লেকচার নোট: ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস

ঢাকা ইউনিভার্সিটি কুইজ সোসাইটিতে প্রদত্ত বক্তৃতা

বক্তা: সাবিদিন ইব্রাহিম

ডাকসু ভবন, দ্বিতীয় তলা-২৭ জানুয়ারি, ২০১৬

ইতিহাস কি? এটা কি শুধু কিছু দিন তারিখ আর সালের সমাহার? নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু! I think history is not merely about some dates and years rather it is about events and the stories behind those events.

আমরা আজকে শুধু কিছু বোরিং সাল তারিখই জানবো না বরং সেসব সাল তারিখ আলোচিত, আলোকিত বা সমালোচিত ও কলঙ্কিত হওয়ার পেছনের গল্প, পেছনের ঘটনা এবং সেসব ঘটনার পেছনের গল্পও বলার চেষ্টা করবো।

আলোচনার প্রথমে ইতিহাস মনে রাখার একটা সহজ তরিকা আপনাদের সাথে শেয়ার করি।

  • The Angles, the Saxons, and the Jutes

The name English derived from the Angles, and the names of the countries Essex, Sussex, and Wessex refer to the territories occupied by the East, South and West Saxons.

 

ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাগুলোকে মনে রাখার জন্য মুক্তার মালা বা ফুলের মালা তার ছবিটা মনে রাখতে পারেন। একটা সুতা পুরো মালাটা আটকে রাখে। সুতাটা কেটে দিলে যেমন সবগুলো দানা এক এক করে পরে যায় তেমনি ইতিহাসের সেই সুতাটা না ধরতে পারলে পুরো বিশ্ব ইতিহাসের এক একটি ঘটনাকে এক একটি সম্পর্কহীন দানা মনে হবে। আবার এই সুতাটা ধরতে পারলেই সমগ্র বিশ্বইতিহাসকে একটি মালায় নিয়ে আসা সম্ভবপর হবে।

আবার এই যে মুক্তার মালা, তার শুরু বা শেষ কোনটা এটা নির্ধারণ করা কিন্তু অসম্ভব। যেকোন জায়গা থেকে শুরু করে আপনি পুরো মালাটার উপর দিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। বিশ্ব ইতিহাস বা যেকোন জাতি বা সম্প্রদায় বা রাষ্ট্রের ইতিহাস জানার জন্য যেকোন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছুইলেই আপনি পুরো ইতিহাসের উপর ঘুরে আসতে পারবেন।

ইংরেজি সাহিত্যে কি এমন কোন একক উপন্যাস কি আছে যা রুশ লেখক লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’ বা ফরাসী লেখক গস্তাভ ফ্লুবার্ট এর ‘মাদাম বোবারি’র মতো বিশ্বজনীন? এই প্রশ্ন বিশ্বসাহিত্যের অনেক সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকাতেও উল্লেখ থাকে।

“It can be argued that no single English novel attain the universality of the Russian writer Leo Tolstoy’s ‘War and Peace’ or the French writer Gustave Flaubert’s ‘Madame Bovary.”

(Entry: English Literature, Encyclopaedia of Britanica, V-18, page-426)

আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হবে: এই বিশ শতকের সব সেরা ইংরেজি গদ্য লেখকরা কিন্তু ইংল্যান্ডের মূল ভূমির বাইরের! এ কালের সালমান রাশদী থেকে শুরু করে ভিএস নাইপাল বা হেনরী জেমস থেকে জোসেফ কনরাড কেউই মূল ইংল্যান্ডের নয়।

ইংরেজ ও ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে কথা বলার প্রাসঙ্গিকতা কি? তাদের সাথে আমাদের কি ভাই না ভাসুরের সম্পর্ক এ নিয়ে অনেকেই কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ থেকে নীরদ, নজরুল থেকে গোলাম মুরশিদ। আমাদের অতীত, বর্তমানের সম্পর্ক কখনোই এক স্বাদের ছিল না। বরং অম্ল-মধুর, তেতো-জ্বাল সবই। বাংলা সাহিত্যের সেরা প্রতিভা রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি:

“তখন ইংরেজি ভাষার ভিতর দিয়ে ইংরেজি সাহিত্যকে জানা ও উপভোগ করা ছিলার্জিতমনা বৈদগ্ধ্যের পরিচয়। দিনরাতি মুখরিত ছিল বার্কের বাগ্মিতায়, মেকলের ভাষাপ্রবাহের তরঙ্গভঙ্গে; নিয়তই আলোচনা চলত শেক্সপিয়রের নাটক নিয়ে, বায়রনের কাব্য নিয়ে এবং তখনকার পলিটিক্সে সর্বমানবের বিজয়ঘোষণায়। তখন আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করেছিলুম, কিন্তু অন্তরে অন্তরে ছিল ইংরেজ ঔদার্যের প্রতি বিশ্বাস। সে বিশ্বাস এত গভীর ছিল যে একসময় আমাদের সাধকেরা স্থির করেছিলেন যে, এই বিজিত জাতির দাক্ষিণ্যের দ্বারাই প্রশস্ত হবে।” (সভ্যতার সংকট, র.ঠা.)

(কালান্তর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

আলোচনা মনে রাখার জন্য প্রথমেই প্রধান ভাগগুলো আপনাদের সামনে উল্লেখ করে নেই। ইংরেজি সাহিত্যের উল্লম্ফনকে মোটাদাগে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমেই সেগুলোর উল্লেখ করে নেই।

স্কুল: বিভিন্ন গ্রুপের নামের পেছনের কথা, নামকরণের কারণ-বিত্তান্ত

একটি নির্দিষ্ট সময়কালে লেখক-কবি-চিন্তকদের মধ্যে চিন্তা, প্রকরণ বা ধরণের মিল খুজে পায় পরবর্তী সময়ের লেখক-কবি-চিন্তকগন। তাদের পূর্বসূরীদের সহজে একনামে ডাকার জন্য একটা কমন নাম দেয়ার চেষ্টা শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাসে একটি সাধারণ ট্রেন্ড। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসেও আমরা এমন অনেকগুলো যুগ, অনেকগুলো স্কুলের সাথে পরিচিত হবো। রোমান্টিক কবিদের একজনও জানতেন না তারা রোমান্টিক ধারায় পড়েছেন। গথিক ঔপন্যাসিকরাও জানতেন না তারা একটি বিশেষ ধারায় পড়ে যাচ্ছেন। গ্রেইভইয়ার্ড স্কুল নামে যারা পরিচিত হয়েছিলেন তারাও জানতেন না যে এই নামে তারা পরিচিত হবেন!

স্পেন্সারের মত করে যারা কবিতা লিখছিল তারা স্পেন্সারিয়ান কবিদের দলভুক্ত হয়ে গেলেন। মেটাফিজিক্যাল কবিরাও নিজেদেরকে এই নামে পাবেন বলে ভাবেন নি।

তারপরও আলোচনার সুবিধার্থে ইংরেজি সাহিত্যের সর্বজন গৃহীত যুগ বিভাজনকে তুলে আনি:

Title Duration
The Anglo-Saxon Period 449-1066
The Middle Ages 1066-1485
The Renaissance 1485-1660

 

Elizabethan Age 1558-1603
Jacobean(Latin) 1603-1625
Caroline 1625-1649
Commonwealth Period or Puritan Interegnum 1649-1660
The Restoration and the Enlightenment 1660-1798

 

Restorattion Period 1660-1700
The Augustan Age 1700-1750
The Age of Johnson 1750-1791
The Romantic Period 1798-1832
The Victorian Age 1832-1901
The Modern Era 1901-present

 

IMPORTANT AGES

Elizabethan Age

Elizabethan age is the supreme age for England with comparison to other ages the history of England is divided into.
England for the first time in European history appeared as the leader in politics, literature and trade and commerce.
For politics, Queen Elizabeth was one of the shrewd politicians of all times and very successful administrator. It was the time of religious bigotry and confusion and difference among different Christian sects. She ablehandedly and with cunning and intelligence managed them all and even sometimes being too harsh.
Defeating the Spanish Armada in 1588 can be considered as one of her supreme achievements! It was such an important event in history that from then on England appeared as a powerful navy which ensured them as the leading country with colonies which comprised of the half of the world in the later centuries and their supremacy in navy was remain unchallenged until the second world war when USA took its place.
In literature this age was the most flourishing one. We can get rare example of such profuse production of various arts in a single age. It was the time of Christopher Marlowe,one of the finest playwright of world literature.
It was the time of Ben Johnson, a learned and well taught genius.
It was the time of Sir Philip Sidney,the perfect Elizabethan character in manifold diversity.
Above all, it was the time of the bard, William Shakespeare who sang such eternal songs the world is still mesmerized in getting the pleasure immortal and finding the meaning of those!
It was the time of Francis Bacon who pioneered the English prose who said things in precision and exactness and in extreme brief with epigrams and wits.
It was the age when England felt confident on her and the nation began to rise to rule the world for years ahead.

