লেকচার নোট: অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ-সেনেকা

লেকচার টপিক: জীবন ছোট নয়: অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ-সেনেকা

আলোচক: সাবিদিন ইব্রাহিম

স্থান: শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সাবিদিন বলছেন

আপনারা আমাকে আপনাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের একটি বড় অংশ উপহার দিয়েছেন এজন্য প্রথমেই অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আপনারা ভাবছেন কোন সম্পদটা দিলেন? না, টাকা বা জায়গা জমি নয়। মানুষের Irreplaceable (অপূরণীয়) সম্পদ হচ্ছে সময়। টাকা বা জায়গা জমি হারিয়ে গেলেও সেগুলো ফেরত পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সময় কখনো ফেরত আনা সম্ভব নয়। এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

তো, সেই অমূল্য, অপূরণীয় সময় আমাকে দিয়েছেন এবং আমিও আমার অমূল্য সময় এখানে দিচ্ছি; আমাদের দুপক্ষেরই লাভ হউক, ভালো একটি বিনিয়োগ হউক এই আশা রেখে শুরু করি আজকের লেকচার। লেকচারের শুরুতে কয়েকজনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চাই।

শেরে বাংলাতে পা ফেলে!

শেরে বাংলাতে পা ফেলে!

ভালো বই একটি ভালো সফটওয়ার

আমার কাছে একটি ভালো বই একটি ভালো সফটওয়ার। সফটওয়ার যেমন কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্ট ফোনের কাজের প্রকৃতি পাল্টে দেয় তেমনি একটা ভালো বইও মানুষের দেখার দৃষ্টি, ভাবনার পদ্ধতি পাল্টে দেয়। তাই আমার মতে বই মানুষের জন্য সেরা সফটওয়ার। আর একেকটা সেরা বই পড়া হচ্ছে একেকটা সফটওয়ার ইন্সটল করা; তার মানে জগতকে একেকবার একেকটি দৃষ্টিতে দেখার সক্ষমতা অর্জন করা।

সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ আমার কাছে তেমন একটি বই। যখন মনে হয় আমি অহেতুক সময় অপচয় করছি, যখন মনে হয় আমি আমার নিজের কাছে কমিটমেন্টের সাথে প্রতারণা করছি, আমার মনের গহীন কোণে হতাশার চাষবাস করছি তখনই এমন কিছু সফটওয়ারের সাহায্য নেই। এগুলো ইনস্টল করার মাধ্যমে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি।

৩

হেঁটে যাই শেকৃবি!

আপনাদেরকে একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু:

আপনাকে যদি বলা হয় আপনি আর ১৩ বছর ৯ মাস ৭ দিন ১৩ ঘন্টা ২৩ মিনিট ৪২ সেকেন্ড বাঁচবেন, তাহলে ভাবুন কেমন লাগবে।

আচ্ছা, আমাদের প্রত্যেকের জীবনের বাকি থাকা সময়গুলো কি এরকম কোন ডিজিটেরই, তাই না? কারো হয়তো ৩০ বছর….২০ বছর… বা বড়জোর ৫০ বছর…

আমরা জানিনা বলে মনের অজান্তেই আমরা হয়তো এটা ভেবে থাকি আমরা মারা যাবো না, অনেক বছর বাঁচবো…এমনটা।

“But if each one could have the number of his future years set before him as is possible in the case of the years that have passed, how alarmed those would be who saw only a few remaining, how sparing of them would they be! ”

আমরা যখন জেনে ফেলি Exact সময়টা আর যখন জানিনা দুটোর মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?

চিন্তা করুন, আপনি জেনে গেলেন কতক্ষণ বাঁচবেন; একেবারে ঘন্টা, মিনিট ও সেকেন্ড সহকারে। জানার আগের জীবন এবং পরের জীবনটার মধ্যে গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন কি?

কত বছর চলে গেল তার সাথে তুলনা করে যদি দেখানো যেত আর কত বছর আছে তাহলে মানুষ অবাক হয়ে দেখতো কত অল্প সময়ই না আছে! তখন কিভাবে সময়ের ব্যবহার করতো?

কেমন হবে কল্পনা করুন—তখন প্রতিটি বছর, প্রতিটি মাস, প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘন্টা কত মূল্যবান হয়ে দাড়ায়…

 

 “Self Awareness”

জীবনের মূল্য, সময়ের মূল্য, অস্তিত্বের অর্থময়তা নিয়ে আমার মধ্যে, আপনার মধ্যে যখন এই উপলব্ধিগুলো আসবে তখন থেকেই আসলে সত্যিকারের বাঁচা শুরু হতে পারে। এর আগে হয়তো অস্তিত্ব নিয়ে থাকা হয়েছিল মাত্র, সত্যিকারের বাঁচা সম্ভব হয়নি।

এই সেল্ফ অ্যাওয়ারনেস বা আত্ম সচেতনতাটা জীবনের শেষ বছরেও আসতে পারে, ৬০ বা ৭০ বছরে গিয়েও আসতে পারে আবার ২০ বছর বয়সেও আসতে পারে। কোনটা বেটার বলে মনে করেন?

আজকের বক্তৃতায় আমরা এমনসব প্রশ্ন ও প্রশ্নের সম্ভাব্য ও সেরা উত্তর নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো। এক্ষেত্রে আমরা যে বইটির আলোকে কথা বলবো সেটা হলো ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’। প্রথমে আমরা বইটির লেখক এবং বইটির ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে একটু জেনে আসি।

সেনেকার পরিচয়:

suicide of seneca

যে লোকটির লেখা নিয়ে আলোচনা করবো তাকে নিয়ে একটু জেনে নিই–

সেনেকা (৫ খ্রি.পূ.-৬৫ খ্রি.) ছিলেন একজন রোমান দার্শনিক। স্পেনের কর্ডোভাতে জন্মগ্রহণ করলেও খুব অল্প বয়সে পরিবারের সাথে রোমে চলে আসেন। তর্কশাস্ত্র ও আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন। মায়ের প্রভাবে দর্শনের জগতে প্রবেশ করেন। স্টোয়িকবাদের সাথে পরিচিত হন এবং শক্ত অনুসারী এবং প্রচারকে পরিণত হন। ছিলেন রোমান সম্রাট নীরুর গৃহশিক্ষক এবং পরবর্তীতে উপদেষ্টা। রাজনীতির রেষারেষি থেকে দূরে থেকে দর্শনের জগতে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন রোমান সম্রাট নীরুর উপর। বড় হওয়ার সাথে সাথে নীরু তার শিক্ষক সেনেকার প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে যান। সম্রাট নীরুর মধ্যে দার্শনিকতা বা দার্শনিক রাজার গুণাবলী ছাড়া অন্য অনেক কিছুই ছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই সেনেকার স্টোয়িক দর্শন দ্বারা বেশি প্রভাবিত হননি।

