লেকচার নোট : মানব সত্তার পাশবিকীকরণ ( Animalization of Being)

 আমরা এ মুহূর্তে যে পৃথিবীতে বসবাস করছি তাতে আমাদের জীবন চালানোর জন্যে অর্থনৈতিক পরিপূরণ অনিবার্য বিষয়। এটা ব্যক্তি বিশেষে কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে কিংবা বৈশ্বিকপরিমন্ডলে যে ভাবেই হোক না কেন।প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্যে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারিত হলেও অর্থনৈতিকভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতা বিরাজমান।বর্তমান বিশ্বে একটিই অর্থনীতি, গ্লোবালক্যাপিটালিজম।এদিক থেকে মানুষ নিজেদের বায়োলজিক্যাল নিড পরিপোষণেযে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, ঐতিহাসিক ভাবে দেখলে তাএরকম ছিলনা।ব্যক্তির অর্থনৈতিক পরিপোষণের পরিমণ্ডলও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল দুইটি ভিন্ন ছিল।আধুনিক রাজনীতি গ্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিচ্ছবি হলেও বর্তমানে এ অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের অভিন্ন  পরিস্থিতিতে প্রাণী বা মানুষ হিসেবে ব্যক্তির দুইটি দিকের মধ্যে মানবিকসত্তার চেয়ে প্রানিজসত্তাকে অধিক প্রতিফলিত হয়ে থাকে। এখন পর্যন্ত ফিলসফির যে ডেভেলপমেন্টতা, বায়োলজি থেকে ইউৎসারিত।সত্তা হিসেবে প্রানি তার পরিবেশে কেমন ভাবে বিচরণ করে, এক্ষেত্রে প্রানিএবংমানুষের পার্থক্যের জায়গা, মানুষ কোনপরিস্থিতিতে কেবল প্রানিজসত্তাকেই প্রতিফলিত করে, তা নৃতাত্ত্বিকভাবে বৈজ্ঞানিক কল্পে বিবেচ্য।এক্ষেত্রে মানুষের সত্তা সম্পর্কিত প্রশ্নকে ঐতিহাসিক পরম্পরায় নৃতাত্ত্বিক ভাবে তার বিকাশ থেকে দেখা,বর্তমানে মানুষ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কেন মানবিক সত্তা থেকে সরে গিয়ে পাশবিক সত্তায় হাজির হচ্ছে, এ পাশবিকীকরণ প্রক্রিয়া কী,জীবনের অস্তিত্বকী, প্রানিজ ও মানবিক সত্তায় জীবনের ধারণা সুস্পষ্ট করে জীবনের অর্থ কী,প্রানিজ ও মানবিক সত্তার বৈপরীত্যের ভিত্তিতে জীবনের অর্থ নির্ধারণ আলোচনার বিষয়।এআলোচনায়পরিবেশেরসাথেপ্রানিরসম্পর্কওজগতেরসাথেমানুষেরসম্পর্কঅত্যন্ততাৎপর্যপূর্ণ।

মূল আলোচনা

এখানে যে বিষয় গুলোকে আলোচনা করা প্রয়োজন সেবিষয় গুলো হল- ওয়েস্টার্ন মেটাফিজিক্স, এ্যন্থ্রোপলজিক্যালমেশিন,  বায়োপলিটিক্স, অ্যানিম্যালাইজেশন, নিহিলিজম।

ওয়েস্টার্ন মেটাফিজিক্সেমানুষ তার প্রানিজ রূপের মধ্য দিয়েও মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। প্রাণীর সংজ্ঞা হল প্রাণী মাত্রই অ-মানুষ। এক্ষেত্রে যে কোন মানুষ বায়োলজিক্যালি মানুষের আকার ধারণ করলেও তার মানবীয় সত্তা বা মানবিক রূপ না থাকলে সে অ-মানুষ।  মানুষের মানবীয় সত্তা একটা বিশেষ অনুশীলনের ফল। প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তার করার ওপরই মানুষের স্বরূপ নিহিত। এ অনুযায়ী মানবিক সত্তার বাইরে আসলেই কেবল প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়া সম্ভব। কেননা প্রাণী ও প্রকৃতি তখন একত্রে একাকার। এক্ষেত্রেমানুষ অন্যান্য প্রানিজ সত্তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তার মানবিকতাকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

