শিদলাই ইউনিয়নের একটি অনন্য পদযাত্রার ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশের খুব কম গ্রামই রয়েছে যা তথাকথিত আদর্শ গ্রাম। এমনটা বললে অত্যুক্তি হবে না, রূপকথায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ সমাজ। অতীতে যে নেতিবাচক পরিস্থিতি ছিল না ব্যাপারটা এমন নয়। বরং দেশের বিভিন্ন অঙ্গে পচন ধরার মতো বর্তমানে গ্রামগুলোতেও পচন ধরেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটু বেশীই ধরেছে। গ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বেশ নড়বড়ে আকার ধারণ করেছে। আমরা বেশিরভাগই এগুলোকে সময়ের পরিবর্তনে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিই। আবার সমাজে ক্ষুদ্র একটি অংশ সবসময়ই থাকে যারা চোখ বুঝে, মুখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নেয় না।

ইতিহাসের এমন একটি অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করছে একটি ইউনিয়নের একদল যুবক।

এবার ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসে অসাধারণ এক কাজ করে বসলো কুমিল্লা জেলার বি-পাড়া থানার শিদলাই ইউনিয়নের একদল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র। সমাজের নানা সংকট ও অসঙ্গতি নিয়ে আয়োজন করলো একটি সচেতনতা মূলক পদযাত্রা।

পদযাত্রার তাত্পর্যবাহী সাদা কালো ব্যানার

পদযাত্রাকে ঘিরে ঈদপূর্ব এক সপ্তাহ ধরেই গ্রামের সচেতন তরুন, যুবকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছিল। প্রতিদিন বাজারে জমায়েত হয়ে নিজেদের মধ্যে প্লান-পরিকল্পনা শেয়ার করেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আয়োজক দলটি। আয়োজনটি বিভিন্ন দিক থেকেই তাত্পর্যবহ।

প্রথমত, এটি পুরোপুরি দল নিরপেক্ষ কর্মসূচি। তবে সব দল, মত ও পথেরই প্রতিনিধিত্ব ছিল এ পদযাত্রা আয়োজনে। সবার জন্য উন্মুক্ত এ আয়োজনে তাই অংশ নিয়েছেন কিশোর, তরুন, যুবকসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ।

দ্বিতীয়ত, এটি এক বা দুজন ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। এটি যৌথ বা সমষ্টিক নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। কোন এক বা দুই ব্যক্তির পরিচয়ে পরিচিতি পায়নি আয়োজনটি। আয়োজনে সবাই ছিল কর্মী, আবার সবাই ছিল নেতা।

সমাজে কুশিক্ষা, অবিচার ও মাদকের ভয়াবহতা বেড়েছে। অর্থের বিনিময়ে মিলছে বিচার (কিংবা অবিচার), শিক্ষা (কিংবা কুশিক্ষা) এবং মাদক (কিংবা মৃত্যু)।

তৃতীয়ত, স্রেফ একটি ইস্যু নিয়ে ছিল না এ আয়োজন। পারষ্পরিক সম্পর্কিত ১১ টি ইস্যু বা এজেন্ডা ছিল প্রতিপাদ্য বিষয়।

পদযাত্রার একটি বিশেষ মুহূর্ত

এই পদযাত্রা আয়োজনের পেছনে তাদের মূল বয়ান হচ্ছে:

সমাজে কুশিক্ষা, অবিচার ও মাদকের ভয়াবহতা বেড়েছে। অর্থের বিনিময়ে মিলছে বিচার (কিংবা অবিচার), শিক্ষা (কিংবা কুশিক্ষা) এবং মাদক (কিংবা মৃত্যু)।

ছোটদের প্রতি স্নেহ ও বড়দের প্রতি সম্মান-এ নিপাট বন্ধনে যে গ্রামীণ সমাজ শক্তিশালী ছিল তা আজ খুব দুর্বল ও নড়বড়ে। বড়দের মধ্যে ভেতর থেকে সম্মান করা লোকদের অভাব তীব্রভাবে লক্ষণীয়, আবার ছোটরাও বড়দের সম্মান করার শিক্ষা পাচ্ছে না।

স্বাগত বক্তব্য রাখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আশরাফুল আলম। পাশে উপস্থাপক লোকমান হোসাইন।