রোমান সাম্রাজ্যে বিভিন্ন বড় পদে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। তার জীবনের শেষ তিন বছর নিজের দর্শনকে গুছিয়ে শেষ করে যান। রোমান সম্রাট নীরুকে হত্যার লক্ষ্যে পিসোনিয়ান ষড়যন্ত্র হয় ৬৫ খ্রি.। সেই ব্যর্থ ষড়যন্ত্রে সেনেকার নামও চলে আসে। তবে বেশিরভাগ গবেষকদেরই মতামত সেনেকা এতে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু কি আর করা! রাজরোষের শিকার হলেন সেনেকা। এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলো তারই ছাত্র সম্রাট নীরু। আরেকটি সক্রেতেসীয় কাহিনীর শুরু। সেনেকাকে নিজের জীবন নিজে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। সেনেকা তার রগগুলো কেটে দিলেন যাতে রক্ত ফুরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে মারা যেতে পারেন। বুড়ো বয়সের কারণে হয়তো রক্ত ধীরে ধীরে বের হচ্ছিল। এজন্য সক্রেতিসের মতো বিষও পান করেছিলেন সেনেকা। বিষটি দুর্বল হওয়ার কারণে সেটাও ধীরে ধীরে কাজ করছিলো। অবশেষে দ্রুত মৃত্যুর জন্য উষ্ণ পানির টাবে নামেন যাতে শরীর থেকে দ্রুত রক্ত বের হয়ে যায়। আশেপাশে ভক্ত ও শিষ্য পরিবেষ্টিত হয়ে সেনেকা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

সেনেকার বেশিরভাগ নাটকই ট্রাজেডি। বিখ্যাত নাটকগুলো হচ্ছে: দ্য ম্যাডনেস অব হারকিউলিস, দ্য ট্রোজান ওইমেন, দ্য ফিনিসিয়ান ওইমেন, আগামেমনন, ঈদিপাস, মিদিয়া।

চিঠি ও প্রবন্ধ আকারে অনেকগুলো গদ্য লিখেন যার প্রতিটিতেই জীবনের গভীর উপলব্ধি অর্জনের মশলা পাওয়া যাবে। পলিনাস নামে একজন রোমান রাজকর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ লিখেছিলেন। সময়টা ছিল ৪৯ খ্রিস্টাব্দ। ল্যাটিন ভাষায় বইটির শিরোনাম ছিল De Brevitate Vitæ (দে ব্রেভিতেত ভাইতা)।

 

বিস্তারিত আলোচনা

মানুষের জীবন কেন এত ছোট এ নিয়ে বেশিরভাগ মানুষেরই অভিযোগ আছে। কিন্তু এ স্বল্প জীবনেই যে কামালিয়াত অর্জন করা যায় তার পথ বাতলে দিয়েছেন সেনেকা। বেশিরভাগ মানুষই কিভাবে অন্যের জন্য বাঁচে, অন্যের জীবন যাপন করে এবং সবচেয়ে কম কাছের থেকে যায় নিজের কাছে এর উপলব্ধি হবে বইটি পড়ে।

মানুষের কি বৈচিত্র্যময় জীবন। তারা তাদের মালিকানায় থাকা জায়গা-জমির এক ফুট ও যদি অন্য কেউ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে কেমনে ক্ষেপে যায়, তেড়ে আসে এবং কি জানও তো নিয়ে ফেলে। অথচ একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ যদি থাকে সেটা হলো সময়। আমরা সেই মূল্যবান সম্পদ সময়টিতে কিভাবে ভাগ দিয়ে দেই বিভিন্ন মানুষকে। এবং জায়গা-জমি, সম্পদের ক্ষেত্রে বড় কিপটা হলেও সময় সম্পদ বিতরণের ক্ষেত্রে আমরা অনেক বদান্য। যাকে তাকে মালিকানা দিয়ে দেই এই মহামূল্যবান সময় বা সময়ের বড় অংশটুকু। সেনেকার মতে এটা এমন বড় ডাকাতি যেটা মালিক টের পায় না।

আমরা পৃথিবীতে এমনভাবে জীবনধারণ করি যেন আমরা অমর, মৃত্যু মনে হয় আসবেই না। অথচ যে মুহূর্তটা একবার চলে গেল সেটা আর ফিরিয়ে আনা কখনোই সম্ভব না। এবং মৃত্যু ও চলে যাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রাজিক সত্য। এটা ট্রাজিক সত্য কারণ এই সত্যটা সবাই জানলেও ভুলে থাকে বা ভুলে যায়।

সেনেকার মতে-‘তুমি এমনভাবে সময় অপচয় করো যেনো তোমার অফুরান যোগান আছে। কিন্তু ব্যাপারটা হলো কোনদিন কাউকে যে সময়টা দিলে বা যে জন্য দিলে সেটা হয়তো তোমার শেষ সময়। মরণশীল প্রাণীর সব ভয় তোমাদের মধ্যে কিন্তু তোমাদের আকাঙ্খা এত যেন তোমরা মরবে না।’

যারা বিভিন্ন আকামে ব্যস্ত থাকে অথচ ভবিষ্যতে কোন একসময় ভালো কাজ করবে বা ৫০/৬০ বছরের পর অবসরে গিয়ে সকল ভালো কাজ করার পরিকল্পনা করে রাখে তাদেরকে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন কিভাবে তারা নিশ্চিত যে ৫০ বছর বা ৬০ বছর বেঁচে থাকবে? সেনেকার মতে এমন মানুষদের লজ্জা পাওয়া উচিত। যে তার জীবনের সেরা সময়টাতে ভালো কাজ করতে পারে নাই সে শেষ জীবনে গিয়ে করে ফেলবে এটা ভাবা অহেতুক কল্পনাবিলাস নয় কি? সেনেকার কথা হচ্ছে যা কিছু করার আজই শুরু করতে হবে। ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখার দরকার নেই।

কেমনে জীবন যাপন করতে হয় সেটা অনেক সহজ আবার সারা জীবন চলে যায় সেটা আবিষ্কার করতে। এটা কি কেউ কাউকে শেখাতে পারে? সেনেকার মতে-

‘It takes the whole of life to learn how to live, and—what will perhaps make you wonder more—it takes the whole of life to learn how to die.’

