শেখ মুজিব আমার পিতা

বই : শেখ মুজিব আমার পিতা

লেখিকা : শেখ হাসিনা

শুরুতে বলে নিতে চাই, এই বইটি পড়ে জ্ঞান উৎসাহী পাঠকরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে একটি কথা স্বীকার করবেন যে, তিনি একজন অসাধারণ পাঠক। একজন পাঠকই একজন অসাধারণ লেখকে পরিনত হন। জ্ঞান অন্বেষণে লেখিকার আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করেছে। একজন রাজনীতিবীদ হয়েও সাহিত্য অঙ্গনে তার পদচারণার মূল দুটি কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করলাম। প্রথমত: বঙ্গবন্ধু নিজেও একজন অসাধারণ পাঠক ছিলেন এবং ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর গড়ে তোলা লাইব্রেরিটি পারিবারিক উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে। দ্বিতীয়ত: শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে অধ্যয়ন করেছেন। তাই সাহিত্য রস আহরণে তার আগ্রহ ছিল অত্যাধিক। পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনায়েকরাই তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে বই প্রকাশ করার চেষ্ট করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্রই পরিলক্ষিত হয়েছে।ইতিহাসকে ধারণ করার নিয়ামক সৃষ্টিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। বঙ্গবন্ধুর লিখিত অসমাপ্ত আত্মজীবনীটিও সত্যিকার অর্থেই একটি খন্ডিত ইতিহাস। যেখানে শুধু দেশভাগ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত ঘটনাসমূহ স্থান পেয়েছে।আজ যদি ১৯৬৯ থেকে স্বাধীনতা কিংবা ১৯৭৫ পর্যন্ত ইতিহাস বঙ্গবন্ধুর স্বরচিত হতো, তাহলে জাতির এ দ্বিধা বিভ্রান্ত এতটা নোংরা পর্যায়ে যেত না।

যাই হোক শেখ মুজিব আমার পিতা বইটি মূলত ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তার লেখা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ ও সংকলনের সংগ্রহ। বইটি তে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকান্ড এবং একজন সন্তান হয়ে বাবার নৃশংস হত্যাকান্ডের বোঝা বহনের যন্ত্রণা প্রকাশ করেছেন। প্রায় দশটি প্রবন্ধে সাজানো এই বইটিতে শেখ হাসিনা তার লেখনী প্রতিভার অসাধারণ নৈপূণ্য দেখিয়েছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র মতো মধুমতি নদীর তীর ঘেষে গড়ে উঠা টুঙ্গপাড়ার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন আপন মহিমায়। টুঙ্গিপাড়ার সৌন্দর্য তোলে ধরতে গিয়ে লেখিকা বলেছে ‘‘নদীর দুপাশে তাল, তমাল, হিজল গাছের সবুজ সমারোহ। ভাটিয়ালি গানের সুর ভেসে আসে হালধরা মাঝির কণ্ঠ থেকে, পাখির গান আর নদীর কলকল ধ্বনি এক অপূর্ব মনোরম পরিবেশ গড়ে তোলে”। টুঙ্গীপাড়া গ্রামে নদীর পাশে একটি ঘর বানিয়ে জীবনের শেষ সময়গুলো ব্যায় করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এ লেখিকা।

বইতে বঙ্গবন্ধু ও তার সেনাবাহিনী এবং কিছু বিপদগামী নরপিশাচদের ন্যাক্কারজনক ১৫ আগস্টের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বুঝাতে চেয়েছেন, জাতির পিতার হত্যার জন্য তিনি সব সেনাবাহিনীকে দোষারোপ করছেন না। পরাজিতরাই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে জাতির জনককে হত্যা করেছে।এবং পরবর্তী সময় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে এই হায়নারা কেমন করে আশ্রিত-পালিত হয়েছে তার ঘটনা প্রবাহ আলোকপাত করেছেন।

শহীদ জননী জাহানার ইমামের করুণ পরিনতি এবং রাষ্ট্রর তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতি যে প্রীতি প্রদর্শন তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। স্বৈরাচারী আন্দোলনে তার নেতা কর্মীদের নিপীড়ণ এবং পিঠে বুকে গনতন্ত্রের স্লোগান বহনকরী নুর হোসেনের আত্মদান খুব করুণভাবে তোলে ধরেছেন একজন বোন হয়ে।

বইটি পড়ে শেখ হাসিনার সাথে আজ নতুনভাবে পরিচিত হলাম। আট দশটা সাধারণ বঙ্গালি মেয়ের মতো টুঙ্গিপাড়ায় পরবর্তীতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বেড়ে উঠা শেখ হাসিনা বাংলাদেশ তথা বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র নায়েক হিসেবে গড়ে উঠার পিছনের ইতিহাসটা যে কোন মানুষকেই উৎসাহিত করবে বলে মনে করছি। দূর থেকে একজন মানুষকে যতকিছুই মনে হোকনা কেন, কাছ থেকে দেখা মানুষটির রূপ অবশ্যই অন্যরকম এবং নির্মল। পরিবার-পরিজন হারিয়েও ধৈর্য ধরে রেখে নিজেকে টিকিয়ে রাখা লেখিকার চিন্তা-দর্শন সম্পর্কে জানতে আরো পড়তে পারেন তার রচিত- ওরা টোকাই কেন?, বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, দারিদ্র দূরীকরণ: কিছু চিন্তাভাবনা, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র & People & Democracy.

একজন মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে বইয়ের কোন বিকল্প নেই।

লেখক : আক্তারুজ্জামান রনি

Related Posts

About The Author

Add Comment