রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’: পাঠ প্রতিক্রিয়া

একসময়ের একটি ছোট্ট চারাগাছ বিশাল মহীরুহে রূপ নেয়। ছোট্ট চারাগাছটির পাতাকে অবজ্ঞার ভঙ্গিতে অনেকেই কান মলে দিতে পারে। কিন্তু চারাগাছটি যখন বিশাল মহীরুহে রূপ নেয় তখন ঢালপালা শোভিত রাজকীয় উপস্থিতি অনেক দূর থেকেই নজরে আসে। তার শীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় ক্লান্ত পথিক। কিছুক্ষণ আশ্রয় নিয়ে আবার তার গন্তব্যে হাঁটা শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে এমন এক বিশাল মহীরুহ। তবে তার নীচে পড়ে থাকলে বাড়ার তাড়নাটা হারিয়ে যেতে পারে। আমরা যারা আগামী দিনের সাহিত্যের শ্রমিক বা শিল্পী হতে চাই তাদেরকে এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে। আমাদের পথ অনেক নতুন, অনেক দূরে আমাদের গন্তব্য। রবীন্দ্রনাথের মত মহীরুহের ছায়ায় আমরা কেবল বিশ্রাম নিতে পারি। দীর্ঘ সময়ের সংসার নয়। এ মহীরুহটি চারা থাকা অবস্থায় কেমন ছিল এটা দেখার জন্যে তার ‘ছেলেবেলা’ বইটি হয়তো অনেকেই পড়েছেন আর যারা পড়েননি তারাও পড়ে দেখতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে বাঙালীর সবচেয়ে বড় প্রতিভা। জ্ঞানের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ছিল তার সদর্প বিচরণ। এই প্রতিভাধর বাঙালীর ছেলেবেলা কেমন ছিল, কিভাবে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন ভবিষ্যতের জন্য তা কেবল তরুন-নবীনদেরই আগ্রহের বিষয় নয় সববয়সী ভক্ত পাঠক ও সমালোচকদের আগ্রহের বিষয়। সৌভাগ্যের বিষয় এজন্য রবীন্দ্রনাথ নিজেই যথেষ্ঠ মসলা সরবরাহ করে গেছেন। তার আত্মজীবনী কেন্দ্রিক লেখাগুলো থেকে তার একটা স্পষ্ট ছবি দাড় করানোর চেষ্টা করতেই পারে রবীন্দ্র ভক্তরা। এক্ষেত্রে ‘ছেলেবেলা’ হতে পারে প্রথম দরজা। এ দরজায় প্রবেশ করে আদ্যিকালের রবীন্দ্রনাথকে ও তার প্রাগৈতিহাসিক শৈশবকে বুঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। আর তার ‘ছেলেবেলা’ পাঠ করে উপভোগের সাথে সাথে শেখার সম্ভাবনাও কম নয়।

যেমন ধরুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছেলেবেলা’ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেটা শেখতে পারবেন সেটা হলো-“জিজ্ঞাসা করবার সাহস নতুন কালের ছেলেদের; আর বুড়ো কালের ছেলেরা সবকিছু মেনে নেয় ঘাড় গুঁজে।”(ছেলেবেলা, পৃষ্ঠা-২২)

এত দূরের শৈশবের ঘটনাপুঞ্জির এত নিখুত ও ডিটেইল বর্ণনা আমাকে যেমন বিস্মিত করেছে আপনাকেও বিস্মিত করবেনা এমন মনে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মনে হবে রবীন্দ্রনাথ যেন আগে চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন এবং শৈশবে ফিরে গিয়ে অভিনয় করে এসেছেন।