জীবনের অর্থ খুজে পাওয়া বা কিভাবে বাঁচতে হয় এটা শিখতে অনেক কষ্ট হয়, এমনকি জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে অনুধাবন হয় যে আসলে সেরকম বাঁচতেই পারলাম না। অনেকে বেশি মানুষের উপর ক্ষমতাবান হওয়াকে জীবনের সফলতা মনে করে। এর একটা বড় গোলকধাঁধা হচ্ছে এই যে অনেকের কাছে পরিচিত হলেও দেখা যায় সে নিজের কাছে সবচেয়ে অপরিচিত। এজন্য অনেক খ্যাতিমান লোক দিন শেষে দেখে তার নিজের জন্য সময় বরাদ্ধ কত কম!

সেনেকার মতে-‘All those who summon you to themselves, turn you away from your own self.’ মানে- ‘যারা তোমাকে তাদের দিকে ডেকে নেয় তারা আসলে তোমার কাছ থেকেই সড়িয়ে নেয়।’

সেনেকা তার সিসেরোর একটি চিঠির অংশবিশেষ উল্লেখ করে বলেন কিভাবে সিসেরো নিজেকে ‘আধেক বন্দি’ (হাফ এ প্রিজনার) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বড় দায়িত্ব, বড় অবস্থান কিছু কিছু মানুষকে সেই বড় দায়িত্ব বা অবস্থানের হাতে বন্দি করে ফেলে।

অন্যকে সুখি করতে, অন্যের সামনে সুখি হিসেবে নিজেকে সবসময় তুলে ধরে রাখতে কত মানুষের জীবনের বড় অংশ চলে যায়। জীবনের যোগ বিয়োগ শেষে দেখা যায় আর সবাইকে সুখি করতে পারলেও যাকে সুখি করা হয়নি সেটা হলো নিজেকে! পাবলিক লাইফের প্যাড়া এমনই! এজন্যই আমরা কত রাজা-বাদশা, ধনরাজ, জ্ঞানী-মুনী-ঋষীকে দেখি অর্থ, সম্পদ, প্রাসাদ ছেড়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বের হয়ে পড়েন। তাদের মধ্য থেকেই বের হয়ে আসে গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, সক্রেতিস, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দেকার্ত বা লুডবিগ ভিৎগেনস্টেইন প্রমুখ মহামানব।

বেশিরভাগ মানুষের দিন কাটে অতীতের অনুশোচনা আর ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা নিয়ে। কয়জন পারে আজকের দিনটাকেই শেষদিন মনে করে পূর্ণ করে বাঁচতে? আর অনেকের দিন কাটে ভবিষ্যতের ভালো সময়ের অপেক্ষা করে। সেনেকার প্রশ্ন ভবিষ্যতের কাছে দাবি-দাওয়া বা ভবিষ্যতের ভয় ছাড়া বর্তমানে বাঁচতে পারে কয়জন?

মানুষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসকেই সবচেয়ে বেশি হেলা করে। আর সব ব্যাপারে কিপটে হলেও সময়ের ব্যাপারে আমরা বেশ উদার তার কারণ এটা দেখা যায় না। আন্তোনিও দে সেইন্ট এক্সিওপেরি’র ক্লাসিক লেখা ‘দি লিটল প্রিন্স’-এ ও আমরা দেখি জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন সূত্র হচ্ছে- It is only with the heart that one can see rightly; what is essential is invisible to the eye.”  মানে ‘মানুষ কেবল হৃদয় দিয়েই ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারে। আমাদের যা প্রয়োজন তা দৃষ্টিশক্তি দিয়ে ধরা যায় না। (দি লিটল প্রিন্স, পৃষ্ঠা ৪৮)

সময়ের অপচয় সেনেকা মেনে নিতে পারেন না। অন্য তুচ্ছ জিনিস নিয়ে বেশ সতর্ক হলেও এ ব্যাপারটাতে বেহিসাবী। সময়কে তুচ্ছ করে যারা অপচয় করে, অহেতুক কাজ করে বেড়ায় তারাই আবার যখন গভীর অসুস্থতায় পড়ে বা মৃত্যুমুখে পতিত হয় তারা ডাক্তার কবিরাজদের হাঁটুর নিচে পড়ে থাকে যেন আর কয়টা দিন বাঁচা যায়। বা কাউকে যখন মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয় তখন উকিল-মোক্তারদের পেছনে ভাই-বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনদের দৌড়ানো দেখলেই বুঝা যায় একটি দিন বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, একটি দিন কত বড়! আবার এ লোকটিই হয়তো দিনের পর দিন দিন ক্ষয় করে গেছে, অন্যের জীবন যাপন করে গেছে আর নিজের কাছে অচেনা থেকে কাটিয়েছে।

মহাভারতে যুদ্ধমাঠের মাঝে দাড়িয়ে কৃষ্ণকেও একই ধরণের কথা বলতে শুনি। অর্জুনকে উদ্দেশ্য করে গীতার সেই কালজয়ী বাণীটি হচ্ছে-‘মানুষ বড়ই আশ্চর্যজনক ও বোকা। সে সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য হারায়। তারপর আবার স্বাস্থ্য ফিরে পেতে সম্পদ নষ্ট করে। সে বর্তমানকে ধ্বংস করে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আবার ভবিষ্যতে কাঁদে অতীতের কথা স্মরণ করে। সে এমনবাবে জীবন অতিবাহিত করে যে সে কখনো মরবে না, কিন্তু সে এমনভাবে মরে যেন সে কখনো জন্মায়ই নি।’