মানুষ প্রকৃতির অংশ।তবু প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারেরও পর তার মানবিকতা নিহিত।আর মানুষও প্রকৃতির এ পরিবর্তনশীলতার সাথে তার ইতিহাস তৈরি হয়।ইতিহাস দ্বন্দ্বমুখর, ইতিহাস গড়ে ওঠে অসংখ্য বিপরীত ধর্মিতা ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে।এতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান এমন বৈশিষ্ট্য, যা তার প্রতিটি বিকাশের ধাপে দ্বন্দ্ব তৈরি করে ও বিকাশ সাধন করে। এক একটা ঐতিহাসিক মুহূর্তে তার নবনব রূপান্তর ঘটে।ঠিক যেমন- হোমোস্যাপিয়েন্সের পর্যায়ে আসারপরেইমানুষের সামগ্রিক রূপ প্রানিজ ও মানবিক সত্তার প্রকাশ ঘটে।ধারণা করা হয় হোমোস্যাপিয়েন্সের পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোতে কেবল প্রাণী রূপের মধ্যেই মানুষ সীমাবদ্ধ ছিল।

১৯২৯ সালে মারটিন হাইডেগার তার ইউনিভার্সিটি অব ফ্রেইবার্গে ‘অন অ্যানিম্যাল’ নামে একটা কোর্সে ন্যাচার অব বিয়িং এর আলোচনায় ‘প্রাণী ও মানুষের সম্পর্ক’নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।  এ আলোচনায় প্রাণী ও মানুষের পার্থক্য করতে গিয়ে তাদের সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে ‘Profound Boredom’ উল্লেখকরেন।জিওর্জিওআগাম্বেন তাঁর দ্য ওপেন:ম্যান এন্ড অ্যানিম্যাল  গ্রন্থে হাইডেগারের ‘Profound Boredom’ এর আলোকে হিউম্যানবিয়িং ওঅ্যানিমেলের অভেদ ব্যাখ্যা করেন। এই অভেদের মধ্যেই ভিন্নতার বহিঃপ্রকাশ রক্ষিত। এই অভেদ হল প্রাণী ও মানুষের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে বিদ্যমান সাদৃশ্য। এটা স্পষ্টত লক্ষণীয়। কেননা প্রাণী ও মানুষ উভয়েরই সমাজবদ্ধতার দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়। মানুষ সমাজকে ছাপিয়ে তার ভাষার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। এ প্রকাশের বিপরীতে যে নিগূঢ় বিষয় রয়েছে, তার মধ্যে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্থ নিহিত। নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের দিক থেকে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা প্রানিজ সত্তা লাভের পর। আগাম্বেন ‘অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মেশিন’ এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে এ বিষয়টির ‘রাজনীতিকরণ’ করে বলেন, ‘মানুষ হয়েও অ-মানবীয় রূপে জীবন ধারণ অ-মানুষ হওয়ার শামিল, যা পাশবিক সত্তার বহিঃপ্রকাশ।

হিউম্যানিজমের ভেতরে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমানসম্পর্কের ডিসকোর্সকে ইতিহাসের জটিল আবর্তে নিহিত মানুষ ধারণা থেকে মুক্ত করাটাই হল অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মেশিন অব হিউম্যানিজম।এই অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মেশিনকে অনেকটা বলা যায়, একটা মটর, যে মটর মানুষের বিকাশের প্রক্রিয়ায় কীভাবে অ্যানিম্যালিটি থেকে হিউম্যানিটি তৈরি হয় আবার একইভাবে হিউম্যানিটি থেকে অ্যানিম্যালিটিতে পর্যবসিত হয়, এটা ব্যাখ্যা করে। এই অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মেশিনের আওতায় যাদের জীবনাচরণে মানবিক চর্চার কোন ছাপ পাওয়া যায় না, তারা অ-মানুষ হিসেবে স্বীকৃত। অনেকটা বলা যায়, মানুষ কাতারের অন্তর্ভুক্ত হয়েও তারা তাদের জীবনাচারের দ্বারা মানুষ কাতার বহির্ভূত (হোমো অ্যানিম্যালিস) বা (র‍্যাশনাল অ্যানিম্যাল)হিসেবে।এখানে হোমো অ্যানিম্যালিস ও হোমো র‍্যাশনালে এই দুটো ধারণার ক্ষেত্রে একটু পার্থক্য রয়েছে। ( দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা জিউসদের হত্যা করে। এখানে নাৎসিদের বলা যায়,অ্যানিম্যাল রেশনাল, আর তাদের কাজটি ছিল অ্যানিমেলাইজেশনের বহিঃপ্রকাশ। এখানে নাৎসিরা তাদের র‍্যাশনালিটির মাধ্যমে জিউসদের বিরুদ্ধে এই পরিকল্পনা করে।তাই অ্যানিম্যাল র‍্যাশনাল, আর জিউসরা ছিল হোমো অ্যানিম্যালিস,ইতিহাসের জটিল আবর্তে মানুষ ধারণার থেকে বাইরে, মানব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েও অ-মানুষ। )। এটাই অ্যানিমেলাইজেশন। এদিক থেকে প্রাণী, যারা অ-মানুষ তারা মানুষ সমাজের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও প্রাণীজ সত্তার দিক থেকে এক কাতারের, কেননা তারা মানবীয় বৈশিষ্ট্য বর্জিত।