গৌরবময় স্মৃতিরোমন্থন

অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের সাথে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গৌরবগাথা মিশ্রিত থাকে সেটা সব ধরণের মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই যে ছোট্ট রবি, সে তো কোন সুপারস্টার ছিলনা; ছিল অতি সাধারণ একটি ছেলে! কিন্তু বয়স্ক রবীন্দ্রনাথ তার ঐ কম গৌরবময় শৈশবকেই সবচেয়ে বেশি গৌরবের মুকুট পড়িয়েছেন।  মধ্যবয়স কিংবা তার পরের জীবন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কে কখনো অতটা গর্ব করতে দেখিনি।

তবে এটা অনেকেই করে থাকেন। একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কি, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, মার্ক টোয়াইন সবার কাছেই তাদের শৈশব অত্যন্ত গৌরবময়। এদিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ একজন সাধারণ মানুষই, বর্তমানের দেবতুল্য মনীষা নন।

কবিতার সাথে কোলাহল

এবার শুনুন এ বুড়ো রবীন্দ্রনাথের স্বগোতক্তি-“ছেলেদের সাহস মেয়েদের চেয়ে অনেক কম, লজ্জা অনেক বেশি, সেদিন ছোটো বয়সের ছেলে কবি কবিতা লিখেছে মনে পড়েনা, এক আমি ছাড়া। আমার চেয়ে বড়ো বয়সের এক ভাগনে একদিন বাৎলিয়ে দিলেন চোদ্দ অক্ষরের ছাঁচে কথা ঢাললে সেটা জমে উঠে পদ্যে। স্বয়ং দেখলুম এই জাদুবিদ্যের ব্যাপার। আর, হাতে হাতে সেই চোদ্দ অক্ষরের ছাঁদে পদ্মও ফুটল; এমন-কি, তার উপরে ভ্রমর ও বসবার জায়গা পেল। কবিদের সঙে আমার তফাত গেল ঘুচে, সেই অবধি তফাত ঘুঁচিয়েই চলছি।”  (ছেলেবেলা, পৃষ্ঠা-২৪)

একবার ছোটবেলায় স্কুলে কবিতা লিখে ও পড়ে শুনালে চুরির অভিযোগের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেন-“নিন্দুকেরা জানতে পারেনি, তার পরে যখন সেয়ানা হয়েছি তখন ভাব-চুরিতে হাত পাকিয়েছি। কিন্তু এ চোরাই মালগুলো দামি জিনিস।” (পৃ:২৫)

বউ ঠাকরুনের প্রভাব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা বিকাশে বউ ঠাকরুনের প্রভাব অনেক বেশি। তিনি এ কথা স্বীকার ও করেছেন।  ঐ কিশোর কবি কবিতা লিখে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বউঠাকরুনের কাছে আসতেন প্রশংসা শুনতে, কিন্তু- “বউঠাকরুনের ব্যবহার ছিল উল্টো। কোন কালে আমি যে লিখিয়ে হব, এ তিনি কিছুতেই মানতেন না। খোঁটা দিয়ে বলতেন কোন কালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতে পারবনা। আমি মন মরা হয়ে ভাবতুম তাঁর চেয়ে অনেক নীচের ধাপের মার্কা যদি মিলত, তা হলে মেয়েদের সাজ নিয়ে তাঁর খুদে দেওর কবির অপছন্দ অমন করে উড়িয়ে দিতে তাঁর বাধত।”

এটা খুব স্পষ্ট কিশোর রবির প্রতিভার সলতেতে কেরোসিন বাড়িয়ে দিয়ে প্রতিভার আগুনটাকে যথেষ্ঠ উসকে দিয়েছিল বউঠাকরুন।

বিলিতি চালের পত্তন

১৭ বছর বয়সে আমেদাবাদে মেজদার কাছে নিয়ে আসা হল ‘বিলিতি চাল-চলনের গোরাপত্তন করে নিতে’ । লন্ডনে যাওয়ার কিছুদিন আগে আমরা ওখানে এক অন্তর্মুখী, লাজুক তরুণের দেখা পাই। সে সবসময় উৎকুণ্ঠিত, ভীত, লজ্জিত, সংকিত, কুণ্ঠিত।

