লেকচার নোট: বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী

“এই যে এত এত স্বাধীনতা যুদ্ধের বই বাজারে, আমি তার অনেকগুলিই দেখেছি। পাবলিক লাইব্রেরিতে গেছি, দেখেছি সব মুক্তিযুদ্ধের রূপকথা (আতাউল গনি ওসমানি, ‘সাক্ষাৎকার’, বিচিত্রা, ২৪ নভেম্বর, ১৯৮৩)।

পটভুমি
গেল দশকের ঘটনাবহুল টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির অন্ধকারের মধ্যে ২০০৪ খ্রিঃ যে অতখানি ইতাহাসে আলো ছড়াবে, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যখন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা অনেকটা মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন তখনই হাতে পান পিতার স্বহস্তে লেখা চারটি খাতা
এই গ্রন্থে বর্ণিত সময়কাল হচ্ছে ১৯৫৫ পর্যন্ত। মানে তখনো শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে উঠেন নি।
আলোচ্য বিষয়
তাঁর শৈশব, ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবন, আওয়ামীলীগ গঠন ও বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের জন্য উতসর্গীকৃত জীবনের ইতিহাস নিজ হাতে ঢাকা জেলে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় লিখে যান। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে নয় বারং দেশি-বিদেশি ইতিহাস গবেষণায় এক অক্ষয় কীর্তি হয়ে থাকবে।
ব্রিটিশ শাসন থেকে শুরু করে, পাকিস্তান সৃষ্টি ও নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সাথে অধিকার ও প্রাপ্তির প্রশ্নে যে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে তা সুচারুভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বইটাকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। বইয়ের শুরুতে তাঁর পরিবার, বংশের কথা খোলামেলা ভাবেই বলা হয়েছে। কিছুদূর এগোতেই স্বভাবতই চলে আসে সমকালীন রাজনীতি। সে রাজনীতির প্রথম ভাগ হচ্ছে স্বপ্নের ‘পাকিস্তান আন্দোলন’। সে আন্দোলন সফল হওয়ার পরই আসে স্বপ্নের পাকিস্তানে স্বপ্ন ভঙ্গের অধ্যায়। সে স্বপ্ন ভঙ্গের সাথে শুরু হয় তার নিজের উপর জেল – জুলুম। জেলের এবং জেল জীবনের বিস্তারিত বিবরণ আছে শেষ ভাগ টা জুড়ে। সাথে আছে ৪৩ এর দূর্ভিক্ষ এবং কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার স্মৃতিচারণ। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাস। শেষের দিকে আছে লেখকের চীন সফর নিয়ে বিশাল বর্ণনা। সে বর্ণনায় তখনকার ঘুরে দাঁড়ানো ‘নয়া চীন’ এর প্রতি মুগ্ধতাও ঝরে পড়ে লেখকের কলমে।

পাঠ পর্যালোচনা
আমি মনে করি বইটি পাঠে শুধু ইতিহাস উদ্ধারই নয় বরং পাঠকের আত্নসচেতনতা, জাতীয়তাবোধ, দৃঢ়চেতা ও মানব প্রেমিক হতে উদ্বোদ্ধ করবে। ৫২ ভাষা আন্দোলনে যারা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে চান কিংবা যারা অপরাপর সবাইকে ছাপিয়ে তাঁকে ভাষা আন্দোলনের একক নায়ক ভাবতে চান তাদের জন্যও অসমাপ্ত আত্নজীবনী একটি প্রামাণ্য দলিল।

