি করে এরা অনেক লুটপাট করে চলেছে, অনেক বছর ধরেই। এই স্নো, পাউডার ও সাবানের যে সুন্দর সুন্দরী মডেল দেখানো হয় এরা কিন্তু এসব সাবান, স্নো ব্যবহার করে হননি। এই সহজ জিনিসটাও এত বড় ভোক্তা শ্রেণী বোঝে না। ফর্সা হতে ইচ্ছুক মাতাল আর উন্মাদ মানুষের সংখ্যাই বেশি।

অথচ চামড়া হলো জন্মসূত্রে পাওয়া জিনিস। এটা সাদা হতে পারে, কালোও হতে পারে। হতে পারে বাদামী, হলদে কিংবা গোলাপীও। প্রত্যেকটা রং-ই সুন্দর। সৌন্দর্য সাদা-কালো, হলদে-গোলাপী মানে না। পবিত্র কোরআনের সূরা ত্বীনে আল্লাহ বলে দিয়েছেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে উত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের নামিয়ে দিয়েছেন সর্বনিম্ন স্তরে।’ আহ! মানুষ যদি বুঝতো প্রত্যেকটা মানুষই অনন্য এবং প্রত্যেকেই সুন্দর, ‘উত্তম আকৃতির’।

ক্রিস গেইল

অবশ্য এই সৌন্দর্য ব্যবসায় নতুন সংযোজন বাংলাদেশি মডেল তিশার ‘ফ্রেশ মানেই সুন্দর’। মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর বানানো বিজ্ঞাপনটিতে আরেকটি প্রতারণা করা হয়েছে। এখানে অপ্রধান মডেল হিসেবে যেসব মডেলকে উপস্থাপন করা হয়েছে তারা শ্যামবর্ণের সুন্দরী। কিন্তু তিশা শ্যাম বর্ণের এটা কখনো দেখি নাই। তাকে ক্যামেরার মাধ্যমে অহেতুক একটু ‘ডার্ক’ করে দেখানোর চেষ্টা ছিল। বড় বড় বিলবোর্ডগুলোতে এই প্রচেষ্টা পুরোপুরি ধরা পড়ে। সাদা কালোর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ যে খেলটা ফারুকী দেখাতে চাইলেন এটা ভুলভাবে খেলা হয়েছে। এখানে তিশাকে না এনে কেন অন্য কোন শ্যামসুন্দরীকে রাখা হলো না? আবার শ্যামবর্ণ মানেই সুন্দর বর্ণ এটা বুঝানোর জন্য কেন তিশাকে একটু ‘শ্যাম বা ডার্ক’ করে দেখাতে হলো?

সত্য কথা হলো মূর্খতা-অজ্ঞতার সওদা করেই বেঁচে আছে সৌন্দর্য সাবান এবং ফেয়ার এন্ড লাভলীরা। এর দ্বারা যদি শুধু ব্যবসাই হতো তাহলে বাঁচা যেতো। কিন্তু এরা আমাদের চিন্তা-চেতনা, মন ও মগজ নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন বিয়ে করার সময় একজন মদন টাকলাও ঐশ্বরিয়া, ক্যাটরিনার মত কনে দেখে (তাই বলে আমি মদন টাকলার বিয়ের বিপক্ষে নই)। এতে সমস্যা না হলেও সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো তাদের ভেতরকার মনস্তত্বটা। এরা সুন্দরী বলতে ‘সাদা’ চামড়াকেই বুঝে। এর পেছনের কারণ কি হতে পারে? দীর্ঘদিন ‘সাদা’ প্রভুদের দ্বার শাসিত হওয়া এই অঞ্চলের মানুষগুলোর মাঝে ‘সাদা চামড়া ফ্যানটাসী’ আছে এটা পরিষ্কার। সমস্যা হলো ‘সাদাই সুন্দর’ মানসিকতা।

পরিষ্কারক দ্রব্য হিসেবে সাবানের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ফর্সাকরণের ভুল বিজ্ঞাপন, ভুল শিক্ষা সমাজে অনেক ঝামেলার সৃষ্টি করে। সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধের একটি ‘বর্ণবাদ’ সম্প্রসারণে এগুলো কাজ করছে। অনেক মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, অসংখ্য বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, সংসারে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। এ রকম একটা অসুস্থ আইডিয়ার জন্য এত বড় ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেয়া যায় না।