তার বর্ণনায়-“শিকড়সুদ্ধ আমাকে উপড়ে নিয়ে আসা হল এক খেত থেকে আর-এক খেতে। নতুন আবহাওয়ার সঙে বোঝাড়া শুরু হলো। গোড়াতে সব-তাতেই খটকা দিতে লাগল লজ্জা। নতুন লোকের সঙ্গে আলাপে নিজের মান রক্ষা করব কী করে এই ছিল ভাবনা।” (পৃ:২৯)

কি অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি, শব্দপ্রয়োগ ও রোমাঞ্চের অসাধারণ ব্যাপ্তি!

মেজদা রবিকে বোম্বাইয়ের এক গৃহস্থঘরে রেখে এসেছিলেন যাতে-“বিদেশকে যারা দেশের রস দিতে পারে সেইরকম মেয়েদের সঙ্গে আমাকে মিলিয়ে দিতে পারলে হয়তো ঘরছাড়া মন আরাম পাবে। ইংরেজি ভাষা শেখবারও সেই হবে সহজ উপায়। তাই কিছু দিনের জন্য বোম্বাইয়ের কোন গৃহস্থঘরে আমি বাসা নিয়েছিলুম। সেই বাড়ির কোন-একটি  এখনকার কালের পড়াশুনোওয়ালা মেয়ে (আন্না তড়খড়) ঝকঝকে করে মেজে এনেছিলেন তাঁর শিক্ষা বিলেত থেকে।”(পৃ-৩০)

ঐ পড়াশুনা জানা আধুনিক মেয়ের মন জয় করার কৌশল নিয়ে যা বলছেন তা হল-

“আমার বিদ্যে সামান্যই, আমাকে হেলা করলে দোষ দেওয়া যেতে পারতনা। তা করেননি। পুঁথিগত বিদ্যা ফলাবার মতো পুঁজি ছিলনা, তাই সুবিধে পেলেই জানিয়ে দিতুম যে কবিতা লেখবার হাত আমার আছে। আদর আদায় করবার ঐ ছিল আমার সব চেয়ে বড়ো মূলধন। যাঁর কাছে নিজের এই কবিআনার জানান দিয়েছিলেম তিনি সেটাকে মেপেজুখে নেননি, মেনে নিয়েছিলেন। ” (পৃ-৩০)

বুঝাই যাচ্ছে এটা কবির অন্যতম স্মরণীয় স্বীকৃতি, তা ও আবার কোন তরুণীর কাছ থেকে। এজন্যেই পুরো কথাটাই মনে গেঁথে ছিল। তাই বুড়ো বয়সের রবীন্দ্রনাথ তরুন বয়সের এ এপিসোডটা আরেকটু বাড়িয়ে নিয়ে বলেন-তার ঐ ঢাগর চোখ, কালো রংয়ের মুখায়ব ও শীর্ণ দেহের প্রশংসা নাকি পেয়েছিলেন ঐ তরুণী থেকেই। এ বর্ণনা তিনি দিচ্ছেন বেশ গৌরব করেই। আসলে মেয়ে মানুষের প্রশংসা বলে কথা! তরুণ বয়সের এ মধুর স্মৃতি ভুলা কি সম্ভব?

“মনে পড়ছে তাঁর মুখেই প্রথম শুনেছিলুম আমার চেহারার তারিফ। যেমন একবার আমাকে বিশেষ করে বলেছিলেন, ‘একটা কথা আমার রাখতেই হবে, তুমি কোনোদিন দাড়ি রেখোনা; তোমার মুখের সীমানা যেন কিছুতেই ঢাকা না পড়ে। তাঁর এই কথা আজ পর্যন্ত রাখা হয়নি, সে কথা সকলেরই জানা আছে।” (পৃ-৩১)