আমলাতন্ত্রের প্রতাপ
পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রথম থেকেই আমলাতন্ত্রের যে প্রবল প্রতাপ তার উত্তাপ বোঝা যায় “অসমাপ্ত আত্মজীবনী“ এর ১৯৫ পৃষ্ঠার বর্ণনা থেকে পাওয়া যায় – “১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী ও আমি যখন জেলে, সেই সময় জনাব লিয়াকত আলী খানকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও তাঁরই হুকুমে এবং নূরুল আমিন সাহেবের মেহেরবানীতে আমরা জেলে আছি, তবুও তাঁর মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলাম। কারণ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করে হত্যা করা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তারা এই সমস্ত জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব তাঁর মন্ত্রিত্বে একজন সরকারি আমলাকে গ্রহণ করলেন, এরপর আমলাতন্ত্রের প্রকাশ্য খেলা শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে। একজন সরকারি কর্মচারী হলেন গভর্নর জেনারেল, আরেকজন হলেন অর্থমন্ত্রী। খাজা সাহেব ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির লোক। তিনি অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন, তবে কর্মক্ষমতা এবং উদ্যোগের অভাব ছিল। ফলে আমলাতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াল। আমলাতন্ত্রের জোটের কাছে রাজনীতিবিদরা পরাজিত হতে শুরু করল।’
প্রতিযোগীতায় টিকে যাবার পরেও অক্সফোর্ডে ২ বছর পড়াশুনা ও প্রশিক্ষন শেষে তারা শিক্ষনবীশ অফিসার থেকে আইসিএস অফিসার হতে পারতেন যদিও প্রশাসনের উচ্চপদ ব্রিটিশদের জন্যেই সংরক্ষিত ছিলো। এই আইসিএস অফিসারদের ততকালীন সময়ে বলা হত “স্বর্গীয় সন্তান”, এবং তাদের ক্ষমতার সুপিরিওরিটি সেভাবেই দেয়া হত।
দুঃখজনকভাবে আমাদের আজকের প্রশাসন ক্যাডারের প্রশিক্ষনের সময়েও তাদের এভাবেই জ্ঞান দেয়া হয় যে তারা শাসক এবং বাকিরা প্রজা।