  • মনে রাখার মতো:

রাণী এলিজাবেথ: রাণী তার ভাষাজ্ঞান নিয়ে গর্ব করতেন। ফ্রেঞ্চ, ইতালিয় ভাষায় দক্ষ এবং গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় পড়তে পারতেন।

তিনি তার ভাষা সুন্দর করার জন্য হোরেস, সেনেকা, প্লুতার্ক, বোয়েথিয়াস, ক্যালভিন এমন কবি লেখকদের লেখা অনুবাদ করেছেন।কিছু অরিজিনাল কবিতাও লিখেছেন। তিনি অনেক সুন্দর বক্তৃতা প্রস্তুত করতেন। স্পিচ এট টিলবারি তার বিখ্যাত বক্তৃতা।

১৫৮৮ সালে স্পেনের আরমাদা ঠেকানোর জন্য সব ব্রিটিশ সেনার সাথে ইংলিশ চ্যানেল পর্যন্ত চলে আসেন রাণী প্রথম এলিজাবেথ। নিজেকে অনিরাপধ করে একেবারে সাধারণ সৈন্যদের মাঝে নেমে আসা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছিল তার অনেক উপদেষ্টা, শুভাকাঙ্খী। কিন্তু ব্রিটেনকে সবচেয়ে ভয়ানক পরাজয় ও লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য রাণী এলিজাবেথ যে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও তাকে ব্রিটিশদের হৃদয়ে আসন দিয়ে রেখেছে। এজন্য আমরা তার বক্তৃতার শুরুতেই সে কথার উল্লেখ পাই যে তিনি বেশ নিরাপত্তা ঝুকি নিয়ে যুদ্ধ ময়দানে এসেছেন। তিনি তার উপদেষ্টাদের কথায় কর্ণপাত না করার পেছনে যুক্তি দেখিয়ে বলেন তিনি তার সৈন্যদের বিশ্বাস করেন।

“My loving people, we have been persuaded by some, that are careful of our safety, to take heed how we commit ourselves to armed multitudes, for fear of treachery; but I assure you, I do not desire to live to distrust my faithful and loving people. Let tyrants fear; I have always so behaved myself that, under God, I have placed my chiefest strength and safeguard in the loyal hearts and good will of my subjects. And therefore I am come amongst you at this time, not as for my recreation or sport, but being resolved, in the midst and heat of the battle, to live or die amongst you all; to lay down, for my God, and for my kingdom, and for my people, my honor and my blood, even the dust. “

 

তিনি যে একজন নারী এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে যে উক্তিটি করেন তা আজও সবার মুখে মুখে। তার কথাটি ছিল এমন, ‘আমি জানি আমার শরীর, নারীর দুর্বল শরীর কিন্তু আমার হৃদয় একজন রাণীর এবং সেটা ইংল্যান্ডের’। তিনি ব্রিটেনকে বহি:শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে নিজে অস্ত্র ধারণ করবেন এবং সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করবেন, ইংরেজ সেনাদের যুদ্ধে অবদানের বিচার ও পুরস্কার বিধান করবেন, যুদ্ধ মাঠের ধূলা গায়ে মাখবেন।

“I know I have the body but of a weak and feeble woman; but I have the heart and stomach of a king, and of a king of England too, and think foul scorn that Parma or Spain, or any prince of Europe, should dare to invade the borders of my realm; to which rather than any dishonour shall grow by me, I myself will take up arms, I myself will be your general, judge, and rewarder of every one of your virtues in the field. “

রাণীর মুখ থেকে প্রায় লক্ষাধিক সেনা এমন বক্তৃতা শোনার পর দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধে নেমেছিল। সে কারণ এবং আরেকটি প্রাকৃতিক কারণেই ব্রিটেন তার সূচনালগ্নে ভয়ানক এক পরাজয় থেকে বেঁচে যায়। রাণী প্রথম এলিজাবেথের এই বক্তৃতাটিকে ‘স্পিচ এট টিলবারি’ (টিলবারির বক্তৃতা) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

তার সর্বশেষ বক্তৃতাটাতে ‘গোল্ডেন স্পিচ’ বলা হয়। তার শেষ লাইনটি এমন যার মাধ্যমে তিনি তার সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতেন! “You bring them all to kiss my hand”(last line)

 

ফরাসী বিপ্লব, উত্তাল ইউরোপ এবং ইংরেজি কবিতার রোমান্টিক যুগ

বিশ্ব ইতিহাসে নাড়া দেয়া কয়েকটি ঘটনার মধ্যে ফরাসী বিপ্লব অন্যতম। এটি সমকালীন চিন্তা-চেতনা, রাজনৈতিক ভাবনা, শিল্প-সাহিত্য, মানুষের মধ্যেকার সম্পর্ক সবগুলোকে নাড়া দিয়েছিল এবং নতুন করে ডিফাইন করেছিল। এ বিপ্লবের ঢেউ ইউরোপের সকল উপনিবেশ, তখন পর্যন্ত জানা সকল ভূখণ্ড ও জাতিগোষ্ঠির জীবনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল বা প্রভাবিত করেছিল। আর ফ্রান্সের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী, ক্লাসিক প্রতিপক্ষ গ্রেট ব্রিটেনকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে, সেটা পজিটিভ বা নেগেটিভ যেভাবেই হউক না কেন। শিল্প সাহিত্য ও রাজনীতির জগতে এটা প্রথম দিকে বেশ ঝাকি দিয়েছিল। ইংরেজি কবিতার রোমান্টিক যুগের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা ও অনুসঙ্গ হচ্ছে ফরাসী বিপ্লব। এডমান্ড বার্ক যেমন ফরাসী বিপ্লবের প্রথম বছরগুলোতেই এর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা লিখেন, আবার তারই দেশের তরুণ কবি ফ্রান্স ভ্রমণ করে কাব্য মসলা নিয়ে আসেন যা দিয়ে কয়েক বছর পর কাব্যজগতে রোমান্টিক যুগকে আহ্বান করবেন।

বেশিরভাগ রোমান্টিক কবি লেখকদের ইমাজিনেশন (কল্পনা) দখল করে রেখেছিল ফরাসী বিপ্লবের ঘটনাবলী ও বিপ্লবের ধারণা। বিপ্লবের প্রথম দিকে একমাত্র এডমান্ড বার্ক ছাড়া সবাই তাকে সমর্থন ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছিল। রবার্ট বার্নস, উইলিয়াম ব্ল্যাক, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, সাউদি এবং ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্ট ছিলেন ফরাসী বিপ্লবের কঠিন সমর্থক। কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী ভয়ংকর ঘটনাবলী তাদের পরের প্রজন্মকে বীতশ্রদ্ধ করে ফেলেছিল। এ ধারার মধ্যে পড়েন হ্যাজলিট, লি হান্ট, শ্যালী ও বায়রন। বিপ্লবের অনেক ভুল-ত্রুটি সত্ত্বেও ফরাসী বিপ্লব সর্বব্যাপী আশাবাদ ছড়িয়ে দেয় পুরো ইউরোপে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে পুরনো জরাঝীর্ণ সমাজের শেষ দেখা যায় এবং নতুন সমাজ নির্মাণ করা যায়।

ফরাসী বিপ্লবের শিশু নেপোলিয়ন যৌবনে পৌছে ইউরোপে নতুন অর্ডারের আগমনী বার্তা দেন। প্রায় কমবেশি একযুগ সময়ে নেপোলিয়ন পুরো ইউরোপকে আরও শক্তিশালী ঝাকি দেন। ইতালী, স্পেন, পর্তুগাল জয় করেন; শক্তিশালী অস্ট্রিয়ান সাম্রাজ্যকে করতলে নিয়ে আসেন। প্রিয় শত্রু ‘দোকানদারদের দেশ’(Country of Shoppers) ইংল্যান্ডকে পরাজিত করার চেষ্টা চালান। ফরাসী বিপ্লবের পর থেকে শুরু করে ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত এই যে আড়াই দশক তখন গ্রেট ব্রিটেন কিন্তু বসে থাকেনি। ব্রিটিশ রাজ সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে ব্রিটিশ ভূখণ্ডে ফরাসী বিপ্লবের কুপ্রভাব ঠেকিয়েছে। ফরাসী বিপ্লবের সমসাময়িক সেই বছরগুলোতে ব্রিটেনেও অনেক ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ছিল কিন্তু ব্রিটিশ রাজ তাদেরকে ভয়ানক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তখন নাটক থিয়েটারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার, প্রসার এবং বিকাশের জায়গাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ঠিক এ সময়টাতেই ইংরেজি কবিতা তার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌছায়। এত প্রতিভাবান কবিদের একসাথে সমাগম এর আগে দেখা যায়নি। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলী, বায়রন, কীটস থেকে শুরু করে উইলিয়াম ব্ল্যাক, রবার্ট বার্নস এর মত কবিদের মেলা বসেছিল সে সময়টাতে। রোমান্টিক যুগের সময়কালকে ধরা হয় সাধারণত ১৭৮৫ থেকে ১৮৩০ এ সময়টাকে। ১৭৮৫ সালে স্যার স্যামুয়েল জনসনের মৃত্যুর পর একটা যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং নতুন যুগের আগমন ঘটে। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১৭৯৮ থেকে ১৮৩২ পর্যন্ত সময়টাকে রোমান্টিক যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরকম সময় ভাগ করে দেয়ার বিষয়টি আসলে সে যুগের কবিকুল নিজেরা নিজেদেরকে দেয়নি। এর অনেক পরে সাহিত্যসমালোচক ও পণ্ডিতকুল সময়টাকে বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে এ নাম দেন এবং সময়কালে ভাগ করে দেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর সময়কালের কবি লেখকরা নিজেদেরকে ‘রোমান্টিক’ হিসেবে অভিহিত করতো না। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা তাদের সময় থেকে অর্ধ শতাব্দী পর এই অভিধা দেয়। সমসাময়িক সমালোচকরা তাদেরকে একসাথে চিহ্নিত করতো না বরং একেক জনকে আলাদা আলাদাভাবে ধরতো। তবে তাদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ, ধারা, স্কুল বা ব্লক ছিল। যেমন ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজ ছিলেন ‘দ্য লেক স্কুল’; রবার্ট সাউদি, লেই হান্ট, হাজলিট ও জন কীটসকে ‘দ্য ককনি স্কুল’ এ ফেলানো হতো যা লন্ডনি কবি লেখকদেরকে খুবই নিন্দার্থে ব্যবহার করা হতো। আর বায়রন, শেলী ও তাদের অনুসারীদের ‘দ্য স্যাটানিক স্কুল’ এ ফেলানো হতো।

এ সময়কালটা পুরো ইউরোপের জন্য যেমন উত্তাল ছিল তেমনি ব্রিটেনের জন্যও। কৃষিভিত্তিক সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা থেকে শিল্প ও পুজিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করছিল ব্রিটেন। শিল্প বিপ্লব এবং সে সময়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার মানুষের জীবনে অভূতপূর্ব গতি দেয়, বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেগুলো হচ্ছে জেমস ওয়াটের স্টিম এঞ্জিন, স্টিফেনসনের রেলওয়ে ও আর্করাইটের সুতার কল।  এবং ‘শিল্প বিপ্লব’ কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শেষ দুই দশকেই শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে। তখন পুরনো সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন ব্যবস্থা গড়ে উঠছিল। এর মধ্যে আমেরিকান বিপ্লবও ইউরোপকে বিশেষ করে ব্রিটেনকে ধাক্কা দিয়েছিল। উল্লেখ্য আমেরিকান বিপ্লব ফরাসী বিপ্লবকেও প্রভাবিত করেছিল।

