রহস্যময় লেখক এডগার এলান পো

১৬৬ বছর আগে রহস্যজনকভাবে মারা যান এডগার এলান পো। বিষাদবিলাসিরা অবশ্যই তার জন্য শোক প্রকাশ করে। কারণ রহস্য গল্পের এই স্রষ্টার মৃত্যুও যে অসীম রহস্যে ঘেরা। পণ্ডিত মহলে এখনো এই বিষয়ে ঘোর বিতর্ক চলে, কেন তাঁকে মৃত্যুর মাত্র চারদিন আগে জীর্ণ পোশাকে উন্মত্ত অবস্থায় মেরিল্যান্ডের বল্টিমোরে পাওয়া গিয়েছিল। জায়গাটি ছিল তাঁর নিউ ইয়র্কের বাসা থেকে বেশ দূরে। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে এলকোহলে আসক্তি থেকে শুরু করে জলাতঙ্ক ইত্যাদি রোগ বলে মনে করা হয়।

আমেরিকার এই প্রসিদ্ধ কবির মৃত্যুই যেখানে রহস্যপূর্ণ, সেখানে তাঁর জীবন-যাপন কী রকম ছিল? তাঁর সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? তিনি কি তাঁর গল্পের ক্ষ্যাপাটে খুনি চরিত্রের মতোই ছিলেন? নাকি ছিলেন বদ্ধ মাতাল? এসব পশ্নের উত্তর কৌতূহলীরা পেয়ে যেতে পারেন হাফিংটন পোস্টে তাকে নিয়ে লিন কালেনর একটি নিবন্ধে, যার তরজমা করেছেন মহসিন কামাল;

উপরের প্রশ্নই আমাকে ‘মিসেস পো’ উপন্যাসটি লিখতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। পো-কে অনুধাবন করার জন্য ফিরে তাকিয়েছিলাম ১৮৪৫ সালের নিউ ইয়র্ক শহরের দিকে। এখানে এই সময়েই পো রচনা করেছিলেন ‘দ্যা র‌্যাভেন’ নামক বিখ্যাত কবিতা। এজন্য আমাকে সাহায্য নিতে হয়েছে পাঠাগারের আর্কাইভের। হাঁটতে হয়েছে পো’র হাঁটা পথে, মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করতে হয়েছে তাঁর সকল রচনা। জানা যায় তাঁর অকাল মৃত্যুর মাত্র চার বছর পূর্বে খুব সম্ভবত তিনি একটি নারীর প্রেমে পড়েছিলেন। ওই নারী তাঁর স্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ হবে এটাই সবার ধারণা।

যতটুকু জানা যায়, রহস্যময়ী এই মহিলাটির নাম ছিল ফ্রান্সিস অসগুড। শিশুতোষ লেখা ও আলংকারিক কবিতার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। যখন তার সাথে পো’র দেখা হয় তখন সবেমাত্র তার স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছে। তখন তিনি লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছিলেন। শীগ্রই তাঁদের মধ্যে মনের লেনদেন হয়ে গেল। তখন তাঁরা প্রকাশ্যেই প্রেমের কবিতা বিনিময় করতেন। সেই বছরেই গ্রীষ্মে উভয়ের এক বন্ধুর বাসায় পো তাকে প্রেম নিবেদন করেন। বন্ধুটির বাসা ছিল পোর বাসার নিকটেই। পো’র ঘরে তখন তাঁর স্ত্রী পার করছিলেন হতাশা ও দুশ্চিন্তাময় জীবন। বিভিন্ন পার্টিতে তাঁরা একে অন্যের কাছাকাছি অবস্থান করতেন। বিষয়টি আর লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল না। রেভান্ড রাফুস উইলমুড গ্রিসউল্ডই বোধ হয় তাঁদের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখেছিলেন।