সেনেকার ‘অন দ্য শর্টনেস অব লাইফ’ মূলত এরকম একটি থিমের উপর ভিত্তি করেই দাড়িয়ে আছে। বর্তমানের গুরুত্ব নিয়ে একার্ট টুলের বিখ্যাত ‘শক্তিমান বর্তমান’ (দ্য পাওয়ার অব নাউ) আরেকটি অসাধারণ বই।

অনেক বছর বাঁচলেই কেবল বড় মানুষ হওয়া যায় না। সেনেকা বলেন- কারো ধূসর চুল আর কুচকে যাওয়া চামড়া দেখে ভেবো না সে অনেকদিন বেঁচেছে। সে আসলে অনেকদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

 

যে অংশটা সত্যিকারভাবে বাঁচি সেটা আসলে খুবই ছোট

 

জীবনের যে অংশটা সত্যিকারভাবে বাঁচি সেটা আসলে খুবই ছোট। আর আমাদের অস্তিত্বের বাকি অংশটা বাঁচা নয়, সেটা স্রেফ সময়।

“The part of life we really live is small. For all the rest of existence is not life, but merely time.”

কেউ তো টাকা পয়সা সবাইকে ভাগ করে দিয়ে দেয় না। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগই তো নিজের জীবনকে ভাগ করে দিয়ে দেই! সয়-সম্পত্তি পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা খুবই সতর্ক থাকি। আর সময় অপচয়ের বেলাতে যখন আসলে আমাদের কিপটে হওয়ার কথা ছিল তখন সবচেয়ে অপচয়ী হিসেবে আবির্ভূত হই।

তুমি এমনভাবে জীবন কাটাও যেন চিরকাল বাঁচবে, মৃত্যুর কথা একেবারেই মাথায় আসে না, কত সময় চলে গেল তার তোয়াক্কাই করো না। তুমি সময় এমনভাবে অপচয় করো যেন কোন অফুরান ভান্ডার থেকে নিয়মিত সাপ্লাই পাচ্ছো। কিন্তু নির্মম সত্যটা হচ্ছে আজকে তুমি যে সময়টা কোন ব্যক্তি বা বস্তুর পেছনে দিলে সেটা হয়তো তোমার শেষ সময়টা!

তোমাদের ভয়গুলো হচ্ছে মরণশীল প্রাণীর কিন্তু আকাঙ্খাগুলো অমরদের!

You have all the fears of mortals and all the desires of immortals.

অনেক লোক আছে যারা বলে: “আমার পঞ্চাশ বছর বয়সে অবসরে চলে যাবো, ষাটের দিকে সরকারি দায়িত্ব থেকে সড়ে যাবো”।

আচ্ছা, আপনাকে এই গ্যারান্টি দিলো কে আপনি ওই পর্যন্ত বাঁচবেন? আর আপনার কি লজ্জা লাগে না যে জীবনের শেষ সময়গুলো যখন আসলে আপনি আর কিছুই করতে পারবেন না সেটা শুধু নিজের জন্য রাখছেন? হায়! যখন আপনার জীবন শেষের দিকে গড়ালো তখন বাঁচতে শুরু করার পরিকল্পনা করলেন!

সেনেকা বলছেন-তুমি দেখবে অনেক ক্ষমতাবান ও উচু পদে সমাসীন ব্যক্তি মাঝে মাঝে এই মন্তব্য করে সে অবসর চায়।

স¤্রাট অগাস্টাস সিজার নিরন্তর অবসরের প্রার্থনাই করতেন
তুমি দেখতে পাবে সবচেয়ে ক্ষমতাধর বা উচ্চ পদস্থ ব্যক্তিরা এই মন্তব্য করে বসে যে তারা অবসর চায়। তারা সেটাকেই তাদের সবচেয়ে সেরা আশীর্বাদ মনে করে। তারা মাঝেমাঝে এই কামনা করে যদি তারা কোন ধরণের বড় কোন ঝুকি ছাড়া নীচে নেমে যেতে পারতো। দেবতার বরপ্রাপ্ত মহান স¤্রাট অগাস্টাস সিজার নিরন্তর অবসরের প্রার্থনাই করতেন আর কামনা করতেন কবে এই রাষ্ট্রীয় কর্মকা- থেকে মুক্তি পেতে পারবেন। তার সকল আলাপ-আলোচনাই একসময় এই অবসরের আকাঙ্খার রূপ পেতো। এই অপূর্ণ অথচ মিষ্টি স্বপ্নটার মাধ্যমে কাজে আনন্দ নিয়ে আসার চেষ্টা করতো আর ভাবতো একদিন সে শুধু নিজের জন্যই বাঁচবে। সিনেটকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিঠিতে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে তার অবসরকাল তার অতীতের গৌরবগাথার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে না। সেখানে এভাবেই লেখা আছে: ‘এটা আসলে কথার চেয়ে কাজে দেখানো যায় ভালো। আমার সেই মনোহর স্বপ্নটা বাস্তব থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে। কিন্তু সেই সময়টাকে তীব্রভাবে কামনা এবং শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ আনন্দ দিয়েছে।’ অবসরটা অগাস্টাসের কাছে এমনই পরম আকাঙ্খিত ছিল যে বাস্তবে সেটা না পেলেও কল্পনার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। যার উপর অনেক কিছুর ভার, অনেক ব্যক্তি ও জাতির ভার রয়েছে সে ওই সময়ের সুখ কল্পনা করে কাটায় যে সময়টাতে সে তার বড়ত্বকে পাশে ফেলে রাখতে হবে।
চিঠিতে সিসেরো

অ্যাটিকাসের কাছে লেখা চিঠিতে সিসেরো লিখছেন-‘তুমি কি জানতে চাও আমি এখানে কি করে কাটাচ্ছি? আমি আমার তাসকিউলান ভিলাতে পড়ে আছি এবং আঁধা বন্দির মতো জীবন কাটাচ্ছি।’ সে তার পরবর্তী কথাতে আগের জীবনের জন্য আক্ষেপ করে, বর্তমানের জন্য অভিযোগ-অনুযোগ এবং ভবিষ্যতের জন্য হতাশা ব্যক্ত করে চিঠি শেষ করলো। সিসেরো’র একটা কথার দিকে মনোযোগ দিন যে সে নিজেকে ‘অর্ধেক বন্দি’ মনে করতো। আচ্ছা কোন জ্ঞানী ব্যক্তি এমন নিচ একটা টার্ম ব্যবহার করে কিভাবে, তিনি কিভাবে অর্ধেক বন্দি হতে পারেন-যার স্থিতিশীল ও অফুড়ান স্বাধীনতা রয়েছে? তার তো স্বাধীনতা ছিল এবং অন্যের উপর প্রভাব ছিল? প্রভাব-প্রতিপত্তের উপরেও কোন জিনিসটা থাকতে পারে?

