রঙের রহস্য

রং দিয়ে মোড়ানো আমাদের এই পৃথিবী। শুধু কী পৃথিবী? যেখানেই যত দূর চোখ যায় আমরা দেখি নানা বর্ণের সমাহার | প্রতিটি বস্তুই একটি নিজস্ব রং ধারণ করে আছে | আমাদের দুই চোখের স্বপ্নে রং, কল্পনায়ও রং | আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা উইল প্যাকার এ কথাটিকে সুন্দর ভাষায় বলেছিলেন,

‘আমার ভাবনা আকাশের মতো অসীম | আমি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি আর আমার সব স্বপ্নগুলো উজ্জ্বল রঙে রাঙানো |’

সবকিছুই যদি রংহীন হতো তাহলে কেমন হতো? যাই হোক, সে প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজব না | আমরা জানতে চেষ্টা করব এতসব রঙের উৎস কোথায় এবং কীভাবে ডিজিটাল জগতে আমরা রং–তুলি ছাড়াই রঙের মিশ্রণ ঘটাই |

প্রথমে জানি রং কি? সোজাসাপ্টা ভাষায় রং হচ্ছে আলোর বিভিন্ন আকৃতির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য | সূর্যই সকল আলোর উৎস এবং আজ থেকে প্রায় তিন শ বছর আগেই মানুষ জেনেছে পৃথিবীর সকল রঙের উৎস এই সূর্যের আলোতেই | আলো মূলত এনার্জি অর্থাৎ শক্তির বহনযোগ্য ক্ষুদ্রতম অংশ, যেটাকে আমরা এলিমেন্টারি পার্টিকল (Elementary Particle) বলে থাকি | এমন একটি পার্টিকল হলো ফোটন। যেটার সত্যিকারের কোনো আকৃতি নেই। শুধুমাত্র সৃষ্টি ও বিনাশ আছে | অন্যভাবে আলোকে বলা যায় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম | ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্রাম হলো শক্তির আরেকটি বিশেষ রূপ, যেটা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন দ্বারা গঠিত | এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন আবার নানা অসংখ্য আকৃতির তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সমন্বয়ে গঠিত | আর তরঙ্গ মানেই সেটার কম্পাঙ্ক অর্থাৎ ফ্রিকোয়েন্সি আছে | কম্পাঙ্ক হলো প্রতি সেকেন্ডে কোনো তরঙ্গের পূর্ণ স্পন্দন সংখ্যা | এর একক হার্টজ (Hz) | কোনো বস্তু থেকে আলো আমাদের চোখে প্রবেশ করলে সেটার একটা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক থাকে | বস্তু ভেদে কম্পাঙ্ক ভিন্ন হয় | তাই আমরা রঙের এত ভিন্নতা লক্ষ্য করি | উদাহরণস্বরূপ, কোনো বস্তু থেকে যদি আমাদের চোখে প্রবেশকৃত আলোর কম্পাঙ্ক ৪৩০ থেকে ৪৮০ THz (১ THz= ১ ট্রিলিয়ন হার্টজ) হয় তাহলে আমরা লাল আলো দেখি | আবার কম্পাঙ্ক ৬৭০ থেকে ৭৫০ THz এর মধ্যে হলে সেটার রং বেগুনি | ধরা যাক টেবিলের এর ওপর রাখা একটি পাকা কলার রং হলুদ | হলুদ হওয়ার কারণ হচ্ছে কলাটির গা থেকে নিঃসৃত আলোক তরঙ্গের কম্পাং ৫১০ থেকে ৫৪০ THz এর মধ্যে | আমাদের চোখে দেখা সব রঙের ক্ষেত্রে এই একই নিয়ম প্রযোজ্য | লাল বস্তু থেকে নিঃসৃত আলোর রং লাল, সবুজ বস্তু থেকে নিঃসৃত আলোর রং সবুজ ইত্যাদি | পাশাপাশি এসব বস্তু থেকে আসা আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এবং কম্পাঙ্কও ভিন্ন | এতক্ষণ তো জানলাম বাস্তব জীবনে আমাদের চারপাশে দেখা অদেখা নানা রং সম্পর্কে | এর বাইরেও আছে ডিজিটাল রঙের অনেক ব্যবহার | মোবাইল ফোন, টিভি ও কম্পিউটার পর্দায় আমরা যেকোনো রংই দেখতে পারি |