বইয়ে বর্নিত তাঁর গুনাবলী
তিনি যে কতটা বড় মাপের ও মনের মানুষ ছিলেন তার পরিচয় বইটির শুরুতেই পাওয়া যায়। গোপালগঞ্জের ৫৪ খ্রিস্টাব্দের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি প্রচারে এক বৃদ্ধ মহিলার তার প্রতি ভালবাস এবং এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর অশ্রুসিক্ত নয়নে মনে মনে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাতে তার মানুষের প্রতি ভালবাসা ফুটে উঠে। সেই পরিস্থিতির বর্ণনায় তিনি বলেন, “নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেইদিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না (পৃঃ ২৫৬)।
ছাত্র রাজনীতির সময় থেকেই তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা এতটাই দূরদর্শী ছিল যে তৎকালীন ঝানু নেতৃবৃন্দেরও প্রশংসা কুড়াতো। হোসেন শহিদ সাহেব গোলাম মোহাম্মদ আলীর আইনমন্ত্রী হওয়া ও তার পরিণতি তিনি কতটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন সেটা জানা না গেলেও শেখ মুজিব যে আদ্যপান্ত সইব অনুধানব করতে পেরেছিলেন তার বর্ণনা শহিস সাহেবের সাথে সাক্ষাত পর্বেই বুঝা যায়। তার বর্ণনায় তিনি বলেছেন, “পূর্ব বাংলায় যেয়ে সকলের সাথে পরামর্শ করে অন্য কাউকেও তো মন্ত্রিত্ব দিতে পারতেন। আমার মনে হয় আপনাকে ট্র্যাপ করেছে (পৃঃ ২৮৬)।“
গান্ধীজিকে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় সহকর্মী মিস্টার ইয়াকুবের তোলা ছবি কৌশলে উপহার দেয়া তার দূরদর্শী প্রজ্ঞাকেই সমর্থন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ছয় দফা দাবী উত্থাপন তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই প্রতিফলন।
‘হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় শুধু মুসলিমদের পক্ষই নেননি। হিন্দুদেরকেও সাধ্যমত দাঙ্গা থেকে বাঁচিয়েছেন। আদমজির বাঙ্গালি-অবাঙালিদের দাঙ্গায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিলের ভিতরে প্রবেশ করে দাঙ্গাকারীদের শান্ত করেছেন এবং কয়েকজন পুলিশ ও মোহন মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় তিনশত আহত লোককে হাসপাতেলে পাঠিয়েছিলেন। বিহার দাঙ্গায় অক্লান্ত ভাবে যেচ্ছাসেবী হিসেবে পড়াশুনা রেখে ত্রাণকাজে যোগ দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক। তাইতো হিন্দু সহপাঠীদের বাড়িতে অপমানিত হয়েও হিন্দু বন্ধু ননীকুমার দাসকে নিজের বাড়িতে ঢুকার ব্যপারে কোন রূপ বাঁধা-নিষেধ রাখেননি। ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেছেন, “ননী আমাকে বলল, তুই আর আমাদের বাসায় যাস না। কারণ তুই চলে আসার পরে কাকীমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিস্কার করেছ পানি দিয়ে ও আমাকেও ঘর ধুতে বাধ্য করেছে। বলালাম, ‘যাব না, তুই আসিস (পৃঃ২৩)।’
৪৭ এর দেশ বিভাগের পরও তাইতো দেশ ছেড়ে যাওয়া লোকদের ফেরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। এমকি কলকাতায় শহিদ সহরোয়ার্দীর সরনাপন্ন হয়েছেন। তিনি যে সত্যিকারের এক অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী তার প্রমাণ আর একবার পাওয়া যায় আওয়ামী মুসলিমলীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ লিয়ে আওয়ামীলীগ গঠনের মাধ্যমে।
“রাজনৈতিক পথ-মতের পার্থক্য থাকবেই। গণতান্ত্রিক রাজনীতির এ এক সৌন্দর্য। তা বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় চর্চা করে গেছেন। তাইতো বিরোধী রাজনীতিকদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলেছেন এমনকী অনৈতিক ভাবে ভোট কেনা বেচার মাধ্যমে প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনে হেরে গিয়ে তাদের সমালোচনা করলেও অপামান-অপদস্ত হয় এমন কিছু করেননি। এমনকি তাদের নাম পর্যন্ত গোপন রেখেছেন। তিনি তার আত্নজীবনীতে যে সুরুচিবোধের পরিচয় দিয়েছেন, অগ্রজ রাজনীতিবীদদের প্রতি যে শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়েছেন দেখিয়েছেন তা যুগে যুগে অনুকরনীয়।

সাহিত্যিক মান/ভ্রমন বর্ননা
সাহিত্যিক না হয়েও তাঁর শৈশব থেকে ছাত্র জীবনের নানা বাঁকে রাজনৈতিক চর্চা, বিহার দাঙ্গা, ৪৩’র দুর্ভিক্ষ, ৪৭’র দেশ ভাগ, আওয়ামীলীগ গঠন এবং লালকেল্লা ও তাজমহল দর্শন, চীন সফর ও পশ্চিম পাকিস্তান সফরের বর্ণনায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধুর শিল্প, সাহিত্য, কবিতা, সৌন্দর্যবোধ ও সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুল, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তির কথা ও আব্বাস উদ্দীনের গানে মুগ্ধ হওয়ার ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে।

১৯৪৩ এর দূর্ভিক্ষের ভয়াবহতার চিত্র
১৯৪৩ এর দূর্ভিক্ষের ভয়াবহতার চিত্র লেখক অনেকটা এভাবেই তুলে ধরেছেন,
“… সেই বাংলাদেশের এই দুরবস্থা চোখে দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্চা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্যে কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, ‘মা বাঁচাও, কিছু খেতে দাও, মরে তো গেলাম, আর পারি না, একটু ফেন দাও।”
রাজনৈতিক গুরু
রাজনৈতিক জীবনে গান্ধীজী থেকে শুরু করে, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী, পীর মানকি, মাওলানা আকরম খাঁসহ পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ, এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাষানী, শামসুল হক, মানিক মিয়াসহ রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গের সাথে অন্তরঙ্গতা ও মতের মিল-অমিল সবিস্তারে উঠে এসেছে তার এই গ্রন্থে।