গ্রিসউল্ড এবং পো’র সম্পর্কে ফাটল ধরল। পো গ্রিসউল্ডের কবিতার তীব্র সমালোচনা করতে লাগলেন। সাহিত্য সমালোচনার মাধ্যমে তাঁদের দ্বৈরথ আরও বাড়তে থাকল। লোভী গ্রিসউল্ডের সাথে সাময়িকভাবে জয়ী হলেও তাঁদের মধ্যকার বৈরিতা চলেছিল দীর্ঘ দিন। গ্রিসউল্ড ছিলেন পাগলাটে, বাতিকগ্রস্ত ব্যক্তি। বিভিন্ন সময় চেষ্টা করলেও জীবিত অবস্থায় তিনি পো’র খুব কমই ক্ষতি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পোর মৃত্যুর পর গ্রিসউল্ড তার প্রতিহিংসা চরমভাবে চরিতার্থ করেছিলেন। পো’র মৃত্যুর পর ঘটেছিল সাহিত্য ইতিহাসের এক উদ্ভট ঘটনা। পো’র চাচী ও শাশুড়ি মারিয়া ক্লেম পো’র চরম শত্রু গ্রিসউল্ডকেই তাঁর সকল কর্মের নির্বাহক পদে মনোনীত করেছিলেন।

গ্রিসউল্ড প্রথমেই পো’র জীবনী সম্বলিত বিদ্বেষপূর্ণ ভাষায় শোকসংবাদ প্রকাশ করেন। গ্রিসউল্ডের হাতেই তার এক সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বীর রচনা। তিনি তাঁর চিঠিগুলোকে বিকৃত করলেন, তাঁর চরিত্র সম্পর্কে অপপ্রচার রটাতে থাকলেন। নিজের মনগড়া তথ্য দিয়ে পো’র জীবনী রচনা করলেন, যা পরবর্তীতে প্রায় ২৫ বছর বহুল প্রচলিত ছিল। এমনকি ঘটনাপঞ্জির লেখকেরাও পো’র জীবনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই তথ্যকেই গ্রহণযোগ্য বলে ভাবতেন।

গ্রিসউল্ডের এইসব অপপ্রচার জনতার চৈতন্যে মিশে গিয়েছিল। পো সম্পর্কে বানানো অন্য একটি গল্পে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। খুব সম্ভবত মানুষ আর এই সব কালিমালেপন পছন্দ করতে পারছিল না। এই সব বানানো গল্পের ভিত্তি ছিল অসত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই এগুলোকে এখনো আমরা লালন করে চলছি।

সুতরাং, কে ছিলেন এই পো যিনি ‘দ্যা রাভেন’ কবিতা লিখেছিলেন? আরও লিখেছিলেন আমেরিকার চেতনায় অসংখ্য গল্প। আমরা যেই পো-কে চিনি তিনি এই পো নন; বরং অন্য রকম এক পো। বিষয়টি ‘মিসেস পো’ উপন্যাসে খোলাসা করার চেষ্টা করেছি। তাই আসুন, অন্তরাল থেকে বের হয়ে এসে দৃষ্টি দেই সত্যিকারের এলেন এডগার পো’র দিকে।

১. তাঁর প্রেমিকা
নারীরা তাদের পার্টিতে পো’কে পাওয়ার জন্য আকুল হয়ে থাকত। পো যখন তাঁর কবিতাগুলো আবৃত্তি করত তখন তারা মূর্ছা যেত। তাদের মধ্যে একজন নিজের রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য কূটকৌশল অবলম্বন করল। সে অন্যদের কানে ছড়িয়ে দিল যে পো’র ফ্রান্সিস উসগড নামক এক বিবাহিত মহিলার সাথে সম্পর্ক রয়েছে। কারো মনের মানুষকে পাওয়ার জন্য এ এক অকার্যকর পন্থাই বটে!

২. দ্যা র‌্যাভেনতাঁকে এনে দিল তারকা খ্যাতি
‘দ্যা র‌্যাভেন’ প্রকাশের পর রাতারাতি খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছে যান পো। তাকে নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্যারোডি লেখার ধুম পড়ে যায়। শিশুরা রাস্তায় রাস্তায় হাত নাড়াতে নাড়াতে তাঁর কবিতা আওরাতো।

৩. বিড়াল অনুরাগী
তাঁর গল্পে বিড়ালের ন্যায় প্রাণীদের হত্যার প্রসঙ্গ থাকলেও তিনি এ জাতীয় প্রাণীদের অত্যন্ত ভালবাসতেন; তাঁরাও পো’কে ভালবাসতেন। তিনি ক্যাটারিনা নামক এক কচ্ছপের অনুরাগী ছিলেন। পো ভ্রমণে গেলে প্রাণীটিকে অত্যন্ত বিষন্ন মনে হতো। পো’র মৃত্যুর পর তাঁদের সম্পর্কর ইতি ঘটে এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সেও মারা যায়।

৪. পো ভাড়ার যোগান দিতে পারতেন না
পো ১৮৪৫ সালে ভাড়া বাবদ ৪০০ ডলার পরিশোধ করেছিলেন। বছরটি ছিল তাঁর জন্য অর্থনৈতিক ভাবে লাভ জনক। কেন না এই বছরই তাঁর ‘দ্যা র‌্যাভেন’ প্রকাশিত হয়। অধিকাংশ বছরই তাঁকে বন্ধু মহল কিংবা আত্মীয়দের নিকট হাত পাততে হতো।

৫. সুদর্শন পো
তাঁর যে ছবিগুলো প্রচলিত আছে তৈরি তার সবগুলো তোলা হয়েছিল মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে। সেখানে তাঁকে দেখা যায় ঢোলা চোখ বিশিষ্ট বদ্ধ উন্মাদের ন্যায়। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ। ‘দ্যা র‌্যাভেন’ প্রকাশের সময় তাঁর যে ছবি চিত্রিত হয়েছিল তাতে তাঁকে নারীদের মনোহরণ করার মতোই সুদর্শন বলে মনে হয়। তাঁর এক ভক্তের মতে, ‘তাঁর সর্বাঙ্গে ছিল ভদ্রোচিত চেহারার ছাপ।’

৬. মল্লক্রীড়াবিদ ও সুশ্রী
ক্ষরস্রোতা জেমস নদীতে ছয় মাইল সাঁতার কাটার রেকর্ড ছাড়াও পো’র রয়েছে নিউ ইয়র্কের টার্টল উপসাগরে নৌকা চালানোর অভিজ্ঞতা। তাঁর রয়েছে গ্রামের নির্জন পথে দীর্ঘক্ষণ হাঁটার অভ্যাস। তিনি ছিলেন দীর্ঘ লাফের চ্যাম্পিয়ন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য মাত্র এক জোড়া জুতা থাকলেও তিনিই জয়লাভ করতেন।

৭. স্বল্প সময়েই তাঁর অবস্থার পরিবর্তন
‘দ্যা র‌্যাভেন’ এর সফলতা পো’কে নিউ ইয়র্কের শিক্ষিত সমাজে এক আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। আবার এই মহলটাই উসগুডের সাথে কথিত সম্পর্কের কারণে তাঁকে সমালোচনার বানে বিদ্ধ করে। তবে শুরু থেকেই উসগোড পো’র সাথে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে তাঁর মর্যাদা কিঞ্চিত রক্ষা করেছিলেন। গর্ভে বাচ্চাসহ পূর্ব স্বামীর কাছে ফিরে তার মান রেখেছিলেন। কিন্তু পো তাকে উপলক্ষ করে একটা পার্টিতে প্রেমের কবিতা লিখে পাঠান। উল্লেখ্য ওই পার্টিতে পো নিষিদ্ধ ছিলেন। তাই বলা যায়, তারা তাদের গোপন সম্পর্কের কথা এড়িয়ে যেতে পারেনি।