এমনতর পরিস্থিতিতে শিদলাই ইউনিয়নের যুবকদের এ আয়োজন খুবই অর্থবহ ঘটনা। তাদের বার্তা সুস্পষ্ট-এমনটা চলতে দেয়া যায় না।

  • অর্থের বিনিময়ে বিচার-শালিস করা যাবে না। এটা অবিচার।
  • কিশোর, যুবকদের মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হবে।
  • এবং কুশিক্ষা ও শিক্ষা বাণিজ্য রুখতে হবে।
  • যেসব ভিত্তির উপর একটি সমাজ দাড়িয়ে থাকে সেসব ভিত্তিগুলো মজবুত করতে হবে।

ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। জল বিনা পাত্র যেমন মূল্যহীন তেমনি পাত্র বিনা জলও অস্তিত্বহীন। এজন্যই ব্যক্তি মানুষ সত্য, সুন্দর ও ন্যায়বান হয়ে উঠার সাথে সাথে সত্য, সুন্দর ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ তৈরীর প্রয়োজন পড়ে। অন্যথা উভয়ই হারিয়ে যায়! আর তখনই রাজত্ব করে মিথ্যা, অসুন্দর ও অবিচার!

এ পদযাত্রা আয়োজনের পেছনে দার্শনিক ভিত্তি নিয়ে শিদলাই গ্রামের সন্তান ও পদযাত্রার অন্যতম আয়োজক দার্শনিক আরিফুর রহমান বলেন বলেন, ‘সত্য, সুন্দর ও ন্যায়বান মানুষ তৈরীর জন্য সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের দরকার হয়।  ব্যক্তি ও সমাজ একে অপরের পরিপূরক। জল বিনা পাত্র যেমন মূল্যহীন তেমনি পাত্র বিনা জলও অস্তিত্বহীন। এজন্যই ব্যক্তি মানুষ সত্য, সুন্দর ও ন্যায়বান হয়ে উঠার সাথে সাথে সত্য, সুন্দর ও ন্যায় ভিত্তিক সমাজ তৈরীর প্রয়োজন পড়ে। অন্যথা উভয়ই হারিয়ে যায়! আর তখনই রাজত্ব করে মিথ্যা, অসুন্দর ও অবিচার!’

পদযাত্রা-পূর্ব আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

পদযাত্রায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে অনুভূতি শেয়ার করতে গিয়ে ওই গ্রামে জন্ম নেয়া লেখক ও চিন্তক সাবিদিন ইব্রাহিম বলেন, ‘স্বাপ্নিক ও আদর্শ তরুনদের এ উদ্যোগে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসতে এ পদযাত্রা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের একজন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইকরামুল হক মোল্লা তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা আজ আমাদের পদযাত্রা সফল ভাবে সম্পন্ন করেছি। আমার জানা নেই বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন গ্রাম সচেতন ছাত্রদের উদ্যোগে এরকম কাজ করেছে কি না। ধন্যবাদ জানাই সকল উদ্যোগ গ্রহণকারী ভাইদেরকে যারা জ্ঞান দিয়ে, শ্রম দিয়ে নতুন সমাজের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।’

পদযাত্রার অন্যতম আয়োজক দার্শনিক আরিফুর রহমান আরো বলেন, ‘সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই’-এই স্লোগানের ভিত্তিতে আয়োজিত হয়েছে আমাদের সমাবেশ ও পদযাত্রা। আশা করি আমি বদলাবো, বদলাবে মানুষ এবং বদলাবে সমাজ। অংশগ্রহণকারী সকল ছাত্র, বন্ধু,ছোট ভাই,বড় ভাই এবং মুরুব্বিদের জানাই হূদয় গভীরের সত্য স্বচ্ছ ভালোবাসা। আশা করবো সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সবাই একত্রিত থাকবে চিরকাল।’

পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইদুল ইসলাম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘আমরা অনেকগুলো সাদা একত্রিত হয়ে আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দিলাম খানিকটা। এভাবেই আলোয় আলোয় দূরীভূত হউক সকল অন্ধকার, অন্যায় ও অনিয়ম।’