হিউম্যানিজম এখন কাজ করছে না বলে আগাম্বেন মনে করেন।আগাম্বেন তাঁর দ্যওপেন:ম্যান এন্ড অ্যানিম্যালবইতে ইতালির অ্যাম্ব্রোসিয়া লাইব্রেরিতে পাওয়া হিব্রু বাইবেলে অ্যানিম্যাল সহ হিউম্যান ফিগারের একটি বর্ণনা তুলে ধরেন। এই মিনিয়েচারটি অনুমান করে যে অ্যানিম্যাল ও হিউম্যানের পার্থক্য, এই পার্থক্যকে আমাদের চিন্তা দ্বারা বা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।এখান থেকে আগাম্বেন অনুমান করেন যে, অ্যানিম্যালের মাথার অংশটি বর্তমান ইসারাইল। এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের শিল্পী প্রতীয়মান করে তুলতে চান যে, শেষ দিন মানুষ ও পশুর মধ্যে একটি সহাবস্থান তৈরি হবে। মানুষের ভেতরেইহিউম্যানিটিকে অ্যানিম্যাল ও অ্যানিম্যালিটির সাথেই সম্পর্ক তৈরি করতে হয়, একইসাথে অ্যানিম্যালকেও হিউম্যানের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। তাহলে এই সহাবস্থান সম্ভব।  অ্যানিম্যালের একটি প্রাণ আছে, যে প্রাণের জীবন্ততা তার প্রবৃত্তি অনুসরণ করেই ক্ষান্ত, জীবনের অর্থ অনুপস্থিতবলে কোন অর্থ নেই। তাই এটা বেয়ার লাইফ বা শুধু প্রাণ। অপরদিকে হিউম্যানকে নিজের ভেতরের অ্যানিম্যালিটিকে অধিকারে এনে হিউম্যানিটি ও তা থেকে হিউম্যানিজমের চূড়ান্ত রূপ তৈরি করতে হয়। আর তখনই মানুষ হিউম্যান অ্যানিম্যাল হয়ে ওঠে।  তার জীবন থাকে চূড়ান্ত অর্থে সমুজ্জ্বল।

মানুষের মানবীয় সত্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার ভাষা। ভাষার কারণে সে সামাজিকতা তথা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সকলের মতৈক্য তৈরিতে অংশ নিতে পারে। এখানেই মানুষের সাথে প্রাণীর সোশিও-পলিটিক্যাল হওয়ার বড় পার্থক্য নিহিত। হাইডেগার ১৯২৭ সালে রচিততার ‘টাইম এন্ড বিয়িং’ রচনায় নাৎসিকে ইউরোপিয়ান ট্রাডিশনের নিহিলিস্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।  এখানকার উপজীব্য বিষয় হল মানুষ তার একটি সময়ের পরিসীমায় তার জীবনের অর্থ খুঁজে পাক, যাতে সে মনে করে জীবনের অর্থের মধ্যে তার মানবিকতা নিহিত। হাইডেগারের মতে, যে কোন কিছুই তার নিজস্ব অর্থ হারিয়ে ফেললে বস্তুতে পরিণত হয়। কারণ হিসেবে বলা যায়, আমরা এগুলোকে ব্যবহার করি, কিন্তু এগুলোর অর্থ অনুধাবন করি না।  হাইডেগারের সব থেকে বড় উদ্বেগের জায়গা হল টেকনোলজি। বিংশ শতকে টেকনোলজির  বিপ্লব তার মনে ভীতির সঞ্চার করেছিল। গ্রিক ভাষায় টেকনো শব্দের অর্থ হল টুলস। কোন টুলকে যখন আমরা জগতের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি, তখন জগতের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বস্তুর সাথেও আমাদের সম্পর্ক হয়ে ওঠে অর্থহীন। এক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণী বা মানুষের সাথে সম্পর্কের জায়গা হয়ে ওঠে অর্থহীন।  পোস্ট হিস্টরিক্যাল পিরিয়ডে তার ভাষা থাকবে না।  এসময়ে তার হোমো স্যাপিয়েন্সের বাস্তবতায় কেবল প্রানিজ সত্তা হাজির থাকবে।  এখানেই মানুষের মানবীয় সত্তার মৃত্যু ঘটবে।  জীবনের চূড়ান্ত অর্থ এক্ষেত্রে শূন্য।  তার ওপর শূন্যতাবাদ ভর করবে। মানুষের জীবনে মানবিকতা রূপ হাজির না থাকা মানে হল তার জীবনের কোন অর্থ নেই। এটাই নিটশের নিহিলিজম।