ফরাসী বিপ্লবের প্রথম দিককার ঘটনাগুলোর মধ্যে বাস্তিল দুর্গের পতন এবং ‘ডিক্লারেশন অব দ্য রাইটস্ অব ম্যান’ ঘোষণা করা একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাস্তিল দুর্গের পতন ঘটিয়ে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্ত করার মাধ্যমে যে বিপ্লবের শুরু হয় সেটাকে প্রথম থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছিল ব্রিটেনের লিবারেল ও র‌্যাডিকালরা। সে সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক তর্কগুলো বুঝতে হলে আমাদেরকে সে সময়ের দুজন প্রভাবশালী লেখক ও রাজনীতিবিদের লেখার দিকে খেয়াল করতে হবে।

ফরাসী বিপ্লবের সমালোচনা করে প্রথম লিখেন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও চিন্তক এডমান্ড বার্ক। তার ‘রিফ্লেকশনস্ অন দ্য রেভুলূশন ইন ফ্রান্স’ প্রকাশিত হয় ১৭৯০ সালে, একেবারে বিপ্লবের ঠিক এক বছরের মাথাতেই। তার এ লেখার তীব্র সমালোচনা করে থমাস পেইন লিখেন ‘রাইটস্ অব ম্যান’(১৭৯১-৯২)। তিনি এডমান্ড বার্কের সমালোচনা করে ফরাসী বিপ্লবকে মহিমান্বিত করে তুলে ধরেন। ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্টের ‘অ্যা ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান’ (১৭৯২) প্রকাশ একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি পরবর্তীতে নারী অধিকার আন্দোলন তথা নারীবাদের মেনিফেস্টো হিসেবে স্বীকৃত হতে থাকে। ঠিক এ সময়টাতে ব্রিটেনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা প্রকাশ পায়। উইলিয়াম গডউইন এর ‘ইনকোয়ারি কনসার্নিং পলিটিক্যাল জাস্টিস’। তার লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৭৯৩ সালে। (এর কিছুদিন পর ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্ট ও গডউইন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবেন এবং তাদের একটি কণ্যাসন্তান হবে যার নাম ম্যারি শ্যালি!) সেখানে এমন একটি সমাজের কল্পনা বা পূর্বাভাস দেওয়া হয় যেখানে সমাজ বিবর্তনের মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি স্তরে পৌছবে যেখানে সকল সম্পদ সমভাবে ভাগ করা হবে এবং সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটবে। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী ও অন্যান্য রোমান্টিক কবিদের উপর এ বইটির প্রভাব অনেক।

কিন্তু ফরাসী বিপ্লবের প্রতি সমর্থন উঠে যেতে থাকে যখন ফ্রান্সের সাবেক রাজা-রাণী থেকে শুরু করে রাজপরিবার ও অভিজাতদের অনেককে গিলোটিনে দেওয়ার পর ফ্রান্সে ‘অরাজকতার রাজ’ (রেইন অব টেরর) শুরু হয়।

রোমান্টিক যুগের এপিটাফ যদি আমরা লিখতে চাই তাহলে সে সময়ের সবচেয়ে সেরা সাহিত্য সমালোচক ও গদ্যকারের একজন উইলিয়াম হাজলিট এর ভাষায় বলতে হয়: “…It was a time of promise, a renewal of the world-and of letters.”

এটা ছিল প্রতিশ্রুতির সময়, বিশ্বের নতুনত্বের সময় আর শিক্ষা-দীক্ষার সময়।

নভেলের আবির্ভাব: ইংরেজি নভেল, গথিক নভেল, নভেলের শৈশব

ইংরেজি নভেল এবং কলোনিয়ালিজম পিঠাপিঠি বড় হয়েছে, হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে, যৌবন পেয়েছে এবং দাপট দেখিয়েছে। ইউরোপে রেনেসাঁ যখন তার পুরুষদেরকে ঘরের বাইরে বের করে আনছিল, নতুন নতুন ভূখন্ড সন্ধানে বের করে দিচ্ছিল তখন নারীরা কিন্তু অতটা ক্ষমতায়িত হয়নি। তারা সনেটে, কবিতায় নায়িকা হিসেবে পূজিত হলেও ঘরে তাদের দায়িত্ব সংসার ব্যবস্থাপনা পর্যন্তই ছিল। তাদের শিক্ষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল চিঠি লেখা এবং পড়তে পারা পর্যন্ত। শিল্প বিপ্লবের পর আরেকটু বেড়েছে। অষ্টাদশ শতকেও মনে করা হতো নারীর মস্তক কঠিন চিন্তা করার জন্য ফিট নয়। তারা সন্তান প্রজনন এবং পরিবার দেখাশুনা করা নিয়েই ব্যস্ত থাকুক। তাছাড়া অল্প বয়সে বিয়ে এবং তারপর ৫,৬ বা ১০ টি সন্তান গর্ভ ধারণ করা, জন্ম দেয়া, লালন-পালন করা ইত্যাদি বিভিন্ন কাজেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পার করে দিতো। বুড়ো বয়সে হয়তো খানিক অবসর মিলতো কিন্তু তখন আর কোন সৃষ্টিশীল, সমাজসেবামূলক কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

মোটাদাগে, নারীদের কাজ ছিল ঘর-গৃহস্থালি দেখা, সন্তান পয়দা ও লালনপালন করা। পুরুষরা যতদূর ইচ্ছা লেখাপড়া করতে পারলেও নারীদের শিক্ষা ছিল বড়জোর পড়তে ও লিখতে পারা পর্যন্ত। বিভিন্ন ক্রিশ্চিয়ান কনভেন্টে মেয়েরা বিয়ের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন কেতাবাদি পড়া, ল্যাটিন ও ফরাসী ভাষার মৌলিক পাঠ আর সেলাই কর্মে হাত পাকানোর প্রশিক্ষণ নিতো। এর বাইরে সিরিয়াস পড়াশুনা করা সম্ভব ছিলনা। এই সময়টাতে যেসব নারী একটু বেশি পড়াশুনা করেছেন তাদের বেশিরভাগই বাড়িতে, বাবা ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিশাল লাইব্রেরিতে। ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্টের পেছনে ছিলেন তার স্বামী উইলিয়াম গডউইন, ম্যারি শ্যালির পেছনে বাবা উইলিয়াম গডউইন, মা ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্ট আর স্বামী পি.বি. শ্যালী। জেন অস্টিন অবিবাহিত ছিলেন এবং বাবার লাইব্রেরিতেই প্রস্তুতি। ব্রন্তি বোনত্রয়ী (শার্লট, এমিলি ও অ্যান ব্রন্তি)ও বাবার বাসাতেই প্রস্তুতি ও বিকাশ। এজন্য বিশ শতকের শক্তিমান লেখিকা ভার্জিনিয়া ওল্ফ তার বিখ্যাত ‘ওমেন এন্ড ফিকশন’ প্রবন্ধে লিখেন- ইংরেজি সাহিত্যের চারজন শ্রেষ্ঠ নারী ঔপন্যাসিক-জেন অস্টিন, এমিলি ব্রন্তি, শার্লট ব্রন্তি ও জর্জ এলিয়ট-এদের কারো কোন সন্তান ছিল না এবং তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন অবিবাহিত!

“And it is significant that of the four great women novelists-Jane Austen, Emily Bronte, Charlotte Bronte and George Eliot-not one had a child, and two were unmarried.” (Women and Fiction, Virginia Woolf)

ভার্জিনিয়া ওল্ফ যেদিকে ইঙ্গিত করেছেন সেটা সহজেই বোধগম্য হওয়ার কথা। রাজপরিবার বা অভিজাত পরিবারের ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া অন্যদের আগানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ প্রতিবন্ধকতা ছিল। তো রাজপরিবার বা অভিজাত পরিবারের নারী সদস্যদের অবসর-বিনোদনের মোটামুটি ব্যবস্থা ছিল বিভিন্ন কোর্টে, রাজপ্রাসাদে বা ক্যাসলে।

কিন্তু এর বাইরে বিশাল যে নারী সমাজটি ছিল তাদের কাজ ছিল কি, তাদের বিনোদন ছিল কোথায়? যারা আবার একটু লিখতে পড়তে জানে, যাদের বাবা, স্বামী, প্রেমিক ও ভাই দূরের বিভিন্ন ভূখণ্ডে রাজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। তাদের কাছে চিঠি লিখে হাত শান দেওয়া এবং নভেল নামক নতুন ধারাটি পাঠ করে সময় পার করার সুযোগ পায়। এই বিশাল নারী পাঠকশ্রেণীকে পড়ার উপকরণ দেওয়ার তাগিদেই নভেল একটি ফর্ম আকারে সমৃদ্ধ হতে থাকে।  এখন যেমন বিভিন্ন সিরিয়ালের প্রধান ভোক্তা নারী তেমনি তখন নভেলের বাজার তৈরিতে এই অলস পাঠক শ্রেনীটি বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে।

ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম নভেল ধরা হয় স্যামুয়েল রিচার্ডসন এর ‘পামেলা’কে। ‘পামেলা’ কেমন আমরা যদি তার দিকে খেয়াল করি দেখবো সেটা আসলে নবীন প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রীকে প্রেমপত্র লেখাদির কলা। তার অন্যান্য নভেলগুলোতেও চিঠির আধিক্য আছে। গ্রেট ব্রিটেনের বিশাল সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পুরুষকুল, তরুণসমাজ। তাদের স্ত্রী বা প্রেমিকাদের বেশিরভাগই ছিল ব্রিটেনে। তখন যোগাযোগের সহজলভ্য মাধ্যম ছিল চিঠি। নারীদের নতুন পাওয়া পড়তে ও লিখতে শেখার চর্চা হতো এই চিঠি লেখালেখির মাধ্যমে। এজন্য স্যামুয়েল রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম সার্থক নভেল হতে বাধ্য। ‘পামেলা’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৪০ সালে।

অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে গ্রেট ব্রিটেনের বিশাল উপনিবেশ এবং তা থেকে অর্জিত, সংগৃহীত অকল্পনীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ব্রিটেনে একটি বিশাল অলস শ্রেণী তৈরি করে।  সেখানে পুরুষদের কাজ ছিল বিভিন্ন ক্যাফেতে যাওয়া, আড্ডা মারা, তর্ক করা আর নারীদের কাজ ছিল কয়েক পলেস্তেরা মেকাপ লাগিয়ে এই সব আড্ডার রওশন বাড়িয়ে দেয়া। তাদের বেশিরভাগের অবস্থা ছিল টিএস এলিয়টের ‘ইন দ্য রুম ওম্যান কাম এন্ড গো টকিং অব মাইকেল এঞ্জেলো’র মতো!