পদযাত্রা যখন শিদলাই বাজারে

পদযাত্রার অন্যতম আয়োজক দার্শনিক আরিফুর রহমান আরো বলেন, ‘সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই’-এই স্লোগানের ভিত্তিতে আয়োজিত হয়েছে আমাদের সমাবেশ ও পদযাত্রা। আশা করি আমি বদলাবো, বদলাবে মানুষ এবং বদলাবে সমাজ। অংশগ্রহণকারী সকল ছাত্র, বন্ধু,ছোট ভাই,বড় ভাই এবং মুরুব্বিদের জানাই হূদয় গভীরের সত্য স্বচ্ছ ভালোবাসা। আশা করবো সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সবাই একত্রিত থাকবে চিরকাল।’

যে সব মহতি স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত হয়েছিল ছাত্র-যুবকদের ঈদ পরবর্তী পদযাত্রা:

১) সত্য, সুন্দর  ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ চাই

২) বিচারের নামে প্রহসন বন্ধ চাই

৩) জ্ঞানভিত্তিক আলোকিত সমাজ চাই

৪)বিচার ব্যবসার বিলোপ চাই

৫) সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার চাই

৬)সহ অবস্থান মূলক সমাজ চাই

৭) সত্যই হোক সমাজ ব্যবস্থার একমাত্র মানদণ্ড

৮)শিক্ষার নামে রিমান্ড বন্ধ করি

৯)ছাত্রদের স্বশিক্ষায় উৎসাহিত করি

১০) ভিন্ন মত কে শ্রদ্ধা করতে শিখি

১১)আমাদের কর্তব্য ও অধিকার সর্ম্পকে সচেতন হই

পদযাত্রা শুরুর পূর্বে শিদলাই মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে একটি আলোচনা সভা আয়োজিত হয়। এখানে উপস্থিত তরুণদের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও সংক্ষিপ্ত আলোচনা রেখেছেন। লোকমান হোসাইনের উপস্থাপনায় আলোচকদের মধ্যে ছিলেন আশরাফুল আলম, আসাদুজ্জামান সৌরভ, রুহুল আমিন, ফরমান উল্লাহ, জুবায়েদ আল মাসুদ, আরিফুর রহমান, সাবিদিন ইব্রাহিম প্রমুখ। এছাড়া শিদলাইয়ের সর্বজন সম্মানিত আলেম মাওলানা শহীদুল্লাহ ফরায়জিও এসে যোগ দেন এবং সংক্ষিপ্ত আলোচনা রাখেন।

পদযাত্রা যখন শিদলাই ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড অতিক্রম করছিল

প্রথম পর্ব সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা শেষে মাদ্রাসা মাঠ থেকে পদযাত্রা শুরু হয়ে দক্ষিন শিদলাইন নাজনীন হাইস্কুল মাঠ প্রাঙ্গনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে দ্বিতীয় দফা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহ পরান, শহীদুল্লাহ, সাইদুল ইসলাম, শাহজালার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জসিম উদ্দিন (সম্রাট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিহাবুল ইসলাম শাওন, সালাউদ্দিন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ার ছাত্র ইয়াসিন আরাফাতসহ বেশ কয়েকজন তরুন।

পদযাত্রার ভিডিও:

https://www.facebook.com/ashraful.alam.75685962/videos/pcb.1772273649557086/1772270866224031/?type=3&theater

দ্বিতীয় দফা আলোচনা পর্ব শেষে পদযাত্রা আবার শিদলাই বাজারের দিকে রওয়ানা হয়। শিদলাই আশরাফ হাইস্কুল, শিদলাই আমির হোসেন জোবেদা কলেজ প্রাঙ্গন হয়ে ঐতিহ্যবাহী শিদলাই বাজারে এসে পদযাত্রাটি শেষ হয়।

এবারের মতো পদযাত্রাটি শেষ হলেও তরুনদের মধ্যে নানা আশা ও স্বপ্নের বীজ বপন করে দিয়ে গেছে এটি।

দার্শনিক আরিফুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একাংশ: https://www.facebook.com/sabidin.ibrahim/videos/538123456631812/

এবং সে স্বপ্ন ও আশাটি হলো-একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ।

তরুনদের এ উদ্যোগ সফল হউক, তা যদি পুরোপুরি সফলও না হয় তা ভবিষ্যতে অসংখ্যা স্বাপ্নিক তরুনদের পথ দেখাবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস।

 

ছবি ক্রেডিট: রুহুল আমিন

Related Posts

About The Author

2 Comments

Add Comment