আলেকজান্ডার কোজেভে ১৯২৯ সালে ‘মানুষ কীভাবে প্রাণী হয়ে ওঠে’তা নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন।  তার মতে, সব কিছু একদিন কালের অতলে নিমজ্জিত হবে, তখন মানুষের প্রজ্ঞা বা দর্শনের মৃত্যু ঘটবে, তখন কোন সুর মানুষকে আন্দোলিত করবে না, কিংবা শিল্পের নান্দনিকতায় আর ভাব থাকবে না। মানুষ তার সত্তার বিকাশের সাথে সাথে এমন জায়গায় স্থিত হবে যে, সে শিল্প, প্রজ্ঞা বা প্রজ্ঞা থেকে উৎসারিত বোধের দ্বারা তৃপ্ত হবে। পোস্ট হিস্টরিকাল পিরিয়ডে মানুষ এতটা প্রাচুর্য ও নিরাপত্তার মধ্যে থাকবে যে সে তার প্রয়োজনকে অনুভব করতে পারবে না। 

কালের পরম্পরায় একটি কাল থেকে কালোত্তীর্ণ পর্যায়ে কীভাবে মানুষ প্রাণী থেকে মানুষ হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তার অ-মানবিকীকরণ কীভাবে সংঘটিত হয়, তা উপজীব্য বিষয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল  মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা সার্বজনীন বিষয় হলেও প্রত্যেক মানুষ পোস্টহিস্টরির বিষয় নয়। পোস্ট হিস্ট্রিতে অ্যানিম্যালিটি কীভাবে তৈরি হয়? কোজেভে মূলত একটি বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে আরেকটিকে খারিজ করার প্রক্রিয়ার সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক তৈরি ও এ আলোকে প্রাণী ও মানুষের বৈপরীত্য আলোচনা করেছেন। আলো থাকে বলেই যেমন অন্ধকার নেই বলা সম্ভব হয়, ঠিক একইভাবে একটি বৈশিষ্ট্যকে স্বীকৃতি দেয়া বা তাকে প্রতিষ্ঠিত করা হল, অন্যগুলোকে বাতিল বা খারিজ করে দেয়া। এই আলোকেই মূলত কোজেভে ব্যাখ্যা করেন। এ ব্যাখ্যায় তিনি কেবল প্রাণী থেকে মানুষ হওয়াকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে আলোচনা করেননি। বরং আধুনিকতা যে ব্যক্তির জীবনের অর্থ খুঁজতে বা জীবনের প্রতি যত্নশীল হতে শুরু করেছে, ফলে মানুষের ন্যাচারাল লাইফ বিপন্ন হয়ে উঠছে।কারণ সে জীবনের অর্থ খোঁজার জন্যে তার যা প্রয়োজন সেটাকে বাতিল করে অর্থ খুঁজছে। ফুকো  এটাকে বলেছেন বায়ো পাওয়ার।  সতের শতক থেকে আধুনিক রাষ্ট্র  তার ভূখন্ডের জনসাধারণের রক্ষণাবেক্ষণের দায় গ্রহণ করে যে রাজনীতি তৈরি করে, তা হল বায়োপলিটিক্স।  এসময়ে এসেই পলিটিক্স, বায়োপলিটিক্সে রূপান্তরিত হয়।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা যে ক্লিনিক্যালি কারো মৃত্যুর বিষয় তদন্ত করি, তখন মূলত তার প্রানিজ সত্তার জীবন নিয়ে পরীক্ষা করা হয়।  মানুষ বলতে এমন এক সত্তা যা সবসময়ই মানবিক, পরস্পরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে সামাজিক, যে সত্তা তার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া টিকিয়ে রাখতে প্রাকৃতিক ও একই সঙ্গে আত্মিক, যে আত্মিকতা অতিমানবিকতাকে উপলব্ধি করতে পারে।  এক্ষেত্রে মানুষের প্রাণীজ ও মানবিক সত্তা দুটো এক করার মধ্য দিয়ে সোশিওপলিটিক্যাল জীবন তৈরি হয়, এই দুইটি অভেদকে পৃথক করার চেয়ে দুইটির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কীভাবে মানুষ থেকে অ-মানুষ তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়া আলোচনা করা শ্রেয়।  