এই অলস পাঠক  শ্রেণীটিও নভেলের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে বৈকি।

নিয়ন্ত্রত মঞ্চ এবং নভেলের বিকাশ

১৭৫০ এর আগে ‘নভেল’ শব্দটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সাহিত্যের একটি ফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েই সেটা জুলিয়াস সিজারের মত সাহিত্যজগতে ‘এলাম, দেখলাম এবং জয় করলাম’ বলে উঠলো।

স্টেজ বা মঞ্চ কয়েক হাজার বছর ধরে একটি গণতান্ত্রিক মাধ্যম এবং সেখান অনেক লোকের সমাগম হয়ে থাকে। এজন্য রাজতন্ত্র এটাকে নিয়ন্ত্রিত রেখেছে বিভিন্ন সময়। আবার ধর্মীয় বিভিন্ন উত্থান-পতনের সময়গুলোতে এর উপর প্রভাব পড়েছে। পিউরিটান পিরিয়ড বা ক্রমওয়েলের ইংল্যান্ডে তো থিয়েটার নিষিদ্ধ ছিল। রেস্ট্রোরেশন পিরিয়ডে থিয়েটার উন্মুক্ত হলো। এর পরবর্তীতে বিভিন্ন শাসনকালে এবং ফরাসী বিপ্লব পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে রাজ বিভিন্নভাবে থিয়েটারের উপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করতো।

ব্রিটেন সব সময়ই বিপ্লবকে ভয় পেতো এবং কোন ধরণের বিপ্লব দানা বাধার সুযোগ দেয়া হতো না। এজন্য ফরাসী বিপ্লোবত্তর উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে নাটকের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসা হয়। এ সময়কালটাকে পিউরিটান পরবর্তী সবচেয়ে কঠিন সময় ধরা যায় নাটক থিয়েটারের জন্য। থিয়েটার ও নাটক নিয়ন্ত্রণের যে ‘লাইসেন্সিং অ্যাক্ট’ ছিল সেটাও ১৮৪৩ সালে রহিত করা হয়। এটা রহিত করার আগে মাত্র দুটি থিয়েটার নাটক নিয়ে আসতে পারতো। ‘দ্রুরি লেন’ ও ‘কভেন্ট গার্ডেন’ নামে দুটো থিয়েটার বৈধ (লেজিটিমেট) ও কথ্য (স্পৌকেন) ড্রামা আনতে পারতো। আর বাকিরা শুধু গীতিনাট্য (মিউজিক্যাল প্লে) মঞ্চায়ন করতে পারতো। সেখানে নাচ-গান থাকতো, সংলাপ থাকতো না। মঞ্চের এই চাপা সময়টাতেই নভেল একটি ফর্ম আকারে ফুলে ফেপে উঠে।

গথিক নভেল, নভেলের শৈশব:

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগটাতে একটি নতুন ঘরানার নভেল আসে। পরবর্তীতে যাকে গথিক নভেল (Gothic Novel) অভিধা দেওয়া হয়। হোরেস ওয়ালপুল, এক প্রধানমন্ত্রীর তনয় ‘ক্যাসল অব অত্রান্তু: অ্যা গথিক স্টোরি’ নামে একটি নভেল লিখেন।  ১৭৬৪ সালে প্রকাশিত এই নভেলটি পরবর্তীতে আরও একই ধাচের নভেলকে প্রভাবিত করে, বা অনেক লেখক এ ধাচে লেখা শুরু করেন। একই ধারার আরেকটি গথিক নভেল হচ্ছে ক্লারা রিভ এর ‘দ্য চ্যাম্পিয়ন অব ভার্চ্যু: অ্যা গথিক স্টোরি’ যেটি প্রকাশিত হয় ১৭৭৭ সালে। এ ধারার লেখার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলোর সেটিং ও কাহিনী মধ্যযুগের কোন পুরনো প্রাসাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। রহস্য, খুন, ভয়ংকর কাহিনী, আধিভৌতিক গল্প গথিক নভেলের প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ। এই ধারার সবচেয়ে সফলদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি বেশি। একটা কারণ হতে পারে সমকালীন নারীদের বদ্ধ জীবন এবং তার প্রকাশের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম ছিল এটি। সহজ ভাষায়, সরাসরি যে কথাগুলো বলা যায়না, পুরুষতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক সমাজের যে অসংগতি সরাসরি বলা সম্ভব ছিল না এটা গথিক স্টাইল সম্ভব করে দিয়েছিল। পুরুষের নির্যাতন ও বঞ্চনাকে সরাসরি উপস্থাপন না করে কোন আধিভৌতিক, ভয়ংকর, খুনে চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা খুব কাজের ছিল।

অ্যান র‌্যাডক্লিফ একজন উল্লেখযোগ্য লেখিকা। ‘দ্য মিস্ট্রিজ অব ওডলফো’(১৭৯৪) এবং ‘দ্য ইতালীয়ান’(১৭৯৭)-এ দুটি নভেলে একজন হোমি ফ্যাটালে বা ভয়ংকর পুরুষ ভিলেন চরিত্রে থাকেন। (একই ধাচের ‘ফেমে ফেটালে’-ভয়ংকর/ধ্বংসাত্মক নারী)

সে সাধারণত খুবই রহস্যজনক ও নিঃসঙ্গ পুরুষ হয়ে থাকে এবং অন্যের উপর নির্যাতন করে থাকে কারণ সে নিজেও অপ্রকাশ্য অপরাধবোধে আক্রান্ত। ভিলেন হওয়ার পরও পাঠকের মনে নায়কের চেয়ে বেশি আগ্রহের স্থান নিয়ে থাকতো। এই গথিক স্টাইলের প্রভাব রোমান্টিক কবিতাতেও প্রভাব ফেলেছে। রোমান্টিক কবিকুলের সর্দারদের একজন কোলরিজ এর ‘ক্রিস্তাবেল’ গথিক উপাদানে সমৃদ্ধ কবিতা। বায়রনের নায়ক-ভিলেন চরিত্রগুলোতে গথিক উপাদান ভালোভাবে পাওয়া যায়। জন কিটসের ‘ইভ অব সেন্ট এগনেস’-এর সেটিং ও বর্ণনামূলক অংশগুলো গথিক ধাঁচের।

এর সিলসিলা অনেক লম্বা সময়ের জন্য ছিল। শার্লট ব্রন্তির ‘জেন আয়ার’-এ ও আমরা এর প্রভাব দেখতে পাবো।

নতুন শতকের (১৯শ) শুরুতে আরেকটি ধাচের নভেল আবির্ভূত হয়। ফরাসী বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নভেলে রাজনৈতিক ও সামাজিক তত্ত্ব নিয়ে আসেন তখনকার লেখকরা। এখানে একটি পরিবারের নাম উল্লেখ না করলে ইউরোপের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল পরিবারের কাহিনী থেকে বঞ্চিত হবো।  তাদের সময়কালে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে শিক্ষিত ও সৃষ্টিশীল সমাজের অংশ ছিল। গডউইন ও ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্ট দম্পতি তাদের সময়ের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। উইলিয়াম গডউইন একজন রাজনৈতিক দার্শনিক। ১৭৯৪ সালে ‘কালেব উইলিয়ামস্’ (Caleb Williams) নামে একটি নভেল লেখেন যেখানে গল্পাকারে তার রাজনৈতিক মতাদর্শ তুলে ধরেন। তিনি দেখান কিভাবে অভিজাত শ্রেণীর ইচ্ছা, আকাঙ্খার কাছে নিম্ন শ্রেনীর মানুষের জীবন আটকে থাকে। তার স্ত্রী আধুনিক গ্রেট ব্রিটেনের ইতিহাসে আধুনিক চিন্তাভাবনা, শিক্ষাভাবনার অধিকারী হিসেবে স্বীকৃত। তার ‘অ্যা ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস্ অব ওম্যান’ (১৭৯২) ফেমিনিজমের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারী লেখা। তাদের মেয়ে ম্যারি শেলী লিখেন ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’। যা ওই নতুন ধারার নভেলের একটি। রোমান্টিক কবিকুলের বিদ্রোহী পুরুষ পি.বি. শ্যালী ছিলেন তার স্বামী। মা ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্ট যেমন ‘অ্যা ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস্ অব ওম্যান’ লিখে চিন্তা জগতে হইচই ফেলে দেন তেমনি ম্যারি শেলীর ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ সাহিত্য দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ক্লাসিকের মর্যাদা লাভ করে।