 

কিভাবে বাঁচতে হয়?

কিভাবে বাঁচতে হয় এটা জানতে পুরো জীবন চলে যায়। আর তোমাকে হয়তো আরও বিস্মিত করবে ব্যাপারটা যে কিভাবে মরতে হয় সেটা জানতেও সারা জীবন চলে যায়।

অনেক মহামানবকেই দেখি তারা সকল ধন-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আনন্দ-বিলাস ত্যাগ করে ফেলে। জীবনের শেষভাগে এসে কিভাবে বাঁচা যায় এটা শেখার চেষ্টা করে। তার একটা বড় অংশই জীবন ত্যাগ করে এটা স্বীকার করে যে তারা আসলে তখনো জানেনি। আর যারা জেনেছে তাদের সংখ্যাটা নেহাতই হাতেগুণা।

বিশ্বাস করো, সময়কে কাবুতে রাখা অনেক বড় মানুষের কাজ এবং তাকে সাধারণ মানুষের দুর্বলতার উর্ধে উঠতে হয়। যারা এটা করতে পারে তাদের জীবন আসলে অনেক বড়। কারণ তিনি তার পুরো সময়টাই তার জন্য বরাদ্ধ করেছেন। তার কোন সময়ই অবহেলা বা আলস্যে কাটেনি, তার সময়ের উপর অন্য কারো আধিপত্য ছিলো না। সে খুবই কড়াভাবে তার সময়ের পাহারা দিয়েছে এবং সময়ের বিনিময়ে কোন কিছু সওদা করার মতো পায়নি। এ কারণে সে পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে। আর যার জীবনের বড় অংশটা অন্যকে বিলিয়ে দিয়ে নিঃশেষ করেছে তার আসলে সময় খুব কমই রয়েছে।

‘আমি বাঁচার কোন সুযোগই পেলাম না!’

আর তোমার এটা ভাবার কারণ নেই এসব লোক তাদের এই বিশাল ক্ষতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তুমি একটু খেয়াল করলেই দেখবে ওইসব ক্ষমতাবান মানুষগুলো মাঝে মাঝে চিৎকার করে উঠে: ‘আমি বাঁচার কোন সুযোগই পেলাম না!’

অবশ্যই তোমার কোন সুযোগ ঘটেনি! যেসব লোক তোমাকে তাদের দিকে নিয়ে যায় তারা আসলে তোমাকে তোমার কাছ থেকেই সড়িয়ে দেয়।

প্রত্যেকেই যেন এক তাড়ার মধ্যে আছে; ভবিষ্যতের কাছে কামনা এবং বর্তমানকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে থাকে।

কিন্তু যে তার পুরো সময়টা নিজের জন্য বরাদ্দ রাখে, যে মনে করে প্রতিটি দিনই তার শেষ দিন হতে পারে সে কখনো অহেতুক কামনার মধ্যে বাঁচে না বা আগামীকাল নিয়ে অহেতুক ভীতির মধ্যে। কোন ঘন্টা তার জন্য কি নতুন আনন্দ নিয়ে আসতে পারে? এগুলো তো জানা হয়ে গেছে, একেবারে ভরপুর উপভোগ করা হয়েছে।

কারো ধূসর চুল বা কুচকানো চামড়া দেখে ভাবার উপায় নেই সে অনেকদিন বেঁচেছে। সে আসলে দীর্ঘদিন টিকে ছিল। বন্দর থেকে জাহাজে উঠার পর অল্পক্ষণ পরই যদি ঝড়ের কবলে পড়ে এবং উদ্দাম সমুদ্রে এদিক ওদিক লাফালাফি করে, বৃত্তাকারে একই জায়গায় ঘুরেফিরে তাকে তো বলা যাবে না অনেক পথ ভ্রমণ করেছে। সে অনেক অভিযান করেনি, এদিক ওদিক ঘুরেছে মাত্র।

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো নিয়ে মানুষ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। কারণ এগুলো চোখের কোণায় ধরা পড়ে না। এজন্য এটাকে সস্তা জিনিস হিসেবে গুণা হয়ে থাকে যেন এর কোন মূল্যই নেই।

কিন্তু তারা সময়কে কোন মূল্য দেয় না। তারা এটা দেদারছে বিলিয়ে দেয় যেন এর কোন মূল্যই নেই। আবার তারাই যখন অসুস্থ হয় বা তাদেরকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তখন ডাক্তারের পায়ে পড়ে, বিচারকের কাছে প্রাণভিক্ষা চায় এবং সকল অর্জিত সম্পদের বিনিময়ে হেেলও আরেকটু সময় বেশি বাঁচতে চায়। মানুষের অনুভূতির এই হলো দ্বিচারিতা।

২

লেকচার শেষে!

তোমার জন্য জীবন দিয়ে দিবো

এটা ভাবার কোন উপায় নেই তারা এটা জানে না যে সময় কত মূল্যবান। তারা যাদেরকে বেশি ভালোবাসে তাদের কাছে বলতে শুনা যাবে তাদের জন্য জীবনের কিছু সময় বিলিয়ে দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। অবশ্য তারা তাদের নিজের সময় অজান্তেই তাদেরকে দিয়ে দেয়। কিন্তু এ দেয়ার ফল হলো এই যে সে কেবল নিজের সময় কিছু হারায়, প্রিয়জনের জীবনে কোন সময় যোগ করতে পারে না। কষ্টের ব্যাপারটা হলো এটাই তারা এই ক্ষতিটা অনুধাবন করতে পারে না।

 

কেউ সময় ফিরিয়ে আনতে পারে না

জীবন তার পথেই এগিয়ে যাবে। এটা তার পথ থেকে ফিরে না, কারো জন্য থামে না। এর চলার পথে কোন শব্দ হয় না। এটা কত দ্রুত চলে যায় সেটা তোমাকে মনে করিয়ে দেবে না। এটা  নীরবেই প্রবাহিত  হয়ে যায়। কোন রাজার আদেশে এটা থামবে না, জনতার উল্লাসে বিলম্ব করবে না। এটা প্রথম দিনেই যেভাবে শুরু হয়েছে সেভাবেই চলবে। কোথাও ফিরে তাকাবে না, কোথাও থামবে না। আর ফলাফলটা হবে কি?

 

ভবিষ্যতের আশায় বসে থেকো না

 

কিছু লোকের এরকম হাস্যকর দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে আর কি হতে পারে যারা তাদের দুরদৃষ্টির গর্ব করে? তারা নিজেদেরকে বিভিন্ন কাজে ব্যতিব্যস্ত রাখে এই আশায় তারা যেন ভালো করে বাঁচতে পারে। তারা বাচার জন্য প্রস্তুতি নিতে নিতেই জীবন ক্ষয় করে ফেলে। তারা জীবনের উদ্দেশ্যকে দূর ভবিষ্যতে ফেলে রাখে। এরকম ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে জীবনের অনেক বড় অপচয়। এটা প্রতিদিনের জীবন থেকে বঞ্চিত করে। ভবিষ্যতের আশায় রেখে বর্তমানকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

জীবনের অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে এই আশায় বসে থাকা। কারণ এই আশাটা ভবিষ্যতের উপর পরে থাকে যেটা বর্তমানকে অপচয় করে। তুমি তার উপর নির্ভর করে বসে থাকো যেটা অনিশ্চিত আর সেটাকে হারিয়ে যেতে দাও যার উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ ছিল। আচ্ছা তুমি কোন দিকে তাকিয়ে আছো? তোমার লক্ষ্যটা কি? যে সময়টা আসবে সেটা তো অনিশ্চিত, বর্তমানে বাঁচো!

জীবনকে তিনভাগে ভাগ করা যায়

জীবনকে তিনভাগে ভাগ করা যায়-যেটা চলে গেছে, যেটা চলছে আর যেটা হবে। তিনটার মধ্যে বর্তমানটা সংক্ষিপ্ততম, ভবিষ্যত সন্দেহপূর্র্ণ আর অতীতটা সুনিশ্চিত। কারণ শেষেরটিতে আসলে আপনি আপনার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। এটাকে ফিরিয়ে আনা কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
বর্তমান একটি দিন নিয়ে আসে এবং মিনিট মিনিট করে। কিন্তু অতীতের সবগুলো দিনকেই ইচ্ছে করলে টেনে আনা যায়। তুমি এগুলো বুকে টেনে রাখতে পারবে, যারা অতিমাত্রায় ব্যস্ত তাদের পক্ষে এগুলো করা সম্ভব নয়। যে মন অবিচল ও প্রশান্ত তার ক্ষমতা আছে জীবনের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করার। কিন্তু যারা সবসময় ব্যতিব্যস্ত থাকে তারা তাদের কাঁধে জোয়াল পড়ে রাখে। তারা এদিক ও যেতে পারে না, ওদিক ও যেতে পারে না। এ কারণে তাদের জীবন অতলে তলিয়ে যায়।

যে কলসের তলা নাই সেখানে যত পানিই ঢালা হউক না কেন কাজ হবে না। সময়ের ব্যাপারটা ঠিক একই রকমের। তোমাকে যত সময়ই দেয়া হউক না কেন এটা কোন অর্থ বহন করে না যদি না সে সময়টাকে অর্থবহ কাজে ব্যয় করা হয়। এটা মনের বিভিন্ন চিপাগলি দিয়ে অতলে হারিয়ে যায়।
বর্তমানের সময়টা একেবারে সংক্ষিপ্ত। এটা এতই সংক্ষিপ্ত যে টের পাওয়া যায় না। কারণ এটা তো সবসময় দৌড়ের উপরই থাকে। এটা প্রবাহিত হয় এবং দ্রুত চলে যায়। আসতে না আসতেই আসলে ফুরিয়ে যায়। আকাশ মহাকাশের তারা নক্ষত্রের গতিবিধি যেমন থামানো যায় না, এগুলো যেমন কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না তেমনি সময় ও স্থির থাকে না। আর যারা ব্যতিব্যস্ত লোক তারা বর্তমানকে ধরতে চায়। কিন্তু এটা এতই ক্ষণকালের যে এটাকে ধরা যায় না। এমনকি এটা তাদের হাত থেকে ফসকে যায়, আর সব বিভিন্ন জিনিস যেমন তাদের কাছ থেকে ফসকে যায়।

এককথায়, তুমি কি জানতে চাও তারা কিভাবে ‘দীর্ঘদিন বাচে’ না? দেখবে তারা কিভাবে বেশিদিন বাঁচতে চায়! বুড়ো অথর্ব লোকেরা প্রতিদিন প্রার্থনায় এই কামনা করে যেন তাদের জীবনের হিসাবের খাতায় আরও কয়েকটি বছর যোগ হউক। তারা মনে করে তারা আগের চেয়ে জোয়ান হচ্ছে। আসলে তারা মিথ্যা দিয়ে নিজেদেরকে বুঝ দিচ্ছে। তারা নিজেদেরকে ফাকি দিতে পেরে আনন্দিত হয় যেন তারা আসলে ভাগ্যকেই ফাকি দিতে পেরেছে।

কিন্তু জড়া এসে যখন তাদের মৃত্যুর কথা বলে দিয়ে যায় তখন তারা কি ভয় নিয়েই না মারা যায়। মনে হয় যেন তারা জীবন ছেড়ে যাচ্ছে না বরং তাদেরকে জীবন থেকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা যে বোকামির শিকার হয়েছে এজন্য কান্নাকাটি করে। কারণ, আসলে তারা তো বাঁচেনি। তারা যদি সেই মরণঘাতী রোগ থেকে বেঁচে উঠে তাহলে অবসরে যাবে। তখন তারা ভাবার সময় পায় কিভাবে তারা অর্থহীন জীবন যাপন করে আসলো। ওসব জিনিসের পেছনেই দৌড়িয়েছে যেগুলো আসলে উপভোগ করে না। হায়, কিভাবে তাদের সকল শ্রম বৃথাই গেল। কিন্তু যারা এমন অহেতুক কাজে জীবন অপচয় করেনি তাদের জন্য জীবন কেন পর্যাপ্ত হবে না?