এতে বর্তমানের মানবাধিকারের বিষয়গুলো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মানুষ এবং প্রাণীর আরেকটি সুস্পষ্ট পার্থক্যের জায়গা হল কগনিটিভ এক্সপেরিয়েন্স। মানুষের কগনিটিভ ক্যাপাসিটি আছে। এ ক্যাপাসিটির দ্বারা সে যৌক্তিকভাবে ব্যখ্যা করতে সক্ষম।  এক্ষেত্রে মানুষ যখন সহিংস হয়ে ওঠে তখন তার কগিনিটিভ ক্যাপাসিটি থাকে না। সে সেই পরিবেশে পাশবিকতার পরিচয় বহন করে।  এক্ষেত্রে আরেকটি পার্থক্যের জায়গা সুস্পষ্ট হয় মানুষের ওয়ার্ল্ড আছে, প্রাণীর ওয়ার্ল্ড নেই, এনভায়রনমেন্ট আছে। এটাই প্রাণীর পোভার্টি অব ওয়ার্ল্ড।  হাইডেগার প্রানিবিজ্ঞানী ইউএক্সস্কুলের বায়োলজিক্যাল অবজারভেশনের আলোকে ব্যখ্যা করেছেন। আগাম্বেন তার এই ব্যাখ্যার পুনরূপয়ায়ন করেন। হাইডেগার ভাষাকে একটি টুল হিসেবে দেখেননি।  প্রাণী ও মানুষের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা হল জীবন্ত প্রাণী হিসেবে ভাষা প্রকাশের সক্ষমতা। আগাম্বেন তাঁর দ্য ওপেন: ম্যান এন্ড অ্যানিম্যালবইতে হাইডেগারের একটি উদাহরণ দেন, ‘The stone is worldless.’ এরঅর্থহলপাথরহলএমনএকটিজিনিস, যাকে বস্তু হিসেবে জগতের সাথে সম্পর্কিত করা যায়, কিন্তু সে নিজে জগতের সাথে তার সম্পর্ক প্রকাশ করতে পারে না। এটাই পাথরের অপ্রকাশ্যদিক।এদিক থেকে মানুষ নিজে তার জগত তৈরি করে।প্রাণীর একটা পরিবেশের সুনির্দিষ্ট কিছু জিনিসের সঙ্গেই সম্পর্ক থাকে। এ সম্পর্ক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ব্যাপারের আলোকেই তৈরি হয়। এ সম্পর্কের বাইরে অন্য কোন জিনিসের সঙ্গে প্রাণী সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। প্রাণী কেবল তার সাথে সম্পর্কিত বস্তুগুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকে। এই সচেতনতা তার প্রবৃত্তি বা ইন্সটিংক্ট সাপেক্ষ। মানুষ তার প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকে বা কোন ব্যাপারে তার সচেতন হওয়া প্রয়োজন সে বুঝতে পারে।

ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের এই আলোচনায় একটা জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান মোরালের নোশন পরিলক্ষিত হয়।  শেষের দিন মেসিয়ানিক ডিনারে রাইটাসরা প্যারাডাইসের গাছের ছায়ায় মুকুট পরিহিত অবস্থায় দুই বাদ্য বাদকের সুর শুনবেন। এই দিনের আইডিয়া এমন যে তোরাহকে সারাজীবন যারা অনুসরণ করে এসেছে, তাদেরকে লেভিয়াথন দিয়ে ফিস্ট দেয়া হবে। রাব্বিনিক ট্র্যাডিশনে বিহিমথ পিওর হয়ে যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল সেদিন রাইটাসরা মানুষের মাথা নয়, বরং তাদের পশুর মত মাথা থাকবে।

এজিকেলের এই আইডিয়াটি ইতালির মিলানের আম্ব্রোসিয়া লাইব্রেরিতে পাওয়া তের শতকের হিব্রু বাইবেলের।  ওয়েস্টার্ন ফিলসফি সম্পর্কিত এই আইডিয়াটি মূলত শরীরের গঠন সম্পর্কিত।  কালচারাল ও পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউটের গঠন, পরবর্তীতে এন্ড অব দ্য টাইমে ওয়েস্টার্ন চিন্তার গঠন।