নিখুঁত চরিত্রায়ন

তার শৈশবের সব তুচ্ছ/ক্ষুদ্র চরিত্রগুলো কলমের খোঁচাতে এত নিখুঁত হয়ে উঠেছে যে যেন মনে হয় তারা কোন শক্ত চিত্রনাট্যের নায়ক-নায়িকা এবং তাদের গুরুত্বও প্রধান নায়ক নায়িকার মত।

প্রথম দিকে ছোটবেলার কেচ্ছার জগত, ভূত-পেতদের জগতের কথা পাওয়া যাবে। গল্প শুনার যে নিরন্তন তৃষ্ণা এ যেন ফুরোবার নয়-‘তারপর কি হয়েছিল’ প্রতি গল্পপ্রিয় শিশুর এই প্রশ্ন হয়তো তাকেও তাড়িত করেছিল অনেকদিন, অনেক বছর।

 

ঠাকুর বাড়ির হাঁড়ির গল্প

ঠাকুর পরিবার নিয়ে অনেক খ্যাতি,যশ, আভিজাত্যের কাহিনী খানিকটা সত্য হলেও তখন যে জৌলুস বেশ কমে এসেছিল এটা ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের জবানিতে।

“জানিয়ে রাখি আমাদের চাল ছিল গরিবের মতো। গাড়ি-ঘোড়ার বালাই ছিলনা বললেই হয়।… বাইরে কোণের দিকে তেঁতুল গাছের তলায় ছিল চালাঘরে একটা পাল্কিগাড়ি আর একটা বুড়ো ঘোড়া। পরনের কাপড় ছিল নেহাত সাদাসিধে। অনেক সময় লেগেছির পায়ে মোজা উঠতে।… সাবেক কালের বড়োমানুষির ভগ্নদশা সহজেই মেনে নেবার তালিম চলছিল।” (পৃষ্ঠা-৮)

স্কুল বিদ্যার বয়ান

এবার শুনুন স্কুলবিদ্যার বয়ান- ডিক্রুজ সাহেবের ‘বেঙ্গল একাডেমি’তে “ল্যাটিন শেখার ক্লাসে আমি ছিলুম বোবা আর কালা, সকল রকম একসেসাইজের খাতাই থাকত বিধবার থান কাপড়ের মত আগাগোড়াই সাদা। আমার পড়া না করবার অদ্ভূত জেদ দেখে ক্লাসের মাস্টার ডিক্রুজ সাহেবের কাছে নালিশ করেছিলেন। ডিক্রুজ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন-পড়াশোনা করবার জন্যে আমরা জন্মাইনি। মাসে মাসে মাইনে চুকিয়ে দেবার জন্যেই পৃথিবীতে আমাদের আসা।”

‘ছেলেবেলা’ শেষ হলো বিলেত গিয়ে; হওয়ারই কথা। বিলেত গেলে তো কেউ আর কাঁচা থাকতে পারেনা। জীবন ও তার অভিজ্ঞতার জগতটা প্রশস্ত হয়ে যায়।

শেষ প্যারাটি ছিল এমন-“বিলেত গেলেম, ব্যরিস্টর হইনি। জীবনের গোড়াকার কাঠামোটাকে নাড়া দেবার মতো ধাক্কা পাইনি। নিজের মধ্যে নিয়েছি পূর্ব-পশ্চিমের হাত-মেলানো। আমার নামটার মানে পেয়েছি প্রাণের মধ্যে।”(পৃ:৩২)

কোন শিক্ষাতেই অতি মেধাবী ছিলেন এ কথা বলা যাবেনা তবে তিনি বিবিধ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষার ভিত গড়ে তুলেছিলেন ঐ ছেলেবেলাতেই। তিনি সেই অর্থে পাশ করে করে এক ক্লাস ছেড়ে অন্য ক্লাসে যাননি। তবে দেখেছেন চোখ খুলে, শেখেছেন বিস্তর।

সাবিদিন ইব্রাহিম

Related Posts

About The Author

Add Comment