সমালোচনা
আওয়ামীলীগ ও তদসংস্লিষ্ট বুদ্ধিজিবীদের সবচেয়ে বড় সফলতা বাংলার ইতিহাসকে ২৫ শে মার্চ থেকে ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা। ৭১ পরবর্তী ৭২-৭৫ ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে বাকশাল, দুর্ভিক্ষ, গুম-খুন অনেক কিছু চলে আসে। ফলে ৭১ পরবর্তী ইতিহাসের আলোচনায় আওয়ামীলীগ সরাসরি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ চলে যায়। আবার ৭১ পূর্ববর্তী আলোচনায় আওয়ামীলীগ ৫২’র ভাষা আন্দোলন ছাড়া তেমন কিছু আলোচনা করে না।পাকিস্তান শাসনামলের ২৩ বছরে উন্নয়নের অসমতা যেমন ছিল আবার অনেক উন্নয়নও হয়েছিল।বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান কাঠামোগত উন্নয়ন পাকিস্তান আমলেই গড়ে উঠা।
এখন অসমতা হোক আর উন্নয়ন হোক তার কিছুটা ভাগীদার আওয়ামীলীগ নিজেও। কারন তত্কালীন আওয়ামীলীগ প্রধান সোহোরাওয়ার্দি অখন্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আওয়ামীলীগের অন্যতম পলিসি মেকার আবুল মনসুর আহমাদ অখন্ড পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।
এছাড়াও বাংলাদেশ থেকে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এবং ঢাকার খাজা নাজিমুদ্দিন অখন্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সে কারনে আওয়ামীলীগের বক্তব্য মূলত ৭১ আর কিছুটা ৫২ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

বঙ্গবন্ধু নিজে পাকিস্তান আন্দোলন করলেও আওয়ামীলীগ পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে, ৪৭ নিয়ে তেমন কিছু বলে না।কারণ পাকিস্তান আন্দোলন নিয়ে কথা বলার অর্থ হচ্ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং বর্ণবাদী ব্রাহ্মনদের বিরুদ্ধে কথা বলা। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলা গেলেও ব্রাহ্মনদের বিরুদ্ধে কথা বললে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। ফলে ব্রিটিশ শাসনামলের ১৯০ বছর বাংলাদেশের মানুষের উপর অবর্ণনীয় নানা অত্যাচার-নির্যাতন আলোচনার বাইরেই থেকে গেল।
অন্যদিকে আওয়ামীলীগ বিরুধীদের ব্যর্থতাও এখানেই, তারাও ইতিহাসকে ওই ৯ মাসের বাহিরে নিয়ে যেতে পারেনি।তারা ইতিহাসকে যেমন ৭১ থেকে উদ্ধার করতে পারেনি, তেমনি ৭১ নিয়ে সত্য-মিথ্যার যেই সংমিশ্রন রয়েছে সেখান থেকেও সত্যটাকে আলাদা করতে পারেনি।যে কারণে একটা জাতির ইতিহাস আটকা পরে আছে ৯ মাসের মধ্যে।

আমরা কি জানি ১৭৬৯-১৭৭৩ এর দুর্ভিক্ষে বাংলার কত লোক মারা গিয়েছিল? আমরা কি জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য ধান-চাল গুদামজাত করতে গিয়ে দুর্ভিক্ষে কত লোক মারা গিয়েছিল? ১ কোটিরও বেশি মানুষ মারা যায় শুধু বৃটিশ পলিসির কারনে। এসব আমরা জানি না বলেই ৬৬, ৬৯ কারো কাছে অনেক বড় মনে হয়। ইতিহাসের আলোচনায় ৭১ এবং ৫২ যেমন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ১৯৪৭ এবং ১৯০৫ সাল। একইভাবে ১৮৫৭, ১৭৫৭ এবং ১২০৪ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ন।