ব্যবসার সব কু-ফর্মুলাগুলো অনুসরণ করে ফেয়ার এন্ড লাভলীরা। একই জিনিস নতুন মোড়কে নতুন নাম নিয়ে আসে কিছুদিন পরপর। ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে ছেলেদের মধ্যেও। এক সময় বেশিরভাগ ভোক্তা ছিল শুধু নারীরা। এবার ছেলেদেরও বিভিন্ন ধরনের ক্রিম বাজারে ছেড়েছে, সে অনেক বছর হলো। ছেলেদেরও চামড়া ‘উজ্জ্বল’ ও ‘ফর্সা’ করার আহ্বান নিয়ে একই পণ্য নতুন মোড়কে এনে বাজারে বিক্রির মহরত জারি রাখে।

টিভিতে শুধু ফেয়ার এন্ড লাভলির-ই আধা-ডজন বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। কয়েক মিনিট পরপরই কোনো না কোনো ফেয়ার এন্ড লাভলি’র বিজ্ঞাপন ভেসে উঠে টিভি পর্দায়। সারা দিন-রাত ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে এত বেশি বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার করে ‘ব্রেনওয়াশ’ তো করেই আমার মনে হয় ব্রেনকে ধুয়ে ফেলেও দেয়া হয়। ভোক্তা ও ব্যবহারকারীরা হয়ে পড়ে মস্তিষ্কবিহীন প্রাণী, যাদের মস্তিষ্কে একটাই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ‘তোমাকে ফর্সা হতে হবে, উজ্জ্বল হতে হবে’। আর এজন্য এই সাবান ব্যবহার করতে হবে, এই স্নো ব্যবহার করতে হবে। এই পাউডার ব্যবহার করতে হবে। কারণ ‘সৌরভেই ভালোবাসা হয়’।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এই বিজ্ঞাপনের মডেলরাই ওইসব জিনিসগুলো ব্যবহার করে না। শুধু বিজ্ঞাপনের সময়ই ওগুলো ব্যবহার করেন। বিজ্ঞাপনে যেভাবে ওগুলো ব্যবহার করতে দেখানো হয় ওভাবেও ও’গুলান ব্যবহার করা যায় না। তবে তাদের জিজ্ঞেস করলে কিন্তু অন্যটা বলবে! কারণ মডেলকন্যারা অনেক টাকা পান শুধু এই কথা বলার জন্য যে, আমি এই সাবান, এই স্নো ও পাউডার মাখি। এদের বেশিরভাগ ক্রেতাই বোকাসোকা আমজনতা।

ফেয়ার এন্ড লাভলিতে যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় ওগুলো ব্যবহারকারীদের কিডনি ও পাকস্থলীর জন্য অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। আবার চর্মরোগসহ, মুখের অনেক সমস্যার কারণও ওসব ক্রিম। কেমিক্যাল রি-একশেন কইরা বহিরাঙ্গ ধবলকরণ কাজ ভালোই চালাচ্ছে লাভলিরা। ভেতরাঙ্গ ধবলকরণের কোনো প্রজেক্ট কী আছে তাদের? কালো মনওয়ালা মানুষের সংখ্যা জগতে অনেক বেড়ে গেছে। কালো মনকে সাদা করার কোনো যদি ফেয়ার এন্ড লাভলি নিতো! এই প্রজেক্ট নিলে ব্যবসা ভালো হবার চান্স আছে, কাস্টমারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে এটা নিশ্চিত। বহিরাঙ্গ ধবলকরণের এই ব্যবস্থার সাথে ভেতরাঙ্গ ধবলকরণের প্রজেক্ট নেওয়ারও সময় এসেছে। তার আগে ফেয়ার এন্ড লাভলিকে জিজ্ঞেস করতে হবে- আপনি ‘ফেয়ার’ এবং ‘লাভলি’ তো? প্রথমে আপনার ভেতর-বাহির দুটোই ‘ফেয়ার’ ও ‘লাভলী’ করে নেন।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment