লর্ড জিম : এডভেঞ্চার নাকি অন্তর্দ্বন্দ্বের গল্প?

ভ্রমনকাহিনী কার না ভালো লাগে । আর সে ভ্রমন কাহিনীতে সমুদ্রপথের দুর্গম স্থানের চমৎকার বর্ণনার সাথে যদি মনস্তাত্ত্বিক বিবরণের সম্মিলন ঘটে তাহলে তো কথাই নেই। পলিশ লেখক জোসেফ কনরাড এমনি একজন লেখক। রচনাশৈলীর গভীরতা এবং সমুদ্র ও বিভিন্ন দুর্গম স্থানের জীবন সম্পর্কে লেখার কারণে জীবদ্দশায়ই তিনি অনেক প্রশংসিত হন। তবে সমুদ্রের রোমাঞ্চকর গল্পের আড়ালে তাঁর রচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি কিছুটা ঢাকা পড়ে গেছে, সেটা হচ্ছে মানব মনের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে ভাল-খারাপের দ্বন্দ্ব। ভয়ানক একাকীত্বের কারণে সমুদ্র কনরাডের কাছে একটা ট্র্যাজেডির জায়গা ছিল। যত দিন যাচ্ছে ততই তাকে ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা ঔপন্যাসিকদের একজন মনে করা হচ্ছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘লর্ড জিম’ (১৯০০), ‘নস্ট্রোমো’ (১৯০৪) ও ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ (১৯০৭) এবং বড় গল্প ‘হার্ট অব ডার্কনেস’ (১৯০২)।

“Those who read me, know my conviction that the world … rests on a few very simple ideas … It rests, notably … on the idea of Fidelity.” — Joseph Conrad

জোসেফ কনরাডের ‘লর্ড জিম’ ঠিক এমনি একটি বই। এতে যেমন রয়েছে হতাশাপূর্ণ ও ট্র্যাজিক উপাদান তেমনি রয়েছে ভিনদেশি অদ্ভূত মোরালিটি। জর্জ ইলিয়টের ‘মিডলমার্চ’ -এ সামাজিক উপন্যাসের আড়ালে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রয়াস যেমন দেখিয়েছেন কনরাডের ‘লর্ড জিম’ ও তেমনি, তবে পার্থক্য হল এতে প্রধান চরিত্র লর্ড জিমের গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দ্বন্দ্ব।

‘স্ট্রিম অব কনসাসনেস’ বর্ণনাভঙ্গিতে লেখা উপন্যাসটির শুরুতে দেখা যায় জিম জাহাজে কাজ করতেন। যদিও কাজটা সহজ ছিলনা তবুও জিম তাঁর কাজে খুশি ছিল এবং সকলে তাকে ভালোবাসতো। জিমের ছোট বেলা থেকেই সাগরের প্রতি ছিল প্রবল টান । সে সাগরকেই তাঁর জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে চায়। তার জন্য সে জাহাজ চালানোর প্রশিক্ষনও নেয়। তারপর সে পাটনাতে নাবিক হিসেবে তাঁর প্রথম যাত্রা শুরু করে। তাঁর জাহাজটি ছিল পুরনো যা তীর্থ স্থানের জন্য বরাদ্দ ছিল। তাঁর জাহাজে ছিল আটশ মুসলিম তীর্থযাত্রী। যাত্রাপথে আরব সাগরে এক অন্ধকার নিস্তব্ধ রাতে দেখা দেয় দুর্যোগ। জাহাজটির তখন ডুবো ডুবো অবস্থা। সকল তীর্থযাত্রীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে এবং তাঁর সঙ্গী নাবিকরা জাহাজটি ডুবে যাবে ভেবে লাইফবোর্ড নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যক্রমে জাহাজটি ডোবেনি।

তারপরের পুরো উপন্যাস জুড়ে দেখবো আমরা লর্ড জিমের অপরাধ বোধ । কোলরিজের এনশিয়েন্ট মেরিনার যেমন আলবাট্রস পাখি মেরে সারা জীবন অনুতাপ আর অনুশোচনায় ভুগেছে, তেমনি লর্ড জিম পাটনাগামী পবিত্র তীর্থযাত্রী মুসলিমদের বিপদে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার মতো ভীরু আচরণের জন্য সারা জীবন অনুতপ্ত ছিল। সাফল্য তাঁকে ধরা দিলেও অপরাধের পিছুটান তাঁকে সফল হতে দেয়নি। “Never test another man by your own weakness.” পরবর্তীতে তাঁর মার্লো নামে একজন ভালো বন্ধু জোটে। অন্তর্কোন্দলে ভোগা লর্ড জিম মার্লোকে ভালো ভাবে না দেখলেও মার্লো তাকে বন্ধু ভেবে মালাবার হাউজে ডিনারে ডাকে। পাটনা দুর্ঘটনার তদন্তে জিম চাকরি হারালে মার্লো তাঁকে চাকরীর ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু তাতেও তাঁর মনে শান্তি নেই, অতীতের অনুশোচনায়।

মার্লোর সহায়তায় সে সাক্ষাত পায় স্টেইন-এর। স্টেইন তাকে পাটুসান-এ যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। পাটুসানে তাঁর ভালই কাটছিল। সেখানে জোয়েল নামে এক নারীর প্রেমে পড়ে সে, কিন্তু ঐ রমনীর প্রেমে মজেও তাঁর শান্তি মেলেনি। গল্পের শেষ দিকে অতীত অপরাধবোধ তাঁর সলিল সমাধি ঘটায়। কনরাড’র জীবনের অধিকাংশ সময়ই কাটে সাগর ভ্রমনে। তাই তাঁর সব উপন্যাসের প্লট সাগরকেন্দ্রিক। তবে তিনি চটকদার গল্পের খাতিরে এমন প্রেক্ষাপট নির্বাচন করতেন না, বরং তাঁর কাছে মনে হয়েছিল- জাহাজে বা কোন প্রত্যন্ত গ্রামে কোন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে পুরো জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে একেবারে নিজের মতো করেই সেটার সুরাহা হয়। এ কারণে অন্য সবকিছুর তুলনায় এই পরিস্থিতিগুলোকে আলাদা ও প্রকটভাবে উপলব্ধি করা যায়। তখনকার অধিকাংশ লেখকেরা বিশ্বের তাবৎ আপাত অদ্ভূত বিষয় নিয়ে লেখার মাধ্যমে সমাজের প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ হতে চেয়েছিলেন যা কনরাডের ক্ষেত্রে খাটে না। তিনি বিচ্ছিন্ন জগতে ট্র্যাজেডির ঘনীভবন নিয়ে চিন্তিত ছিলেন । যার প্রমান তাঁর ‘লর্ড জিম’

আশা করি ‘লর্ড জিম’ পড়তে আপনারা ভুলবেন না। শেষ করছি লর্ড জিম থেকে প্রিয় একটা উক্তি দিয়ে:

“And after all, one does not die of it.”

“Die of what?” I asked swiftly.

“Of being afraid.”

 

এমদাদুল এইচ সরকার

শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা।

Related Posts

About The Author

Add Comment