জেন অস্টিন

অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের মিলনস্থলে, ইউরোপে নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের উত্তাল সময়ে এক মহিয়সী লেখিকার জন্ম হয় একেবারে অগোচরেই। মাত্র বাইশ বছর বয়সেই ‘প্রাইড এন্ড প্রিজুডিস’ লিখে ফেলেন। কিন্তু তাকে এক যুগ অপেক্ষা করতে হয় নভেলটিকে আলোর মুখ দেখানোর জন্য। মাত্র ৪২ বছরের (১৭৭৫-১৮১৭) ক্ষুদ্র জীবনে ছয়টির মতো নভেল লিখেন যার কয়েকটি ক্লাসিকের মর্যাদা পাচ্ছে। ‘প্রাইড এন্ড প্রিজুডিস’ এর সাথে সাথে ‘এমা’, ‘সেন্স এন্ড সেন্সিবিলিটি’, ‘পার্সুয়েশান’ ও ‘ম্যান্সফিল্ড পার্ক’ ইংরেজি সাহিত্যে অনেক সম্মানজনক জায়গা নিয়ে রেখেছে। খ্রিস্টান পাদ্রীর এই মেয়েটি তার স্বল্প জীবনটার বেশিরভাগ সময়টাই ঘটনাহীন জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন দক্ষিণ ইংল্যান্ডের গ্রাম-শহরগুলোতে বসবাস করে। তার নভেলের থিমগুলোও তার জানাশুনা জগত থেকেই নেয়া। প্রেম, বিয়ে এবং উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী খুজে পাওয়া পর্যন্তই। ভার্জিনিয়া ওল্ফ পরবর্তীতে সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলবেন একজন মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে যেসব কাহিনীর সূত্রপাত হয় তার বাহিরে যেতে পারেননি জেন অস্টিন।  তার সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ কিভাবে তার লেখনীতে পড়েনি সেটা বিস্ময়ের ব্যাপার বৈকি।  তবে তার সীমানায় তিনি সফল হয়েছেন এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সমসাময়িক স্যার ওয়াল্টার স্কট(১৭৭১-১৮৩২) যখন গ্যোতে ও বায়রনের মত আন্তর্জাতিক লেখকের সম্মান পাচ্ছিলেন তখন জেন অস্টিন শুধু একটি সীমিত সংখ্যক পাঠকের দ্বারাই আদৃত হতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় নভেলের মহারানীর আসনে স্থান পেতে থাকেন জেন অস্টিন। তার ভক্ত বা তার প্রতি সহানুভূতিশীল সমালোচকরা অনেক সময় অতি আবেগে বা অতি ভালোবাসার প্রাচুর্যে তাকে ইংরেজি সাহিত্যের সেরা লেখিকার আসন দিয়ে থাকেন। এটা সাহিত্যের অনেক পণ্ডিত মেনে নেননা, বা তীব্র বাদানুবাদ করেন। তবে তিনি যে শীর্ষ একটি আসন দাবি করতে পারেন এ নিয়ে মতান্তর নেই।

রোমান্টিক যুগ (১৭৯৮-১৮৩২)এ যেমন কবিদের জয়জয়কার ছিল তার পরবর্তী ভিক্টোরীয় যুগটি ছিল নভেলের। সে সময়টাতে চার্লস ডিকেন্স, থ্যাকরে, কার্লাইল, ক্রিস্টিনা রসেটি, রাশকিন, ব্রন্তি বোনত্রয়ী, জর্জ এলিয়ট ও থমাস হার্ডির মতো লেখকদের হাত ধরে ইংরেজি নভেল তার শিখরে পৌছায়।

 

ভিক্টোরীয় যুগ (১৮৩২-১৯০০)

গ্রেট ব্রিটেনের গ্রেট ইতিহাসে ভিক্টোরীয় যুগ একটি সোনালী অধ্যায় গ্রেট ব্রিটেনের জন্য। শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, বাণিজ্য এবং বিশ্বে প্রভাবের দিক থেকে এ সময়টা আগের সব যুগকে ছাড়িয়ে গেছে। রাণী প্রথম এলিজাবেথের সময় থেকে যদি ব্রিটেনের উত্থান শুরু হয় বিশ্বশক্তি হিসেবে তাহলে ভিক্টোরিয়ার সময়কালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী মোড়লে পরিণত হয় ব্রিটিশ রাজ। রাজনৈতিক প্রভাবের সাথে সাথে রাজনীতি ও দর্শনের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি উপন্যাস, কবিতা ও গদ্যে উৎকর্ষতার তুঙ্গে উঠে ইংরেজি সাহিত্য।

যদিও রাণী ভিক্টোরিয়া ১৮৩৭ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন কিন্তু ১৮৩২ সালে ভিক্টোরীয় যুগের খুটি মারার কারণ হচ্ছে ১৮৩২ সালের রিফর্ম বিল এবং তখন থেকেই রোমান্টিক যুগ থেকে সাহিত্য একটা মোড় নিচ্ছিল। এর বছর দুয়েক পড়ে একসাথে অনেকগুলো বড় প্রতিভা মারা গিয়েছিল বছর কয়েকের ব্যবধানে। এরপর কিছুদিন মনে হয়েছিল সাহিত্যে একটা শূন্যতা দেখা দিচ্ছে। ভিক্টোরীয় যুগে বেঁচে থাকা রোমান্টিক কবিদের মধ্যে প্রধানতম পুরুষদের একজন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার কবিতায় সেই হারানো সময় নিয়ে কাঁদুনী এবং বর্তমানকে নিয়ে হতাশার চাষবাস করেছেন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ নিয়ে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে তিনি তার শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলো জীবনের প্রথমার্ধেই লিখে ফেলেছিলেন। তার দীর্ঘ জীবনের শেষার্ধে আসলে তেমন কোন কীর্তি রেখে যেতে পারেননি প্রথমার্ধের স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া।

ভিক্টোরীয় যুগকে বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে এর কিছুদিন আগে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব হয়েছে এবং ব্রিটেনের কলোনি এত বিস্তৃত হয়েছে যে ‘বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনো সূর্য অস্তমিত হয় না’। শিল্প বিপ্লবের ফলে যথারীতি উৎপাদন ব্যবস্থায় একটা বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে এবং এর প্রভাব পড়েছে তার মানুষের উপর। পুরনো সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন বুর্জোয়া, পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর বিকাশ হচ্ছে। এর প্রভাব অবশ্যই পড়েছে শিল্প-সাহিত্য ও দর্শন ও রাজনীতিতে।

ভিক্টোরীয় যুগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল;

প্রথমত, বড় কোন যুদ্ধ বা বাহির থেকে ঝুঁকির কোন ভয় ছিল না  (যেমনটা ছিল এর আগের যুগটিতে। বিশেষ করে নেপোলিয়ন।)

দ্বিতীয়ত, পুরো সময়টাতেই ধর্মবিশ্বাস বিশেষত খ্রিস্টধর্মের সমালোচনায় মুখর ছিল চিন্তাজগত।

বিশ্ব পরিসর বা বাণিজ্যে বড়সর উত্থানপতন না ঘটলেও ব্রিটেনের ভেতরে, সামাজিক, ধর্মীয় পরিসরে ব্যাপক ওলটপালট হয়েছে এই ভিক্টোরীয় যুগে।  ক্রাইমিয়ার যুদ্ধটাই এই সময়কালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল ব্রিটেনের জন্য। এছাড়া ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম  যেটাকে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ নাম দিয়েছে সেটা খুব সহজেই দমন করতে সক্ষম হয়। ১৮৫৭ সালে ভারতের সেই স্বাধীনতা সংগ্রাম ব্যর্থ হলে পুরো ভারতবর্ষ ব্রিটেনের করতলে চলে আসে। দখলে চলে আসে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং আফ্রিকার বহু দেশ।

বিশ্বজুড়ে এই বিশাল উপনিবেশগুলো থেকে সস্তা ধরে কাঁচামাল সংগ্রহ করে বড় আকারের উৎপাদনে চলে আসে ব্রিটেন। আবার সেসব উৎপাদিত পণ্য বেশি দামে বিক্রির জন্য প্রস্তুত বাজার ছিল কলোনি বা উপনিবেশগুলোতে। ব্রিটেনের কিছু কিছু শহরে গড়ে উঠলো বিশাল শিল্পনগরী। ম্যাঞ্চেস্টার, ল্যাংকাস্টার, ডারহাম, বার্মিংহাম, শেফিল্ড, লীডস, নিউকাসেল, নর্দ্রামবারল্যান্ড অন্যতম। শিল্প-কারখানা ও উৎপাদনে গতির সাথে সাথে মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অনেক গতি চলে আসে। রেলওয়ের মতো অতিকায় দৈত্যাকার যান মানুষের জীবনে গতি নিয়ে আসে।

যথারীতি শহরগুলোতে কাজের সন্ধানে আসা মানুষের চাপ বাড়তে লাগলো। আর কয়েক দশক আগে থেকেই গ্রামের মানুষ কৃষি থেকে শিল্প শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাতে শুরু করেছিল। এটা ভিক্টোরীয় যুগে এসে চরম সীমায় পৌছায়। গ্রামের কৃষিজীবি মানুষ শহরে এসে হয়ে গেল শ্রমিক-মজুর। দেখা গেল ১৮৭০ এ এসে ইংল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ শ্রমিক হয়ে গেল। এবং মাত্র ৩০ ভাগ কৃষিতে রয়ে গেল। আরেকটা তথ্য মনে রাখার মতো। ১৮২৫ সালে যখন ব্রিটেনের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ মিলিয়ন সেখানে রাণী ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর সেটা তিনগুণ হয়ে দাড়িয়েছিল।

উৎপাদনে কর্মচঞ্চল হলো পুরো ব্রিটেন এবং এর শহরুগুলো মানুষে গিজগিজ করতে লাগলো। বিশাল সেই শ্রমিকশ্রেণীর জায়গা হলো শহরের ছায়ায় বা উপকূলে অবস্থিত বস্তিগুলোতে। সেসব নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে বাস করত কলকারখানার শ্রমিকেরা। পর্যাপ্ত আলো বাতাসহীন জায়গায় একসাথে ৪০-৫০ জন শ্রমিক কাজ করতো, ঘুমাতো। তাদের অবর্ণনীয় কষ্টের বর্ণনা আমরা পাবো ভিক্টোরীয় যুগের ঔপন্যাসিকদের রচনায়, কবিদের কবিতায় এবং চিন্তকদের লেখায়। আমরা বর্তমান বাংলাদেশের দিকে ভালো করে খেয়াল করলে ব্যাপারটা খুবই পরিস্কার হয়ে যাবে।

এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে ভিক্টোরীয় যুগেই কমিউনিজ, সোসালিজম রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সেই বিশাল সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণীর উপর একটি ক্ষুদ্র বুর্জোয়া শ্রেণীর শোষণের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জেগে উঠতে থাকে ব্রিটেনসহ পার্শ্ববর্তী ইউরোপীয় দেশগুলোর শ্রমিকশ্রেণী। ১৮৪৮ সালেই প্রকাশিত হয়েছিল কার্ল মার্ক্স ও এঙ্গেলস এর বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ বা ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’। এটা ভিক্টোরীয় যুগের একটি গুরুত্বপূণ্য টার্নিং পয়েন্ট। আরেকটা বই যেটা ভিক্টোরীয় যুগের চিন্তা, দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্য জগতকে সমূলে নাড়িয়ে দেয় সেটা হলো চার্লস ডারউইনের বিখ্যাত ‘দ্য অরিজিন অব স্পিসিজ’ (১৮৫৯)। এটা এর আগে পর্যন্ত চলে আসা সকল ধর্মভাবনা, সমাজচিন্তা ও বিজ্ঞানচেতনার কাঠামোর গোড়াতে আঘাত করে। তার পরের অবস্থাটা হয় ডব্লিউ বি ইয়েটস্ এর সেই বিখ্যাত উক্তির মতো:

Things fall apart, centre cannot hold

Mere anarchy is loosed upon the world.

তো দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্মভাবনায় যে ওলটপালট হচ্ছিল তার প্রভাব পড়েছিল সমাজকাঠামোতে, শিল্প ভাবনায় ও সাহিত্যরীতিতে। একটা জিনিস লক্ষণীয় ভিক্টোরীয় যুগের আগের যুগ অর্থাৎ রোমান্টিক যুগে একগাদা প্রতিভাধর কবিদের সম্মিলন ঘটেছিল যার সাথে ব্রিটেনের আর কোন যুগের আসলে তুলনা চলে না। ঠিক একইভাবে ভিক্টোরীয় যুগে ব্রিটেনের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও গদ্যকারদের সমাবেশ ঘটেছিল যার সাথে আর কোন সময়য়ের আসলে তুলনা হয় না। যদিও এ সময়টাতেও কয়েকজন শ্রেষ্ঠ কবির আগমন ঘটে কিন্তু এ যুগটাকে বিশেষ করে আলাদা করতে হয় আসলে উপন্যাস ও গদ্যের জন্য।

ব্রিটেনের বাজার প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে তার সংস্কৃতি ও তার ভাষাও সম্প্রসারিত হয়। আর শিল্পবিপ্লবোত্তর ব্রিটেনের প্রকাশনা জগত ও এক বড় লাফ দেয়। সর্বজনীন শিক্ষার ধারণা লেখা-পড়া করতে জানা মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। এটা ছিল আসলে পত্রিকা, সাময়িকী ও উপন্যাসের উত্থানের সময়। ১৮৪৪ সালে টেলিগ্রাফের আবিষ্কার ব্রিটেনের শহরবাসী তথা পুরো ইউরোপের শহুরেদের একটা সম্পর্কের বাধনে নিয়ে আসলো। এখনকার সময়ের ইন্টারনেট, ফেসবুক, স্কাইপে ইত্যাদির কথা মনে রাখতে পারেন। এগুলো কিভাবে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। রেলওয়ের মতো টেলিগ্রাফ ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি মাইলফলক। এলিজাবেথের সময়ে শেইক্সপীয়র, মার্লো ও বেন জনসনের হাত ধরে যেমন নাটক অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, ভিক্টোরীয় যুগে তেমনি ভূমিকাটা রেখেছে উপন্যাস।

ষোড়শ, সপ্তদশ শতাব্দীতে নাটকের জনপ্রিয়তা যেমন ছিল তুঙ্গে তেমনি উনবিংশ শতাব্দীতে উপন্যাস জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছায়। দর্শন, কবিতা, বিজ্ঞান বা বাণিজ্য এ সব জায়গাতেও ভিক্টোরীয় যুগ অনেক আলোচিত। সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে অবশ্য উপন্যাসের উপরই বেশি আলো ফেলতে হবে। রাণী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহনের সাল অর্থাৎ ১৮৩৭ সালে ডিকেন্সের ‘পিকউইক পেপারস’থেকে শুরু হয়ে ১৮৯১ এ থমাস হার্ডির ‘টেস অব দি ডুরবারবিলস্– এর মাঝখানে অসংখ্য উপন্যাস ইংরেজি সাহিত্যের রওশন বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমে ভিক্টোরীয় যুগের উপন্যাস ও ঔপন্যাসিকদের নিয়ে আলোচনা আগাই। ঔপন্যাসিকদের নামের তালিকায় প্রথমেই আসে চার্লস ডিকেন্সের (১৮১২-১৮৭০) নাম। খুবই দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সাহিত্যে মহান অবদান রাখা সাহিত্যিকদের তালিকায় বেশ সম্মানের সাথেই চলে আসে চার্লস ডিকেন্সের নাম। জীবদ্দশায় লেখালেখি করে প্রচুর অর্থ, সম্মান ও পরিচিতি পাওয়া লেখকদের অন্যতম ডিকেন্স। তার লেখাতে উঠে এসেছে তার ব্যক্তিগত জীবন-সংগ্রাম, তার বেড়ে উঠে, তার পরিবেশ, তার দেশ-সমাজ ও সময়ের চালচিত্র। তার চরিত্রগুলোও নিজের পরিচিত জগত বা আশপাশ থেকে নেয়া। খুব অল্প বয়স থেকেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়া এবং লেখালেখির জগতে প্রবেশ করলেও তার প্রথম জনপ্রিয় লেখা হচ্ছে ‘পিকউইক পেপারস্’। ধারাবাহিকভাবে এটা প্রকাশিত হয়ে আসছিল ১৮৩৬-১৮৩৭ এর দিকে।  ‘পিকউইক’ এর মাধ্যমেই খ্যাতির চূড়াতে আরোহন শুরু করেন। এরপর শুধু একেকটি মাইলফলক ঢিঙানো। অলিবার টুইস্ট (১৮৩৭), নিকোলাস নিকলবি (১৮৩৮), দি ওল্ড কিউরিওসিটি সপ (১৮৪০), ডেভিড কপারফিল্ড (১৮৫০-৫১), ব্লিক হাউস (১৮৫২), হার্ড টাইমস (১৮৫৪), এ টেল অব টু সিটিজ (১৮৫৯), গ্রেট এক্সপেকটেশনস্ (১৮৬০) সহ প্রায় বিশটি উপন্যাস লিখেন।

মনোরঞ্জন করা যদি একটি শিল্প হয় তাহলে চার্লস ডিকেন্স একজন অসাধারণ শিল্পী।  তিনি মানুষের হাসি-কান্না, দু:খ-কষ্ট নিয়ে কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের সংগ্রামের জয়কে দেখাতে চেয়েছেন তার সাহিত্যে। বিনিময়ে তিনি যে মূল্যবান উপহার পেয়েছেন তা হচ্ছে মানুষের ভালোবাসা। তার উপন্যাসের জনপ্রিয়তাকে তুলনা করা যায় শেইক্সপীয়রের নাটকের জনপ্রিয়তার সাথে। তারা দুজনই তাদের সমকালের মানুষকে ভালো স্টাডি করেছেন এবং তাদের মনোরঞ্জন করার চেষ্টা করেছেন। তার লেখনির মধ্যে সমসাময়িক লন্ডন ও তার মানুষ ও জীবনসংগ্রাম এমনভাবে উঠে এসেছে যার কারণে তাকে ‘ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বিশেষ সংবাদদাতা’ (like a special correspondent for posterity) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন তার সমসাময়িক সাংবাদিক ও প্রবন্ধকার ওয়াল্টার বেজেত।

ভিক্টোরিয়ান যুগের আরেকজন ঔপন্যাসিক যার জন্ম হয়েছে ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় তিনি হচ্ছেন উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারে (১৮১১-১৮৬৩)। চিত্রশিল্পী হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে সোনা ফলান আসলে উপন্যাসে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত ও আলোচিত উপন্যাসের নাম হচ্ছে ভ্যানিটি ফেয়ার (১৮৪৮)

একঝাক রমণীকুল

ভিক্টোরীয় যুগে লক্ষণীয়ভাবে একঝাক প্রতিভাধর নারী ঔপন্যাসিক সাহিত্যজগতে বেশ সাড়া ফেলে দেন। তাদের মধ্যে কমপক্ষে চার-পাঁচজন বিশ্বসাহিত্যের সেরা ঔপন্যাসিকদের তালিকায় থাকেন। তারা হচ্ছেন-জর্জ এলিয়ট,  শার্লট ব্রন্তি, এমিলি ব্রন্তি, অ্যান ব্রন্তি, এলিজাবেথ গাসকেল প্রমুখ।

দিসরাইলি ও গ্লাডস্টোন:

রাণী ভিক্টোরিয়ার সময়ে ব্রিটেন পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূখ- শাসন করতো। আর ব্রিটেনের ভেতরকার রাজনীতি আবর্তিত হতো দুজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদকে কেন্দ্র করে। তারা হচ্ছেন গ্লাডস্টোন ও দিসরাইলি। চরম মেধাবী, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এবং ব্রিটিশ জনগোষ্ঠীর উপর বেশ প্রভাববিস্তারী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দুজনেই সমান আলোচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দিসরাইলি প্রথম ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে এবং লেখক ও রাজনীতিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা ব্যক্তিদের তালিকায় দিসরাইলির নাম বারবারই চলে আসে।

একজন সিরিয়াস পাঠক হিসেবে বন্ধু লর্ড ম্যাকলে কে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ইংরেজি সাহিত্যের একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক থ্যাকারে বলেন: “ম্যাকলে একটা বাক্য লেখার জন্য বিশটি বই পড়েন আর শত মাইল ভ্রমণ করে কোন জায়গা নিয়ে এক লাইন বর্ণনা লেখার জন্য।”