আগেই বলেছি মানুষের চোখ কীভাবে রঙের পার্থক্য অনুভব করতে পারে এবং কখন আমরা একটি নির্দিষ্ট রং দেখি | কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইসে তৈরি রংও আমাদের চোখে একইভাবে পৌঁছে | তবে কম্পিউটারে রং তৈরি করার পদ্ধতিটা পুরোপুরি আলাদা | আমরা জানি কম্পিউটার তার যাবতীয় কাজ দুটি সংখ্যা শূন্য ও এক–এর মাধ্যমে সম্পাদন করে থাকে | শূন্য ও এককে বলা যায় যথাক্রমে একটি সুইচের বন্ধ ও চালু অবস্থা, যেগুলো বিট নামে পরিচিত | ৮টি বিট মিলে এক বাইট গঠিত হয় | এ রকম পর্যাপ্ত পরিমাণ বাইটের উপস্থিতিতে যেকোনো রং ফুটিয়ে তোলা যায় | যেহেতু ৮টি বিট মিলে এক বাইট হয় সে ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এক বাইট ব্যবহার করে ২৫৬টি সম্ভাব্য রং তৈরি করা যায় | এখন আমরা মোটামুটি নিশ্চিত যে, সংখ্যার ব্যাপ্তি যদি শূন্য থেকে ২৫৫–এর মধ্যে হয় তাহলে আমরা একটি রঙের অনেকগুলো মাত্রা পেতে পারি | যেমন শূন্য মানে রঙের অনুপস্থিতি অর্থাৎ কালো এবং ২৫৫ হলো সাদা | এর মাঝখানের সংখ্যাগুলো দ্বারা কালো ও সাদার মাঝামাঝি বহু রং তৈরি করা যায় |

13450784_1001513689970094_1643718154751095381_nআধুনিক কম্পিউটার রঙের আরও বৈচিত্র্যতা আনতে আরজিবি (RGB) পদ্ধতি ব্যবহার করে | এ পদ্ধতিতে তিনটি ভিন্ন ধরনের রঙের (লাল, সবুজ ও নীল) মিশ্রণ ঘটানো হয় যার মাধ্যমে যেকোনো রং তৈরি করা সম্ভব | উদাহরণস্বরূপ, লাল ও সবুজের মিশ্রণ হলো হলুদ এবং লাল, সবুজ ও নীলের মিশ্রণ হলো সাদা | RGB এর মিশ্রণে ১৬ মিলিয়নেরও বেশি রং তৈরি করতে পারে | উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি হলুদ রঙের RGB নম্বর (R=২৫৫, G=২৫৫, B=0) | এর কারণ প্রথম দুইটি সংখ্যা ২৫৫ ও ২৫৫ দ্বারা যথাক্রমে লাল ও সবুজ রঙের মিশ্রণ বোঝায় যেটি মিলে হলুদ গঠন করে। আর শেষের শূন্য কোনো ভূমিকা পালন করে না।

প্রশ্ন জাগতে পারে শুধুমাত্র কয়েকটি সংখ্যা দিয়ে কীভাবে রং তৈরি হয় অর্থাৎ সংখ্যা কীভাবে রং তৈরি করে? আসলে সংখ্যা রং তৈরি করে না, রঙের উৎপত্তি সেই আলো থেকেই | তাহলে সংখ্যা কি বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যসম্পন্ন আলো তৈরি করতে পারে? হ্যাঁ, বিস্ময়কর হলেও সেটা সম্ভব | বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ার জন্য আমরা হলুদ রঙের RGB-কে উদাহরণ ধরি | হলুদ রং তৈরিতে দরকার ২৫৫, ২৫৫ ও একটি শূন্য | ২৫৫–এর বাইনারি নম্বর হবে আটটি এক | আগেই বলেছি এক দিয়ে একটি সুইচের চালু দশা বোঝানো হয়। অর্থাৎ সেখানে বিদ্যুৎ প্রবাহ চলবে | যখন এই সংখ্যাগুলো কম্পিউটার ইনপুট হিসেবে নেয় তখন সে বুঝতে পারে যে তাকে মনিটরের একটি লাল বিন্দুকে আলোকিত করতে বলা হয়েছে | একইভাবে পরের ২৫৫ দিয়ে সবুজ বিন্দুকে আলোকিত করা হয় | বস্তুর রঙিন ছবি দেখার জন্য প্রস্তুতকৃত পর্দার (যেমন একটি এলসিডি মনিটর) প্রতিটি পিক্সেল এমনভাবে গঠন করা হয়ে থাকে যে, সেখানে তিন রঙের (RGB) সন্নিবেশ থাকে | হলুদ রঙের জন্য নির্দিষ্ট করা আরজিবি (২৫৫, ২৫৫, ০) কম্পিউটারের প্রসেসর গ্রহণ করার পর মনিটরের পিক্সেলকে আলোকিত করে এবং দুটি ভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট আলোর মিশ্রণ ঘটে | এই দুই ধরনের আলোর মিশ্রণই হলো লাল ও সবুজের মিশ্রণ যেটা আমাদের চোখে পৌঁছলে আমরা হলুদ বর্ণ দেখি |

আলো ও রঙের সম্পর্ক অনেক গভীর | রং তৈরির প্রক্রিয়াটাও অনেক মজার | আলো থেকে রং তৈরির ব্যাখ্যা আরও কতটুকু প্রসারিত করলে সেটা পর্যাপ্ত হবে আমার জানা নেই, তবে যেটুকু জানি এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর বিজ্ঞান |

সবশেষে উইল প্যাকারের মতো আমাদেরও সবার জীবন হোক রঙিন, কল্পনাগুলো হোক আকাশ ছোঁয়া এবং স্বপ্নগুলো হোক উজ্জ্বল রঙে রাঙানো |

(লেখক : জাবির আল ফাতাহ, মালমো (সুইডেন) থেকে
শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং)

Related Posts

About The Author

Add Comment