সাহিত্য জগতে বিভিন্ন তুচ্ছ বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা

আর সাহিত্য জগতে কিছু লোক আছে যারা বিভিন্ন তুচ্ছ বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করে বেড়ায়। যেমন গ্রিকদের মধ্যে এমন কিছু সাহিত্য পণ্ডিত ছিল যাদের কাজ ছিল ইউলিসেস এর কয়জন বৈঠা বাওয়া লোক ছিল, ইলিয়াদ বা ওদিসির মধ্যে কোনটা আগে লেখা হয়েছে, এটা কি একই জন লিখেছেন, এরকম বিভিন্ন জিনিস নিয়ে পরে ছিল। এটা তো আসলে মনকে আনন্দ দেবে না, এগুলো প্রকাশ করলে তুমি প-িতের চেয়ে বরং একজন বিরক্তিকর ব্যক্তিতে পরিণত হও। এখন এরকম ফালতু জিনিস শেখার চেষ্টা রোমানদের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে।

গত কিছুদিন ধরে এটা বলতে শুনতে পাচ্ছি এমন ধরণের চর্চা হচ্ছে- কোন রোমান সেনাপতি এটা করেছেন বা ওটা করেছেন, দুইলাস হচ্ছেন প্রথম সেনানায়ক যিনি প্রথম নৌযুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, কিউরিয়াস দেন্তাতাস হচ্ছেন প্রথম সেনাপতি যিনি যুদ্ধে হাতি ব্যবহার করে জয়ী হয়েছেন। এসব বিষয়াদি আসলে কিছুই যোগ করে না, হয়তো রাষ্ট্রের জন্য একটু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিন্তু এ জ্ঞানের কোন উপকারীতা নাই।

আমরা ছোটবেলায় একটা চটি বইয়ে একটা কুইজ দেখেছিলাম যেখানে একটা প্রশ্ন ছিল-যমুনা সেতু বানাতে কয়টি বাঁশ লেগেছিল।

আইনস্টাইনের মাথায় কয়টা চুল আছিল..?

রবীন্দ্রনাথের গোঁফ থেকে দাড়ির দূরত্ব কতটুকু?

 

কারা আসলে সত্যিকারের বাঁচা বাঁচে?

সব মানুষের মধ্যে যারা দর্শনের জন্য সময় রাখে তারাই আসলে সত্যিকার বাঁচে। তারা শুধু নিজের জীবন যাপন নিয়েই সন্তুষ্ট নয়, তারা সব যুগকে নিজের জীবনের সাথে যোগ করতে পারে। কোন যোগই তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সব যুগেই তাদের সমান প্রবেশাধিকার রয়েছে।

আমরা ইচ্ছে করলে সক্রেতিসের সাথে তর্ক করতে পারি, কার্নিয়াদস এর সাথে সন্দেহ প্রকাশ করতে পারি, এপিকিউরিয়াস এ শান্তি পেতে পারি, স্টোয়িকদের মাধ্যমে মানব প্রকৃতির দুর্বলতা জয় করতে পারি, সিনিকদের মাধ্যমে সেটা আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি। আমরা সময়ের তুচ্ছ সীমা অতিক্রম করে অতীতের সেরা সেরা মানুষদের সংস্পর্শে থাকতে পারি।

কার সন্তান হতে চাই?

আমাদের মা-বাবা বাছাই বা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের নাই, কিন্তু আমরা কাদের এবং কেমন সন্তান হিসেবে পরিচিত হতে চাই সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে!

We are wont to say that it was not in our power to choose the parents who fell to our lot, that they have been given to men by chance; yet we may be the sons of whomsoever we will.

সময়ের নির্মম কুঠারে কোন কিছুই টিকে না

সম্মান, স্থাপনা, বড় বড় ভবন, বড় সমাধিসৌধ কোন কিছুই টিকে না। সময়ের নির্মম কুঠার কেটে দেয় সবকিছু, ভেঙ্গে চুরমার করে দেয় সবকিছু। থাকে কি?

কিন্তু জ্ঞান ও দর্শনের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় না। সময় সবকিছু গিলে ফেললেও দর্শনকে গিলে ফেলতে পারে না। জ্ঞান ও দর্শনকে সম্মানের আসনে বসিয়ে রাখে সময়।

একজন ফিলসফারের জীবনটা কেমন?

  • সাধারণ মানুষদের জীবন যেভাবে সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে একজন দার্শনিকের তেমন নয়।
  • তারাই কেবল মানব জাতির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। সব যুগই তাদের অধীন। যে সময় চলে গেছে সেটা সে স্মরণ করে, বর্তমানটাকে সে ব্যবহার করে। আর যে সময়টা আসবে? সেটা সে ধারণা করে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে ধারণ করতে পারেন দার্শনিক!
  • সব সময়কে একত্রিত করে একজন দার্শনিক তার জীবনকে দীর্ঘায়িত করে।

He makes his life long by combining all times into one. 

যে অতীতকে ভুলে যায়, বর্তমানকে অবহেলা করে এবং ভবিষ্যতকে ভয় পায় তার জীবনটা আসলে খুবই ছোট এবং সংকটপূর্ণ। এরকম হতভাগারা যখন জীবনের শেষ অংশে পৌছে যায় তখন দেখতে পারে তারা তাদের এই দীর্ঘ জীবনে বেহুদা কাজেই ব্যস্ত ছিল।

 

ফাঁকফোঁকরে কিভাবে সময় চলে যায়, অচেতন মুহূর্ত সম্পর্কে সচেতন কি?