 

“Macaulay reads twenty books to write a sentence and travels one hundred miles to make a line of description” (p525, William J. Long, English Literature-Its History and Its Significance)

 

উপরোক্ত উক্তিতে হয়তো খানিকটা বন্ধুসুলভ অতিরঞ্জন আছে। কিন্তু বাস্তবতার খুব কাছাকাছি হওয়ারই কথা। বা পাঠক, লেখক, গবেষক, রাজনীতিবিদ ম্যাকলের সিরিয়াসনেস এর কথাই ফুটে উঠে বন্ধু থ্যাকারের কথায়। উইলয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারে ‘ভেনিটি ফেয়ার’ উপন্যাস সহ অনেকগুলো উপন্যাস লিখে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে স্বমহিমায় উজ্জল।

 

ম্যাকলে ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার খ্যাত বা কুখ্যাত কীর্তি ‘ম্যাকলে মিনিটস’ যেখানে তিনি এক শিক্ষানীতি প্রস্তাব করেন যার মাধ্যমে এই ভারতীয়দের এমন বানানো হবে ‘যারা রক্তে মাংসে হবে ভারতীয়, কিন্তু মাথা-মগজ ও পোশাক-আশাকে হবে ইংরেজ’।

 

এই ভদ্রলোক ভারতীয় ইতিহাসে এমনভাবে জাড়িত হয়ে আছেন যাকে আপনি পছন্দ না করলেও মুছে দিতে পারছেন না! ম্যাকলে প্রবর্তিত শিক্ষানীতি প্রায় একশো বছর চলে আসছিলো। এর পরেও সেই পাটাতনের উপরই নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এখনো আমাদের শিক্ষানীতি ম্যাকলে থেকে কতটুকু এগিয়েছে সেটা দেখার বিষয়। আজকে শুধু ব্যক্তি ম্যাকলের পাঠক হিসেবে পরিচয়টা নিয়ে থাকলাম। পরবর্তীতে ভালো করে তাকে স্টাডি করার প্রয়োজন বোধ করছি।

লর্ড ম্যাকলে যিনি ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যার প্রবর্তিত শিক্ষানীতিটাকেই আমরা টেনে হিচড়ে লম্বা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছি প্রায় দুইশো বছর ধরে। ম্যাকলে আসলে কেমন ছিলেন। খুব ছোটবেলা থেকেই একজন অসাধারণ পাঠক হিসেবে পাওয়া যায় তাকে। ম্যাকলেকে নিয়ে বলা হয়ে থাকে ম্যাকলে অন্যরা যত দ্রুত স্কিম করে তত দ্রুত একটা বই পড়ে ফেলে, আর অন্যরা পৃষ্ঠা উল্টানোর আগেই স্কিম করে ফেলে।

 

মধ্যবয়সে তিনি লন্ডনের রাস্তায় নিয়মিত হাঁটতে বেড়োতেন। এমনকি লন্ডনের সবচেয়ে জনাকীর্ণ রাস্তাগুলোতেও। এখানেও তাকে নিয়ে প্রচলিত কথা ছিল: ‘তিনি অন্য যে কারো চেয়েই অনেক দ্রুত হাঁটেন, এবং তিনি অন্য যেকোন ব্যক্তির চেয়ে অনেক দ্রুত বই পড়েন।

 

(As he grew toward maturity he proved unique in his manner, as well as in his power, of reading. It is said that he read books faster than other people skimmed them, and skimmed them as fast as any one else could turn the leaves, this, however, without superficiality. One of the habits of his middle life was to walk through Lond on, even the most crowded parts, ‘as fast as other people walked, and reading a book a great deal faster than anybody else could read.’)

 

পৃষ্ঠা ১৩৯, অ্যা হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার, রবার্ট হান্টিংটন ফ্লেচার

 

১৯২২ সাল

বিংশ শতকের দুটি শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়। একটি কাব্যদুনিয়ার ম্যাপ পাল্টে দেয় এবং আরেকটি উপন্যাসের দুনিয়া। টিএস এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কাব্য এবং জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ এই বছরেই প্রকাশ পায়। সহজে মনে রাখার জন্য এটা মনে রাখতে পারেন, কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি এ বছরেই প্রকাশিত হয় এবং তখনকার ভারতে সবচেয়ে বড় তারকার আসনে নজরুলকে বসিয়ে দেয়।

ইউলিসিস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জয়েস একটি চিঠিতে একসময় বলেছিলেন:

“I’ve put in so many enigmas and puzzles that it will keep the professors busy for centuries arguing over what I meant, and that’s the only way of ensuring one’s immortality.”

রোমান্টিক যুগের মেনিফেস্টোঃ

১৭৯৮ সালে ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস্’ প্রকাশিত হয়। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও এস টি কোলরিজ দুজন মিলে লিখেন এই কাব্যগ্রন্থটি। এ সালটিকে বেশিরভাগ সাহিত্য সমালোচক রোমান্টিকতার শুরু হিসেবে ধরে থাকেন। তো ১৭৯৮ সালে ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস্’ এর সাথে একটি ছোট্ট বিজ্ঞাপন(অ্যাডভারটাইজমেন্ট) লিখেছিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ। সেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠকদের কাছে আহ্বান করেন যেন তারা অধিকাংশ সংখ্যক কবিতাকে পরীক্ষণ বা নিরীক্ষা হিসেবে ধরেন যেখানে তিনি চেষ্টা করেছেন কিভাবে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের মুখের ভাষা কবিতায় নিয়ে আসা যায়।

প্রথম প্রকাশের ঠিক দুই বছর পর অর্থাৎ ১৮০০ সালে এর দ্বিতীয় সংস্করণ বের হয়। সেখানে ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার ছোট্ট বিজ্ঞাপনটিকে একটি নাতিদীর্ঘ ভূমিকাতে (প্রিফেস) পরিণত করেন। ভূমিকার বেশিরভাগ বিষয়াদিই ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতার ভিত্তিতে রচিত। এই ভূমিকাটি আরেকটু আরও সংশোধিত হয়ে তৃতীয় সংস্করণে প্রকাশিত হয়। ১৮০২ সালে প্রকাশিত তৃতীয় সংস্করণে বর্তমানে বহুল প্রচলিত এই ‘প্রিফেস টু লিরিক্যাল ব্যালাডস’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর থেকে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অসাধারণ সংযোজন হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে এই ভূমিকাটি। একটি আদর্শ ইংরেজি গদ্যের উৎকৃষ্ট নমুনা এই ভূমিকাটি। এটাকে রোমান্টিক কবিতার মেনিফেস্টো হিসেবে অভিহিত করা হয়।

উনবিংশ শতকের শুরুতে কবিতার ভাষা কি হবে এ নিয়ে জোর বক্তব্য পেশ করেন কবিদ্বয়। এর আগের শতক অর্থাৎ আঠারো শতকে কবিকুল কৃত্রিম, নাটকীয় ভাষায় কবিতা লিখেছেন। ক্লাসিকের অন্ধ অনুকরণ অনেকটা কৃত্রিমতা এবং জীবন বিচ্ছিন্নতা নিয়ে এসেছিল ইংরেজি কবিতায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজ এসে উচ্চারণ করলেন যে একেবারে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়ও কবিতা লেখা যায়।

এর আগে কবিতায় জায়গা পেতো শুধু অনেক বড় নায়কেরা, বীর যোদ্ধা, রাজা-রাণীরা আর অভিজাত মহলের বাসিন্দারা। তাদের জীবন, সংঘাত-সংঘর্ষই ছিল কবিতার বিষয়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ এসে ঘোষণা করলেন তিনি ‘ইচ্ছে করেই সাধারণ মানুষ এবং তাদের জীবনকে তুলে এনেছেন’ এবং তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন ‘যা ঐসব মানুষ ব্যবহার করে।’ এজন্য আমরা তার কবিতায় দেখবো তিনি তুলে এনেছেন চাষাবুষা, মুটে-মজুর, শিশু, ভবঘুরে, অপরাধী এবং নিচের তলার মানুষদেরকে। তাদের জীবন সংগ্রাম তার কবিতার বিষয়বস্তু হয়েছে এবং তাদের করুণ কাহিনী তার কবিতার সৌন্দর্য হয়েছে।

কবিতার ভাষার ক্ষেত্রে ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। ‘সকল ভালো কবিতাই হচ্ছে শক্তিশালী/প্রগাঢ় অনুভূতির স্বত:স্ফূর্ত বিচ্ছূরণ’। (…all good poetry is the spontaneous overflow of powerful feeling)

এই আলোচিত মেনিফেস্টো এবং লিরিক্যাল ব্যালাডস শুধু ইংরেজি সাহিত্য নয় বিশ্ব সাহিত্যে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ এটি একটি বিশাল পালাবদলের নেতৃত্ব দিয়েছিল। কৃত্রিম ভাষা, ছকবাধা ছন্দে কবিতার খোলনলচে একটি নতুন কাব্যভাষা ও কাব্যপ্রকরণ নিয়ে আসে যা পরবর্তীতে মুক্তছন্দে কবিতা লেখার পথকে স্বাগত জানাবে। আর সাধারণ মানুষ যে কবিতার বিষয় হতে পারে এবং তাদের মুখের জবানিও যে কাব্যভাষার গৌরবের ভাগিদার হতে পারে তা একেবারে হাতে ধরিয়ে দেখিয়ে দিলেন ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও কোলরিজ তাদের লিরিক্যাল ব্যালাডস এবং তাদের বিখ্যাত ভূমিকায়।

এর বাইরেও ‘প্রিফেস টু লিরিক্যাল ব্যালাডস’ এর আরও যুগান্তকারী ভূমিকা রয়েছে। এটি ইংরেজি সমালোচনা সাহিত্যের জগতে একটি মাইলফলক এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

 

সহজে মনে রাখুন কিছু মনে রাখার মতো কথা:

 

  • এপিথ্যালমিয়ন: বিয়ের রাতে বাসর ঘরে বউয়ের জন্য রচিত: এডমান্ড স্পেন্সার।
  • বেন জনসন: ১৫৭২-১৬৩৭- ল্যাটিন জানার কারণে হত্যাকাণ্ডের অপরাধের শাস্তি থেকে বেঁচে যান।
  • (John Milton: After leaving the university, he studied at home in Horton, Buckinghamshire (1632-7), and was grateful to his father for allowing him to do this instead of preparing for a profession. He lived a pure life, believing that he had a great purpose to complete. At college he was known as The Lady of Christ’s.

