লেকচার নোট : মানব সংস্কৃতির বিকাশ ও বিশ্বসভ্যতা

মানব সংস্কৃতির বিকাশ ও বিশ্বসভ্যতা

ইতিহাস,প্রত্নতত্ত্ব   , ধর্মবিশ্বাস  কিংবা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে অনেকগুলো প্রশ্ন। বিশ্লেষণের পাঠপ্রেক্ষিতে উপস্থিত একটি শব্দবন্ধ ‘সভ্যতা’। অনেক গবেষক এই শব্দটি নিয়েই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন সভ্যতার কথা যদি বলতে হয় তাহলে এর বিপরীত শব্দ কি হবে? এখানে যাদের সভ্যতা অংশ বলে মনে করা হচ্ছে বাকিরা কি অসভ্য। আমরা যারা  প্রত্নতত্ত্ব  বা ইতিহাসের পাঠ নিয়েছি কিংবা নিচ্ছি স্পষ্ট দেখেছি কিছু মানদণ্ডে নির্ধারণ করা হচ্ছে সংস্কৃতির কোন পর্যায়কে আমরা সভ্যতা বলব? কিন্তু অবাক করার বিষয় এক এক ক্ষেত্রে সভ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই মানদণ্ড অবাক ভঙ্গিমায় বদলে যাচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই।

লিখনী, চাকার ব্যবহার, উপযুক্ত নগর ও আইন কানুন থেকে শুরু করে আরও নানা বিষয়কে সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ চলক হিসেবে ধরা হচ্ছে যেখানে সমরবিদ্যা ও বাণিজ্যের মত বিষয়গুলোও বাদ পড়েনি। তবে কবে থেকে শুরু হয়েছে এই সভ্যতা। সেদিক থেকেও সভ্যতা প্রপঞ্চটি আরেক দফা প্রশ্ন বিদ্ধ হচ্ছে বার বার। সম্প্রতি ইজরাইলের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষক অধ্যাপক ইয়ুভাল নোয়াহ হারারি অনেকগুলো বিষয় নিয়ে ধুন্ধুমার বিতর্ক তুলে জনপ্রিয় হয়েছে। আমরা দেখেছি উপনিবেশের যুগে সেই হেনরি লুই মর্গানও নানা বাক্যবাণে বন্য (ঝধাধমবৎু) থেকে বর্বর (ইধৎনধৎরংস)  তারপর সভ্য (ঈরারষরুধঃরড়হ) সমাজে পদার্পণের কথা বলেছেন।

আমজহা সোজাসাপ্টা সবকথা শুনে কিংবা পড়ে তা বিশ্বাস করতে পারি না। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়া উপনিবেশে তাদের শোষণ, জুলুম নিপীড়নের বৈধতার রাজনীতি এর সঙ্গে জড়িত। এখানে তাদের বন্য কিংবা বর্বর বলে দাবি করে ইউরোপীয়দের সভ্য প্রমাণের রাজনীতি চলেছে আদতে যাদের দেশে কথিত সভ্যতার সূচনা আরও আগে। এক্ষেত্রে প্রশ্নটা উঠেছে ভৌগোলিক পরিসীমা নিয়ে আর তার উপযুক্ত রূপায়ন ঘটতে দেখা গেছে পরিমাপের মানদণ্ডেও।

বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের প্রশ্নে সভ্যতার বিষয়টি হোঁচট খাচ্ছে বার বার। এক্ষেত্রে যাঁরা ধর্মবিশ্বাসী তারা মানতে নারাজ বিবর্তনবাদকে। আবার যাঁরা ধর্মকে সহ্য করতে পারেন না তারা পুরোপুরি বিরোধী অবস্থান থেকে দেখাতে চেষ্টা করছেন সভ্যতার ইতিকথা। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই সভ্যতার বিশ্লেষণী বক্তব্যটা হওয়ার উচিত যুক্তিতর্কনির্ভর, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের জোর দাবি নিয়ে নয়। ধর্ম জৈবিক বিবর্তবাদের তত্ত্বকে অস্বীকার করলেও কার্যত সাংস্কৃতিক বিবর্তনবাদকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এখানে মানুষের জীবনমানের উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের কথা বলা যেতে পারে যেখানে বার বার বলা হয়েছে আলো থেকে অন্ধকার কিংবা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসার কথা। এখানে শয়তান কিংবা ঈমানের প্রশ্নে কথাটা  বেশি বলা হলেও তাকে ভিন্ন ব্যাখ্যার্থে ব্যবহার করা যেতেই পারে। বিশেষ করে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বলতে সাংস্কৃতিক রূপান্তরে সভ্যতায় পদার্পণ ধরা যেতেই পারে। একইভাবে সভ্যতার ধ্বংসকে আলো থেকে অন্ধকারে পতনের নির্দেশক বলাটা বোধকরি ভুল হবে না।

