শাহাদুজ্জামানের লেখালেখি

শাহাদুজ্জামানের লেখালেখি

একজন লেখকের কাছ থেকে অন্য লেখকদের বা তার পছন্দের লেখকদের গল্প শুনা কতটা উপভোগ্য হতে পারে তার সুন্দর নমুনা হচ্ছে শাহাদুজ্জামানের ‘লেখালেখি’ বইটি। কথা সাহিত্যে শাহাদুজ্জামান তার অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন এরই মধ্যে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরদের সিলসিলার যোগ্য উত্তরসুরী শাহাদুজ্জামান। অনুবাদেও রয়েছে তার নিপুণ দক্ষতা। অল্প কয়েকটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেও জানান দিয়েছেন সেক্ষেত্রে তার মুন্সিয়ানার কথা। ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত ‘লেখালেখি’ তে শাহাদুজ্জামান মূলত নিজের লেখালেখি, পছন্দের লেখক, প্রিয় বই ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

গত দুদিন শাহাদুজ্জামানের লেখালেখির সাথে থাকা সময়টা অনেক উপভোগ্য ছিল। এবং বাংলা ভাষার একজন সেরা লেখকের কাছ থেকে ‘লেখালেখি’ নিয়ে কথা শুনা ছিল খুবই শিক্ষণীয় একটি অভিজ্ঞতা। ‘লেখালেখি’তে উঠে এসেছে তার প্রিয় লেখকদের নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, শহীদুল জহিরের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ও আগ্রহের বিষয়টি টের পাওয়া যাবে বইটির বেশ বড় অংশ জুড়ে। শহীদুল জহিরকে নিয়ে তার ভালোবাসার কথা, তার অকাল মৃত্যুর বর্ণনা পাঠককে ছুঁয়ে যাবে।

আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমরা পাবো শাহাদুজ্জামানদের মতো উদীয়মান লেখকদের যোগ্য মেন্টর হিসেবে। নবীন লেখকদের সলতেটাতে আগুন উসকে দেওয়ার মতো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসদের অভাবটা অনুভব হবে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একেবারে অন্তরঙ্গ পরিচয় তুলে ধরেছেন শাহাদুজ্জামান। শাহাদুজ্জামানের বর্ণনাতে আমরা ঠিকই শুনতে পাবো ইলিয়াসের সেই দরাজ হাসি। এবং হাসির পেছনে বেদনাকে লুকিয়ে রাখার সফল প্রচেষ্টার প্রতিচ্ছবি! শেষ জীবনে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া এবং এক পা কেটে ফেলাসহ ইলিয়াসের করুণ মৃত্যুর বর্ণনা পাঠককে স্বস্তি দেবে না।

বইটিতে আছে তার অন্যতম কীর্তি ‘ক্রাচের কর্নেল’ নিয়ে কথাবার্তা। কিভাবে এর চিন্তা মাথায় আসলো, কিভাবে তার পিএইচডি গবেষণার থেকেও পরিশ্রম করে এই উপন্যাসটি প্রস্তুত করেছেন তার বর্ণনা। আমাদের সময়ের লেখকদের এই অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত হওয়া খুবই জরুরী। আমরা যেখানে খুব অল্পতেই তুষ্ট হয়ে যাই, খ্যাতির মোহে ডুবে যাই কিন্তু কাজের কাজ সৃষ্টিকর্মে সবচেয়ে কম শক্তি দেই তাদের জন্য খুবই উপযোগী পরামর্শ নিয়ে হাজির হবেন শাহাদুজ্জামান।

আর প্রথম লেখাটি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে। ‘রবীন্দ্রনাথ: ব্যক্তিগত কোলাজ’ শিরোনামের লেখাটিতে কিভাবে পারিবারিকভাবে লেখালেখির প্রতি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তার বর্ণনা আছে। বিশেষ করে তার বাবা যে তরুণ বয়সে সাহিত্যকর্মী হতে চেয়েছিল আবার বিভিন্ন ইতস্ততায় আক্রান্ত হয়ে বেশিদূর আগাতে পারেননি তার বর্ণনা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মতো একটি বড়সড় ফিগার কিভাবে চুনোপুটি সাহিত্যসেবীদের ভয় পাইয়ে দেয় শাহাদুজ্জামানের বাবার বেলায় সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। কিভাবে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাভাষীদের জীবন ধারায় অন্তরঙ্গ অনুসঙ্গ তার কথা উঠে এসেছে এই লেখাটিতে।