 

And, too, you have no reason to think that this is any proof that they are living a long time—the fact that the day often seems to them long, the fact that they complain that the hours pass slowly until the time set for dinner arrives; for, whenever their engrossments fail them, they are restless because they are left with nothing to do, and they do not know how to dispose of their leisure or to drag out the time. And so they strive for something else to occupy them, and all the intervening time is irksome; exactly as they do when a gladiatorial exhibition is been announced, or when they are waiting for the appointed time of some other show or amusement, they want to skip over the days that lie between.

All postponement of something they hope for seems long to them

All postponement of something they hope for seems long to them. Yet the time which they enjoy is short and swift, and it is made much shorter by their own fault; for they flee from one pleasure to another and cannot remain fixed in one desire.

সোনার চামুচ মুখে নিয়ে জন্মাও আর দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মাও না কেন জীবন থেকে দুশ্চিন্তার ছুটি নেই। জীবনে একের পর এক চাপ চলে আসে। আমরা অবসর কামনা করলেও সেটা কখনো উপভোগ করি না।

একারণেই বলি প্রিয় পলিনাস, জনতার ভীড় থেকে নিজেকে সড়িয়ে নাও।

The condition of all who are engrossed is wretched, but most wretched is the condition of those who labour at engrossments that are not even their own, who regulate their sleep by that of another, their walk by the pace of another, who are under orders in case of the freest things in the world—loving and hating. If these wish to know how short their life is, let them reflect how small a part of it is their own.

 

উচু পদের মানুষকে ঈর্ষা করো না

তাই কাউকে যখন কোন বড় পদে আসীন দেখবে, বা যার খ্যাতি দেখবে তা দেখে ঈর্ষান্বিত হউও না। এগুলো আসলে সে পেয়েছে তার জীবনের বিনিময়ে। এগুলো তাদের জীবনের সময়গুলো নিয়ে নেবে। তারা তাদের জীবনের সব বছরগুলো অপচয় করবে যেন একবছর তাদের নামে আওয়াজ তোলা হয়।

সেক্সটাস তুরানিয়াস প্রসঙ্গ

সেক্সটাস তুরানিয়াস নামে এক পরিশ্রমী বুড়ো তার নব্বই বছর বয়সে গায়াস সিজারের কাছ থেকে ছুটি পান। তিনি তার পরিবারকে বলেন তাকে যেন বিছানায় শুইয়ে রেখে সবাই তার জন্য শোক করে কান্নাকাটি করে। নব্বই বছরের বুড়ো লোকটির এ আবদারের কথা শুনে তার পরিবারের সবাই হইচই ফেলে দিলো। সে আর শান্তি পাচ্ছিল না। যখন আগের কাজে বহাল হল তখন তাকে থামানো গেল। আচ্ছা এই বাঁধনের মধ্যে আটকে থেকে মরার মধ্যে কি আনন্দ? তারপরও আমরা দেখবো অনেকেই এই কামনাই করে। তারা তাদের সক্ষমতার চেয়ে বেশিসময় কাজ করে যেতে চায়। তারা তাদের নিজের ঝড়া শরীরের সাথে লড়াই করে। তারা বুড়ো বয়সকে খুব ভয় পায়। কারণ বার্ধক্য তাদেরকে ফেলে রেখে যায়। আইনে কিন্তু পঞ্চাশ বছরের পর কেউই আর সেনা থাকতে পারে না, ষাটের পরে আর কোন সিনেটরকে ডাকে না। আইনের কাছ থেকে অবসর নেয়ার চেয়ে নিজের কাছ থেকে অবসর নেয়া অনেক কঠিন দেখায় আসলে। তারা যখন তাদের জীবনকে চুরি করে ফেলে বা জীবন তাদের কাছ থেকে চুরি হয়ে যায় তারা খুবই অসহায় হয়ে পরে। জীবনে আনন্দ থাকে না, জীবনে কিছু পাওয়া হয় না, মনের কোন উন্নতি হয় না।

কারো কারো শষেকৃত্য, সমাধি সৌধ নর্মিাণ প্রসঙ্গ

কছিু কছিু লোক আছে তার মৃত্যুর পর কি কি হবে তারও ব্যবস্থাপত্র করে রাখ।ে বশিাল সমাধসিৌধ, অন্তষ্ট্যেক্রেয়িার জন্য উপহার সামগ্রী, ধুমধাম আয়োজনরে ব্যবস্থা করে যায়।

কিন্তু, সত্যি বলতে কি এসব লোকের অন্তেষ্টেক্রিয়া খুব ছোট্ট মোমবাতির আলোতে সেড়ে ফেলা উচিত। কারণ তারা তাদের জীবনের অল্প অংশই আসলে বেঁচেছিল।

‘আমরা বাঁচার জন্য খুব অল্প সময় পাই ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা আসলে এর বড় অংশটাই অপচয় করি।

 

 

শেষ কথা

পেছনে ফিরে তাকান: দেখুন তো কখন আপনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল, কোন দিনগুলো নিজের ইচ্ছেমত কাটাতে পেরেছিলেন, কোন সময়টাতে আপনার নিজের নিয়ন্ত্রণ ছিলো, কখন আপনার মন প্রশান্ত ছিল?

এই দীর্ঘ জীবনে কি অর্জন করেছেন? কতজন আপনার জীবন থেকে চুরি করে নিয়ে গেল একেবারে আপনার অজান্তেই?

অহেতুক দুঃখবিলাসে, আহাম্মকির আনন্দ উল্লাসে, লোভাতুর কামনায়, সমাজের মোহ কত সময় চলে গেল?

আপনার জীবনের কত অল্পটাই আপনার জন্য রয়ে গেল? আপনি দেখবেন সময়ের আগেই আপনি মারা যাচ্ছেন।

Some people live and very few can define living.

Which party you belongs to?

Do you want merely to exist some years on earth like millions of creatures?

Or you want to take control of your life and define living for yourselves and millions to come?

 

তাই…চলুন, সিদ্ধান্ত নেই, আজকে থেকে। প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিই, প্রতিটি সময় বাঁচি, অর্থবহ বাঁচি।

 

Choose Love, choose love

Without this beautiful love

Life is nothing but a burden

Rumi

Related Posts

About The Author

One Response

Add Comment