শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

শহীদুল জহির (১৯৫৩-২০০৮)

শহীদুল জহির মুল নাম শহীদুল হক পরিবর্তন করে লিখে ফেলেন তার প্রথম উপন্যাস “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা”(১৯৯৪)। উপন্যাস পর্যালোচনা করার মতো অত মেধাবী এবং উৎকৃষ্ট লেখক আমি নই। বলতে গেলে ভালোলাগা থেকেই এই লেখা। বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার আদলে যারা লিখেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলেন শহীদুল জহির। প্রথম গল্পগ্রন্থ “পারাপার” দিয়েই লেখকস্বত্তা হিসেবে তার জাত চিনিয়েছেন তিনি। কিছুটা নিভৃতবাসী শহীদুল জহির অতি উৎসুক পাঠক ছাড়া অত বেশি পৌছাতে পারেননি বলেই আমার মনে হয়।

সে যাইহোক শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস “জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা” মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি উপন্যাস। মাত্র ৪৮ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসকে পাঠক প্রথমে প্রবন্ধ বলে ভাবতেই বেশি পঁছন্দ করবে। সংলাপ বিহীন এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন ঔপন্যাসিক শহীদুল জহির। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা তিনি তুলে ধরেছেন পুরাণ ঢাকার মানুষদের কথার অবয়ব দিয়ে। ‘পাকিস্তান মিলিটারি এক ঘন্টায় ৫০ হাজার বৎসর ধরে বুনে তোলা সভ্যতার চাদর ছিড়ে ফেলে’।

রাজাকারদের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অবাধ চলাফেরা আর মনুষ্যত্য বিকিয়ে দেওয়ার উল্লম্ফ প্রতিফলন দেখা যায় এই উপন্যাসের মাধ্যমে। ‘দাড়িয়ে প্রসাব করে বোতাম লাগানোর সময় ক্যাপ্টেনের হাতে প্রসাব লেগে যায় এবং সে তার ভেজা হাত নিজের পকেটে রুমাল না থাকায় বদু মওলানার পিঠের কাপড়ে মুুছে।পরে জানা গেছে যে তাকে ক্যাপ্টেন ছু্ঁয়েছিল এই ব্যাপারটির প্রতি সম্মান দেখানো এবং স্মৃতি ধরে রাখার জন্যই সে তার জোব্বাটি সংরক্ষন করে’। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বদু মওলানার রাজনীতিতে নাটকীয় প্রবেশের পরিবেশকে ঔপন্যাসিক বলছেন… ‘রাজনীতিতে চিরকালের বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, কাজেই অতীত ভুলে যাওয়া ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে মানুষের’। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্হার বাস্তবিক পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন এই সংলাপের মাধ্যমে।সবশেষে গল্পের কথক আব্দুল মজিদের বোনের (মোমেনা) নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে এক ধরনের হতাশা ফুটে উঠেছে অত্যন্ত বাস্তবতার নিরিখে।

‘কালক্রমে মানুষেরা দেখতে পায় যে বদু মওলানাকে (নামধারী লোককে) কিছুই আর বলার থাকে না তাদের; বরং বদু মওলানাই পুনরায় তাদের বলতে শুরু করে’।জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এমন বাস্তবিক প্রয়োগ শুধুমাত্র শহীদুল জহির বলেই সম্ভব হয়তোবা।

Related Posts

About The Author

Add Comment