এই আলোচনার উপজীব্য বিষয় হল নিও লিব্যারালিজমের জমানায় পোস্ট হিস্টরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সে হিউম্যান হিসেবে গ্লোব্যাল ক্যাপিটালিজমে আমাদের সকল কাজ শেষ। আগামী দিনে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, আমরা কোন দিকে এগোব, এর ওপর ভিত্তি করেই হিউম্যান বিয়িং হিসেবে আমাদের ডেস্টিনি, আমাদের প্রজাতির আইডেন্টিটি নির্ধারিত হবে। এর নজির স্পষ্ট হয় বুর্জোয়া ব্যাবস্থায় যেভাবে শরীরের ক্লোন করা হচ্ছে, রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে যেভাবে সবকিছুর নতুন রূপ বের করার প্রয়াস করার লক্ষণ থেকে। এ সবগুলো আলোচনার আলোকে ওয়েস্টার্ন কন্সেপশন অব মেনকে ব্যাখ্যার আলোকে বর্তমান সময়ের পলিটিক্সকে ব্যাখ্যা করা যায়।

বর্তমান রাজনীতিতে ফুঁকোর বায়োপাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ। বায়োপাওয়ার হল সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে স্টেটের মধ্যে বসবাসকারী নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা, রক্ষণাবেক্ষণের সামগ্রিক ক্ষমতা। যাকে অনেকটা বলা যায়, নাগরিকের বায়োলজিক্যাল ফাংশন দেখা শোনা করার কর্তৃত্ব গ্রহণ। ওয়েস্টার্ন পলিটিক্সে এটা স্টেট পাওয়ারের একটা ভিন্ন রূপ। এরিস্টটল ও আগাম্বেন হিউম্যান লাইফকে সাবস্ট্যান্স বা এসেন্স হিসেবে দেখেননি। এটি হল নিউট্রিটিভ ও ভেজেটিটিভ লাইফের স্ট্র্যাটেজিক ডিভিশন। ভেজিটিটিভ লাইফ হল আমাদের নিজেদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া ঠিক রাখতে তার জন্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সরবরাহ এবং নিউট্রিটিভ লাইফ হল এই উপাদানগুলো নিশ্চিত করেই নয় কেবল, এরপর এর বিকাশের ক্ষেত্রে মানবিক হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি। আর এই দুইটির স্ট্র্যাটেজিক ডিভিশনের মধ্যেই জীবন নিহিত।

সাধারনত হিউম্যানকে ধরা হয় আত্মা ও বডির সম্মিলন। হিউম্যান লাইফ তখনই চিন্তা করা যায়, যখন বেয়ার লাইফকে অ্যানিম্যাল লাইফের মধ্যে থাকে। এই দুইটির পৃথক করার মধ্য দিয়ে অ্যানিম্যাল ও বেয়ার লাইফের বিচ্ছেদ ঘটে। আগাম্বেন এই সেপারেশনকে আলোচনা করেন।তাঁর কাছে এই বিভাজনগুলো স্পষ্টভাবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মানুষকে অ-মানুষ থেকে এবং হিউম্যান থেকে অ্যানিম্যালকে। এর মধ্যেই হিউম্যান রাইটসের ভ্যালুগুলো নিহিত।

ধারণাকরাযায়, হাইডেগারইশেষদার্শনিক, যিনিরাজনীতির অবস্থান (Place in Polis)-এ হিউম্যান ও অ্যানিম্যালের এই প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দিকগুলোর সংঘাত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেন। তিনি অনুমান করেন যে এখন এই সংঘাতগুলোকে নিরসন করে হিউম্যান হিস্টরির গতিপথ সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব। এই অ্যান্থ্রোপলজিক্যাল মেশিনের আওতায় এই মানুষ, অ-মানুষ, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দিকগুলোর সংঘাতের মীমাংসা করে হিউম্যান হিস্টরি ও ডেস্টিনিকে পুনরায় সাজানো যায়।

মানুষের মৌলিক ধারণাটি ইউনিফাইড বা একেবারে ফিক্সড নয়। এর কেবল পজিটিভ বৈশিষ্ট্য আছে এমনও নয়। বরং নেতিবাচক ও অনির্দিষ্ট, একটা অদৃশ্যবিভাজনরেখা আছে। এক্ষেত্রে সমগ্র গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় ওয়েস্টার্ন পলিটিক্সের বিস্তৃতি ঘটছে এবং রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে স্ট্র্যাটেজি তৈরি হচ্ছে, হিউম্যান রাইটসের চর্চা হচ্ছে। একটি বিষয় হল যিনি মানুষের অধিকারের কথা বলেন, তিনিও মানুষ, আবার যার জন্যে বলেন তিনিও মানুষ। মানুষ হয়ে মানুষের অধিকারের কথা বলাটা দাবি করে সেখানে প্রকৃতপক্ষে মানুষের মানবীয় আচরণের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি অন্য কোন কারণে নয়, মানুষের মানবীয় রূপ থেকে সরে গিয়ে পাশবিকতা চর্চার কারণে।