৮. চরম মুহূর্তে পোর নিয়ন্ত্রণহীনতা
পো জন্মেছিলেন বোস্টন শহরে। পো স্বপ্ন দেখতো হঠাৎ কখনো বোস্টনে ফিরে আসার। ‘দ্যা র‌্যাভেন’ প্রকাশ করার পর তাঁর সে সুযোগ জুটেছিল। তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন একটি মিলনায়তনে নিজেকে উপস্থাপন করার। পরিপূর্ণ মিলনায়তনে তিনি আবৃত্তি করেছিলেন একটি আনাড়ি কবিতা। কবিতাটি ছিল তাঁর অপরিণত বয়সের রচনা। তাঁর অভিনব নামকরণ ‘দ্যা মেসেঞ্জার স্টার’ ও তাঁর জন্য ফলপ্রসূ হয়নি। তাঁর রচনায় মুগ্ধ হতে পারেন নি বোস্টনবাসীরা।

৯. পারিবারিক সম্পর্কে ফাটল
পো’র ধনাঢ্য কাজিন নেলসন পো অন্য কাজিন ১৩ বছর বয়সী ভার্জিনিয়া ক্লেমনকে তার বাসায় নিয়ে আসলে সে ভয় পেয়ে যায়। পো ভার্জিনিয়া ও তার মায়ের বাসায় কিছুদিন ছিল। এই দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারটির প্রতি আলাদা ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। নেলসনের সাথে যেন সে পালিয়ে না যেতে পারে এজন্য ভার্জিনিয়ার কাছে সপে দেন নিজেকে। ধারণা করা হয়, তাদের বিয়েটিতে রোমান্টিকতার চেয়ে বেশি ছিল ভাই-বোন সম্পর্ক। যদিও বর্তমানের পণ্ডিতগণ এর সত্যতা নিয়েও সন্ধিহান।

১০. স্থানীয় ক্লাবে অংশগ্রহণ
১৮৪৫ সালে তাঁর সাহিত্য অনুরাগী এ্যান শারলোট লিন্চ বিভিন্ন লেখক ও শিল্পীদের তার নিউ ইয়র্কের বাসায় বিভিন্ন পুস্তক ও তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে আপ্যায়নের ব্যবস্থা ছিল অন্য রকমের। ক্লান্তি দূর করার জন্য সেখানে চা ও ইটালিয়ান আইসের ব্যবস্থা ছিল। অতিথিরা এই আলোচনা বেশ আনন্দের সাথেই উপভোগ করতেন। ফ্রান্সিস উসগুডের সাথের কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে তাঁর অবাধ যাতায়ত ছিল।

১১. অন্যদের সাথে বৈরিতা
একজন আসক্ত পো’র যে প্রতিমূর্তি আমরা পাই তার বেশিরভাগই তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিসউল্ডের নিকট থেকে পাওয়া। সত্যিকার অর্থে এক পরিশ্রমী লেখক হিসেবে এডগার পো পান করার খুব কম সময়ই পেতেন। একবার অসুস্থ থাকার কারণে সামান্য পরিমাণ আফিম পান করেছিলেন। এতে তাঁর রোগ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি কখনো আফিমের ধারে কাছেও যাননি। কিন্তু এতে তাঁর খ্যাতি আর ফিরে আসেনি। যদিও গ্রিসউল্ড সুচিন্তিতভাবে পো’র খ্যাতি ধ্বংস করেছিলেন কিন্তু এতে তার মনেও কিন্তু শান্তি আসেনি। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কাটিয়ে ছিলেন একান্তই নিভৃতে, অসুস্থ অবস্থায়। তার কক্ষে ছিল তিনজনের প্রতিকৃতি। তার নিজের, ফ্রান্সিস উসগুডের এবং এডগার পো’র।

মহসিন কামাল
ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Related Posts

About The Author

Add Comment