Milton’s studies at Horton were deep and wide. One of his notebooks contains pieces taken for eighty writers-Greek, Latin, English, French and Italian. At the same time he was studying music.

There are three divisions in his life:

At Horton: Wrote Shorter Poems

Next: He wrote mainly prose.

Last: Three greatest poems in the last part of his life..

Milton’s prose works were mainly concerned with church affairs, divorce, and freedom…

  • Locke’s ‘Essay on the Human Understanding (1690) is one of the most important works of English philosophy. (p67, an outline..)

 

  • মনে রাখার ব্যাপার হলো ১৮শ শতকের শেষার্ধের কয়েকজন সেরা লেখক সমসাময়িক এবং ‘দ্য লিটারেরি ক্লাব’ এর সভ্য ছিলেন। স্যামুয়েল জনসন, গিবন, বার্ক, গোল্ডস্মিথ, স্যার জসুয়া রেইনল্ড, বসওয়েল। জনসন সন্ধ্যারাতে ক্লাবে যেতেন এবং ‘ইনক্রেডিবল অ্যামাউন্ট অব টি’ গ্রহণ করতেন এবং বাসায় দুপুর পর্যন্ত ঘুমাতেন। অবশ্য এটা মধ্যবয়সের কথা। জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় ভয়ানক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন জনসন।

P-82= Dr. Samuel Johnson was always poor and therefore had to do all kinds of literary work, even if he did not like it.

First of the English dictionaries appeared in 1755 by Johnson..

He was a kind of literary ruler, giving judgements on books and authors like a god.

জনসন মারা যান ১৭৮৪ সালে।

‘Life of Johnson(1791’ by James Boswell is the greatest biography in English.

(“Sir, when a man is tired of London, he is tired of life; for there is in London all that life can afford”)p83 (An Outline of English Literature)

 

  • এডওয়ার্ড গিবনের নাম নিতে গিয়ে কোন ঐতিহাসিকই নিরাবেগ হতে পারেন না। তার কাজের বিশালতা, ব্যাপকতা সব ঐতিহাসিকের জন্য বিস্ময়। ১৮ শতকের ইউরোপের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ইতিহাসগ্রন্থটি লিখেছেন গিবন। তিনি বছরের পর বছর অপরিচিত, অনালোচিত থেকে গেলেন, পাশে অনেক তরুণ নাকের ঢগা দিয়ে খ্যাতির মসনদে বসলো-এই নির্মোহ মনোভাব অর্জন করা যে কত বড় সাহস ও আত্মবিশ্বাসের কাজ সেটা খুব অল্পই বুঝতে পারে।

`The Decline and Fall of the Roman Empire’ by Edward Gibbon is recognized as the greatest historical work in English. First book published in 1776, two more books in 1781 and the last three in 1788.

After more than twenty years of search and study, Gibbon says, ‘it was on the day, or rather the night, of the 27th of June, 1787, between the house of eleven and twelve that I wrote the last line of the page in a summer house in my garden.

 

  • উপন্যাস ১৮শতক থেকে। পামেলা-স্যামুয়েল রিচার্ডসন
  • জেন অস্টিন, এমিলি, শার্লট, অ্যান ব্রন্তি-

“1. And it is significant that of the four great women novelists-Jane Austen, Emily Bronte, Charlotte Bronte and George Eliot-not one had a child, and two were unmarried.”

  1. The best part of Conrad’s novels, for instance, would be destroyed if it had been impossible for him to be a sailor. Take away all that Tolst oy knew of war as a soldier, of life and society as a rich young man whose education admitted him to all sorts of experience, and “War and Peace’ would be incredibly impoverished.”
  2. “Middle-class drawing room’ এ যে কাহিনী মিলে তা নিয়েই লিখেছেন Jane Austen, Emily Bronte, Charlotte Bronte and George Eliot- সব নারী ঔপন্যাসিকরা

Women and Fiction, Virginia Woolf

  • রোমান্টিক পিরিয়ডের সব শ্রেষ্ঠ লেখকরাই কবি ছিলেন। এলিজাবেথান যুগের পর এটাকে ইংরেজি সাহিত্যের স্বর্ণযুগ ধরা হয়।
  • বেশিরভাগ রোমান্টিক কবিই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পালিয়েছেন। কোলরিজ, ওয়র্ডসওর্থ দুজনেই পড়া শেষ করেননি। তবে অক্সফোর্ডে থাকাকালে বন্ধু কবি সাউদির সাথে মিলে একটি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্যান্টিসোক্রেসি নাম দিয়েছিলেন ঐ সোসাইটির।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাল ও ঘটনা:

  • ৫৯৭: ‍সেইন্ট অগাস্টিন কেন্ট এ আগমন করেন। অ্যাংলো-স্যাক্সননদের খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করা শুরু করেন।
  • ১০৬৬: উইলিয়াম দ্য কনকারার এর নেতৃত্বে নরম্যান আক্রমণ ও দখল
  • ১২০৯: ক্যামব্রিজ প্রতিষ্ঠা
  • ১৩৪৮-১৩৫০: দ্য ব্ল্যাক ডেথ, প্ল্যাগে ইউরোপের ৩০-৪০% মানুষ মারা যায়।
  • ১৩৩৭-শতবর্ষের যুদ্ধ শুরু হয়
  • ১৪৮৫: উইলিয়াম ক্যাক্সটন স্যার থমাস ম্যালরি’র ‘মর্তে দ্য আর্থর’ এর বইটি প্রকাশ করেন। এটা ইংল্যান্ডে প্রিন্ট হওয়া প্রথম দিককার বইয়ের একটি।
  • রেনেসা ১৪শ ও ১৫শ শতকে ইতালিতে শুরু হয় এবং সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। আর রিফর্মেশন বা সংস্কার জার্মানীতে শুরু হয় মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে। তারপর পুরো ইউরোপেই কম বেশি ছড়িয়ে পড়ে।
  • ১৫১৭: মার্টিন লুথারের ‘নাইনটি ফাইভ থিসিস’ এর মাধ্যমে জার্মানীতে রিফর্মেশন শুরু হয়।
  • স্যার থমাস মুর: ১৪৭৮-১৫৩৫, ১৫১৫ সালে ‘ইউটোপিয়া’ ল্যাটিনে প্রকাশিত হয়।
  • ১৫৮০: মন্তে বা  মতাইয়ের ‘এসেইজ’ প্রকাশিত হয়।
  • ১৫৯৯: গ্লোব থিয়েটার খোলা হয়।
  • ১৬১১: কিং জেমস বাইবেল প্রকাশিত হয়
  • ১৭০৭: অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন- স্কটল্যান্ড, ইংল্যান্ড মিলে গ্রেট ব্রিটেন গঠিত হয়।
  • ১৭৫৫: জনসনের ডিকশনারি প্রকাশিত হয়।
  • ১৮৩৮: রাণী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক অনুষ্ঠানে ৪ লাখ মানুষ সমবেত হয়!
  • ১৮৪৮: কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, ফ্রান্সে ব্যর্থ বিপ্লব
  • ১৮৫৯: ডারউইন ও অরিজিন অব স্পিসিচ’, ভিক্টোরিয়ান ডাউট, আরনল্ড ‘ডোভার বিচ’
  • প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

দোহাই:

১. মডার্ন ফিকশন, ভার্জিনিয়া ওল্ফ

২. অ্যা রুম অব ওয়ান’স ওন, ভার্জিনিয়া ওল্ফ

৩. লিটারেরি থিওরি, অ্যান ইনট্রুডাকশান, টেরি ঈগলটন

৪. নর্টন এনথলজি অব ইংলিশ লিটারেচার, ভলিউম-২, সিক্সথ এডিশন

৫. অ্যা হিস্ট্রি অব ইংলিশ লিটারেচার, রবার্ট হানটিংটন ফ্লেচার

৬. ওম্যান এন্ড ফিকশন, ভার্জিনিয়া ওল্ফ

৭. অ্যান ইংলিশ অ্যানথলজি, নিয়াজ জামান, ফকরুল আলম ও ফিরদাউস আজিম সম্পাদিত

৮. ইংলিশ লিটারেচার, ইটস্ হিস্ট্রি এন্ড ইটস্ সিগনিফিক্যান্স-উইলিয়াম জে. লং

৯. British Literature-Traditions and Change DU Library: Call: 820.7BRI

১০.The Norton Anthology of English Literature-v-01, Call: 820.8NOR

১১.The New Pelican Guide to English Literature- edited by Boris Ford, 8.The Present

১২. English Critical Texts by D.J. Enright, Ernst De Chickera

১৩. The Literature of the Victorian Era by Hugh Walker, Cambridge University Press

১৪. Dictionary of Literary Terms and Literary Theory by J.A. Cuddon, Penguin

১৫. বিশেষ সংখ্যা, শালুক-ফেব্রুয়ারি ২০১১/ আধুনিক সাহিত্যের সর্বাধিক আলোচিত কাব্য ও উপন্যাস

১৬. চিরায়ত পুরাণ-খোন্দকার আশরাফ হোসেন

১৭. An Introduction to Post-Colonial Theory by Peter Childs and Patrick Williams

An Outline of English Literature by Thornley and Roberts, DU Central Library, Call Number: 820.9THO

১৮. Cambridge History of English Literature, DU Central Library, Call Number: 820.9WAC

১৯. কালান্তর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

২০. ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, ড: শীতল ঘোষ

২১. এনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা, ভলিউম-১৮

Related Posts

About The Author

Add Comment