এক্ষেত্রে পাশবিকীকরণ বা অ্যানিম্যালাইজেশনগুলো কীভাবে ঘটে, এর ধরনগুলো বোঝা জরুরি।

প্রথমত,

রাষ্ট্র যখন কোন নাগরিককে ক্রিমিনালাইজ করে এবং নাগরিকের অধিকার থাকা সত্ত্বেও সে অধিকার অনুসারে রাষ্ট্রের আইন প্রতিষ্ঠাকারী সংগঠন থেকে কোন সহযোগিতা না লাভ করে, তবে সেটা হল ডিহিউম্যানাইজেশন। ডিহিউম্যানাজেশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুত নাগরিককে যে অধিকার দেওয়ার কথা থাকে, সেটি দেয় না। এরপর টর্চার সেলে যখন কোন উদ্দেশ্যে টর্চার করে, বা মেরে ফেলে কিংবা এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং করে, তখন এটা অ্যানিম্যালাইজেশন।

হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান রাষ্ট্রে যে ইহুদি নিধন চালায়, তা ছিল অ্যানিম্যালাইজেশন। রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী নাগরিককে যখন রাষ্ট্রীয় কাজের অংশ হিসেবে নাগরিকের এরকম অধিকার হরণ ও পরে তার জীবন হরণ করা হয়, এর মধ্য দিয়ে তার মানুষ হিসেবে তার মানবিক রূপের মূল্য না দিয়ে বরং তার অ্যানিম্যাল লাইফকে হরণ করার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিকে নিশ্চিহ্ন করা হয়।

দ্বিতীয়ত,

এক একজন ব্যক্তি এক একটা বড় রাষ্ট্র। নিওলিবারালিজম ব্যক্তির যে স্বাতন্ত্র্যের চর্চা করে, সেই স্বাতন্ত্র্যে রাষ্ট্রের এরকম নিপীড়নমূলক আচরণ ব্যক্তিমানসেও দানা বাঁধে। সমাজে প্রত্যেক মানুষ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল ও সমান। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের চর্চা করতে গিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অপরের প্রতি হুংকার ছুঁড়াও অ্যানিম্যালাইজেশনের বহিঃপ্রকাশ। এজন্যেই সমাজে ভায়োলেন্স এক্সিস্ট করে। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে ভায়োলেন্স একটি সামাজিক ব্যাপার। বর্তমান সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসর অভিন্ন হওয়া ও মানুষে মানুষে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে সর্বস্তরে এটা প্রকট হয়ে উঠছে। প্রত্যেক সমাজেই একটা সেলফ এন্ড আদারের সম্পর্ক থাকে, সমাজে মানবিক সম্পর্ক রক্ষার মধ্য দিয়ে এ অধিকার তৈরি হয়। এ অধিকারের ব্যত্যয় ডিহিউম্যানাইজেশন নয়, বরং সরাসরি অ্যানিম্যালিটির বহিঃপ্রকাশ।

তৃতীয়ত,

ইতিহাসের নিরিখে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড পোস্টহিস্টরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এই সময়ের শুরু। পোস্ট হিস্টরির বিষয় হল অ্যান্ড অব দ্য রেকর্ডেড হিস্টরি। যেখানে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষের হিস্টরি এখন পর্যন্ত শেষের দিকে যায়নি, ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে পোস্ট হিস্টরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সের কথা বলছে? বরং এ কথা তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাকে অন্যান্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়াকেই সুস্পষ্ট করে।

১৯৮৯ সালে ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন ‘দ্য এন্ড অব দ্য হিস্টরি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’। পরে ১৯৯২ সালে এটি গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি লিবার‍্যাল ডেমোক্র্যাসির ভূয়সী প্রশংসা করেন। লিবার‍্যাল ডেমোক্র্যাসি, ক্যাপিটালিজমের জয় হল সামাজিক সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারায় বেস্ট প্রোডাক্ট। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা আসলে কার? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা ও ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের বাইরে যারা আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলছে, এক্ষেত্রে আমেরিকা ও ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের পোস্ট হিস্টরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স, ওয়ে অব লিভিং, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা কীভাবে অন্য অভিজ্ঞতার মানুষের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করছে?

গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের শুরু কোল্ড ওয়ার শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি হয়। এ পর্যায়ে যখন একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটি রাষ্ট্রের সম্পর্কের জায়গায় দাঁড়িয়ে, নিজস্ব রাষ্ট্র ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে আগামী দিনের পৃথিবীতে অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করা যেতে পারে বলে মনে করে, তখন তারা অর্থনীতির ওপর ভিত্তি করেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ওয়েস্টের নিজস্ব এক্সপেরিয়েন্স থেকে আগামী দিনের সম্ভাবনায় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে ইসলামকে।  আর দুনিয়াব্যাপী যত মুসলিম দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আধুনিক রাষ্ট্রের ছায়াতলে ছায়া হয়েছে, সে সকল রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পশ্চিমা দুনিয়ার পোস্ট হিস্টোরিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সে সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির দ্বারা পোস্টহিউম্যান কাজের অনুষঙ্গ তৈরি করতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এগুলোর সফল ব্যবহার করা হচ্ছে।  ফলে প্রথমত মানুষের বিপক্ষে এগুলোর ব্যবহারশুরু হয়েছে। আদর্শগত দ্বন্দ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করাচ্ছে ক্ষমতার লোভ। লেলিয়ে দিচ্ছে তালেবান হামলা, আইএসআই, বোকোহারাম, তালিবান, আল কায়দার মত বাহিনীগুলোকে।  এই আদর্শগত দ্বন্দ্ব তৈরি করার মধ্য দিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা জারি রেখে চূড়ান্ত রকমের পাশবিক সত্তা জাগ্রত করছে।

এক্ষেত্রে  পোস্ট হিউম্যান হিস্টরি সম্পর্কিত হাইডেগারের একটি মন্তব্য হল পোস্ট হিস্টরিক্যাল সময়ে মানুষের নিজের অ্যানিম্যালিটির ডিস্ক্লোজ হতেই হবে, কেননা হয় এসময় মানুষকে এর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা শিখতে হবে, নয়ত টেকনোলজি দিয়ে তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। এ নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে অনেকটাই মানবতাকে নিয়ন্ত্রিত করে পাশবিকতাকে ছেড়ে দেয়ার অর্থে হচ্ছে। কিন্তুআমাদের সুস্থ জীবন ও পৃথিবীর জন্যে প্রয়োজন পাশবিকতার পথ রুদ্ধ করে মানবিকতার দিক উন্মোচন করা। মানুষ তাঁর নিজের চালিকাশক্তি। তাই সে যেমন অনেককিছুর বিনাশ করতে পারে, তেমনি সৃষ্টিও করতে পারে। একইভাবে সে নিজের অপ্রকাশ্য সকল কিছুকে, পাশবিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

গোটা বিশ্বে এরকম বিভীষিকাময় পরিস্থিতিগুলো তেমন বেশি কিছু নয়, হেজিমোনি হিসেবে সকলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জনিত কারণে তৈরি।  এক একজায়গার নিজস্ব বৈচিত্র্য রয়েছে, সেই বৈচিত্র্যকে দূর করে রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, জীবনযাপন, আরামের স্বাদ একীভূত বা ইউনিফর্ম করার  যে প্রয়াস, এর ফলে আজকের দিনে ব্যক্তি বিশেষ, রাষ্ট্র কিংবা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতা বিস্তার, দুনিয়ার একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা দিনে দিনে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আজকের এই যে পোস্টহিস্ট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স সমগ্রটি আমেরিকার। পরে ইউরোপে এর বিস্তৃতি ঘটে। এখন তাদের এক্সপেরিয়েন্সকে সরাসরি যেগুলো পোস্টহিস্ট্রিক্যাল অভিজ্ঞতার অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের মধ্যে প্রেরণ করছে। এটাকে অনেকটা বলা যায়, Clash of civilization through culture with the domain of each nation’s social, political, economic, historical experience. আমাদের জীবন নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগোবে। আমরা নতুন নতুন ডাইমেনশন তৈরি করব। তবে মানুষের দুনিয়ায় মানুষের সত্তাকে পাশবিক সত্তায় নিয়ে গিয়ে কোন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয় না, হতে পারে না।  কাজেই পোস্টহিস্ট্রিক্যাল এক্সপেরিয়েন্সে পোস্ট হিউম্যান কার্যক্রম যেমনই হোক না কেন, মানুষের মানবিকতা ও পাশবিকতার প্রবণতা সম্পর্কে সচেতনতাই আমাদের এই ধরনের পাশবিকীকরণের বাস্তবতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

 

Related Posts

About The Author

Add Comment