বইটির শেষ দুটি অধ্যায়ে রয়েছে দুটি সাক্ষাতকার; একটি তার নিজের নেওয়া এক বিদেশির আর অপরটি তার উপর নেওয়া একটি সাক্ষাতকার। প্রথমটির শিরোনাম হচ্ছে ‘ঝগড়াপুরের লেখক ইওস ভ্যান বুরদেনের সঙ্গে আলাপ’। এখানে স্বাধীনতা পরবর্তী কয়েক বছর বাংলাদেশে অবস্থান করা নেদারল্যান্ডের দুজন নাগরিকের বাংলাদেশের গ্রামের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। ইওস ভ্যান বুরদেনের সাথে থাকা অপর ডাচ নাগরিকটি ছিলেন তার বান্ধবী ইয়েনেকা আরেন্স। তারা বাংলাদেশের গ্রামীণ  সমাজ ও নারী বিষয়ে গবেষণার জন্য ১৯৭৪ সালের পুরো বছরটি কুষ্টিয়ার একটি গ্রামে কাটান। সেই অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ‘ঝগড়াপুর’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। গ্রামীণ জীবনে ঝগড়া কিভাবে একটি অবিচ্ছিন্ন অনুসঙ্গ তার উপর ভিত্তি করে লেখা বইটি। বইটি সেসময় যথেষ্ঠ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের গ্রাম গবেষনার ক্ষেত্রে একটি অনন্য দলিল হতে পারে ‘ঝগড়াপুর’ বইটি। শাহাদুজ্জামান সে বইটির লেখকদ্বয়ের একজন বুরদেনের সাক্ষাতকার নেন। সেখানে উঠে আসে একজন বিদেশীর চোখে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ, তার সমস্যা, তার গ্রাম ও মানুষের চিত্র। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কিভাবে ভালোবাসায় পড়লেন, কিভাবে গ্রামে অনেক কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়ে দীর্ঘদিন অবস্থান করলেন তার কথা উঠে এসেছে সাক্ষাতকারটিতে।

শেষের অধ্যায়টি হচ্ছে ‘আমার লেখালেখি: একটি সাক্ষাতকার’। লন্ডনভিত্তিক সংগঠন লিংক বাংলার পরিচালক মঞ্জুরুল আজিম পলাশ শাহাদুজ্জামানের এ সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছিলেন। তার সাথে ছিলেন টি.এম. কায়সার। একজন লেখকের ইন্টারভিউতে সাধারণত তার অন্তরঙ্গ পরিচয় উঠে আসে যদি সাক্ষাতকারগ্রহীতা প্রস্তুতি নিয়ে সেটা গ্রহণ করতে যান এবং সাক্ষাতকার গ্রহণে তার দক্ষতা থাকে। শাহাদুজ্জামানের সাক্ষাতকারটিতে লেখকের ভেতরকার রূপটি ফুটে উঠেছে বলে সাক্ষাতকারটিকে সফল বলা যেতেই পারে। এজন্য দুজনেরই ধন্যবাদ প্রাপ্য।

অন্য লেখাগুলো হচ্ছে ‘সুচরিত চৌধুরী: ঘুড়িটা সাদা কিন্তু লাল’, ‘মিলান কুন্ডেরার লাইফ ইজ এলসহোয়ার’, ও বইমেলা। শহীদুল জহীরকে নিয়ে লেখাটি হচ্ছে ‘শহীদুল জহিরের মৃত্যু: থেমে গেল দক্ষিণ মৈশুন্দি আর ভূতের গলির গল্প’। আছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নিয়ে দুটি লেখা এবং হাসান আজিজুল হক নিয়ে একটি লেখা। প্রত্যেকটা লেখাই পাঠককে আলোচ্য বিষয় বা ব্যক্তির খুব নিকটে নিয়ে যাবে। এক মোড়কে বাংলাদেশের কয়েকজন সেরা কথাসাহিত্যিকদের কথা শুনার জন্য শাহাদুজ্জামানের ‘লেখালেখি’ খুবই কাজের বই হতে পারে।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম

কামরাঙ্গীচর, ঢাকা

Related Posts

About The Author

Add Comment