আর ইতিহাসের আলোচনা হতে হবে নির্মোহভাবে, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার উদ্দেশ্যে, সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রনে ঘৃনা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়।
৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার বাবা’র স্বপ্নের পাকিস্তান আন্দোলন সফল না হলে কখনো ৭১ হত না। অথচ ৪৭ এর বিষয়ে আমরা নিরব। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সাথে ৭১ এবং ৪৭ অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত। আমাদের উচিত ৪৭ এবং ৭১ কে সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করা এবং ইতিহাসের আরো গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়কে (যেমন: ১৮৫৭, ১৭৫৭ এবং ১২০৪) জাতির সামনে তুলে নিয়ে আসা।

বইটিতে তিনি বাঙালি জাতিকে পরশ্রিকাতর ও বিশ্বাসঘাতক বলে উল্লেখ করেছেন (পৃঃ ৪৭)। রাগে ক্ষোভে এমনটি হয়তো করেছেন। কিন্তু আত্নজীবনীতে এমন করে বিষোৎগার না করলেও পারতেন।

এছাড়াও বিভিন্ন আঞ্চললে সফরের সময় নেতা-কর্মীদের সাথে কথোপকথনের বর্ণনা আঞ্চলিক ভাষায় বিধৃত হলে সাহিত্যিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তো।
অসমাপ্ত আত্নজীবনী থেকে

চেয়েছিলাম অবিভক্ত বাংলা ও আসাম
১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা করা হল ভারতবর্ষ ভাগ হবে। কংগ্রেস ভারতবর্ষকে ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে, বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। বাংলাদেশের কলকাতা এবং তার আশপাশের জেলাগুলিও ভারতবর্ষে থাকবে। মওলানা আকরম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন। বর্ধমান ডিভিশন আমরা না-ও পেতে পারি। কলকাতা কেন পাব না? কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করল। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে, কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এই ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না। সমস্ত বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে এটাই ছিল তাদের ধারণা। আজ দেখা যাচ্ছে, মাত্র আসামের এক জেলা_ তাও যদি গণভোটে জয়লাভ করতে পারি। আর বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগুরু জেলাগুলি কেটে হিন্দুস্থানে দেওয়া হবে। আমরা হতাশ হয়ে পড়লাম। কলকাতার কর্মীরা ও পশ্চিমবঙ্গের কর্মীরা এসে আমাদের বলত, তোমরা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, আমাদের কপালে কী হবে খোদাই জানে! সত্যই দুঃখ হতে লাগল ওদের জন্য। গোপনে গোপনে কলকাতার মুসলমানরা প্রস্তুত ছিল, যা হয় হবে কলকাতা ছাড়া হবে না। শহীদ সাহেবের পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। দিলি্ল বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এ কথা তো আমরা জানতামও না, আর বুঝতামও না। এই সময় শহীদ সাহেব ও হাশিম সাহেব মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণশংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাদের আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা যায় কি না? শহীদ সাহেব দিলি্লতে জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তার অনুমতি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। বেঙ্গল মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি এক ফর্মুলা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। যতদূর আমার মনে আছে, তাতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সেই গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্থান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে। যদি দেখা যায় যে, গণপরিষদের বেশি সংখ্যক প্রতিনিধি পাকিস্তানে যোগদানে পক্ষপাতী, তবে বাংলাদেশ পুরাপুরিভাবে পাকিস্তানে যোগদান করবে। আর যদি দেখা যায় বেশি সংখ্যক লোক ভারতবর্ষে থাকতে চায়, তবে বাংলাদেশ ভারতবর্ষে যোগ দেবে। যদি স্বাধীন থাকতে চায়, তাও থাকতে পারবে। এই ফর্মুলা নিয়ে জনাব সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু দিলি্লতে জিন্নাহ ও গান্ধীর সাথে দেখা করতে যান। শরৎ বসু নিজে লিখে গেছেন যে জিন্নাহ তাকে বলেছিলেন, মুসলিম লীগের কোনো আপত্তি নাই, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোনো ফর্মুলা মানতে পারবেন না। শরৎ বাবু কংগ্রেসের নেতাদের সাথে দেখা করতে যেয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন। যুক্ত বাংলার সমর্থক বলে শহীদ সাহেব ও আমাদের অনেক বদনাম দেবার চেষ্টা করেছেন অনেক নেতা। যদিও এই সমস্ত নেতারা অনেকেই তখন বেঙ্গল মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সর্বসম্মতিক্রমে এই ফর্মুলা গ্রহণ করেছিলেন। জিন্নাহর জীবদ্দশায় তিনি কোনো দিন শহীদ সাহেবকে দোষারোপ করেন নাই। কারণ তার বিনা সম্মতিতে কোনো কিছুই তখন করা হয় নাই। যখন বাংলা ও আসাম দুইটা প্রদেশই পাকিস্তানে যোগদান করুক, এর জন্যই আমাদের আন্দোলন ছিল, তখন সমস্ত বাংলা পাকিস্তানে আসলে ক্ষতি কি হত তা আজও বুঝতে কষ্ট হয়! যখন বাংলাদেশ ভাগ হবে এবং যতটুকু পাকিস্তানে আসে তাই গ্রহণ করা হবে এটা মেনে নেওয়া হয়েছে_ তখন সে প্রশ্ন আজ রাজনৈতিক কারণে মিথ্যা বদনাম দেওয়ার জন্যই ব্যবহার করা হয়। বেশি চাইতে বা বেশি পেতে চেষ্টা করায় কোন অন্যায় হতে পারে না। যা পেয়েছি তা নিয়েই আমরা খুশি হতে পারি।

উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার সাড়া জাগানো “জোছনা ও জননীর গল্প” উপন্যাসের ভুমিকায় লিখেন;
“… লেখক-লেখিকাদের ডায়েরির মতো লেখা বইগুলিও আমাকে সাহায্য করেছে (জোছনা ও জননী লেখার ব্যাপারে)। ঢাকা শহরে প্রতিদিন কী ঘটছিল ডায়েরি পড়ে তা বোঝা যাচ্ছিল। তবে এই প্রসঙ্গে ছোট্ট একটা ঘটনার কথাও বলি। ডায়েরি জাতীয় গ্রন্থগুলি পড়ে আমার মনে হয়েছে সেগুলি তখনকার লেখা না। পরে তারিখ দিয়ে সাজানো হয়েছে। কারণ একজন কোনো এক বিশেষ দিনে লিখছেন – ঢাকা শহরে সকাল থেকেই প্রবল বর্ষণ, আরেকজন একই দিনে লিখছেন – কঠিন রোদ। রোদে ঢাকা শহর ঝলসে যাচ্ছে। একজন লিখছেন – এই মাত্র খবর পেলাম প্রবাসী সরকার শপথ নিয়েছে। অথচ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়েছে তার দুদিন পরে। ডায়েরি রচনায় রাজনৈতিক মতাদর্শও কাজ করেছে। কারো কারো ডায়েরিতে প্রতিদিনকার সমস্ত খুঁটিনাটি আছে, কিন্তু জিয়াউর রহমান নামের একজন মেজর যিনি কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধে সবাইকে আহ্বান করেছেন সেই উল্লেখ নেই। তার নামটিও নেই।…আমার ধারণা সাক্ষ্যপ্রমানমূলক তথ্যগুলি ভালোমতো যাচাই করা হয় নি। তাছাড়া জাতিগতভাবেও আমরা অতিকথন পছন্দ করি“[ হুমায়ূন আহমেদ, জোছনা ও জননীর গল্প, অন্যপ্রকাশ – জুন, ২০০৪, ভূমিকা ]
অতীতের প্রতি অবিচার করে কেউ কখনো সুস্থ ভবিষ্যত নির্মাণ করতে পারেনা (আহমদ ছফা, আহমদ ছফার প্রবন্ধ, স্টুডেন্ট ওয়েজ, ঢাকা, ২০০০ পৃ:১৫)।
মুসলিম লীগের রাজনীতিতে শেখ মুজিব ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর শিষ্য এবং গুরু শিষ্য দু’জনেই ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা। বাংলাদেশ যারা স্বাধীন করেছেন এক সময় তাদের বেশির ভাগই ছিলেন মুসলিম লীগে। মুসলিম লীগের Extension or junior partner.
আওয়ামী মুসলীম লীগের সকল নেতৃবৃন্দ এককালে ছিলেন পাকিস্তানি। আমার শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক সেদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললেন, তার কাছে শেখ মুজিবের কিছু ছবি আছে, সেই ছবিতে জিন্নাহ মারা যাওয়ার পর শেখ মুজিব হাউমাউ করে কাঁদছেন।
‘চীন দেখে এলাম’ বইতে মনোজ বসু লিখেছিলেন, শেখ মুজিব পিকিংএ তাকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে, আমরা পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করে ছাড়াবো। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মনোজ বসু বইটা প্রত্যাহার করে নেন। পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার চিন্তা শেখ সাহেবের মনে থাকতে পারে। আমার মনে হয় এতে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে পড়েছে। বীরেন শাসমলের ছেলে নিমলানন্দ শাসমল, ‘ভারত যখন স্বাধীন হচ্ছে’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। সেই বইতে তিনি লিখেছেন,
আজকে যে কারণে আমরা শেখ মুজিবকে মালা দেই, সেই একই কারণে শেখ আবদুল্লাহকে জেলে পাঠাই।

পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হয়েও কেন ‘মুসলিম লীগ’ ত্যাগ করে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠন করলেন? এর প্রয়োজনই বা কি ছিল?
সাধারণত আত্নজীবনীতে নিজেকে একটু বেশি তুলে ধরা হয়। কিন্তু এখানে আপনি শেখ মুজিবকে যতটা পাবেন তার চেয়ে বেশী পাবেন সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী ও শেরে বাংলা কে। শেখ মুজিব শুধু ঘটনা প্রবাহ বলে গিয়েছেন। প্রতিটা মানুষ সম্পর্কে তিনি করেছেন উচ্চকিত প্রশংসা। যেমন, সোহরাওয়ার্দীকে নিয়ে লিখেছেন, “শহীদ সাহেব ছিলেন সাগরের মত উদার। যে কোন লোক তাঁর কাছে একবার যেয়ে হাজির হয়েছে, সে যত বড়ই অন্যায় করুক না কেন, তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন”।
কারো সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু থাকলে যেমন উল্লেখ করেছেন ঠিক তেমনি তার প্রশংসার জায়গায় প্রশংসাও করেছেন। ভাসানী সম্পর্কে এক জায়গায় বলেন, “এই দিন আমি বুঝতে পারলাম মাওলনা ভাসানীর উদারতার অভাব, তবুও তাকে আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতাম। কারণ, তিনি জনগণের জন্য ত্যাগ করতে প্রস্তুত।”
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। ২৫ শে মার্চ রাতে শেখ মুজিবের গ্রেফতার হওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আমাদের মনে। শারমিন আহমদ “তাজউদ্দিন আহমদঃ নেতা ও পিতা” গ্রন্থে স্বেচ্ছায় কারাবরণ এর কথা উল্লেখ করেছেন, “এদিকে বেগম মুজিব ঐ শোবার ঘরেই সুটকেসে মুজিব কাকুর জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখতে শুরু করলেন”।
হুমায়ূন আজাদ যথার্থই বলেছিলেন,

” তিনি শুধু রাজনীতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেন নি, তিনি যুগান্তর ঘটিয়েছিলেন রাজনীতিক ধারার, যেমন কবিতায় যুগান্তর ঘটিয়েছিলেন মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ বা ত্রিশের কবিরা।”

Related Posts

About The Author

Add Comment