বিবর্তনবাদী তত্ত্বে ধর্মকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে সভ্যতার বিশ্লেষণ করার চেষ্টাটা বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রাচীন মিসর থেকে শুরু করে সুমেরের সব সভ্যতা ধর্মাশ্রয়ী। পারস্য, গ্রেকোরোমান, সিন্ধু, চৈনিক কিংবা মায়া ইনকাতেও ধর্মের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। এক্ষেত্রে উগ্র ধর্মীয় নীতি কিংবা অবিশ্বাসের ভাইরাস মুক্ত হয়ে এক ধরণের সমরূপতা মেনে নিতেই হয়। বর্তমান সময়ে মানুষের যেমন জীবন আছে অতীতেও ছিল। এখন যেমন বিশ্বাসী মানুষ আছে তখনও ছিল, তখনকার দিনে সবাই ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাসী ছিল এমনটাও নয়। আমরা দেখেছি বিখ্যাত লেখক হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের  অ্যালান এন্ড দ্য আইস গড বইয়ের বর্ণনা।  সেখানে নেকড়েমুখো প্যাগ ক্ষ্যেদোক্তির সঙ্গে বলছে ‘দেবতারাই ভালুক, নাকি ভালুকগুলোই দেবতা’। অন্যদিকে ধর্মবিশ্বাসে বলীয়ান বুড়ো আর্ক থেকে শুরু করে ওয়াই মোয়ানাঙ্গা, আকা, তানা, ফো কেউ বাদ যাচ্ছে না দেব আরাধনা থেকে। বিবর্তন ও সভ্যতার যোগাযোগ বোঝাতে হ্যাগার্ড এখানে নৌকাযোগে এনেছেন সুন্দরী ললীলাকে যে দেহসৌষ্ঠব থেকে কর্মদক্ষতা সবদিকেই এগিয়ে ছিল ওয়াইয়ের জনপদ থেকে। বাস্তবে এ ধরণের বর্ণনা আর উপাখ্যানের উপর ভর করেই গড়ে উঠেছে সভ্যতার ইতিকথা। হ্যাগার্ড যেমন গল্পের পরিণতিতে দেখাতে চেয়েছে ওয়াইয়ের অসভ্য জনপদে সভ্যতার আলো নিয়ে আসছে ললীলা। তেমনি মর্গান বা হারারিরা চেষ্টা করছেন তাদের দখলকৃত জনপদকে মূলত সভ্য করার মহান দায়িত্ব পালন করেছে ঔপনিবেশিক শক্তি।

সুন্দর বর্ণনা, প্রাঞ্জল বক্তৃতার ভাষা থেকে শুরু করে আরও নানা দিক থেকে নোয়াহ হারারি শুধু ‘স্যাপিয়েন্স’ শিরোনামে বর্তমান সভ্যতা ও সংস্কৃতির ময়নাতদন্ত করেন নি। তিনি ‘হোমো ডিউসে’ দেখাতে চেয়েছেন ভবিষ্যতটা কোনদিকে ধাবিত হতে। আর এগুলো দেখে সভ্যতাকে যদি প্রাক-অনুমিত রূপকল্প বলে উল্লেখ করা হয় তবে সেটা কোন দিক থেকেই ভুল নয়। এমনি তর্ক বিতর্ক বাদ দিয়ে যদি শ্রেণীকক্ষের পাঠক্রম আর পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করতে বসি আমরা পড়ব সভ্যতার নানা সংজ্ঞা। সেখানে একটি জটিল সমাজের কথা জানা যাবে। আরও আসবে নগর উন্নয়ন, সামাজিক শ্রেণী, সাংকেতিক যোগাযোগ কিংবা লিখন পদ্ধতি এবং প্রকৃতির উপর ঐ অঞ্চলের মানুষের নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতার বিষয়টি। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি পরিবর্তন এখানে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শাসক ও শাসিতের প্রশ্ন আসবে। আঞ্চলিকতা ও কালিক পরিসরে আমরা অনেকগুলো নামও পাবো এখানে। যেখানে মিসর, সুমেরীয়, ব্যবিলনীয়, অ্যাশেরীয়, ক্যালডীয়, পারস্য, গ্রোকো-রোমান, সিন্ধু, মায়া কিংবা ইনকার পাশাপাশি চৈনিক সভ্যতার নাম আসবে। এগুলো ক্ষেত্রে বিশেষে অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করার দাবি রাখে। এগুলোর প্রত্যেকটি নিয়ে হতে পারে দীর্ঘ আলোচনা। মানব ‘সংস্কৃতির বিকাশ ও বিশ্বসভ্যতা’ শিরোনামের প্রারম্ভিক এই আলোচনাতে বিশ্ব সভ্যতাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রচলিত জনপ্রিয় বক্তব্যগুলোর দিকেও আলোকপাতের চেষ্টা থাকবে।

মো. আদনান আরিফ সালিম

পিএইচডি গবেষক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সহ-সম্পাদক সম্পাদকীয় বিভাগ

দৈনিক বণিক বার্তা।

Related Posts

About The Author

Add Comment